ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
index

‘সত্য মামলা আগরতলা’ এর ৩৫ জন অভিযুক্তের অন্যতম ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দুই সার্জেন্ট। এরা হলেন সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৭ নম্বর আসামী) ও ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক(১১ নম্বর আসামী)। স্বশস্ত্র অভ্যূত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনার অভিযোগের তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার বিচার চলছিল। এ দুই সহকর্মী তৃতীয় পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ইউনিট লাইনের বন্দিশালায় বন্দি ছিলেন। তারা স্বভাবতই পাঞ্জাবীদের প্রতি খ্যাপা ছিলেন। তাই পাঞ্জাবী গার্ড়দের সাথে তাদের বচসা হয়েছিল। এই কথা কাটাকাটির প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পাঞ্জাবী গার্ড হাবিলদার মঞ্জুর হোসেন শাহ ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি  অতি ভোরে লেট্রিনে নিয়ে যাবার পথে তাদের পিছন দিকে থেকে গুলি করে প্রতিশোধ নেন। কিন্তু তারা তৎক্ষণাৎ শহীদ হননি। মরণাপন্ন অবস্থায় এ দুই দেশপ্রেমিককে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

 

সে সময় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শল্যচিকিৎসকের দায়িত্বরত ছিলেন ডা. মেজর এমএম আলী।  ডা. আলী দেখেন দুই সার্জেন্টই গুরুতর অসুস্থ। তাদের এক্ষুণি অপারেশন করা দরকার। অথচ তিনি একমাত্র শল্যচিকিৎসক। অধিকন্তু সেই সময় ঢাকার সিএমএইচ এ অপারেশন থিয়েটার ছিল মাত্র একটি।

 

দুজনের অবস্থাই এতটা গুরুতর ছিল যে একজনকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলে অন্যজনের বাঁচার আশা পরিত্যাগ করতে হয়। ডা. আলী অনেক চেষ্টা করেও অন্তত একজনকে বেসামরিক হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হন।

 

ডা. আলী প্রথমে গেলেন সার্জেন্ট জহুরুল হকের কাছে। জহুরুল হক ডাক্তারকে অনুরোধ করে বললেন, আমি ভালই আছি। ফজলুল হকের অবস্থা আমার চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। তাই তার অপারেশনটাই আগে করেন।

 

ডা. এবার গেলেন সার্জেন্ট ফজলুল হকের কাছে। ফজলুল হক বললেন, আমি ভালই আছি।আমার চেয়ে জহুরুল অনেক বেশি অসুস্থ। তাই তার চিকিৎসাটাই আগে করেন।

 

ডাক্তার আলী পড়লেন বিপদে। তিনি জানেন দুজনের অবস্থাই শোচনীয়। তিনি একমাত্র ডাক্তার। একজনের অপারেশন করতে কমপক্ষে ৭/৮ ঘন্টা সময় লাগবে। এর মধ্যে অন্যজনের জীবন নির্ঘাৎ বিপন্ন হবে। তিনি আবার জহুরুল হকের কাছে যান। কিন্তু জহুরুল হক তার সিদ্ধান্তে অটল। তিনি ফজলুল হকের আগে অপারেশনে রাজি নন। দুজনেই ঔদার্যে আকাশসম। একজনের জীবনের জন্য অন্যজন নিজেকে কোরবানি দিতে প্রস্তুত।

 

অবশেষে বিভ্রান্ত ডা. মেজর আলী নিজ সিদ্ধান্তে অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুতর সার্জেন্ট ফজলুল হকের অপারেশন করেন। ফজলুল হক আশঙ্কা মুক্ত হলেন। এর পর মুমূর্ষু সার্জেন্ট জহুরুল হকের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রয়োজনের চেয়ে ৭/৮ ঘন্টা পরে অপারেশন শুরু করায় অপরারেশন সফল হলেও বাঁচানো যায়নি সার্জেন্ট জহুরুল হককে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম শহীদ হয়ে রইলেন তিনি।

 

কী ভীষণ দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম এই দুই মুক্তিযোদ্ধার। জীবন-মৃত্যুর এমন চরম সন্ধিক্ষণেও তাদের মানবিক গুণাবলী, ঔদার্য ও দেশ প্রেমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে ডা. মেজর এমএম আলী ভীষণ অভিভূত হন। অভিভূত হই আমরাও।

 

সার্জেন্ট জহুরুল শহীদ হয়ে আমাদের মাঝে দেশপ্রেম, বীরত্ব আর ঔদার্য নিয়ে বেঁচে আছেন। তার স্মরণে স্বাধীনতার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল রাখা হয়। আমি সেই হলের একজন গর্বিত ছাত্র। তবে অকপটে স্বীকার করছি, ছাত্রাবস্থায় এ বীর সম্পর্কে আমি এত কিছু জানতাম না।

 

অন্যদিকে সার্জেন্ট ফজলুল হক পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে অবদান রাখেন। তিনি ১৯৭০ সালে এমপিএ, ১৯৭২ সালে এমসিএ ও ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৬ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালে এ বীর সন্তান মৃত্যুবরণ করেন।

 

( ৬ ডিসেম্বর, ২০১৪) (কর্নেল শওকত আলী (২০১১); সত্য মামলা আগরতলা;প্রথমা প্রকাশন; পৃষ্ঠা-১৪৪-১৪৫)