ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

সন্ধ্যায় আমার ছেলে সাত্ত্বিককে নিয়ে হাঁটতে বের হলাম।আজিমপুর বাসস্টান্ড পার হয়ে পলাসী মোড় ঘুরে নীলক্ষেতের দিকে হাঁটতে থাকলাম। ইডেন কলেজের পাঁচিল ঘেঁসে রাস্তার ফুটপাথে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বস্তি। দিনের বেলায় এ বস্তির মানুষগুলো খোলা আকাশের নিচে থাকে। আসে পাশেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায় তারা। কেউ ফেরি করে, কেউ পিঠার দোকান চালায়, কেউ রিকসাওলাদের জন্য ভাত তৈরি করে। রাতের বেলা পলিথিন দিয়ে তাবু তৈরি করে সেই তাবুর নিচেই ঘুমায়। মাঝে মাঝে এসব বস্তি ভেঙ্গেও দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও এসব সর্বহারা মানুষ রাস্তাকেই তাদের বাড়িঘর মনে করে রাস্তা কামড়ে ধরে পড়ে থাকে।

 

ছেলে সাত্ত্বিককে বললাম, ‘দেখে রাখ। এসব বস্তির জীবন। কে কি করছে। কে কোথায় কিভাবে আছে। বাচ্চারা কেমন আছে, বড়রা কেমন আছে। এরা কিভাবে জীবন যাপন করছে তার উপর একটি অনুচ্ছেদ লিখতে হবে।’ সাত্ত্বিক সব দেখতে থাকল।

 

এক সময় আমরা ফুট পাতের একটি রুটির দোকানে থামলাম।  এক মধ্যবয়সী পুরুষ আটার রুটি তৈরি করছে। চেলা কাঠের খড়িতে সেঁকা হচ্ছে ঠাণ্ডা পানিতে আটা গুলান রুটি। দোকানের পাশে খড়ির পালা। সামনে দুটো ব্রেঞ্চ। একটি  ডেগচিতে ডাল। জিজ্ঞাসায় বললেন, প্রতিটি রুটির দাম ৫ টাকা। কি দিয়ে রুটি খাব, জানতে চাইল ভদ্রলোক জানালেন, এঙ্কর কালাইর ডাল পাঁচ টাকা ও গুড়ের দাম ৩ টাকা। অবশ্য ডিমও পাওয়া যায়। প্রতিটি ডিমের দাম পড়বে ১৫ টাকা।

 

গল্পে গল্পে অনেক দূর গেলাম। রুটি বিক্রেতার পৈত্রিক নিবাস বরিশাল। কিন্তু তার শ্বশুর বাড়ি ফরিদপুর। অবশ্য তারা মাদারীপুরকেও ফরিদপুরের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে। ফরিদপুরেই তারা এখন স্থায়ী। ঢাকার কাছে কেরানিগঞ্জে তারা ভাড়ার বাসায় থাকে। ভদ্রলোকের তিন সন্তান নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেয়ে, মেয়ের জামাইসহ তারা এক বাসায় তিন হাজার টাকায় ভাড়া থাকে।

 

প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এ দম্পতি রুটির দোকান চালান। রাতে পুরুষটি রাস্তার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু তার স্ত্রী বাসায় চলে যান। নীলক্ষেত থেকে রিকসায় নয়া বাজারে ৩০ টাকা; নয়াবাজার থেকে টেম্পুতে কেরানিগঞ্জে ১৫ টাকা। প্রতি দিন এভাবেই তিনি আসা যাওয়া করেন।

 

প্রতিদিন প্রায় ১০ কেজি আটার রুটি তৈরি করেন এ দোকানদার দম্পতি। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন তার নীট রোজগার হল ৫০০ টাকা কিংবা তার একটু বেশি। আমি হিসেব করে দেখলাম, তার মাসিক নীট মুনাফা ১৫ হাজার টাকা। তবে তিনি মাসে ত্রিশ দিনই রোজগার করতে পারেন না। তাই তার মাসিক লাভ ১৫ হাজার টাকা নয় বলে জানান।

 

রাস্তার ফুটপাতের দোকানের কোন ভাড়া দিতে হয় না। তবে প্রতি দিনই তার বিভিন্ন স্থানে বখরা দিতে হয়। রাস্তায় পাহারারত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের প্রতিদিন দিতে হয় ৫০ টাকা করে। রাস্তার পাহারাদার ও মাস্তানগণ নিয়মিত বখরার বাইরেও তার দোকানের রুটি খায়; কিন্তু দাম দেয় না। প্রাত্যহিক এসব খরচের বাইরে প্রতি সপ্তাহে বখরা আছে ১৫০ টাকা। একজন সিভিল লোক এটা নিকটবর্তী আইনের অফিসের জন্য সংগ্রহ করে এ বখরা।

 

রাস্তায় অতি সাধারণ হাঁটার পোশাকে থাকায় রুটিওয়ালা আমার পেশা নিয়ে তেমন সন্দেহ করেন নি। তিনি অবলিলায় বললেন তার জীবনের কাহিনী। তার সংসার, পেশা, সন্তান, সুখ-দুঃখ সব কিছুই আমার কাছে তুলে ধরলেন। আমি তার খদ্দের হয়েই তার কাহিনী শুনলাম। আসার সময় তাকে দাম দিতে দিতে বললাম, আমিও আইনের লোক। তবে আপনাকে রুটির দাম দিলাম।  রুটি বিক্রেতা আমার প্রস্থান পথে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তার ভাবখানা এই যেন, তাহলে আইনের লোকও তার রুটির দাম দেয়!

(২৯ নভেম্বর, ২০২৪)