ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ধারাবাহিক খুনির  আবির্ভাব ও  তদন্ত শুরু

সোভিয়েত ভূখণ্ডে একজন যৌন বিকৃতকাম ধারাবাহিক খুনির অস্তিত্বের কল্পনা শুরু হয় চিকাটিলোর তৃতীয় খুনের পর। লাইউবভের শরীরে ২২ টি ছুরির আঘাতের চিহ্ন ও তার শরীরের বিকৃতির বিভৎসতায় পুলিশের অনুমান হয়, এ হত্যাকণ্ডের সাথে কিশোর অপরাধীগণ, কিংবা যৌনবিকৃতকাম অভ্যাসগত অপরাধীরা জড়িত থাকতে পারে। তাই পুলিশ ইতোপূর্বে সন্দেহকৃত কিংবা দণ্ডিত যৌন অপরাধিদের সন্দেহের তালিকায় রেখেই তাদের তদন্তকার্য পরিচালনা করতে থাকে। এ সময় অন্য একটি যৌন অপরাধের ঘটনায় দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে লাইউবভের হত্যার অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পূর্বেই সে আত্মহত্যা করলে পুলিশের লাইউবভ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এখানেই থেমে যায়।

তদন্তের জন্য টাস্কফোর্স

কিন্তু এরপর একই অঞ্চলে একাধিক নারী ও শিশুর লাশের আবির্ভাব পুলিশকে চিন্তিত করে তোলে। প্রত্যেকটি ঘটনায় ভিকটিমগণ নাবালিকা এবং তাদের শরীরে উপুর্যুপরি ছুরিকাহতের চিহ্ন ও বিকৃত লাশের সমরূপ অবস্থা সচেতন পুলিশ তদন্তকারীদের পাশ্চাত্যে জগতের বহুল আলোচিত ধারাবাহিক খুনিদের কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে থাকল।  ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পুলিশের হাতে থাকা একই ধরনের তিনটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য মস্কো থেকে মেজর ফেটিসভোকে রোস্টব-অন-ডনে পাঠিয়ে ১০ সদস্যের একটি টাক্সফোর্সের নেতৃত্বে দিতে বলা হল। মেজর ফেটিসভো তার দলে একজন তরুণ ফরেনসিক বিশ্লেষক ভিকটর বুরোকভকে অন্তর্ভুক্ত করলেন। সেই সময়ে অত্র অঞ্চলে বস্তুগত আলামত যেমন ফিংগারপ্রিন্ট,  ফুট প্রিন্ট, এবং ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত অন্যান্য বস্তুগত আলামত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বুরোকভের জুড়ি ছিল না। বুরোকভ একাধারে পুলিশ সাইন্স ও মার্শাল আর্টের এক্সপার্ট ছিলেন।

ধারাবাহিক  খুনির সরকারি ঘোষণা

এর অল্প পরেই শাকতি অঞ্চলে  এ সিরিজের চতুর্থ লাশটি উদ্ধার হল। এটা প্রায় ছয়মাস আগের হত্যাকাণ্ড ছিল। এটার অবস্থানও ছিল দ্বিতীয় মৃত দেহের অবস্থানের কাছাকাছি। লাশের শরীরের নির্যাতনের চিহ্নগুলো বলে দিল এটাও একই খুনির দ্বারা নিহত হয়েছিল। হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে না পারলেও পুলিশ আঁচ করতে পারল যে এ হত্যাকারী পূর্বসংস্কার বসতই হোক, আর পরিকল্পিতভাবেই হোক ভিকটিমদের চোখকে তার আক্রমনের প্রথম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। মৃত দেহ থেকে তাদের চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনা প্রমাণ করে যে হত্যাকাণ্ডের পরেও খুনি বেশ কিছুক্ষণ মৃতদেহের সাথে অবস্থান করে।

এর মাঝে একই ধরনের আরো কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটল। তাদের মধ্যে ৪৫ বছর বয়সী এক মহিলা ছিল এবং ছিল স্বল্প বয়সী বালকও। বৃদ্ধা মহিলার হত্যাকাণ্ডটি একই ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। তবে বালকদের হত্যাকাণ্ড ছিল একই ধরনের। তাই এসব ঘটনার পিছনে একজন না একাধিক ব্যক্তি রয়েছে, তা নিয়ে পুলিশ বড় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে। তবে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত পাবলিক প্রসিকিউটর ইতোপূর্বে সংঘটিত বালক ও বালিকাদের ৬টি হত্যাকাণ্ডকে একই সিরিজের অন্তর্ভুক্ত বলে  স্বীকার করেন।

খুনি সম্পর্কে নানামুখি কল্পনা

এ সময় হত্যাকারীর পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়েও নানামুখী ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটে। ভিকটিমদের নাড়ি-ভুঁড়ি বের করা, তাদের শরীরের অংগপ্রত্যঙ্গ কর্তন দেখে কেউ কেউ মনে করেন, এটা হয়ত সংঘবদ্ধ অংগ পাচারকারী দলের কেউ হবে। কেউ আবার ভাবতে থাকেন হয়তো  শয়তানের উপাসক (satanic cult) দলের কাজ । তবে অধিকাংশ পুলিশ অফিসারই মনে করতে থাকেন, হত্যাকারী হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন, সমকামী কিংবা কোন অভ্যাসগত শিশু ধর্ষক হবে। তাই পুলিশ অফিসারদের লক্ষ্য থাকল মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিগণ কিংবা ইতোপূর্বে যৌনঅপরাধে সাজা পাওয়া ব্যক্তিগণ।

একের পর এক মিথ্যা স্বীকারোক্তি

১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকজন তরুণ অপরাধী এ সিরিজ ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিতে থাকে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯ বছর বয়সী  ইউরি ক্যালেনিক। ক্যালেনিক একজন স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন যুকক ছিল। পুলিশের নির্যাতনে সে সেই সময়ের মধ্যে এ সিরিজের সাতটি হত্যাসহ আরো চারটি লুক্কায়িত ও তদন্তাধীন হত্যার কথা স্বীকার করল।এখন পুলিশ শুধু এ সব হত্যাকাণ্ডের সপক্ষে আলামত ও সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করল। যদিও আপাতত সমস্যার সমাধান হল এবং ক্যালেনিককে একজন উত্তম সন্দিগ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবুও বুরোকভের কাছে বিষয়টির পূর্ণ সমাধান হয়েছে বলে মনে হল না। ক্যালেনিক তার হত্যার ঘটনাস্থলে  পুলিশকে সরাসরি নিয়ে যেতে পারেনি। খুব সম্ভব নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ক্যালেনিক পুলিশ যা জানতে চেয়েছিল, তাই স্বীকার করেছে এবং পুলিশের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সে তার  স্বীকার করা হত্যাকাণ্ডগুলোর গল্প তৈরি করেছিল। (অসমাপ্ত)