ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

উত্তরাঞ্চলের বোকাসোকা মানুষগুলোর উপনাম বা উপাধী হল মফিজ। এরা সাধারণত ঘরকুনো। তবে হাল আমলে মফিজদেরও মোবিলিটি বেড়েছে। মফিজরা নোয়াখাইল্লাদের মতোই ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এটা ভাল লক্ষ্ণণও বটে। অনেক মফিজ ঢাকায় এসে রিকসা চালাচ্ছে, কেউ কেউ রিকসা ভ্যানে করি শাকসব্জির ব্যবসাও করছে। এবং কিছু কিছু মফিজ রীতিমত ব্যবসাও ফেদে বসেছে। এবার আমি এমন এক ব্যবসায়ী মফিজের গল্প বলব।

আমার গল্পের এই মফিজটি উচ্চ শিক্ষিত। চাকরির ধান্ধায় অনেক দিন অনেক স্থানে ধর্না দিয়েছে। একবার বিসিএস পরীক্ষার লিখিত অংশে পাশ করার পর মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি কালে আমার কাছ থেকে কিছু পরামর্শ চাইল। মোবাইলের কথা তার শেষ হয় না। পরে তার চাকরি হল না। মফিজ এখনও বেকার।

কিছুদিন পূর্বে তার বাবা অবসরে গিয়েছেন। বাবার পেনশনের টাকা নিয়ে সে ব্যবসা শুরু করার জন্য ঢাকায় এসেছে। কিন্তু কি ব্যবসা করবে সে?

সে ডলারের ব্যবসা শুরু করল। এক সুইপার তাকে বলল, স্যার, আমি তো ময়লা সাফ করতে গিয়ে এক মাড়োয়ারীর বাড়ি থেকে ৪ হাজার ডলার পেয়েছিলাম। মাড়োয়ারী তো তার পরিবার নিয়ে ভারতে চলে গেছে। এখন এ ডলারগুলো নিয়ে আমি কি করব, স্যার? আমি যদি বাইরে বিক্রয় করতে চাই, আমাকে তো মানুষ সন্দেহ করবে; পুলিশে ধরবে। স্যার, আপনি আমার ডলারগুলো অল্প দামে কিনে নিন। আমার আলোচিত মফিজ মনে করল, এবার ডলার কিনে বড় লোক হব। সে নামমাত্র মূল্যে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় ৪ হাজার ডলার কিনল।

তার ভাগ্যটা খারাপ। ৫০ হাজার টাকার দিয়ে ডলারগুলো হাতে নেয়ার পরই দেখে আশে পাশে সাদা পোশাকের পুলিশ। এরা আস্ত ডিবি। তাকে খপ করে ধরে ফেলল। এই ব্যাটা, তোর ব্যাগে কি? ওরে বাপ রে বাপ! ডলার! এই ব্যাটা তোর ব্যাগে ডলার কেন? তোর কি লাইসেন্স আছে যে ডলারের ব্যবসা করবি? চল, এবার ডিবি অফিসে।

এবার মফিজ ঘাবড়ে গেল। কি আর করা যায়! একদিকে ডলারের লোভ অন্য দিকে ডিবি পুলিশের গ্রেফতারের ভয়। সে আমার কাছে ফোন দিল। আমিও প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ। যদি এই মফিজকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচেই কি করে?

তবে অবৈধ ব্যবসায়ীগণ পুলিশের কাছ থেকে বাঁচার জন্য ঘটনা স্থলেই একটা কিছু করতে চান। এ মফিজ আমাকে ফোন দিল বটে, কিন্তু কথিত ডিবির কাছ থেকে সে ঘটনাস্থল থেকেই বাঁচার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। বিকাশ নম্বর থেকে তার আত্মীয়রা কথিত ডিবির অফিসারদের কাছে টাকা পাঠিয়ে তাকে মুক্ত করেছে।

ডিবির কাছ থেকে বাঁচার পর এ নব্য ডলার ব্যবসায়ী মফিজ তার ক্রয় করা ডলারগুলো গুনতে শুরু করল। কিন্তু ডলারের তাড়া খুলতেই বেরিয়ে এল সাবানের বার। সাবানের বারের উপর দুই দিকে দুটো ডলারের নোট। নোটের ভিতর হুইল সাবানের বার।
মফিজ হায়, হায় করে উঠল। বাবাগো, আল্লা গো! আমাকে ডলারের পরিবর্তে সাবান দিয়ে সেই সুইপার পঞ্চাস হাজার টাকা নিয়ে গেল। তাহলে কি পুলিশগুলোও ভূয়া ছিল?

হ্যাঁ, পুলিশ, সুইপার, ডলারের তাড়া সব কিছুই ছিল ভূয়া। লোভের পাল্লায় পড়ে এ মফিজ তার সব কিছুই হারাল। এবার ফোনে আমার কাছে সে হাউ মাউ করে কান্না জুড়ে দিল। ভাই, আমাকে বাঁচান। আমার বাবার পেনশনের টাকাগুলো প্রতারকরা সব নিয়ে গেল। আমার বাবাও মরলেন, আমিও মরলাম।

আমার পেশাগত জীবনের শুরুতেই এ ধরনের প্রতারণার বিষয় ডিল করেছিলাম। এক পুলিশ সার্জেন্টের অবসরপ্রাপ্ত বাবা তার পেনশনের সমূদয় টাকা দিয়ে ডলার কিনেছিলেন। প্লানিং কমিশনে চাকরিরত এক ডেপুটি সেক্রেটারিও এ ধরনের এক প্রতারকের কাছ থেকে ডলার কিনে সর্বশান্ত হয়েছিলেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকায় এক ঔষধের দোকানী পুরো দুই লাখ টাকার ডলার কিনে এ ধরনের ভিম বারের টুকরো পেয়েছিলেন।

প্রায় সকল প্রতারকের প্রতারণার গল্প ঠিক এমনই। তবে সময়ের ব্যবধানে এ প্রতারক দলগুলোর মধ্যে নতুনত্ব এসেছে। তাদের প্রতারণার কৌশলকে তারা আরো শানিত করেছে; বিস্তৃত করেছে। এখন তারা সুইপারের ডলার মালিক হওয়ার গল্পের পাশাপাশি ভূয়া ডিবি পুলিশও সেজেছে। প্রতারক ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ অসহায়ত্বের মধ্যে ফেলে দেয়ার এটা একটা অভিনব কৌশল।

প্রতারণার অপরাধ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এ ধরায় শাস্তির পরিমাণ সর্বোচ্চ সাত বছরের জেল ও জরিমানা। আদালতে গেলে সহজে জামিনও পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা হল, বর্তমানে দণ্ডবিধির এ ধারাটি দুর্নীতি দমন কমিশনের সিডিউলভুক্ত। তাই পুলিশ সরাসরি এ ধারার অপরাধের মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করতে পারে না। তাই আমার এ দেশি মফিজকে চাইলেও আমি তাৎক্ষণিকভাবে কোন প্রতিকার দিতে পারছি না।(০৪/১২/২০১৪