ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অবশেষে গ্রেফতার

নিরীক্ষার ষষ্ঠ দিনে ২০ নভেম্বর তারিখে চিকাটিলো একটি বড় পাত্রে কিছু বিয়ার/মদ নিয়ে একটি পার্কে যান। বড় পাত্র থেকে সেগুলো ছোট ছোট পাত্রে ভরিয়ে পার্কে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। তার লক্ষ ছিল ছোট ছোট বাচ্চাদের বিয়ারের লোভ দেখিয়ে ভোলান। এক সময় টিকাটিলো একটি ক্যাফেতে ঢোকার মুহূর্তে একদল সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

কিন্তু বরাবরের মতো চিকাটিলো এবারও পুলিশকে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, ইতোপূর্বে একই কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা পুলিশের ভুল ছিল। কিন্তু পুলিশ এবার চিকাটিলোর কথা কান দিল না। তাদের কাছে এবার অকাট্য প্রমাণাদি ছিল। অতিরিক্ত তল্লাশিকালে চিকাটিলোর শরীরে আরো কিছু আলামতও পাওয়া গেল। চিকাটিলোর একটি আঙ্গুলে মাংসল ক্ষত ছিল। ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণিত হল, এ ক্ষত প্রকৃত পক্ষে মানুষের কামড়ের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। চিকাটিলোর সর্বশেষ শিকার ছিল ১৬ বছর বয়সী এক তরুণী যে শারীরিকভাবে ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ধারণা করা হয় তাকে হত্যাকালে বাঁচতে গিয়েই তরুণী চিকাটিলোর আঙ্গুলে কামড় দিযেছিল। ঘটনাস্থল পরিদর্শন কালে আরো কিছু আলামত উদ্ধার হল। তার সঙ্গের জিনিসপত্রের মধ্যে একটি ফোল্ডিং চাকু ও দুই প্রস্ত রশিও পাওয়া গেল।  পরবর্তীতে চিকাটিলোর বাসায় তল্লাসি চালিয়ে পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ২৩টি ছুরি। গ্রেফতারের পর চিকাটিলোকে রোস্টভের কেজিবি কার্যালয়ের হাজতে রাখা হল। কৌশল হিসেবে তার সাথে বন্দী হিসেবে রাখা হল পুলিশের এক সোর্সকে যাতে চিকাটিলোর কাছ থেকে গোপন তথ্য আদায় করা যায়।

পূনরায় রক্ত পরীক্ষা আশ্চর্য ব্যতীক্রম

ইতোমধ্যেই চিকাটিলোর রক্তের নমুনা গ্রহণ করে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দেয়া হল। কিন্তু রক্তের গ্রুপ পরীক্ষায় তা বরাবরের মতো  ‘এ’ বলে প্রমাণিত হল। আর যেহেতু ভিকটিমদের শরীরে পাওয়া বীর্জের নমুনায় খুনির রক্তের এন্টিজেন্ট এবি(+) বলে স্থির হয়েছিল, তার রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও পূর্ববত অবস্থার সৃষ্টি হল। যদিও তদন্তকারীগণ দৃঢ়ভাবে বুঝতে পারছিলেন যে চিকাটিলোই প্রকৃত খুনি কিন্তু তার রক্তের গ্রুপ তাদের সন্দেহকে সমর্থন করছিল না। অতঃপর চিকাটিলোর বীর্জের রক্তের এন্টিজেন্ট পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হল।

কিন্তু আশ্চর্যভাবে ল্যাররেটরি প্রতিবেদন আসল যে চিকাটিলোর রক্তের  রক্তের এন্টিজেন্ট ‘এ’ হলেও তার বীর্জের রক্তের এন্টিজেন্ট এবি(+) যা ভিকটিমের শরীরে পাওয়া বীর্জের এন্টিজেন্টের অনুরূপ। তবে বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে অতটা বিস্ময়কর ছিল না। কারণ ১৯৮৮ সালের একটি সার্কুলার অনুসারে সোভিয়েতের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছিল যে ব্যতিক্রম কিছু ক্ষেত্রে কোন মানুষের রক্তের এন্টিজেন্ট ও বীর্জ বা মুখের লালার এন্টিজেন্ট ভিন্নতর হতে পারে। তবে এ আবিষ্কারটি ১৯৮৮ সালে না হয়ে যদি ১৯৮৪ সালে হত, তাহলে চিকাটিলো এতদিন গ্রেফতারের বাইরে থাকত না এবং তার হাতে এতগুলো তরুণ প্রাণও বিনাশ হত না। (৭ম কিস্তি)

আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ

২১ নভেম্বর ১৯৯০ সালে চিকাটিলোকে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাবাদ শুরু হয়। ভার পড়ল এ কাজে বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা ইশা কোস্টেয়েভের উপর। আইন অনুসারে রুশ পুলিশ কোন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদেরজন্য সর্বমোট ১০ দিন সময় পেয়ে থাকে। এ সময়ের মধ্যে হয় তাকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে পাঠাতে হবে নয়তো ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু জিজ্ঞাসবাদের শুরু থেকেই চিকাটিলো নানা প্রকার বাহানা শুরু করে। তার প্রবল দাবি,  তিনি নির্দোষ। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বোঝাতে চাইলেন যে তিনি তো ধরাই পড়ে গেছেন। এখন সব কিছু স্বীকার করলে তার অপরাধকে মনোচিকিৎসকদের দ্বারা মানসিক রোগের ফল হিসেবে চালিয়ে দিয়ে তাকে অন্তত মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচানো যাবে।

জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল চিকাটিলোর আইনজীবীর উপস্থিতিতে। তবে চিকাটিলো বরাবরের মতোই নির্দোষ দাবি করল। দ্বিতীয় দিনে তিনি তার আইনজীবীর উপস্থিতির অধিকার পরিত্যাগ করলেন। কিন্তু কিছুই বললেন না। ধীরে ধীরে তিনি তার যৌন দুর্বলতার কথা স্বীকার করলেন ।  কস্টোয়েভের কাছে স্বীকার করলেন যে তিনি মূলত নপুংশক। তিনি আরো স্বীকার করেন, যৌন উত্তেজনা বসত তিনি ইতোপূর্বে তার কয়েক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন। তবে খুন করার মতো কোন অপরাধ তিনি করেননি। চিকাটিলোকে  অপ্রকৃতিস্ত প্রমাণ করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচানোর প্রস্তাবে তিনি দুই দিন সময় চান। কিন্তু এ দুই দিনেই  তিনি আরো বেশি কঠিন অবস্থায় পৌঁছে যান। তিনি স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন।

খুনি মুখ খোলে না

ইতোমধ্যে ৮দিন কেটে গেছে। স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য আর মাত্র দুই দিন বাকী আছে। কিন্তু  জিজ্ঞাসাবাদ বিশেষজ্ঞ কোস্টোয়েভ এক প্রকার ব্যর্থ। রুশ পুলিশের চৌকশ জিজ্ঞাসাবাদকারী এ পুলিশ অফিসার তার পেশাগত জীবনে শতাধিক আসামীকে জিজ্ঞাবাদ করে মাত্র তিন জন আসামীর কাছ থেকে  স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু চিকাটিলোর কাছে তিনি আজ হেরেই গেলেন।

জিজ্ঞাসাবাদের এ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন বুরোকভ ও ফেটিসভো অন্য চিন্তা করলেন। তারা মনোচিকিৎসক আলেকজান্ডার বুখানোভস্কির সাহায্য প্রার্থনা করতে চাইলেন। এ বুখানোভস্কিই ইতোপূর্বে চিকাটিলোর দুই দুই বার  মনোবৈজ্ঞানিক প্রোফাইল তৈরি করেছিলেন। তার তৈরি করা প্রোফাইলের সাথে চিকাটিলোর বয়স, উচ্চতা ও ব্যক্তিত্বের মিল রয়েছে। তাই জিজ্ঞাসাবাদের সময় বুখানোভস্কির বিশেষজ্ঞ সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোস্টোয়েভ বুখানোভস্কির সহায়তা গ্রহণে রাজি হয়। অন্যদিকে বুখানোভস্কিও এ শর্তে সহায়তা দিতে রাজি হন যে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাবেন না।

প্রোফাইলারের জিজ্ঞাসাবাদ

জিজ্ঞাসাবাদের নবম দিনে বুখানোভস্কি চিকাটিলোকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করেই বুঝতে পারেন, এই সেই লোক যার প্রোফাইল তিনি  প্রায়  তিন বছর আগেই  তৈরি করেছিলেন। অতি সাধারণ মানুষ, নিঃসঙ্গ এবং অনাক্রমণাত্মক। তিনি অতি বিনয়ের সাথে চিকাটিলোর কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরলেন। চিকাটিলোকে বললেন, ১৯৮৭ সালে তিনি এ হত্যাকাণ্ডগুলোর  সাথে জড়িত সম্ভাব্য এক অপরাধীর একটি প্রোফাইল তৈরি করেছিলেন। তিনি চিকাটিলোকে তার প্রোফাইলটি দেখতে দিলেন। চিকাটিলোর সাথে কথা বলে বুখানোভস্কি বুঝতে পারলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। সরাসরি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করে ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় কর্তৃত্বমূলক আচরণ করে  কোস্টোয়েভ চিকাটিলোকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছেন। কোস্টেয়েভ চিকাটিলোর সাথে শুধু কথাই বলেছেন; কিন্তু চিকাটিলোর কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করেননি। কিন্তু চিকাটিলো তার কথা বলতে চান। তাই বুখানোভস্কি প্রথম দুই ঘন্টা ধরে শুধু চিকাটিলোর জীবনের ঘটনাই শুনলেন। এর পর তিনি চিকাটিলোর কাছে তার তৈরি করা প্রোফাইল থেকে নির্বাচিত অংশ পড়তে শুরু করলেন।

গোপন কথাটি রইল না গোপনে

বুখানোভস্কির তৈরি করা প্রোফাইলে চিকাটিলোর জীবনের সকল গোপন কথা প্রকাশ হতে থাকল। তার যৌনসুখলাভের জন্য কম বয়সী মেয়েদের পটানো, পুরুষাঙ্গ উত্থিত না হওযার জন্য মানসিক অস্বস্তি, খুন করার পর তার যৌনসুখলাভ, খুন করে ভিকটিমদের যৌনাঙ্গ কর্তন, তাদের পেটের নাড়িভুড়ি বের করা ইত্যাদি বিষয় এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন যে সবগুলোই চিকাটিলোর জীবনের সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিল। প্রোফাইল পড়তে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকাটিলো কাঁপতে শুরু করেন।  বুখানোভস্কি পড়া অব্যহত রাখলে একসময় তিনি কান্নায় ফোঁপাতে থাকেন এবং সর্বশেষে চিকাটিলো উচ্চৈঃস্বরে কান্না শুরু করেন। কান্না থামিয়ে চিকাটিলো বলতে থাকেন, প্রোফাইলে যা লেখা আছে তা সবই সত্যি। তিনিই এ ধারাবাহিক খুনের ঘটনার নায়ক। তিনি প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ড নিজে ঘটিয়েছেন।(অসমাপ্ত)

 

***
সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৪র্থ কিস্তি-বীর্জের নমুনা)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৫ম কিস্তি-অপরাধ প্রোফাইলিং)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৬ষ্ঠ কিস্তি-ফাঁদ)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৮ম কিস্তি-বিচার, মৃত্যুদণ্ড অতঃপর)