ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য হলেও নতুন কিছু নয়। আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহই ঘটছে। প্রতিনিয়তই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে, উঠতি বয়সী মেয়েরা। ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরই সহপাঠী, সমবয়সী কিংবা ভিন্ন বয়সের প্রেমিক পুরুষগণ। কিন্তু যে সমাজে ধর্ষণ একটি সহনীয় বিষয়; যেখানে কলঙ্ক ছেলেদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে না, কিন্তু কলঙ্কের ডালি মাথায় নিয়ে মেয়েদের আত্মহত্যা করতে হয়, সে সমাজে তো এমন ঘটনা প্রাত্যহিক ঘটবে, তাই না?

ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি। কয়েক দিন আগে ফোন করে  একটি মেয়ে, (নাম দিলাম শিউলি) জানাল, তিন চার মাস আগে থেকে তার সাথে পার্শবর্তী এক গ্রামের একটি ছেলের পরিচয়  হয়। ছেলেটি তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু মেয়ের পরিবার তাতে রাজি নয়। কিন্তু ছেলেটি তার জন্য পাগল। তাকে বিয়ে করতে পারবে না জেনে ছেলেটি নাকি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে চয়েছিল। ছেলেটি দেখতেও বেশি ভাল নয়। তবে তাকে শিউলিও ভালবেসে ফেলেছে। শিউলির ভাবাবেগপূর্ণ যুক্তি, কেউ যদি শিউলির প্রেমে বঞ্চিত হয়ে বিষ খেতে পারে, তাহলে শিউলিরও উচিত সে ছেলেকে ভালবাসা। তবে ছেলেটি সম্পর্কে শিউলি বিস্তারিত কিছু জানেনা।

অবশ্য পরে জানা গেল, ছেলেটি মাত্র এসএসসি পাশ। তার পরিবারের অবস্থাও তেমন স্বচ্চল নয়। একটি বেসরকারি প্রকল্পে সে কাজ করে। বেতন যৎ সামান্য। প্রকল্পটিও ছোট ও ক্ষণস্থায়ী। মানুষ হিসেবেও ছেলেটি সুবিধার নয়। এলাকায় মাস্তানি আর বখাটেপনার দুর্নাম আছে। এমতাবস্থায, একটি স্বচ্ছল পরিবারের কোন মেয়েকে দিয়ে এমন ছেলের বিয়ে দিতে মেয়ের অভিভাবকগণ যে রাজি হবেন না, তাই স্বাভাবিক।

কিন্তু শিউলি আমাকে যা জানাল, তা রীতিমত ভয়ংকর। বই কেনার ছলে বাড়ির বাইরে গিয়ে ছেলেটির সাথে সে সাক্ষাৎ করে। ছেলেটি আরও দুই সহযোগীসহ তাকে দূরবর্তী একটি পিকনিক স্পটে নিয়ে যায়। সেখানে একটি ঘরে তাকে নিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলেটি যৌন মিলন করে। শিউলির কোন মানা সে শোনেনি, তার কোমল দেহের তিব্র প্রতিরোধ কোন কাজেই আসেনি। সে অনাকাঙ্খিতভাবে কৌতূহলে পাত্তা দিতে গিয়ে সেই প্রেমিক পুরুষের কাছে সতিত্ব খুইয়ে সর্বশান্ত হয়েছে।

ঘটনার পর প্রায় চার/পাঁচ দিন নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে শিউলি। সে কি ঘটনাটি কাউকে জানাবে, না বেমালুম চেপে যাবে? সে কি এই লোকটিকে বিয়ে করবে, না করবে না? সে কি একজন উন্মত্ত প্রেমিক, না একজন নিছক যৌন অপরাধী? সে কি ভাল লোক, নাকি একজন নিছক ধর্ষক? তাকে কি বিয়ে করে সুখি হওয়া সম্ভব, না শুধু ইজ্জত হরণকারীর কাছে ইজ্জত দিয়ে নিজের জীবনকে তার হাতে তুলে দেয়ার মধ্যেই সব কিছু শেষ?

এদিকে এই লোকটি বারংবার শিউলিকে ফোন করেই যাচ্ছে।‘তোমাকে তো যা করার তাই করেছি। শুধু তাই নয়, তোমার সাথে আমার যৌন মিলনের সব কিছুই ভিডিওতে ধারণ করেছি। এবার তোমার বাবা-মা আমাকে দিয়ে যদি তোমার বিয়ে না দেয়, তাহলে এই ভিডিও ও ছবি বাজারে ছেড়ে দিব, ইন্টারনেটে আপলোড করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করব যাতে তোমার পরিবারের কেউ দুনিয়ায় মুখ দেখাতে পারবে না।’

 

এমন ঘটনা জানার যে কেউ মর্মাহত হবেন। আমার মতো যারা আইন প্রয়োগকারীদের ভূমিকায় থাকেন তারা যথেষ্ঠ বিরক্ত হবেন। সেই বিবাহ প্রত্যাশি যা করেছে সেটা রীতিমত জঘন্য অপরাধ। একটি সহজ সরল মেয়েকে ভুলিয়েভালিয়ে এক নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে সে যা যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু সে যে সুযোগটি নেয়ার চেষ্টা করেছে সে সুযোগ পাওয়ার যথেষ্ঠ সামাজিক নিরাপত্তা তার রয়েছে।

 

এখন শিউলি যদি এ বিষয়ে থানায় মামলা করতে চায়, তাহলে বিষয়টি সর্বত্র জানাজানি হয়ে যাবে। পুলিশ বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করলেও শিউলিকে যে জোরপূর্বক সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়নি, সেটাও অবলিলায় তারা ধরে নিবে। অন্যদিকে ঘটনার এক সপ্তাহ পর বিষয়টি অভিভাবক মহলে জানাজানি ও তারও অনেক পরে মামলা করার বিষয়টি বিচারিক পর্যায়ে সন্দেহের উদ্রেক করবে। যদি ভিকটিম এটাকে তার বিরুদ্ধে অপরাধই মনে করবে, তাহলে এত পরে থানায় অভিযোগ করা হবে কেন? উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির একজন ছাত্রীর বিবাহ বা যৌনকর্মে সম্মতি দেয়ার মতো যথেষ্ঠ আইনগত বয়স হয়েছে। তাই তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আচরণ কথিত অপরাধীর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকেই বোঝাবে।

 

অন্যদিকে যদি এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যদি এ প্রেমিকরূপী ধর্ষ কভিডিও ও ছবিসমূহ (যা সে ধারণ করেছে বলে হুমকী দিচ্ছে) বাইরে প্রকাশ করে তবে সেটাও হবে কোন মেয়ের পরিবারের জন্য আত্মহত্যা উদ্রেককারী অপমানের। যদি ভবিষ্যতে সেগুলো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে অর্থাৎ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা সিডিতে ছড়িয়ে পড়ে তবে এ নিয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইন-২০০৬ কিংবা পর্নগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ তে মামলা করা যেতে পারে এবং এসব আইন অনুসারে তার শাস্তিও হবে। কিন্তু এসব করে তো মেয়েটির কোন উপকার হবে না। এত কিছু হলে তাকে কেউ বিয়েও করবে না। যদি ইতোমধ্যে বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে তার সে সংসারও টিকবে না। আমাদের বাঙালি সমাজের দোষারোপের ধারা অনুসারে ছেলেটিকে নয়, বরং মেয়েটিকেই সমাজ দোষারোপ করবে। সমাজর বিচার অনুসারে ছেলেটি নয়, মেয়েটিই কলঙ্কিত মনে করা হবে। তাই ছেলেটির সাজা হলেও সে এসমাজে বেঁচে থাকবে, কিন্তু মেয়েটি বিচার পেলেও চূড়ান্তভাবে আর বেঁচে থাকতে পারবে না; সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে।

 

প্রেমে প্রলোভন দেখিয়ে সতিত্ব হরণ আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ পুরাতন প্রতারণার মধ্যে নতুন অনুসঙ্গটি হল যৌনক্রিয়ার স্থির ও ভিডিও চিত্র ধারণ করে তা জনসম্মুখে প্রচার করা বা করার হুমকী দিয়ে ভিকটিমের কাছ থেকে অধিকতর মূল্যবান কিছু আদায় করা। ইলেক্ট্রনিক্স বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে সাইবার স্পেসের বিস্তৃতি আমাদের সমাজকে যতটা উন্নতির দিতে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক ততোটাই পিছনের দিকেও নিয়ে যাচ্ছে।

 

আজ থেকে ১০ বছর আগে হলেও শিউলির মতো মেয়েদের প্রতারিত হওয়াটা একটি নির্দিষ্ট গ্রাম বা মহল্লার মধ্যেই সীমিত থাকত। কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরা সহজলভ্যতা ও ইন্টারনেটে প্রবেশের তাৎক্ষণিকতা শিউলির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত করে দিতে পারে। আর এ ঝুঁকি শিউলির মতো মেয়েদের আত্মহত্যার দিকে দ্রুত ধাবিত করে।

 

আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এদেশে সমাজের হাত আইনের হাতের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও দীর্ঘ। কোন মেয়েকে প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে তার সাথে যৌনকর্ম করে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকীর জন্য আমাদের আইনে অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য দেশে পৃথক আইন ও পৃথক ট্রাইবুনাল রয়েছে। কিন্তু এত কিছু থাকার পরও এজাতীয় ঘটনার অধিকাংশ ভিকটিমই আইনের আশ্রয় গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। এ অনীহা শুধু যে পুলিশের প্রতি মানুষের সাধারণ অবিশ্বাস বা অনাস্থার জন্যই—কিন্তু নয়। এ অনীহা সমাজ প্রদত্ত শাস্তির ভয়ের অনীহা।  আইনের হাত আছে; কিন্তু চোখ নেই। কিন্তু সমাজের আইনের হাতও আছে চোখও আছে। আমাদের বর্তমান সমাজের আইন ও চোখ উভয়েই নারীর বিরুদ্ধে। তাই সমাজের চোখের ভয়ে হাজারও প্রতারণা, অন্যায় ও ক্ষতিকে নারীরা অবলিলায় মেনে নেয়।

 

আমাদের সমাজে অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে অপরাধীদের অপরাধ প্রক্রিয়া ও ধরনে আসছে নৃশংসতা ও ধ্বংসযোগ্যতায় অভিনবত্ব। কিন্তু আমাদের সমাজের মূল্যবোধগুলো এখনও পূর্ববস্থায় রয়েছে। আমাদের সনাতনী মূল্যবোধের জন্যই হয়তো অপরাধীগণ আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায়, সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করে নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রচেষ্টা গ্রহণ করা অবশ্যক।

 

 

বি.দ্র.: সত্য ঘটনা হলেও স্থান, ভিকটিম ও অপরাধীর নাম গোপন রাখা হয়েছে।