ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

অফিসের শেষ বেলায় গ্রাম থেকে এক পিতা-পুত্র এসে হাজির। নিতান্তই দরিদ্র মানুষ তারা। ছেলেটি টঙ্গির একটি কারখানায় কাজ করত। গাজীপুর, টঙ্গিসহ দেশের প্রায় সব কারখানায় মালিকগণ নাম মাত্র মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করে। যা বেতন দেয় তারও একটি বড় অংশ কালক্রমে মেরে দেয়। যেমন, কারখানায় যোগদান করার প্রথম এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত অনেক কারখানায় শ্রমিকদের হাতে বেতন দেয়া হয়না। এ সময় হয়তো কেউ কেউ তাদের একটু আধটু খাবার দেয়। দুই/তিন মাস পর নিয়মিত বেতন দেয়। আর শ্রমিক বা কর্মচারিদের বলা হয় যে তোমার পূর্বের মাসের বেতন জমা রয়েছে। সময় মতো দেয়া হবে।

কিন্তু তাদের কৌশলটা অবশ্য ভিন্ন। যে বেতন বাকী থাকে তা আর কোন দিন পরিশোধ করা হয় না। বাকী বেতনের জন্য কর্মচারী যখন দেন-দরকার করে, বেশি করে চাপটাপ দেয়, তখন তাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়। অনেক সময় কারখানাটি গোটাটাই বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে প্রায় সকল কর্মচারীকেই কোন না ভাবে তারা দুতিন মাস বিনা বেতনেই খাটিয়ে নেয়। বেতন চাইলেই খড়্গ হস্ত হয়। অনেক সময় বেতন চাওয়ার অপরাধে এ নিরীহ কর্মচারীগুলোকে মাস্তানী ও চাঁদাবাজির অভিযোগ দিয়ে পুলিশের হাতেও তুলে দেয়।

আমার এলাকার আজকের এই পিতা-পুত্র এসেছিলেন এমনি একটি বিষয় নিয়ে। তাদের ভাষ্যমতে ছেলেটি টঙ্গির এক কারখানায় কাজ করে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার বেতন পাওনা হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে আকস্মাৎ ছাঁটাই করেছে। টঙ্গির কারখানা বন্ধ রয়েছে। তবে তাদের অন্য এলাকার কারখানাগুলো চালু আছে। প্রথমে বলা হয়েছিল যে তাকে পাওনা টাকা দিবে। কিন্তু পরে বলা হচ্ছে, তুমি কোন টাকাই পাবেনা। একথা শুনে সেইকর্মচারীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ত্রিশ হাজার টাকা তার জন্য অনেক বেশি। কিন্তু মালিক তাকে টাকা তো দিবেই না বরং হুমকি দিচ্ছেন, যদি সে টাকার জন্য আবার ফোন করে বা অন্যকোন ভাবে চাপ দেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের মামলা ঠুকে দিবে, তাকে জেলে ঢোকাবে। বেচারা উত্তরাঞ্চলের মফিজ! এখন ভিক্ষা চায় না সে, শুধু মালিককে তার কুত্তাগুলো সামলাতে বলে।

 

সব কিছু বেচা-বিক্রি করে এ পিতা তার একমাত্র ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে চায়। এজন্য কোন কোম্পানির সাথে নাকি কিছু কথাবার্তাও হয়েছে। কিন্তু যদি এর মাঝে আবার মালিক তার বিরুদ্ধে মামলা করে, তাহলে সে তো বিদেশে যেতে পারবে না। তাই পাওনা টাকা উদ্ধারের জন্য নয়, বরং সেই মালিক যাতে তাকে কোন মামলায় না জড়ায়, তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ নিয়েই তারা আমার অফিসে এসেছিল তারা।

 

এদের বাড়ি আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে রামনাথপুরে। এরা সম্পর্কে আমার কেউ হয়না। তবে এ গ্রামে আমার কিছু আত্মীয়স্বজন রয়েছে। তাদের সুবাদেই আমার কাছে এরা আসে। তবে যে গ্রামে আমার কোন স্বজন নেই যেসব গ্রাম থেকেও মানুষ আমার কাছে আসে। কারণ আমি এ মানুষগুলোর উপকার করার চেষ্টা করি।

 

এ পিতা-পুত্রকে বললাম, তারা আসলে কিছুই করবে না। আপনারা যাতে তাদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না চান তারই জন্য এ মামলা করার হুমকী। তাই চুপ থাকতে পারেন। আপনাদের পাওনা টাকা পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়তো নয়। তবে মামলা যাতে না হয়, সেটা দেখা যাবে।

 

পৃথিবীর যে কোন বৃহৎ অংকের পুঞ্জিভূত সম্পদের পিছনে নাকি অগণিত বঞ্চনার ইতিহাস থাকে। পূঁজিবাদী সমাজে পূঁজি পতিগণ অগণিত মানুষের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদকে কুক্ষিগত করে পূঁজি গঠন করে। সেই পূঁজি পুনপুন বিনিয়োগ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। তাদের অর্জিত সম্পদ মূলত শ্রমিকের শরীরের ফোটা ফোটা ঘামের সন্নিবেশ। শ্রমিকের শোষণই পূঁজি গঠনের প্রথম হাতিয়ার।

 

আমাদের দেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য কারখানার মালিকগণও এমনিভাবে শ্রমিকদের বেতন মেরে মেরে কিংবা বিনামূল্যে শ্রমিক খাটিয়ে পূঁজি তৈরি করছেন; বড় লোক হচ্ছেন, পূঁজিপতি বা শিল্পপতি হচ্ছেন। কিন্তু এসব শ্রমিকদের কান্না তারা শুনতে পাচ্ছেন না।

 

দেশের উত্তরাঞ্চলের নিরীহ, নিঃস্ব মানুষগুলোর অন্যতম হয়ে, তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে আমি মার্ক্সের বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতদের সম্পর্কে বেশ ভালই জ্ঞান লাভ করছি। সম্পদ তৈরির উপায়গুলো যাদের হাতে, সম্পদ যারাই তৈরি করুক না কেন, আসল লাভ তাদের হাতেই চলে যায়। তবে পাশ্চাত্যের পূঁজিবাদীগণ শ্রমিকদের কিছুটা হলেও কল্যাণের চিন্তা করেন; আমাদের দেশে সে চিন্তা নেই। এখানে প্রতিবাদী শ্রমিকদের স্থান কারাগারে। আর উত্তরাঞ্চলের মফিজদের কারাগার পর্যন্ত নিতেও হয়না। থানা-পুলিশের ভয় দেখালেই ওরা পাওনা বেতন না নিয়েই কেটে পড়ে।