ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

গত কয়েক মাস যাবৎ  স্বাধীনতা ও  মুক্তিযুদ্ধের উপর পড়াশোনা করছি। এর মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে সরাসরি জড়িত মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা বইগুলোকেই আমি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোমধ্যেই, এ জাতীয় প্রায় ডজন খানিক বই পড়ে শেষ করেছি। সম্প্রতি পড়লাম কর্নেল (অব) শাফায়াত জামিলের লেখা ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ নামের বইটি।  দেড়শ’ পৃষ্ঠার বইটি দ্রুত শেষ করে ফেললাম। বইটিতে লেখক তার পেশাগত জীবনের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা ও বাংলাদেশের রক্তাক্ত ঘটনাবলীর এক শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিয়েছেন। লেখক হিসেবে শাফায়াত জামিল সুদক্ষ নন। বইটি অন্য একজন (সুমন কায়সারের) সহায়তায় লেখা হয়েছে। হয়তো পেশাদার বা পাকা লেখক হলে বইটি আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পাক বাহিনীর গণহত্যার অব্যবহিত পরই যেসব অকুতভয় বীর বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই সময়ের মেজর শাফাতাত জামিল ছিলেন তাদের অন্যতম। এ সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। বাঙালি সেনা সদস্যদের নিরস্ত্রীকরণের অংশ হিসেবে তার কোম্পানিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হলে সেখানেই ২৭ মার্চ তিনি বিদ্রোহ করে তার ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার খিজির হায়াতসহ পাকিস্তানি অফিসারদের বন্দী করেন। বন্দী কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মালিক খিজির হায়াত খানের প্রতি তার বিখ্যাত উক্তি ছিলঃ

 

You have declared war against the unarmed people of our country. You have  perpetrated genocide on our people. Under the circumstances, we owe our allegiance to the people of Bangladesh and the elected representatives of the pople. You all are under arrest. Your personal safety is my responsibility . Please do not try to influence others.(page-27)

 

বিদ্রোহ সংগঠনের পর সমসের নগর থেকে মেজর খালেদ মোশারফ এসে গোটা ৪র্থ বেঙ্গলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যে কয়েকজন সিনিয়র সেনা অফিসার তাদের নিজস্ব ব্যাটালিয়নের সেনাদের নিয়ে গোটা বা আংশিক ব্যাটালিয়ন শক্তিসহ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে প্রথম প্রথাগত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, মেজর শাফায়াত জামিল ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ও অগ্রগণ্য।

মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ৪র্থ বেঙ্গল পূর্ণ শক্তি অর্জন করলে লেখক দিনাজপুর অঞ্চলে অবস্থানরত তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্বগ্রহণ করেন। এ রেজিমেন্ট পরবর্তীতে মেঘালয়ের তেলঢালা ও সেখান থেকে বাঁশতলায় স্থানান্তরিত হয়। সম্ভবত, মেজর শাফায়েতের ব্যাটালিয়ন দিয়েই নব গঠিত ‘বাংলাদেশ বাহিনী’ সর্বপ্রথম প্রথাগত যুদ্ধ শুরু করে। এ যুদ্ধটি ছিল জামালপুরের কামালপুরে। এরপর ছাতক, গোয়াইনঘাট ইত্যাদি যুদ্ধে এ ব্যাটায়িন অংশগ্রহণ করে যেমন অসম বীরত্বের পরিচয় দেয়, তেমনি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিরও সম্মুখীন হয়। গোয়াইনঘাটের যুদ্ধে লেখক নিজেও আহত হন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনাবাহিনীর ভিতরে বাইরে চলে রাজনীতির নোংরা খেলা। এ সময় বাংলাদেশ আর একবার রক্তাক্ত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দেশের স্থপতিকে হত্যা করার পর খুনিরা পক্ষকাল আসফালন করে বেড়ায়। সামান্য কয়েকজন মেজর তখন দেশের ভাগ্যবিধাতায় পরিণত হয়। দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফারুক-রসিদ-ডালিম গংদের ঔদ্ধত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে যখন গোটা সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কমান্ড ব্যস্ত, সেই সময় একমাত্র কর্নেল সাফায়েত জামিলই প্রকাশ্য দরবারে প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর উদ্ভূত পরিস্থিতির উপর ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য ১৯ আগস্ট তৎকালীন সেনাপ্রধান কেএম সফিউল্লাহ সেনাসদরে গেলে মিটিং এ খুনিদের উদ্দেশ্যে কর্নেল শাফায়াত জামিল বলেছিলেনঃ

 

You all are liars, mutineers and deserters. You are all murderers. Tell your Mustaque that he is an usurper and conspirator. He is not my President. In my first opportunity I shall dislodge him and you all will be tried for your crimes.(Page-111)

 

এমনিভাবে ‘৭৫ এর অক্টোবরের শেষার্ধে সেনাবাহিনীর প্রমোশন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হলে ফারুক, রসিদ, ডালিমদের মেজর থেকে লে. কর্নেল পদে পদোন্নতির প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু কর্নেল শাফায়েত জামিল এ দুবির্নীত ঘাতকদের পদোন্নতির বিরোধীতা করেছিলেন। তার বিরোধীতায় সায় দিয়েছিলেন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল কিউ.জি দস্তগীর, বিগ্রেডিয়ার সি.আর. দত্ত এবং কুমিল্লা বিগ্রেডের কমান্ডার কর্নেল আমজাদ আহমেদ চৌধুরী। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে তাদের বিরোধিতা হালে পানি পায়নি।( পৃষ্ঠা-১৩১)

এরই এক পর্যায়ে লেখক তার স্বাধীতনা যুদ্ধের প্রথম কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যূত্থানের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। কিন্তু সে অভ্যূত্থান মাত্র সাড়ে তিন দিন স্থায়ী হয়। এর পর আর একটি পাল্টা অভ্যূত্থানে খালেদ মোশারফ নিহত হন। লেখক সেই সময় বঙ্গবভনে ছিলেন। তিনি বঙ্গভবনের পূর্ব দিকের পাঁচিল টপকিয়ে আহত অবস্থায় প্রথমে কুমিল্লার দিকে ও পরে মুনসিগঞ্জের দিকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন।  পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গিয়ে আশ্রয় পান এবং সেখান থেকে তাকে সসম্মানে এনে সম্মিলিতি সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবশ্য তার এ সম্মানটুকু পরবর্তীতে অক্ষুন্ন থাকেনি। তাকে অভ্যূত্থানের প্রচেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। পাঠিয়ে দেয়া হয় কেন্দ্রীয় কারাগারে। অবশ্য পরবর্তীতে তাকে সকল প্রকার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

কর্নেল শাফায়াত জামিল তার বইতে নানাবিধ প্রসঙ্গ টেনেছেন। যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বিরোধিতা করেছিল তাদের পুনর্বাসন করা, যুদ্ধের সর্বশেষ দিন পর্যন্ত যে বাঙালি মেজর পাকিস্তানিদের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাঙালি নিধনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তার পরবর্তীতে মন্ত্রীত্বলাভ করা ইত্যাদি। কিন্তু তিনি সব অভিযোগ উত্থাপন করেছেন অত্যন্ত শালীন ও ভদ্র ভাষায়। তার লেখার মধ্যে অভিযোগ আছে, অনুযোগ আছে। তিনি অনেককে দোষারোপ করেছেন। কিন্তু কাউকে অসম্মান করেননি। তার মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মেজর (পরে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশারফের কমান্ডে। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করেছেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের জেড ফোর্সের অধীন। রাজনীতি ও অভ্যূত্থান ও পাল্টা অভ্যূত্থানের এক পর্যায়ে কর্নেল শাফায়াত জামিল জেনারেল জিয়া কর্তৃক বিচারের মুখোমুখী হয়েছিলেন। কিন্তু তার লেখনিতে কোনভাবেই তিনি জিয়াকে অসম্মান করেননি; বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি জিয়ার ভূয়ষী প্রশংসাই করেছেন।

 

জেনারেল এরশাদকে তার আসলরূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে তার বইতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, রাষ্ট্রপতি জিয়ার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অসফল অভ্যূত্থান ও সেই অভ্যূত্থানের কথিত নেতা মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অসংখ্যা মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারকে বিনা বিচারে বা বিচারের নামে হত্যার পিছনে এরশাদ কোন না কোনভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তবে সারা  জীবনে অনাকাঙ্খিত প্রাপ্তি  ও চাতুর্যপূর্ণ চালের জন্য এরশাদ এখন পর্যন্ত সব অভিযোগের ঊর্ধ্বেই রয়ে গেছেন।

 

৭ নভেম্বরের ঘটনাবলীর অন্যতম শিকার বিগ্রেডিয়ার শাফায়েত জামিল। এ সময় যে কয়জন সেনা অফিসার বাংলার ইতিহাসে আলোচিত, তাদের মধ্যে জেনারেল জিয়া, কর্নেল আবু তাহের ও মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ প্রধানতম।  এই তিন জেনারেলের রাজনীতি, সমরনীতি আর জনপ্রিয়তার দৌড় জাতি বেশ কিছুদিন ধরে দেখতে হয়েছিল। এ দৌড়ের সময়ই নিহত হয়েছিলেন মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ। কর্নেল আবু তাহের সেই সময় অবসরে থাকলেও দৃশ্যপটে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। কথিত ‘সিপাহী বিপ্লবের’ সিপাহীরা ছিল মূলত তাহেররই কর্মের ফসল। কিন্তু বিপ্লবের দৃশ্যপট থেকে সেই তাহেরকেই বিদায় নিতে হয়। তাকে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ সৃষ্টির পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

কর্নেল শাফায়েত জামিলের মতে, আর্মির ট্রেডিশন ও চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে ৭  নভেম্বর কর্নেল তাহের অপরাধ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন র‌্যাঙ্কের মধ্যে আনুগত্যের যে বিধি ও ঐতিহ্য ছিল, তাকে চরমভাবে লঙ্ঘণ করেছিলেন। জিয়ার ভাবমূর্তি কাজে লগিয়ে জাসদ ও কর্নেল তাহেরই ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও চেইন অব কমান্ড এবং সেনাপ্রধান পদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও আনুগত্যের কাছে কর্নেল তাহের চরমভাবে পরাজিত হয়েছিলেন।

 

৩ নভেম্বরের ব্যর্থ অভ্যূত্থানের নায়ক মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফকে লেখক একজন নির্লোভ সেনানায়ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ক্ষমতার অতি সন্নিকটে গেলেও খালেদ মোশারফ কোন ক্রমেই ক্ষমতা গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেননি বরং তার শুভানুধ্যায়ীদের এ সম্পর্কিত অনুরোধ বরাবরই উপেক্ষা করেছেন। তিনি সব সময় রক্তপাত এড়িয়ে চলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই সেই রক্তপাতের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন।

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও তার অব্যবহিত পরবর্তী উত্তাল টালমাটাল দিনগুলোর ইতিহাস যারা জানতে চান, কর্নেল শাফায়াত জামিলের বইটি তাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান দলিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। (১৭ জানুয়ারি, ২০১৫)