ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২৮ মার্চ, ২০১৫ সকল জেলার এসপিসহ বেশ কিছু সিনিয়র অফিসারকে মুঠোফোনে একটি ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েছি। মাঝে মাঝেই আমি মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের উদ্দেশ্যে ক্ষুদেবার্তা পাঠাই। এটা এক ধরনের পাগলামো বলা যায়। কেউ কেউ একে বোকামিও বলতে পারেন। ক্ষুদেবার্তা এর উদ্দেশ্য হল, সহকর্মীদের নির্বাচিত বিষয়ে একটু চাঙ্গা করা।

আজকের ক্ষুদেবার্তায় কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন নিয়ে অধ্যয়ন করার জন্য হেদায়েতমূলক অনুরোধ ছিল। ক্ষুদেবার্তাটি ছিল এমন:

‍‘Seniority is not enough to understand community policing. You have to study the philosophy. So read whatever materials you have near the hand’.

 

ক্ষুদেবার্তাটির ভাষায় একটু পাণ্ডিত্য ছিল, ছিল উপদেশ। কেউ কেউ অবশ্য এতে মনে করেছেন, বার্তা প্রেরক হয়তো ধরেই নিয়েছেন সিনিয়র অফিসারগণ কমিউনিটি পুলিশিং বোঝেন না। বার্তায় যেহেতু আমার নাম-পদবি ছিল না এবং আমার মোবাইল নম্বরটিও অনেকের কাছে পরিচিত নয়, তাই অনেক সিনিয়র অফিসার মনে করেছেন, এটা হয়তো কোন উটকো ব্যক্তি হবে যে পুলিশকে  বোকা ভেবে শিক্ষা দিতে চায়।

 

কয়েকজন পুলিশ সুপার তৎক্ষণাৎ ক্ষুদেবার্তা এর মাধ্যমেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একজনের উত্তর ছিল:

Do you mean senior officers do not read, they don’t have idea of community policing? Style changes the meaning sometimes. Sorry—

 

অন্যএকজন পুলিশ সুপার লিখেছেন:

Thanks, I agree with you that seniority should not be the base of knowledge. What’s wrong with the concept? I have the latest one about community policing theory. People need to know which one is applicable and where. Thanks.

একজন পুলিশ সুপার সাথে সাথেই আমাকে রিং ব্যাক করেছিলেন। কিন্তু আমার ট্যাবের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় তার ফোন ধরা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি তার ডিআইও-১ এর মাধ্যমে এ ক্ষুদে বার্তা প্রেরক সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করেছিলেন।

 

অবশ্য এ তিন পুলিশ সুপার আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তারা নিজেরাও বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানান্বেষী পুলিশ অফিসার। তারা কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকেফহাল বলেই হয়তো একটু বেশিই মাইন্ড করেছিলেন।

প্রায় দেড়শত ক্ষুদেবার্তা এর মধ্যে হয়তো অনেকেই মাইন্ড করেছেন। কিন্তু সবাই এমন  প্রতিক্রিয়া জানাননি। যারা জানিয়েছিলেন, তারা অবশ্য স্বভাবগতভাবেই জনগণের যে কোন মতামতকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন ও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেন। এঁদের মিডিয়া যোগযোগ বেশ ভাল।

যারা এ ক্ষুদেবার্তা এর জন্য আমাকে ভুল বুঝেছেন কিংবা আহত হয়েছেন, তাদের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থী। অবশ্যই স্টাইল বা প্রকাশভঙ্গী সৎ উদ্দেশ্যকেও অনেক সময় ব্যহত করে। এখানেও হয়তো তাই হয়েছে। অনেকেই আমাকে ভুল বুঝেছেন।

কিন্তু এর পরও আমি মনে করি, কমিউনিটি পুলিশিং সম্পর্কে আমাদের ব্যাপক পড়াশোনা ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে একটি দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়; সব দিক বিবেচনা না করে অনুদানমূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা যায়, কিন্তু পূর্ণজ্ঞান অর্জন ছাড়া পুলিশিং এর মতো একটি সুদূর প্রসারী বিষয়কে প্রচলিত রীতি থেকে বিচ্যূত করার চেষ্টা করা সঠিক হবে না। পুলিশিং শুধু রাস্তায় পাহারা দেয়া নয়, কোন অপরাধীকে গ্রেফতার করা কিংবা মামলা তদন্ত করাই নয়, পুলিশিং এসবের চেয়ে আরো অনেক বেশি কিছু।

 

১৯৯৯ সালের ক্যাডার পদে যোদনের প্রথম অভিজ্ঞতা মনে পড়ে। তথন আমি বিসিএস(তথ্য-সাধারণ) ক্যাডারে যোগদানের পরেই কর্মক্ষেত্র সিরাজগঞ্জ জেলায় যাই। জেলা তথ্য অফিসার হিসেবে অফিসে যোগদানের মুহুর্তেই আমাকে সহকারী জেলা তথ্য  অফিসারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হল। দায়িত্বগ্রহণের দিনিই বেশ কিছু ফাইল সই করতে হল। ফাইলগুলোর মধ্যে কিছু অর্থ সংক্রান্ত ফাইলও ছিল। এর কয়েকদিন পর আবার পেলাম একটি অডিট আপত্তির কাগজ। কিন্তু মজার ব্যাপার হল,  অফিসের দায়িত্ব সম্পর্কে আমি তখনও কিছু জানতাম না। আমাকে কোন প্রশিক্ষণও দেয়া হয়নি। তেমন কোন ব্রিফিংও দেয়া হয়নি। এক সপ্তাহ অন্ধের মতো ফাইলটাইল সই করে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গেলাম।

 

কিন্তু ২০০১ সালে যখন পুলিশে যোগদান করি তখন দীর্ঘ দেড় বছরের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আগে কোন দায়িত্বই পালন করতে হয়নি। এবং সেটা সম্ভবও ছিল না। কেননা, পুলিশিং জেলা তথ্য অফিসার কিংবা ঐ জাতীয় সিভিল প্রশাসনের মতো কোন পেশা নয়। এখানে আইন-কানুন, বিধি-বিধান আর তার সাথে সুবিজ্ঞচিত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ() এর প্রশ্ন জড়িত আছে। পুলিশের সামান্য ভুল কিংবা অতি উৎসাহী পদক্ষেপ মানুষের জীবন-মরণের দারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।

কমিউনিটি পুলিশিং এমন একটি পুলিশিং দর্শন যা প্রচলিত পুলিশিংকে আগাগোড়াই পরিবর্তন করবে। অনেকে হয়তো মনে করবেন, এ আর কি? জনগণ পুলিশের কাজে সহায়তা করবে, পুলিশ জনগণের কাছে যাবে, আগের চেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে সেবা প্রদান করবে- এসবই তো সব। কিন্তু বিষয়টি যতটা সহজ ভাবা হয়, ততোটা সহজ নয়।

 

মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভুল ধারণা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কমিউনিটি পুলিশিং এর আসল দর্শনটি সঠিকভাবে মাঠ পর্যায়ে সঞ্চারিত না হওয়ায়, যে যেমন করে পারে বা বোঝে তেমন করে এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রয়াস পাচেছ। এক্ষেত্রে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একটি পরষ্পর বিরোধী ধারণার ও প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। পুলিশ ভাবছে, কমিউনিটির লোকজন আমাদের কাজটা করে দিলে মন্দ কি? আর কমিউনিটির লোকজন ভাবছে, বাহ! এ সুযোগে আমি তো ‘পাকা পুলিশ’ হয়ে গেলাম। আমাকে আর পায় কে? ‘পুলিশ মোরে কইছে চাচী, মুই কি আর মুইতে আছি?’

 

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে এধনের বিপরীত ধারণার চেয়েও বড় সমস্যা হল, পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও এর বোঝার বৈপরিত্য লক্ষণীয়। কেউ কেউ কমিউনিটি সদস্যদের নিয়মিত ইউনিফর্ম পরিয়ে তথাকথিত ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বানাতে চাচেছন। কেউ কেউ আবার এমন ধরনের কাজও কমিউনিটি সদস্যদের দিয়ে দিতে চান যেটা একমাত্র পুলিশ সদস্য ছাড়া অন্যদের পক্ষে করা আইনগতভাবেই সম্ভব নয়, এবং সাধারণভাবে উচিতও নয়।

 

এ সব কিছুর একটাই সমাধান। আর তাহল এ দর্শন সম্পর্কে ভালভাবে জানা ও উপলব্ধি করা। কিন্তু এ জানার জন্য সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের স্বউদ্যোগে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। জুনিয়র পুলিশ অফিসাগণ সিনিয়রদের কাছ থেকে নির্দেশনা নেন, তাদের একাডেমি ও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণও দেয়া হচেছ। কিন্তু সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের ক্ষেত্রে এগুলোর  সুযোগ অনেকটাই সীমিত। আমাদের চারকির শর্ত মতেও তাদের নিজেদের উদ্যোগেই সব পরিষ্কারভাবে জানতে হবে। জুনিয়রগণ না জানলে বা ভুলভাবে জানলে সিনিয়রগণ সংশোধন করে দিতে পারে। জুনিয়রদের ভুল ধরিয়ে দেবার অনেক লোক আছে। জুনিয়রের ভুল তাকে বা তার বাইরে সামান্য কয়েকজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু সিনিয়রের ভুল কোন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল ও ক্রমান্বয়ে অকার্যকর করে তোলে।