ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঘটনাস্থল প্রদর্শন ও বিচারের জন্য আলামত উদ্ধার

প্রায় দুই ঘন্টা চিকাটিলোর কথা শুনলেন প্রোফাইলার বুখানোভস্কি। তারপর নিজের তৈরি করা অজ্ঞাত অপরাধী সম্পর্কে প্রোফাইল থেকে নির্বাচিত অংশ পড়ে শোনালেন চিকাটিলোকে। তিনি নিশ্চিত হন যে চিকাটিলো এখন অনুতপ্ত। প্রত্যেকটি অপরাধের কথা তিনি পুলিশের কাছে অকপটে স্বীকার করবেন। পুলিশ চিকাটিলোর মাত্র ৩৩টি হত্যাকাণ্ডের খবর জানতেন । তবে বিভিন্ন সময় তিনি হত্যার সংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলতেন। কোন কোন সময় বলতেন, তিনি ৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু চিকাটিলো পুলিশের কাছে স্থিরভাবে স্বীকার করলেন যে তিন ৫৬টি খুন করেছেন। একের পর এক খুনের ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে লাগলেন পুলিশকে। পুলিশ কর্তারা যার পর নেই বিস্মিত হলেন। প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনাস্থলে সরাসরি নিশ্চিতভাবে তিনি পুলিশকে নিযে যেতে পারছিলেন। তিনি কোন ভিক্টিমকে কিভাবে হত্যা করেছিলেন, তাদের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত কেমন ছিল, হত্যার পর লাশগুলো নিয়ে তিনি কি করলেন ইত্যাদি লোমহর্ষক বিষয়ের বর্ণনা দিলেন পুলিশের কাছে। তবে মাত্র ৫৩টি হত্যাকাণ্ডের প্রামাণ্য আলামত সংগ্রহ করা সম্ভব হল। গুম করা অনাবিষ্কৃত লাশগুলো উদ্ধার করে ময়না তদন্তের ব্যবস্থা করা হল। কিছু কিছু লাশের শুধু সামান্য দেহাবশেষ পাওয়া গেল। অতিরিক্ত তিনটি খুনের কথা চিকাটিলো নিশ্চিত করে বলা ও লাশ গুম করার স্থানে পুলিশকে সঠিকভাবে নিয়ে গেলেও  হত্যাকাণ্ডের কোন আলামতই পাওয়া গেল না। তবে খুনের অভিযোগের বাইরেও শিশু-কিশোর ছাত্র-ছাত্রীদের যৌন হয়রানির জন্য চিকাটিলোর বিরুদ্ধে আরো ৫টি অতিরিক্ত অভিযোগ আনা হল।

মনোচিকিৎস্যকদের মতামত গ্রহণ

স্বীকারোক্তির পর চিকাটিলোকে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মস্কোর সার্বস্কি ইন্সটিটিউটে পাঠানো করা হল। একজন ধারাবাহিক খুনির হত্যার পিছনে কোন আর্থিক বা বৈষয়িক মোটিভেশন থাকে না। তাই তার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তা ছাড়া এ ধরনের অপরাধীদের পক্ষের আইনজীবীগণ সর্বপ্রথমে ও সব চেয়ে শক্ত করে যে অজুহাতটি গ্রহণ করেন, তা হল, তাদের মক্কেল মানসিক রোগে আক্রান্ত। তাই তারা তাদের কৃতকর্মের ফলাফল বুঝতে অক্ষম। এজন্য তারা আইনগতভাবে নির্দোষ। সার্বস্কি ইন্সটিটিউটে প্রায় ৬০ দিন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা শেষে মানসিক চিকিৎস্যগণ জানালেন, চিকাটিলো দ্বৈতব্যক্তিত্বের ধর্ষকামীতার স্তরে (Borderline Personality Disorder with sadistic feature) অবস্থান করছেন। স্নায়ু ও মস্তিষ্ক বিশ্লেষণে দেখা গেল, তার জন্ম থেকেই স্নায়বিক সমস্যা রয়েছে। জন্মের সময় মস্তিষ্কের ক্ষতির ফলে চিকাটিলো তার মূত্রথলী ও বীর্জের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই তার প্রতিরাতেই স্বপ্নদোষ হত যার জন্য তিনি তার মায়ের হাতে প্রায় প্রতিদিনই মার খেতেন। তবে এত কিছুর পরও চিকাটিলো তার কৃতকর্মের পরিণাম সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই আইনগতভাবে তাকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়।

লোহার খাঁচায় চিকাটিলো

যে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তের নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়। চিকাটিলো গত এক যুগে প্রায় ৭০ জন বালক, বালিকা ও স্ত্রী লোককে হত্যা করেছিলেন যাদের মধ্যে ৫৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এর বাইরেও বহুলোকের ছেলেমেয়ে এখনও নিখোঁজ। রাশিয়ার সদ্য মুক্ত প্রচার মাধ্যমে চিকাটিলোর খুনের বর্ণনাগুলো সাধারণ মানুষকেও ক্ষব্ধ করে তুলেছিল। তাই আদালতে আনা নেওয়ার পথে ভিকটিমদের আত্মীস্বজনগণ চিকাটিলোর উপর চড়ায় হতে থাকে। অনেকে চিকাটিলোর দিকে জুতো ছুড়ে মারেন। পুলিশের মনে হতে থাকে যে ক্ষব্ধ জনতা যে কেনা সময় চিকাটিলোকে পুলিশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে কুড়ে ফেলবে। তাই চিকাটিলোর জন্য প্রমাণ সাইজের একটি লোহার খাঁচা তৈরি করা হল। পুরো বিচার চলাকালে তাকে লোহার শিকের ভিতর বন্দী হয়েই আদালতে আসতে হত। অনেক সময় ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনগণ ঘৃণা, ক্ষোভ আর হিংসায় ছুটে আসতেন চিকাটিলোর খাঁচার দিতে।

খুনি কিন্তু সমকামী নই

প্রচার মাধ্যমে ভিকটিমদের পরিচয় প্রকাশ পেলে দেখা গেল তাদের ২২ জনই বালক। তাছাড়া অন্যান্য ভিকটিমরাও ছিল কম বয়সী বালিকা। তাই চিকাটিলোকে একজন সমকামী কিংবা হিঁজড়া হিসেবে প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ করা হতে থাকে। আদালতে দর্শকগণ তাকে সমকামী বলে উপহাস করতে থাকে। কিন্তু মজার বিষয় হল, প্রায় ৫৬টি খুনের ঘটনা স্বীকার করলেও সমকামীতার অভিযোগে চিকাটিলো অত্যন্ত বিরক্ত হন। তিনি এক সময় আদালতে তার ট্রাউজার খুলে তার পুরুষাঙ্গ প্রদর্শন করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে তিনি সমকামী বা নপুংসক নন; বরং একটি শক্তিশালী পুরুষাঙ্গের অধিকারী পুরুষ।

বিচারকালীন সাক্ষ্য প্রমাণ

সোভিয়েত ভাঙ্গার পর রাশিয়ার ইতিহাসে চিকাটিলোর বিচারটি ছিল সবচেয়ে বহুল প্রচারিত। আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার খুঁটি নাটি নিয়ে প্রতিদিনই ফিচার প্রকাশ হতে থাকে। সরকার পক্ষ চিকাটিলোর অপরাধ ও তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত ২২৫ খণ্ডের রেকর্ড পত্র আদালতে উপস্থাপন করা হল। ১৯৯২ সালের ১৪ এপ্রিল চিকাটিলোর আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। প্রথম দিকে আদালতে চিকাটিলো বেশ কথা বলতেন। কোন এক সময় তিনি বিচারক আকুবঝানোভের সাথে বাদানুবাদেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে চিকাটিলো মুখ বন্ধ রাখার নীতি অবলম্বন করেন। তার আইনজীবিগণ তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে প্রমাণের চেষ্টা করেন। এক সময় তিনি তার পূর্বের দেয়া স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করার আবেদন জানান। কোন এক সময় তিনি স্বীকারোক্তি করা ৬টি খুন করেননি বলে দাবি করেন। তবে অন্য চারটি খুনের কথা স্বীকার করেন যা তার বিচারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে চিকাটিলোর এ দাবির প্রতি পুলিশ বা আদালত কোন কর্ণপাত করেনি।

প্রোফাইলারের সাক্ষ্যদান

চিকাটিলোর আইনজীবিগণ দাবি করেন যে একজন মনোচিকিৎসকের সহায়তায় চিকাটিলোর স্বীকারোক্তি আদায়কালে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করা হয়েছিল। তাই তার স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল না। তাই তারা প্রোফাইলার মনোবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বুকানোভস্কিকে আদালতে হাজির করার দাবি তোলেন। উল্লেখ্য মনোচিকিৎসক বুখানোভস্কি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এর মেতা কোন পেশাদার অপরাধ প্রোফাইলার ছিলেন না। তিনি কেবল চিকিৎসাগত কৌতূহলের জন্যই তদন্ত টাস্কফোর্সের প্রধান বুরোকভের অনুরোধে চিকাটিলোর প্রোফাইল তৈরিতে সম্মত হয়েছিলেন।তিনি বুরোকভবে শর্ত দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে এজন্য তাকে আদালতে যেন সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা না হয়। হয়তো চিকাটিলোর আইনজীবীগণ এ বিষয়টি জানতেন। তারা তাই ধরে নিয়েছিলেন বুখানোভস্কি আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসবেন না। তাই সরকার পক্ষ একটু দুর্বল অবস্থানে থাকবেন।

প্রথম দিকে প্রোফাইলার বুখানোভস্কিকে আদালতে উপস্থাপনের আসামী পক্ষের দাবি অগ্রাহ্য করা হলেও পরে বুখানোভস্কিকে আদালতে তলব করা হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুখানোভস্কি বিচারক আবুকঝানোভের আদালতে ১৯৯২ সালের ৩ জুলাই উপস্থিত হন। চিকাটিলোর তৈরি করা ১৯৮৫ সালের অপরাধ প্রোফাইল ও ১৯৯০ সালে স্বীকারোক্তি আদায়কালের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি দীর্ঘ প্রায় তিন ঘন্টা ধরে বর্ণনা দেন। সেই সাথে চলে আসামী পক্ষের প্রশ্ন ও পাল্টাপ্রশ্ন। তার জবানবন্দী থেকে রাশিয়ার আমজনতাও জানতে পারেন যে অপরাধ তদন্তে প্রোফাইলিং নামে একটি নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু হয়েছে এবং পুলিশের অপরাধ তদন্তে পেশাদার মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসকগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বিচারের রায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

অবশেষে ১৯৯৩ সালের ১৫ অক্টোবর বিচারক আকুবঝানোভ তার দুই বছর ধরে চলা বিচারের রায় প্রকাশ করেন। রায়ে চিকাটিলোকে ৫২ টি হত্যাকাণ্ডের জন্য আলাদা আলাদা ৫২টি মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়। এর বাইরেও তাকে ৫টি যৌন হয়রানির জন্য বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের শাস্তি দেয়া হয়। রায় শুনে চিকাটিলো তার খাঁচার মধ্যে রাখা বসার বেঞ্চে আঘাত করেন এবং আদালতকে গালাগালি শুরু করেন। অবশ্য চিকাটিলোর এমন আচরণ নতুন নয়। বিচারের শেষ দিকে চিকাটিলো অনেকটাই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। তিন আদালতে অসংলগ্নভাবে চিৎকার করতেন, কমিউনিস্ট আমলের গণসঙ্গীত গাইতেন। একবার তাকে এজন্য আদালত এলাকা থেকে কিছুক্ষণের জন্য প্রত্যাহারও করা হয়েছিল। তবে রায় ঘোষণার পরবর্তীতে সাংবাদিকগণ চিকাটিলোর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি নিশ্চুপ থাকেন।

রায়ের পর চিকাটিলোকে নোভোচারকাস্ক জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ইতোমধ্যে তিনি সুপ্রিম কোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন যা বাতিল হয়ে যায়। তিনি রুশ রাষ্ট্রপতি বরিস ইয়েলিৎসিনের কাছে জীবনভিক্ষা করলে তাও বাতিল হয়। ১৯৯৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চিকাটিলোকে জেলখানার সেল থেকে শব্দনিরোধক অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার কানের পিছন দিকে গুলি করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৭৮ সালে একজন ১৪ বছর বয়সী স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ, হত্যা ও লাশগুমের অপরাধের মধ্য দিয়ে খুনের জগতে প্রবেশ করা চিকাটিলোর অসহনীয় জীবনের পরিসমাপ্তি এখানেই।

মৃত্যুই শেষ নয়

প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের নজরে দুই সন্তান ও এক স্ত্রী নিয়ে একটি সুখী ও সাবলিল পরিবারের অধিকারী ছিলেন আন্দ্রে রোমানভ চিকাটিলো। লম্বা চেহারার চশমা পরা অতি নিরীহ প্রকৃতির এই মানুষটির মনোজগতে যে জঘন্য খুনি অন্য একটি সত্ত্বা লুকিয়েছিল তা কেউই সন্দেহ করতেন না। তার নিরীহ চেহারা ও অমায়িক আচরণ তাকে চৌকশ পুলিশের হাত থেকেও বারবার বাঁচিয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে চিকাটিলোর উভয় সত্ত্বাই পৃথিবীতে থেকে বিলিন হল। তবে ব্যক্তি চিকাটিলো হারিয়ে গেলেও কাহিনীর চিকাটিলে বহাল তবিয়তে রয়ে গেল পৃথিবীতে। চিকাটিলোর জীবন ও অপরাধ নিয়ে লেখা হল বইপুস্তক, গোয়েন্দাকাহিনী, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা; তৈরি হল ডকুমেন্টারি ও ফিচার ফিল্ম। চিকাটিলোকে নিয়ে এইচ বিও টেলিভিশন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘সিটিজেন এক্স’ একটি ব্যবসা সফল ক্ল্যাসিক ফিচার ফিল্ম। মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপরই গুজব ছড়ায় যে চিকাটিলোর মস্তিষ্কটি জাপানিরা কিনে নিয়ে গবেষণায় কাজে লাগাতে চান। এর জন্য তারা প্রায় দশ লাখ মার্কিন ডলার দাম হেঁকেছেন। পৃথিবীর নৃশংস সিরিয়াল কিলারদের তালিকায় চিকাটিলো প্রথম ১০ জনের মধ্যে অবস্থান করে নিয়েছে। অধিকন্তু চিকাটিলোর অপরাধ প্রমাণ করেছে সিরিয়াল কিলিং বা মৃত দেহের উপর নৃশংসতা কেবল পূঁজিবাদী পাশ্চাত্য সমাজেরই বৈশিষ্ট্য নয়, রাশিয়ার মতো সাম্যবাদী সমাজেও এটা বিদ্যমান।(১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪)

***
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৭ম কিস্তি-গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৬ষ্ঠ কিস্তি-ফাঁদ)
রুশ সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ(৫ম কিস্তি-অপরাধ প্রোফাইলিং)
সিরিয়াল কিলার চিকাটিলোর অপরাধ জগৎ (৪র্থ কিস্তি-বীর্জের নমুনা)