ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি কেন?  জাতি রাষ্ট্রগুলোর সর্বোচ্চ সমিতি ‘জাতিসংঘ’ থেকে শুরু করে আমাদের পাড়ার ‘কর্মজীবী মহিলা সংঘটি’ পর্যন্ত এর একটা না একটা ব্যাখ্যা দিয়ে বসবে। তাদের ব্যাখ্যার মধ্যে ৯৯% থাকবে একই ধরনের কথা, একই ধরনের অনুভূতির পুনরাবৃত্তি। প্রতিবছরই ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসে’ সেগুলো শুনতে হয়তো অনেকের ভাল লাগবেনা; এক ঘেয়েমী আসবে, ‘বস্তাপচা’ মনে হবে।

 

উএনএফপিএ তে চাকরি করে এমন এক মহিলা সহকর্মী আমাকে কয়েকটি পোস্টার দিয়ে বললেন, নেন স্যার। এগুলো আপনাকে বিতরণের জন্য দিলাম। এগুলো ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসের’। তিনি আরো জানালেন, তিনি যদিও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করেন, তবুও এই একটি বিশেষ দিবসকে ‘নারী দিবস’ হিসেবে নির্দিষ্ট করার পক্ষপাতি তিনি নন। রসিকতা করে তিনি বললেন, ৮মার্চ হল ‘বিশ্ব নারী দিবস’। তাহলে বছরের অন্যান্য দিনগুলো হল ‘পুরুষ দিবস’। এর অর্থ হল বছরের একটি দিন হল ‘স্ত্রী লিঙ্গ’; আর ৩৬৪টি দিন হল ‘পুরুষ লিঙ্গ’!

 

হ্যাঁ, হাস্যকর কৌতুকই বটে। কিন্তু কেন আমার সেই মহিলা জাতিসংঘকর্মী মহিলাদের নিয়ে কাজ করলেও, নিজে মহিলা হলেও এমন একটা দিবসে আস্থাশীল নন? এর উত্তর একটাই। কই কত দশক ধরেই না নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিকার ইত্যাদিন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু কেই কোন উন্নতি তো হচ্ছে না। তাই এ সব দিবস-টিবস পালন করে কি কোন লাভ আছে?

 

৮ মার্চে নোয়াখালী থেকে এক বন্ধু ফোন করে একটা মজার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেন। ‘স্যার’ শব্দটি একটি পুরুষ বাচক শব্দ । এর একটি স্ত্রীবাচক শব্দ আছে। সেটা হল, ‘ম্যাডাম’। কিন্তু তিনি লক্ষ করেছেন, পুলিশের সিনিয়র লেডি অফিসারগণকে ম্যাডামের পরিবর্তে ‘স্যার’। বলতে হয় কেন? এর অর্থ কি এ যে একটি স্ত্রীবাচক শব্দের অস্তিত্ব থাকার পরও নারী পুলিশ সদস্যগণ পুরুষবাচক শব্দটিই ব্যাবহার করতে বেশি আগ্রহী? এটা কি এ জন্য নয় যে, নারী পুলিশ সদস্যগণ বিশেষ করে সিনিয়র অফিসারগণ নিজেদের নারী পুলিশ হওয়ার চেয়ে পুরুষ পুলিশ হতে বেশি আগ্রহী? তারা কি নিজেদের নারীত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে রীতিমত পুরুষ হতে চান? তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন মানে কি পুরুষ হয়ে যাওয়া?

 

সত্যি বলতে কি আমি এর সদুত্তর দিতে পারিনি। কারণ, পুলিশের সিনিয়র নারী কর্মকর্তাদের কেন যে ‘ম্যাডামের’ পরিবর্তে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে হবে, সেটা বিদ্যাতয়নিক পরিবেশে কেউ কোন দিন আমাকে শিক্ষা দেয়নি। আমাকে পুলিশ একাডেমিতে কেউ শেখায়নি যে সিনিয়র নারী পুলিশ অফিসারদের ‘স্যার’ বলতে হবে। কিংবা একাডেমির প্রশিক্ষণের পরের মাঠ প্রশিক্ষণেও কেউ বলেনি সে কথা। আবার গত একযুগেরও বেশি পুলিশের চাকরিতেও কেউ আসলে আমাকে এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা দেয়নি।

 

তবে এ সম্পর্কে একটা পরোক্ষ উপদেশের কথা মেনে পড়ে। ২০০১ সালের জুনের প্রথম দিকে পুলিশ একাডেমিতে মৌলিক প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি চলাকালে ডিএমপির টেলিকম অডিটরিয়ামে আমাদের এক দিনের অরিয়েন্টেশন দেয়া হয়। এ সময় একবার কথা বলেছিলেন তৎকালের এসি রাশেদা বেগম। (বর্তমানে জাতিসংঘের তিনি একজন সফল আন্তর্জাতিক স্টাফ)। কথা বলার এক ফাঁকে তিনি আমাদের ব্যাচমেইট লেডি অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বললেন, সুপ্রিয় মহিলা সহকর্মীগণ, অনেকেই আপনাদের ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করবেন। বিশেষ করে, আপনাদের অর্ডালি, বডিগার্ড কিংবা অধীনস্তরা ‘ম্যাডাম’ বলতে অভ্যস্ত। কিন্তু খবরদার! আপনারা নিজেদের ‘ম্যাডাম’ বলতে দিবেন না। নিম্নস্থরা অবশ্যই আপনাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করবেন। এটাই অফিসিয়াল নিয়ম।

 

আমরা বিষয়টি নিয়ে কেউ তখন কোন রূপ চিন্তা করিনি। অবশ্য একটি উর্দিপরা সার্ভিসে বেকায়দা সওয়াল করা সংগত নয়। উপরোস্থরা যা বলবেন, এখানে সেটাই নিয়ম। লিখিত বিধির বাইরেও এখানে একটা অলিখিত ও বহুল স্বীকৃত রীতি আছে। এগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হয়।

 

তাই আজ যখন নোয়াখালীর বন্ধুবর স্ত্রীবাচক শব্দ ম্যাডামের পরিবর্তে পুরুষবাচক শব্দ স্যার ব্যাবহার করার পুলিশি রীতির ব্যাখ্যা চাইলেন, তখন আমার অজজ্ঞতা প্রকাশ করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

 

ভাষা মানুষের তৈরি। আর মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অংশটুকু হল ভাষা। আমরা যা ভাবি, যা করি, যা করাতে চাই কিংবা উপলব্ধিতে আমাদের যা আসে তা কোনভাবেই পুরোপুরি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একই কথা খাটে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারে, এমন ধরনের পরিভাষার অভাব শুধু বাংলায় নয়, সব ভাষাতেই আছে। যদি নারীপুরুষের বর্তমান অবস্থানকে পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করতে চাই তাহলে দেখব অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষবাচক শব্দের প্রাধান্য রয়েছে। শুধু তাই নয়, মহাবিশ্বের তেজোদ্বীপ্ত অংশটুকুর সবটাই পুরুষদের দখলে। শক্তি-সামর্থ্য আর নিয়ম ভাঙ্গা ও নেতৃত্বের প্রতীক হল পুরুষ। বিপরীত দিকে কোমলতা, বস্যতা, আর গোলামীর প্রতীক হল নারী। পৃথিবীতে ভাষার উৎপত্তির আদিতেই এসব বিভাজন বিজ্ঞতা-অজ্ঞতা আর পরিকল্পনাহীনতায় হয়ে গেছে। কিন্তু হাজার বছরের বঞ্চিত নারীদের কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। কিন্তু এখন যখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তখনই শুরু হচ্ছে বিপত্তি।

 

কালের বিবর্তনে পৃথিবী থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়; আবার অনেক নুতন কিছুর সংযোজন ঘটে। নারী অধিকারের আধুনিক রূপ অতি আধুনিক। তাই নারী অধিকারের বিষয়টি অনেকের কাছে বেখাপ্পাই ঠেকে। নারী সেতো নারীই, নারীর আবার অধিকার কী? প্রকৃতিই যখন নারীদের অধঃস্তন ও দুর্বল করে সৃষ্টি করেছে, তখন পুরুষগণ কি করবেন? প্রকৃতিগত দুর্বলতাকে কি গায়ের জোরে রদ করা যায়?– এ হল তাদের যুক্তি। কিন্তু এ জাতীয় যুক্তি যে অধুনা দারুণভাবে অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে সেটা অনেকে বুঝতে চায় না। আজ আমরা যে উত্তরাধুনিক যুগে বসবাস করছি এবং দ্রুতি পরাআধুনিকতায় প্রবেশ করছি সেটা অনেকই বুঝতে চান না। পরাআধুনিক জগতে মানুষের দৈহিক অবয়ব নিতান্তই অকেজো হয়ে পড়বে। সেখানে মস্তিস্কই বিশ্ব জগতের ক্ষমতার নির্ধারক। নারী আর পুরুষের মস্তিস্কের ব্যাবহারযোগ্য নিউরোনগুলোর সংখ্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যে স্টিফেন হকিং এর শরীরের মস্তিষ্কভিন্ন তিনিটি মাত্র হাতের আঙ্গুল কর্মক্ষম সেই হকিং পুরুষ হলেও যা, নারী হলেও তাই।

 

উপসংহারে আবার ফিরে আসব নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা আপাতত হতাশ আমার ইউএনএফপিএ সহকর্মী প্রসঙ্গে। কালের প্রবাহে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে। একই সাথে এগিয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নের সাথে নারী উন্নয়নের সহ-সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের নারী বিপারপতির সুকণ্যাটির সাথে সাথে অজ পাড়াগায়ের কৃষককণ্যাটির মধ্যেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তন শুধু কালিক ও বৈষয়িক নয়; এ পরিবর্তন মানসিকও।

 

শিক্ষার হারের সাথে সাথে আর্থিক সম্মৃদ্ধিও আমাদের এসেছে। তৈরি পোষাক শিল্পের বৃহত্তর শ্রমবাজার আমাদের নিম্নস্তরের নারীদেরও অনেকটাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। দেশি উদ্যোগের সাথে বিদেশি সহায়তার সম্মিলন ঘটেছে। সরকারের ইতিবাচক কর্মসূচির ফলে নারীরা শুধু ক্ষমতায়িতও হচ্ছেন না, ক্ষমতা প্রয়োগে তাদের সামর্থ্যও বাড়ছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীতে বেগম রোকেয়ার কল্পিত সুলতানার মতো কেউ হয়তো ‘নারীস্তানের’ অধিবাসী হবেন না; কিন্তু নারীরা যে তাদের প্রাপ্য অধিকারে আদায় করতে পারবে তা আর কল্পনাতেই থাকবে না, বাস্তব রূপ নিবে।(৯ মার্চ, ২০১৫)