ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

রুশ ইতিহাসে প্রথম অপরাধ প্রোফাইলিং

নানা প্রকার কৌশলের পরেও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা ও হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ  হওয়া  রুশ পুলিশ এবার পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের বাইরে মনোচিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। ক্যাপ্টেন বুরোকভ প্রথম থেকেই সিরিয়াল কিলিং সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানার্জনে বেশ সময় অতিবাহিত করতেন। তিনি জানতেন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে সিরিয়াল কিলারদের শনাক্ত করার জন্য পুলিশ মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা গ্রহণ করে অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। পাশ্চাত্য জগতে অপরাধী শনাক্ত করতে মনোচিকিৎসকদের পরামর্শসহ অন্যান্য বিষয়কে ‘অপরাধ-প্রোফাইলিং’ বলা হয়। ক্যাপ্টেন বুরোকভ সেই ধারণা থেকেই মস্কোর বেশ কয়েকজন মনোচিকিৎসকের দারস্থ হলেন। কিন্তু কেউ তার এই অস্বাভাবিক কাজে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে রাজি হলেন না। সবাই মনে করতেন, একটি সাইকোলোজিক্যাল প্রোফইল তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বুরোকভের হাতে নেই।

অবশেষে আলেকজান্ডার বুখানোভস্কি নামে একজন সাইকিয়াট্রিক বুরোকভের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। বুরোকভের দেয়া সামান্য তথ্যের সাথে অপরাধস্থলের প্যাটার্ন বিবেচনায় নিয়ে তিনি অজানা অপরাধীর বর্ণনা দিয়ে মাত্র সাত পৃষ্ঠার একটি সাইকোলোজিক্যাল প্রোফাইল তৈরি করলেন।

PG6-Aleksandr-Bukhanovsky

অপরাধ প্রোফাইলিং অনুসারে খুনির বর্ণনা

বুখানোভস্তিকর প্রোফাইল মতে, খুনি একজন বিকৃত যৌনকামী। তার বয়স ২৫-৫০ বছরের মধ্যে। তার উচ্চতা পাঁচফুট দশ ইঞ্চির মতো। তার মতে খুনি এক প্রকার যৌন অপূর্ণতায় ভোগেন। ভিকটিম যাতে সরাসরি তাকে দেখতে না পারে সে জন্য তিনি ভিকটিমের চোখ বেঁধে রাখেন। তিনি ভিকটিমের শরীর বিকৃত করেন কিছুটা হতাশা গ্রস্ততার জন্য ও কিছুটা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য। সে একজন ধর্ষকামী ও নৃশংসতার মাধ্যমেই সে তার ধর্ষকামের অস্বস্তি হ্রাস করেন। সে শারীরিকভাবে সব সময় হত্যার নেশায় বুধ থাকে এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না করলে তার শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না। তার মাথা ধরার অসুখ থাকতে পারে। তবে সে সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগি নয়। সে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যা পরিকল্পনা তৈরি করে তা সুচারুরূপে বাস্তবায়ন করতে জানে। সবচেয়ে বড় কথা হল, সে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। হত্যাকাণ্ডে তার কোন সহযোগী নেই।

অপরাধ প্রোফাইলিং বুরোকভের পছন্দ হল না

আলেকজান্ডার বুখানোভস্কির প্রোফাইলে বুরাকভের খুব বেশি উপরকার হল বলে মনে হয় না। তবে এ প্রোফাইল থেকে পাওয়া খুনির যৌন বিকৃতির তথ্যটি বুরাকভকে এলাকার সমকামী অপরাধীদের উপর জোন নজর দিতে উৎসাহিত করে। এরপর গোয়েন্দারা ইতোপূর্বে সমকামীতার অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রোফাইল নিয়ে ঘাঁটতে শুরু করে। তারা এক সময় ভ্যালেরি আইভানেনকো নামের এক সমকামীর উপর নজর রাখতে শুরু করে। আইভানেনকো ইতোপূর্বে কয়েকবার সমকামীতার জন্য সাজা খেটেছিল। তাছাড়া সে নিজেকে একজন সাইকোটিক রোগি বলেও প্রচার করে।  আইভানেনকো ইতোপূর্বে শিক্ষকতার পেশায় জড়িত ছিলেন। তার বয়স ৪৬ বছর। তার ব্যক্তিত্বেও ঐশ্বরিকতার ছাপ রয়েছে। সে চশমা পরে। তাকে রোস্টভের সাইকিয়াট্রিক সেন্টারে ভর্তি করা হলে সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। সব কিছু মিলে আইভানেনকো এ সিরিয়াল কিলিং ঘটনার জন্য একজন উপযুক্ত সন্দেহভাজন ছিল।

রক্তের এন্টিজেন্টের সাথে বীর্জের এন্টিজেন্ট মিলল না

বুকরভ আইভানেনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু কনে। কিন্তু রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল তার রক্তের গ্রুপ ছিল ‘এ’ টাইপের যা ইতোপূর্বে ভিকটিমদের শরীরে পাওয়া বীর্জের রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে না। তবে সে বুকরভকে সমকামী সন্দেহভাজনদের উপর অনুসন্ধান চালাতে সহায়তার আশ্বাস দিল। কিন্তু কোন কাজের কাজ হল না। ইতোমধ্যে আরো খুনের ঘটনা ঘটল। আরো নতুন সন্দেহভাজন গ্রেফতার হল। পূর্বের সন্দেহভাজনরা ছাড়া পেল। আবার নতুন সন্দেহভাজন নতুন করে ঘটনার দায়দায়িত্ব স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে থাকল। তখন পর্যন্ত এ সিরিজ খুনের জন্য মোট পাঁচজন আসামী স্বীকারোক্তি দিয়েছিল এবং সবগুলো স্বীকারোক্তিই ছিল মিথ্যা। এক নাগাড়ে দীর্ঘ ১০ দিন পুলিশের হেফাজতে থেকে নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্যই এরা স্বীকারোক্তি দিয়ে আসছিল।

দ্বিতীয়বার প্রোফাইলিং খুনি  ‘এক্স’

এমতাবস্থায়, ক্যাপ্টেন বুরোকভ পুনরায় মনোচকিৎসক আলেকজান্ডার বুখানোভস্কির স্মরণাপন্ন হলেন। এবার তিনি বুখানোভস্কিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করলেন। তিনি ইতোপূর্বে হত্যাকাণ্ডের সকল ঘটনাস্থলের ছবি, স্কেচ ম্যাপসহ যাবতীয় রেকর্ডপত্র বুখানোভস্কিকে দিলেন। এগুলো নিয়ে তিনি কয়েক মাস পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করলেন। এবার তার উদ্দেশ্য হল অধিকতর বেশিষ্ট্যপূর্ণ এমন এক প্রোফাইল তৈরি করা যাতে বুরোকভের সন্দেহের তালিকা যতদূর সম্ভব সংক্ষিপ্ত হয় এবং তিনি তার গোয়েন্দাদের নিয়ে অতিদ্রুত খুনিকে গ্রেফতার করে এ খুন-অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেন। বুখানোভস্কি তার ইতোপূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে সমকামী, উভকামী, যৌনবিকৃতি, শবকামী (Necrophile), শব-নির্যাতনকারী ইত্যাকার ব্যক্তিত্বের পর্যালোচনা করে প্রায় ৬৫ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণ মনোবৈজ্ঞানিক প্রোফাইল তৈরি করলেন। বুখানোভস্কি খুনির নাম দিলেন ‘খুনি এক্স’।

খুনির বর্ণনা

তার প্রোফাইল মতে খুনির নিজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সে যা করে তা পূর্ব পরিকল্পনা মতেই করে। তাই সে মানসিক রোগি বা সাইকোটিক নয়। সে আত্মপ্রেমিক ও একগুয়ে। নিজেকে মেধাবী বা চালাক মনে করলেও সে অসাধারণ কেউ নয়। সে পরিকল্পনা মতো অগ্রসর হলেও সৃজনশীল নয়।  যৌনতার বিচারে সে সমকামী নয়। তবে বালকদের প্রতি তার আক্রমণ নারীদের প্রতিস্থাপন মাত্র। সে একজন শব-নির্যাতক (Necrosadist)। তার যৌনকামনা নিবারণের জন্য মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা অত্যাবশ্যক।

তার ভিকটিমদের অসহায় করার জন্যই সে তাদের মাথায় আঘাত করে। উপর্যুপরি আঘাত হল তার যৌনকর্মে প্রবেশের বিশেষ সূচনাপর্ব। সে দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে মৃতদেহের উপর বসে পড়ে। অথব খুব কাছে থেকে মৃতদের উপর উবু হয়ে বসে পড়ে। এর অর্থ হল যতদূর সম্ভব সে মৃতদেহের সন্নিকটে থাকতে চায়। মৃতদেহের উপর গভীরতর ক্ষত তার গভীরতর যৌন উত্তেজনাকেই প্রতিফলিত করে। সে মৃতদেহের উপর তার অজান্তেই স্বতস্ফুর্তভাবে কিংবা হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্জপাত ঘটায়।

সে নানা কারণে মৃত দেহের চোখ উত্তোলন বা বিকৃত করে। অপরাধস্থলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করার মতো কোন চিহ্ন বা আলামত নেই। সে চোখ দেখে উত্তেজিত হতে পারে কিংবা এগুলোকে ভয়ও করতে পারে। পূর্বসংস্কারবসত সে বিশ্বাস করতে পারে, মৃতদের চোখের মধ্যে তার নিজ ছবি আঁকা হতে পারে। ভিকটিমদের যৌনাঙ্গ ছেদন মহিলাদের উপর তার ক্ষমতা প্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কর্তিত যৌনাঙ্গসমূহ সে নিদর্শন হিসেবে রেখে দিতে কিংবা খেয়েও ফেলতে পারে। বালকদের লিঙ্গ কর্তন তাদের নিষ্ক্রিয়করণ কিংবা নারীদের অনুরূপরূপে কল্পনা করার মানসে হতে পারে।

খুনির দ্বিতীয় প্রোফাইলের সময় বুখানোভস্কি দেখতে পান যে তার খুনের ঘটনাগুলো আবহাওয়ার উঞ্চতার সাথে উঠানামা করে। তার অধিকাংশ খুনের সময় আবহাওয়া উঞ্চ ছিল। তার খুনের সময় ছিল সপ্তাহের মধ্যভাগে অর্থাৎ মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে। কর্মময় দিনগুলোতে তার পরিবার কিংবা অন্যকোন দিক থেকে মানসিক চাপ কমানোর জন্যও তার খুনের প্রয়োজন হতে পারে।

 

এবারও খুনির উচ্চতা ও পেশা নিয়ে বুখানোভস্কি অনেকটাই বিভ্রান্তিতে ছিল। তবে তার বয়স নিয়ে তিনি একটি স্থির সিদ্ধান্তে আসেন। তার মতে খুনির বয়স অবশ্যই ৪৫-৫০ বছরের মধ্যেই। এর কারণ হল, খুনি যৌন বিকৃতিতে আক্রান্ত এবং যৌনবিকৃতি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে এ বয়সসীমার মধ্যে। খুনির ব্যক্তিত্বে বৈপরিত্য রয়েছে এবং তার ভিতরের টানাপোড়েন সে নিজের ভিতরই রাখে। বাইরে প্রকাশ করে না। তার শৈশবের বেড়ে ওঠা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তার জীবনের তীব্র সুখবোধ রয়েছে। কিন্তু যৌনক্ষেত্রে রয়েছে অস্বাভাবিক সাড়া। বুখানোভস্কি বলতে পারছেন না যে এ খুনি বিবাহিত কিনা কিংবা তার সন্তান সন্ততি আছে কিনা। তবে তিনি এ টুকু বলতে পারেন, যদি সে বিবাহিত হয়, তার স্ত্রী তাকে যথেষ্ঠ সময় প্রদান করে যাতে সে নিজের মতো থাকতে পারে।

বুখানোভস্কি বলেন, খুনি হত্যাযজ্ঞ নিবারণে অপারগ। কোন আসন্ন বিপদের ভয়ে সে তার হত্যাযজ্ঞ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলেও তা তার গ্রেফতার কিংবা মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।   বুখানোভস্কির এবারের প্রোফাইল ছিল দীর্ঘ ও বিস্তারিত। কিন্তু এর পরেও এ প্রোফাইল বুরোকভকে কিভাবে সাহায্য করতে পারে তা তার বুদ্ধিতে কুলাচ্ছিল না। (অসমাপ্ত)

***
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৮ম কিস্তি-বিচার, মৃত্যুদণ্ড অতঃপর)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৭ম কিস্তি-গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৬ষ্ঠ কিস্তি-ফাঁদ)
সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৪র্থ কিস্তি-বীর্জের নমুনা)