ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সাত খুনের ফাঁসির আসামীর সাথে আলাপ

এরপর বুরোকভ এমন একজন ব্যক্তির সাথে আলাপ করেন যিনি এ ধরনের অপরাধের সাথে নিজেই জড়িত ছিলেন। আনাতোলি শ্লিভকো নামের এ সমকামী ব্যক্তি সাত জন বালককে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে  জেল খানায় ফাঁসির জন্য দিনক্ষণ গুনছিলেন। বুরোকভ ও তার গোয়েন্দারা জেলখানায় শ্লিভকোর সাথে দেখা করে একই জাতীয় অপরাধীদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা নিতে চাইলেন।

 

শ্লিভকো তাদের জানালেন যে তিনি স্বাভাবিক উপায়ে যৌনসুখ ভোগে অপারগ ছিলেন। শুধু যৌনসুখ ভোগের উপায় হিসেবেই তিনি বালকদের খুন করতেন। তার মতে, যৌন অপরাধীদের অসংখ্যা আকাশকুসুম কল্পনা থাকে। এসব কল্পনার ভিত্তিতেই তাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। তারা এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি তাগিদ অনুভব করেন যা থেকে নিজেরা বিরত থাকতে পারেন না। শ্লিভকোর ব্যাখ্যায় বুরোকভের তদন্তে কোন উপকার হল না। তবে তার সাক্ষাৎকারে তারা বুঝতে পারলেন যে একই ব্যক্তির ভিতরে পরষ্পরবিরোধী অনেক মূল্যবোধ থাকতে পারে। যে লোক শিশুদের সামনে মদ্যপানের মতো আচরণ বরদাস্ত করতে অপারগ, সেই আবার যৌনসুখ ভোগ করার মাধ্যম হিসেবে শিশুদের অবলিলায় হত্যা করতে পারেন। বুরোকভের সাথে সাক্ষাতের কয়েক ঘন্টা পরই শ্লিভকোকে ফাঁসিতে ঝোলান হয়।

প্রলুব্ধের শেষ ফাঁদ

একের পর একটি উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর বুরোকভ তার সর্বশেষ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি দেখলেন, খুনি এখন নানামুখী কর্মকাণ্ড ও বহুমুখী আচরণের মাধ্যমে তার হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তার খুনের শিকারগণ রেল লাইন, রেলস্টেশন ও বাসরুটের কাছাকাছিই বেশি। তার চেয়েও বড় কথা হল, পুলিশের সাদাপোশাকে ডিউটি ও হাজারো মানুষের ভীড়ে খুনি তার শিকারদের লোকালয়ের কাছেই হত্যা করছে। অনেক লাশ খোলা মাঠেও পাওয়া যাচ্ছে।

বুরোকভ তার পরিকল্পনায় রোস্টভ অঞ্চলের নির্জন তিনটি স্টেশন ছাড়া অন্যগুলোতে পোশাকধারী পুলিশের পাহারা বাড়িয়ে দিলেন। তিনটি রেল স্টেশন- কার্পিচানিয়া,  দোনলেসখোজ ও লেসোস্টেপ ছিল অপেক্ষাকৃত কম ব্যস্ত ও অনেকটাই নির্জন। এসব স্টেশনে বুরোকভ সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করার সিদ্ধান নিলেন। তার ফাঁদটি ছিল যে খুনিকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে দেয়া  যাতে সে ইউনিফর্ম পরিহিত টহল পুলিশের পাহারা দেয়া স্টেশনগুলো পরিহার করে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্টেশনগুলোর অন্তত একটি বেছে নিয়ে তার অপরাধকর্ম সম্পাদন করবে এবং সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যের নিরীক্ষার জালে আটকা পড়বে। বুরোকভের পরিকল্পনায় প্রায় ৩৬০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করতে হল।  নিরীক্ষা কাজে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেয়া হল, স্টেশনের কোথাও কোন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সাথে যদি অল্প বয়স্ক নারী বা শিশু দেখা যায় তবে তার নাম ঠিকানা ও পাসপোর্ট নম্বর টুকে নিতে হবে।

বুরোকভের নিরীক্ষা ফাঁদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হল  ১৯৯০ সালের ২৭ অক্টোবর। সাদা পোশাকে নিরীক্ষাধীন স্টেশন দোনলেসখোজে ৩০ অক্টোবর তারিখে ১৬ বছর বয়সী বালক ভ্যাডিম গুরমভের লাশ উদ্ধার করা হল। তবে সে দশ দিন পূর্বে নিহত হয়েছিল। কিন্তু একই দিনে সাদা পোশাকের নিরীক্ষাধীন অন্য একটি স্টেশন কার্পিচানিয়ায় ১৬ বছর বয়সী বালক ভিকটর তিসচেনোকোর লাশ পাওয়া গেল। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের পর কোনভাবেই কোন সন্দেহজনক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেল না।

খুনি ফাঁদে পা দিল

বুরোকভের ফাঁদ নিরীক্ষার সবচেয়ে সাফল্যের দিন ছিল ৬ নভেম্বর, ১৯৯০। সাদা পোশাকে নিরীক্ষাধীন রেলস্টেশন  দোনলেসখোজের অদূরে একটি বনভূমি থেকে বের হয়ে এলেন একজন দীর্ঘদেহী বয়স্ক লোক। ঐ স্টেশনের নিরীক্ষারত অফিসার দেখলেন, বনভূমি থেকে বের হয়ে লোকটি একটি পাতকূয়ায় গিয়ে তার হাতমুখ ধুচ্ছে। অফিসার লোকটিকে ভালভাবে লক্ষ করে দেখেন, তার কোর্টের হাতার কনুইয়ের উপর মাটি ও ঘাস লেগে আছে। তার চিবুকে একটি রক্তের হালকা দাগও দৃশ্যমান হয়।

নিরীক্ষক অফিসারের কাছে লোকটির আচরণ বেশ সন্দেহজনক মনে হল। বছরের এ সময়ে এ স্টেশনের কাছে কোন মানুষের আগমনের একটি কারণ থাকতে পারে, তাহল, জঙ্গল থেকে ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম সংগ্রহ করা। কিন্তু এ লোকটির পোশাক-আশাক দেখে  মাশরুম সংগ্রহকারীদের মতো মনে হয় না। সে বেশ পরিপাটি পোশাকে ছিল। তাছাড়া তার সাথে ছিল একটি নাইলনের ব্যাগ যা মাশরুম রাখার জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল না। নিরীক্ষক অফিসার তাই লোকটিকে তার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাস করল ও তার কাগজপত্র পরীক্ষা করল। তবে তাকে আটক করার মতো পর্যাপ্ত কারণ সে খুঁজে পেল না।

 

বস্তুত এ লোকটিই ছিল আমাদের ধারাবাহিক খুনি চিকাটিলো যাকে গ্রেফতার করার জন্য এত প্রচেষ্টা। নিরীক্ষক অফিসার চিকাটিলোকে চিনতে পারলেও সে মুহূর্তে জানত না যে চিকাটিলো ঐ সময়  ২২ বছর বয়সী মহিলা সেভেতলানা কোরোস্তিককে হত্যা করে তারই সামনে দিয়ে চলে গেল। পুলিশ অফিসার কর্তব্য শেষে অফিসে এসে প্রতিদিনের মতোই তার নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করল। প্রতিবেদনে সকল ঘটনাই থাকল।

সর্বশেষ খুন

চিকাটিলোর সর্বশেষ খুনটি ছিল এই দোনলেজখোজ রেলস্টেশনের অদূরে। তবে এ সময় সে নিরীক্ষক কোন পুলিশ অফিসারের জিজ্ঞাসার মুখে পড়েনি। ১৩ নভেম্বর, ১৯৯০ তারিখে খুন হয় এক যুবতী। তার শরীরও বরাবরের মতো কাটাকুটা করা হয়। নাড়িভুড়ি বের করা হয়। জিহব্বার শীর্ষভাগ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মহিলা ছিল পুলিশের জানা মতে ধারাবাহিক খুনির ৩৬ তম খুন। এ ঘটনার পর বুরোকভ দোনলেজখোজ স্টেশনে কর্মরত নিরীক্ষা অফিসারকে ডেকে পাঠান। তার দাখিলকৃত গত সপ্তাহের সকল প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আন্দ্রে চিকাটিলোর দিকে। চিকাটিলো পুলিশের কাছে অপরিচিত ছিল না। ইতোপূর্বে তিনি এ সিরিজ খুনের সন্দেহভাজন হিসেবে ১৯৮৪ সালে গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু তার রক্তের এন্টিজেন্ট ভিকটিমদের শরীরে প্রাপ্ত বীর্জের এন্টিজেন্টের সাথে মেলেনি বলে তাকে সে সময় ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তাকে ১৯৮৭ সালে সন্দিগ্ধদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এবারের সন্দেহ থেকে তাকে বাদ দেয়া মুস্কিল হয়ে পড়ল।

বুরোকভ বুঝতে পারলেন, চিকাটিলোই তাদের প্রত্যাশিত খুনি। কিন্তু তাকে কোনভাবেই খুনের ঘটনাগুলোতে সরাসরি সংযুক্ত করা যাচ্ছিল না। তাই তার উপর  সার্বক্ষণিক নিরীক্ষণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। নিরীক্ষায় বিশেষ করে বাস-ট্রেনে ভ্রমণের সময় চিকাটিলোকে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখা গেল। যদি কোন বালিকা বা মহিলা তার সাথে কথোপকথনে ছেদ টানেন, চিকাটিলো আশেপাশে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার নতুন বালকবালিকা ও মহিলাদের সাথে সখ্য গড়ায় প্রচেষ্টায় থাকেন। (অসমাপ্ত)

***
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৮ম কিস্তি-বিচার, মৃত্যুদণ্ড অতঃপর)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৭ম কিস্তি-গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৫ম কিস্তি-অপরাধ প্রোফাইলিং)
সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৪র্থ কিস্তি-বীর্জের নমুনা)