ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যেহেতু আমি কমিউনিটি পুলিশিং এর একজন নিষ্ঠাবান মিশনারি এবং যেহেতু বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়ন হবে বলে আমি প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখি, তাই এ নিয়ে কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিতে হয়। কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে উত্থাপিত ও উত্থাপিতব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্বলিত আমার পুস্তকটির প্রথম সংস্করণ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে।

 

তবে পুলিশ-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণদানকালেও আমি এধরনের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকি। পুলিশ অফিসারদের উত্তরের মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং এর মৌল দর্শন সম্পর্কে বিস্তারিত না হলেও মৌলিক জ্ঞান দেয়ার নিরলশ চেষ্টা করি।

 

চৌকশ পুলিশ অফিসারদের কাছ থেকে যে সব বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন পাওয়া যাদের সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেকায়দার প্রশ্ন হল, কোন আইনের কোন কোন ধারায় কমিউনিটি পুলিশিং করার অনুমতি/তাগিদ বা স্বীকৃতি রয়েছে? তারা দর্শন জানতে বা বুঝতে চাননা; জানতে চান আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা। তাই এ প্রশ্নের ‍উত্তর সহজে দেয়া যায় না, সুনির্দিষ্টভাবে দেয়া যায় না।

 

বাংলাদেশে পুলিশিং পদ্ধতি সম্পর্কে প্রচলিত আইনগুলোর মধ্যে প্রধানতম হল ‘ফৌজদারি কার্যবিধি’ ও পুলিশ আইন। বিধির মধ্যে রয়েছে পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল বা সংক্ষেপে পিআরবি। এর বাইরেও অনেক বিধি বা প্রবিধি রয়েছে যাদের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিধিমালা অন্যতম।

 

কমিউনিটি পুলিশিং এর আইনী ভিত্তি হিসেবে আমরা সাধারণত সিআরপিসির চতুর্থ অধ্যায়ের ৪২-৪৫ নং ধারা, পুলিশ আইনের ১৭ নং ধারা এবং পিআরবির ৩৩-৩৪- নং প্রবিধানসহ আরো কিছু আইন ও বিধিকে  উল্লেখ করি।কিন্তু আমার মতে এসব ধারা বা প্রবিধান কমিউনিটি পুলিশিং এর আধুনিক ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে না।

 

তবে এগুলো না হলে যে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় উত্তরণ সম্ভব নয়, তাও নয়। বস্তুত পুলিশিং একটি ব্যাপক ধারণা। তাই আইন ও বিধিনিষ্টগণ  স্বীকার করুন বা নাই করুন, বাস্তব সত্য হল, পুলিশংকে কোন নির্দিষ্ট আইনের মধ্যে পুরোপুরি সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়।  পুলিশিং শুধু আইনী বিষয় নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও হার্দিক বিষয়ও। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজ পুলিশকে যে স্বাধীন বিবেচনা শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ও তাদিগ দেয়, বিচার ব্যাবস্থার অন্য কোন অঙ্গকেই ততোটা দেয়া হয় না।

 

এজন্য আমাদের আইনের ধারা নয়, আইনের মূল উপাদানগুলোর দিকে লক্ষ করা প্রয়োজন। আইন বিজ্ঞানের ভাষায়, আমাদের দেশের আইন-ব্যবস্থা ইতিবাচক(পজিটিভ) নিষেধাজ্ঞার আওতাভূক্ত। ইতিবাচক নিষেধাজ্ঞা বা পজেটিভ স্যাঙ্কশন বলতে বোঝান হয়, কোন সমাজ বা দেশে মানুষের কোন কর্মকে কোন আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করা ও তা ভঙ্গের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে মানুষের সেই কর্ম বা আচরণ অবশ্যই বৈধ। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাশ করা আইনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়, এমন সকল ধরনের কর্মকাণ্ডই বৈধ।

 

এখন আসা যাক কমিউনিটি পুলিশিং কার্যাবলী সম্পর্কে। কমিউনিটি পুলিশিং কী? অপরাধ প্রতিরোধের জন্য পুলিশ ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টাই হল, কমিউনিটি পুলিশিং। সমাজের প্রয়োজনেই সমাজের মানুষ পুলিশ সৃষ্টি করেছে। জনগণ অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নিজেরা শুধু দায়িত্বপ্রাপ্তই নয়, বরং অপরাধ প্রতিরোধ করা তাদের ব্যক্তিজীবনের অন্যতম প্রাত্যহিক কর্ম। সরল প্রকৃতির সমাজে যখন কোন বিধিবদ্ধ পুলিশ ছিল না, তখন মানুষ প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে ও পরে দলগত ও গোষ্ঠীগতভাবে অপরাধ প্রতিরোধ তথা নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করত। কিন্তু ক্রমান্বয়ে সামাজিক সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে। তখন শুরু হয় কর্ম বিভাজন। তারও পরে আসে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ। পুলিশ এমনি একটি রাষ্ট্রীয় সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান যা জনগণের কাছ থেকে অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

 

তবে যদি রাষ্ট্র গঠনের আদি প্রক্রিয়া অর্থাৎ সামাজিক চুক্তি বা সোসাল কন্ট্রাক্টের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে বুঝতে পারব, জনগণ পুলিশকে অপরাধ প্রতিরোধ করার দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ করলেও তাদের নিরাপত্তা তথা অপরাধ প্রতিরোধের সকল দায়দায়িত্ব পুলিশের উপর ছেড়ে দেয়নি। এটা আসলে ছেড়ে দেয়া যায় না। নিরাপত্তা এমন একটা ধারণা যা জনগণের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গতিধারার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাই এই নিরাপত্তার সবটুকু অন্যের উপর ছেড়ে দিয়ে কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিশ্চিত থাকতে পারে না।

 

আমাদের মত সমাজে জনগণ অনেকটা সারল্যদোষে ও অনেকটা অজ্ঞতাবসে মনে করেন, অপরাধ প্রতিরোধের যাবতীয় দায়দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পাশ্চাত্য ও উন্নত দেশগুলোতে মানুষ সেটা মনে করেন না। আধুনিক পুলিশ সৃষ্টির আদির কথাই যদি বলি, তাহলে দেখব ইংল্যান্ডের সাধারণ জনগণ মানুষের ব্যক্তি ও সামষ্টিক নিরাপত্তার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডে পুলিশ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে ছিল না। তারা মনে করত, যদি নাগরিকের নিরাপত্তা তথা অপরাধ প্রতিরোধের জন্য নাগরিকদের দ্বারা প্রতিপালিত সকল অধিকার আইনগতভাবে পুলিশের উপর ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে জনগণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে। পুলিশ আইনগতভাবে মানুষের বাসাবাড়িতে প্রবেশ করতে পারবে, নাগরিকদের গ্রেফতার করতে পারবে এবং প্রয়োজন মতো নাগরিকদের প্রতি বল প্রয়োগ করবে। ইংল্যান্ডের ব্যক্তিস্বাধীনাতার পূজারী সমাজ তাই রবার্ট পিলের মেট্রোপলিটন পুলিশ সৃষ্টির বিলটিকে সফলভাবে তিন তিনবার সংসদে বাতিল করে দিয়েছি। অবশেষে চতুর্থবারের প্রচেষ্টায় এটা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছিল।

কিন্তু কেন্দ্রীয় কমান্ডে পুলিশ সৃষ্টি বা অপরাধ প্রতিরোধের ভার পুলিশের উপর ছেড়ে দিলে কি হবে, ইংল্যান্ড বা ব্রিটেনের মানুষ এখনও পুলিশ কর্তৃক কৃত কাজের একটা বড় অংশ নিজেরাই করে। এ সম্পর্কে ভারতের একজন ঊর্ধ্বতন আইপিএস অফিসার  এফ.ফি আরুলের বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারেঃ

 

In the United Kingdom, both in urban and rural areas, a great measure of law and order is maintained through an unofficial network of vigilance by local figures of authority such as the publican, the shopkeeper, the teacher, parents and housewives chatting on door-step. By calming a quarrel, cuffing a miscreant and witnessing everything that happens, they are the true policemen of any close community. It is this secondary control, which is of inestimable help to the British Bobby.

কমিউনিটি পুলিশিং প্রকৃতপক্ষে নতুন কোন পুলিশিং নয়। এটা পৃথক দর্শনে পরিচালিত হলেও এটা আসলে পুরাতন ভাবের নব আবিষ্কার। এটা আমাদের জনগণকে মনে করিয়ে দেয়ার একটি উপায় যে,  যে দায়িত্ব আপনারা পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়েছেন সেটা পুলিশের পক্ষে সূচারুরূপে পালন করা তখনই সম্ভব যখন আপনারা আপনাদের আদি দায়িত্বকে সুচারুরূপে পালন করবেন। তাই পুলিশের কাছ থেকে অর্পণ করা অনেক দায়িত্বই আপনাদের কাঁধে পুনরায় তুলে নিতে হবে, কিছু কিছু দায়িত্ব পুনর্বিন্যাশ করতে হবে, কিছু দায়িত্ব আবার নতুন করে অর্পণও করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে আপনাদের হস্তান্তরের অযোগ্য দায়িত্বসমূহের সাথে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা দায়িত্বগুলোর একটি সমন্বয় ঘটাতে হবে।

 

পুলিশকে তাদের সনাতনী ধ্যানধারণা পরিত্যাগ করে নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে যে জনগণ তাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা বাস্তবায়ন করা তখনই সম্ভব যখন জনগণ তাদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে।

অপরাধ প্রতিরোধের জন্য পুলিশ ও জনগণের স্ব স্ব দিক থেকে এই যে মনে করা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিকে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা— এর মাঝে আইনের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। জনগণ যে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে,, সেই প্রচেষ্টাকে কোন আইন দিয়ে কোন কালেই বাধাগ্রস্ত করা হয়নি। নিজেদের নিরাপত্তা, নিজেদের ধনসম্পদ, জানমালের সুরক্ষার অধিকার জনগণের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার আইন বলে ক্ষুণ্ন করা হয়নি বরং সুরক্ষিত করা হয়েছে। আদি ক্ষমতা জনগণের;  সমাজের মানুষের। প্রাগৈতিহাসিক যুগে তারা সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে ও আধুনিক যুগে তারা রাষ্ট্রের সংবিধানের মাধ্যমে কতিপয় বাছাই করা মানুষ তথা রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজনে তারা রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা, অংশীদারিত্ব ও সমন্বয় সাধন করবেন। জনগণের এ কাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পক্ষে শুধু আমাদের দেশে কেন, পৃথিবীর কোন দেশেই কোন আইন নেই।

 

এখানে একটি ছোট্ট ব্যবহারিক উদারণ দিব। আইনে সুনির্দিষ্টভাবে তাদিগ দেয়া না থাকলেও কিছু কিছু কাজ প্রাত্যহিক ভিত্তিতেই পুলিশ সদস্যদের সম্পাদন করতে হয়। এগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নিহত ব্যক্তিদের প্রতি তাৎক্ষণিক সেবাপ্রদান।  এটা স্বীকার্য যে মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের পুলিশ দ্রুততার সাথে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। প্রায় সময় তারা পুলিশের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে। কোন কোন ক্ষেত্রে রাস্তার অন্যগাড়ি ভাড়া বা জোর করে হলেও ব্যবহার করে।

 

কিন্তু আমার জানা মতে, সকড় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণের এ দায়িত্ব পালন করার জন্য কোন আইনে পুলিশকে বাধ্য করা হয়নি। একমাত্র সুনির্দিষ্ট কারণে, যথাযথ পরিস্থিতি উদ্ভব হলে পুলিশের নিজ থেকে গুলি বর্ষণের ফলে আহত-নিহত ব্যক্তিগণ ছাড়া অন্য কোন কারণে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পুলিশের নয়।   কিন্তু আইনে থাকুক বা না থাকুক, পেশার প্রয়োজন বলে হোক আর মানবিক বিবেচনায় হোক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে পৌঁছান বা চিকিৎসার সাময়িক ব্যবস্থা পুলিশের সকল স্তর  ও ইউনিটের অফিসারগণই তা করে থাকে।

এখন আমার প্রশ্ন হল, যদি একজন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে প্রেরণের সপক্ষে বা বিপক্ষে কোন আইন না থাকে এবং তারপরও যদি পুলিশ তা করে এবং পুলিশকে সে কাজ করতে কেউ যদি বাধা না দেয়, তাহলে, কমিউনিটি পুলিশিং করতেও কেন বাধা দিবেন? কমিউনিটি পুলিশিং এর দর্শন, কর্মপদ্ধতি ইত্যাদির এমন কোন স্থানে এমন কোন উপাদান নেই যেটা সমাজের মানুষ অনুমোদন করবেন না। আর আইনে তো জনগণ ও পুলিশের পারস্পরিক যোগাযোগ ও অংশীদারিত্ব স্বীকৃতই রয়েছে।

কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশিং এরই একটি স্টাইল, ধরন, কর্মপদ্ধতি কিংবা দর্শন। জনগণ যখন বাংলাদেশ পুলিশকে পুলিশিং করার দায়িত্ব দিয়েছে, সে দায়িত্বপালনের জন্য আইন ও বিধি দিয়েছে,  তখন কমিউনিটি পুলিশিং এর দায়িত্ব ও বৈধতা সে আইন ও বিধির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।  তাই কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়ন তথা কমিউনিটি পুলিশিং কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য কোন আলাদা আইনের দরকার নেই।(১৫ মার্চ, ২০১৫)