ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

এ সপ্তাহে মুক্তি যুদ্ধের উপর তিটটি বই পড়া শেষ করে চতুর্থ বইটি পড়া শুরু করেছি। মেজর নাছির উদ্দিনের লেখা ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ ও মেজর জেনারেল সুখওয়ান্ত সিংএর লেখা (অনুবাদ) স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় বই দুটো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইতোপূর্বে পঠিত সিদ্দিক সালিকের লেখা উইটনেস টু সারেন্ডার ও জেনারেল খাদিম রাজার লেখা ‘স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ বই দুটো পড়ে পাক বাহিনীর ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছিলাম। এবার সুখওয়ান্ত সিং এর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় বইটি পড়ে যৌথবাহিনীর যুদ্ধ পরিবল্পনা ও যুদ্ধ চালনা সম্পর্কে  বিস্তারিত জানতে পারলাম। আমরা, সাধারণ পাঠকগণ, কেবল মুক্তিযুদ্ধের ভাসা ভাসা বর্ণনা পড়তেই ভালবাসি। যখন যুদ্ধের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর অবতারণা হয়, তখন মনে হয়, এগুলো খুব বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বর্ণনা। হয়তো সমরবিদদের জন্যই এসব লেখা হয়েছে। কিন্তু একটু ধৈর্যসহকারে পড়লে যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার খুঁটিনাটিও বোঝা সম্ভব।

 

যুদ্ধ যুদ্ধই? । যুদ্ধ মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। যুদ্ধ মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা। কবির এ মহান উক্তি সত্যিই তাৎপর্যময়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের খুঁটিনাটি পড়লে আমরা গর্ব বোধ করব যে আমাদের পূর্ব পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাগণ এ দেশটা স্বাধীন করার জন্য কি কষ্টটাই না করেছিলেন। কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও সত্য যে যারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, কিংবা যারা আমাদের ছিলেন সাহায্যকারী বা বন্ধু তারাও আমাদের বিপরীতে বা পাশাপাশি কম লাঞ্ছনার শিকার হননি।

 

সুদূর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা সাধারণ পাঞ্জাবি সৈনিকটি আসলেই জানত না যে তারা কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে, আর কেনই বা যুদ্ধ করছে। এ যুদ্ধ কি ধর্মযুদ্ধ? ন্যায় যুদ্ধ? এটা কি আসলেই তাদের দেশের অখণ্ডতার যুদ্ধ না কোন একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাদের সেনাপতি ও নেতাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তারা আসলেই তা জানত না। তাই তো একটি বিরুদ্ধ পরিবেশে যুদ্ধ করতে এসে তার কচু কাটা হয়েছে পাকিস্তানি সৈনিকগণ। তারা যেমন বাঙালি মায়ের বুক খালি করেছে, তেমনি তাদের মায়েদের বুকও খালী হয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতায় এক সময় যখন বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা মুক্তিযোদ্ধা ও যৌথবাহিনীর হাতে প্রাণ হারাচ্ছিল, তখন পাকিস্তান সেনানায়কগণ তাদের নিহত সৈনিকদের লাশ নিজ দেশে পাঠান তো দূরের কথা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকেও সংগ্রহ করতে অনীহা প্রকাশ করে।

 

যে পাকিস্তানি সুবেদার ভ্রান্তভাবে জানত, আমাদের জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ হল হিন্দু। তার নাম তাজউদ্দীন না, তেজারাম, সেই পাক সুবেদারের মনখানাও পাক সেনাপতিরা তার নিজেদের অজান্তেই কতটা অপবিত্র করেছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে এসে সাধারণ পাক সেনারা যখন বুঝতে পেরেছিল যে তারা কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ভারতীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের স্বজাতী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন তাদেরও নিশ্চয় অনুশোচনা হয়েছিল। কিন্তু ততোদিনে তাদের আর ফিরবার কোন উপায়ই ছিল না। বাঙালিদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন তো নয়ই,এমনকি তারা আত্মসমর্পণ করার অধিকারটুকুও হারিয়েছিল। জেনারেল নিয়াজির ঘোষণা ছিল কোন যুদ্ধে শতকরা ৭৫ জন সৈনিক নিহত বা আহত না হলে পিছু হটা যাবে না। বেচারা পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন কি আর করে, নিজেদের শরীরকে কুকুর শেয়ালদের প্রতি উৎসর্গ করার মানসে যুদ্ধে অটুট থাকল।

 

আমাদের অকৃত্রিম সহায়তা করেছে ভারত। তারা কেবল অন্ন, আশ্রয়, অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি; তারা আমাদের সাথে থেকে শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, আহত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন, নিখোঁজ রয়েছেন এবং বন্দীও হয়েছেন। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে যৌথবাহিনী ভারতের সর্বমোট ১,৪২১ সেনা সদস্য নিহত হয়। আর নিখোঁজ ছিল ৫৬ জন। নিহতদের মধ্যে অফিসারই ছিল ৬৮ জন। অন্যদিকে আহতদের মধ্যে যৌথ বাহিনীর উত্তর কমান্ডের মেজর জেনারেল গুরবক্স সিং এর মতো কর্মকর্তারাও ছিলেন।

 

মুক্তিবাহিনীর আহত নিহতের সংখ্যা বেশুমার। যারা ‍যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, তাদের চেয়েও সংখ্যায় বেশি নিহত হয়েছিলেন যারা যুদ্ধ করেননি। গ্রামের ‍পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানিগণ। বেশামরিক লোকদের হত্যা করে তাদের লাশ একত্রিত করে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে তাদের নিশানা মছে দিয়েছিল আকাশে। হাজার হাজারমুক্তি যোদ্ধা, নিয়মিত বাহিনীর সদস্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে শহীদ হয়েছিলেন, নিখোঁজ হয়েছিলেন, মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে কর্নেল তাহের তো চির দিনের জন্যই পঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানিও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

 

পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো কোন দিনই সঠিকভাবে জানা যাবে না, জানানো হবেও না। তবে সেই সময় যৌথবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন প্রায় ৯৩ হাজার পাক বাহিনী সদস্য যাদের মধ্যে সর্বাধিনায়ক জেনারেল এএকে নিয়াজিসহ ১,৬০৬ জন অফিসার ছিলেন। আত্মসমর্পণের পূর্বরাতে পরিবহন হেলিকপ্টারে করে ঢাকা থেকে মিয়ানমার পালিয়ে আত্মসমর্পণের হাত থেকে রেহােই পেয়েছিলেন জেনারেল রহিমসহ বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন পাক কর্মকর্তা।

 

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হলে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চতুর্থ দেশিয় সূত্রগুলোর সবগুলোই আমলে আনা দরকার। শুধু এক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে বিভ্রান্তি বা অতিশয়োক্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়। একাধিক ‍সূত্রের পুস্তকগুলো হয়তো প্রথমে বিভ্রান্তি ছড়ায়।  কিন্তু একজন বিজ্ঞ পাঠক শেষ পর্যন্ত সঠিক তথ্যটি দ্বান্দ্বিক সূত্র থেকে অনুমান করে নিতে পারেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর শতশত বই পুস্তক ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের নিজেদের স্মৃতিকথা লিখেছেন। তবে এসবের মধ্যে ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট, কামনা-বঞ্চনা, দোষারোপ কিংবা মানবিক ত্রুটি রয়েছে। তাই ‍যুদ্ধের ইতিহাসের উপর কিছু নির্মোহ প্রকাশনার ঘাটতি এখনও রয়েছে। আর মেধাবী ইতিহাসবিদগণই কেবল তেমন নির্মোহ ইতিহাস লিখতে পারেন।