ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

রংপুর অঞ্চলে বিয়ের অনুষ্ঠানের সাথে এই তো সেদিনও একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হত ‘জোগমাগনা’। জোড় শব্দটির অর্থ যুগোল বা যুক্ত এবং মাগনা শব্দের অর্থ মুক্ত বা বিনা অর্থে। তাই জোড়মাগনা কে বলা চলে-বিনা অর্থব্যয়ে খাওয়াদাওয়া। তবে মাগনা বা অর্থ ব্যয় করতে পিতা-কনের পিতার পক্ষে বর ও  তার সাথিদের বিবাহের পরবর্তীতে মূল অনুষ্ঠানে পূর্বদিন পর্যন্ত কিছুদিনের অপ্যায়নের ভার নিতেন তার আত্মীয় স্বজনগণ।

 

জোড়মাগনার অনুষ্ঠান বা পর্ব শুরু হত মূলত কাজী দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিয়ে পড়ানো এবং তার পরে সময় সুযোগ মতে কনেকে যৌতুকসহ স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার মূল যে অনুষ্ঠান হয়, (তা বিয়ে পড়ানোর কয়েকমাস, এমনকি কয়েক বছর পরেও হতে পারে) তার কয়েক দিন আগে। বিয়ের মূল সামাজিকতা সম্পন্ন হওয়া যেদিন বরপক্ষ তাদের আত্মীয় স্বজনসহ কনের বাড়িতে এসে কনেকে নিয়ে বিবাহের পরবর্তীতে মূল অনুষ্ঠানের ভাষার বলে বিয়ে উঠিয়ে দেয়া।

 

বিয়ে উঠিয়ে দেয়ার এক বা দুই সপ্তাহ পূর্বে বর তার বন্ধু-বান্ধব ভাগ্নিপতি ও অন্যান্যদের নিয়ে একটি দলে তার শ্বশুর বাড়িতে উপস্থিত হয়।এরপর কনের আত্মীয় স্বজনরা বর ও তার সাথীদের কনের বাড়িতে এসে দাওয়াত করে যেতেন । কনের সকল চাচা, মামা, ফুফা, খালা কিংবা তার পরিবারের ঘনিষ্ঠরা পালাক্রমে বর-দলকে দাওয়াত দিয়ে থাকে। বর ও কনে তাদের দলটিকে নিয়ে সেদিন দাওয়াত গ্রহণ করতেন। যেমন, আজ দুপুরের খাবার যদি বর কন্যকে আমাদের স্থানীয়  তাহলে আগামী সন্ধ্যে বেলায় দাওয়াত থাকে হয়তো কনের চাচার বাড়িতে। রাতে বর ও তার সাথীরা এ বাড়িতে বাত্রি যাপন করে সকালের নাস্তা সেরে দুপুরের খাবারের জন্য রওয়ানা হতেন পরের স্থান হয়তো পরের গ্রামে কনের খালার বাসায়।

 

প্রত্যেক ক্ষেত্রেই বরও তার দল দাওয়াত কারী  (মেঝবান) এর বাসায় উপঢৌকন  পাঠাতেন। আর আপ্যায়ন শেষে বিদায়কালে কনের আত্মীয়রা বরকে উপহার দিতেন। উপহারের মধ্যে থাকত সাধারণত কাঁশার বদনা, বাটি, গ্রাম পানের বাটা, পানদানি ডাবর, কলসি ইত্যাদি। অনেকে বরকে সোনার আংটি ও কনেকে সোনার মালাও দিত। বরের পাওয়া এসব বস্তু একটি গরুর গাড়িতে করে বহন করা হত এবং বিয়ের মুল অনুষ্ঠানের দিন তা সবার সামনে প্রদর্শন করাও হত। কনের প্রত্যেক আত্মীয়ের বাসায় দাওয়াত খাওয়া কালীন বর সেই পক্ষের সকল সদস্যদের সাথে পরিচিত হতেন যাতে ভবিষ্যতে পথে ঘাটে একে অপরকে দেখলে সালাম  বিনিময় করতে পারেন।

 

জোড়মাগনা অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ থাকতে খাওয়া দাওয়া এসময় বর ও তার জোড়মাগনার দলকে এমনভাবে আপ্যায়িত করা হতো যে অনেকে অতি ভোজনের ফলে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হতেন। তাই বরের সাথে এক বা দুই দিন থেকে তার সঙ্গ ত্যাগ করে বাড়ি চলে যেতেন। তবে এতে বরের দলে লোকের অভাব হত না দু’একজন চলে গেলে এর মাঝে আর অন্য কয়েকজন নতুন করে যোগ দিত।

 

জোড়মাগনা দলের প্রতি অতিভোজনের অবিচার করত সাধারণত বরের শালীকাগণ। তারা বর-দলের সদস্যদের, বিশেষ করে বরের দুলাভাইদের পাতে খাবার দিতে থাকত এবং তা খেতে পীড়াপীড়ি, এমনকি কৌশলে কথায় বাধ্যও করত। বরের সাথে অবশ্য কিছু পেটুক লোককে এজন্য বিশেষভাবে স্থান দেয়া হত। অনেক সময় শালীদের বিব্রত করার জন্য এসব লোক এত বেশি করে খেত যে খাবারের স্বল্পতা দেখা দিত এবং যন্ত্রণাদায়িনী শ্যালিকাগণ পালিয়ে সম্মান রক্ষা করত।

 

রংপুর অঞ্চলে জোড়মাগনা খাওয়ার চাল কমতে শুরু করে মূলত স্বাধীনতার পর থেকে। চাষাবাদে বৈচিত্র্য আসা, মানুষের সামর্থ্য ও সময় কমে যাওয়া এবং আধুনিক সংস্কুতির অনুপ্রবেশ মূলত এর জন্য হয়নি। আমি সর্বশেষ এধরনের অনুষ্ঠানের যোগ দিয়েছিলায় সম্ভবত ১৯৭৮/৭৯ সালে। তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। বিয়েটা ছিল আমার চাচাতো ভাই দৌলত মিয়ার। বিয়ে হয়েছিল রামেশ্বরপুর গ্রামে। এর পর অন্য কারো এভাবে জোড়মাগনা করতে দেখিনি।