ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

রাজধানীর তেজগাঁর বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুর রহমান নামে ২৭ বছর বয়সী এক ব্লগার খুন হয়েছেন। খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতা দুইজন মাদ্রাসা-ছাত্রকে খুনের কাজে ব্যবহৃত চাপাতি ও অন্যান্য আলামতসহ হাতে নাতে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে নরসিংদির জিকরুল্লাহ চট্টগ্রামের হাটহাজিরর দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্র। অন্যজন কুমিল্লার আরিফ রাজধানীর মিরপুরের দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র। তারা পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছে বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।( প্রথম আলো ৩১ মার্চ, ২০১৫) (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৩০ মার্চ ২০১৫)

গ্রেফতারকৃতদের ভাষ্যমতে, ওয়াসিকুর রহমান মহানবী(স) এর অবমাননা করেছেন, আল্লাহ ও রসুলকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন। তাই মাসুম নামের এক বড় ভাইয়ের নির্দেশ ও পরিকল্পনায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, হত্যাকারী মাদ্রাসার ছাত্রগণ জানেন না কিভাবে ওয়াসিকুর ধর্ম, আল্লাহ ও মহানবীর(স) অবমাননা করেছেন। আর এরা একে অপরের পূর্ব পরিচিত নয়। শুধু একজন মানুষকে খুন করার মিশনেই তারা একত্রিত হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের দিক দিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।

ইন্টারনেট তথা ব্লগিং জগতে প্রবেশের পর বিশ্ব মত প্রকাশের ক্ষেত্রে অসম্ভব দ্রুুততিতে একটি অবাধ স্বাধীনতার গোলকধাঁধাঁর ভিতর প্রবেশ করছে। মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় আর তেমন কোন বাধাই থাকছে না। যে কেউ যা খুশী ইন্টারনেটে ছড়াতে পারছে। এ নিয়ে যেমন বিভ্রান্তি বাড়ছে, তেমনি বিভ্রান্তি দূর করারও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পূর্বে প্রচার মাধ্যমের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত। কোন মত প্রকাশ করতে হলে তাকে হয় জনতার কাছে সরাসরি সভা-সমাবেশের মাধ্যমে বা জনে জনে যেতে হত, নয়তো বই প্রকাশ করতে হত। পত্রিকায় বা ম্যাগাজিনে তা প্রকাশ করতে হত। কিন্তু সেগুলো ছিল খুবই সীমিত। কেউ চাইলেই যেমন কোন বই প্রকাশ করতে পারত না, কেউ চাইলেই কোন কিছু পত্রিকা বা প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হত না। প্রচার মাধ্যম ইতোপূর্বে একটি রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমিত থাকত। কিন্তু বর্তমানে প্রচার মাধ্যমের গণ্ডী সীমাহীন। এক্ষেত্রে সম্পদ সীমিত না হলেও সামান্য সম্পদ ব্যবহার করেই সীমাহীন প্রচার পাওয়া যায়। তাই মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমাও যেন অসীমে গিয়ে পৌঁচেছে।

 

বোদ্ধাজন মাত্রই স্বীকার করবেন যেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সভ্য জগতে ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতাই শুধু নয়, যে কোন প্রকারের স্বাধীনতা কখনই অবাধ ছিল না। কেননা সীমিত জ্ঞানের  অধিকারী ব্যক্তির অবাধ স্বাধীনতা অন্য ব্যক্তির স্বাধীনতাকে প্রায়সই খর্ব করত। দুর্বলের মত সবলের উপর চাপিয়ে দেয়া হত, প্রতিরোধে অক্ষমরা নিশ্চিহ্ন হত। তাই ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কাঙ্খিত সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা চলত। এ চেষ্টার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকত এক বা একাধিক নিয়ন্ত্রক ব্যক্তি, সমষ্টি বা সত্তা।

 

ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সীমিত করার প্রচেষ্টা সেই সামাজিক চুক্তির মধ্যেই নিহিত ছিল। প্রকৃতির রাজত্বে (State of Nature) রহিম করিমকে খুন করার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করত। কিন্তু একই রাজ্যের নাগরিক হিসেবে করিমও রহিমকে খুন করার অধিকার ভোগ করত। কিন্তু এক জনের অন্যকে খুন করার এ অবাধ অধিকার প্রয়োগ করতে গেলে অন্যজন একেরবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তাই রহিম ও করিম একটি চুক্তিতে উপনিত হল যে, রহিম করিমকে খুন করার অধিকার পরিত্যাগ করবে, যদি করিমও রহিমকে খুন করার অধিকারটুকু প্রয়োগ না করে।

 

এ হল ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে স্বকীয় স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করার চুক্তি। সামাজিক চুক্তি হল, গোটা সমাজের ব্যক্তি, সমষ্টি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ভূখণ্ডগত চুক্তি। এ চুক্তির বলে ব্যক্তি তার স্বাধীনতার কিয়দংশ কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির উপর এই শর্তে অর্পণ করেছে যে তার সমর্পিত স্বাধীনতাটুকুর বিনিময়ে যে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির কাছে স্বাধীনতা সমর্পণ করা হয়, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি তাকে ও তার অসমর্পণকৃত বাকী স্বাধীনতাটুকু রক্ষা করার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

যে ব্যক্তি বা সমষ্টির কাছে আমরা আমাদের কিছু স্বাধীনতা সমর্পণ করি তারাই হল, আমাদের নেতা, গোষ্ঠী প্রধান, গোত্র প্রধান, সমাজ প্রধান, প্রশাসক কিংবা স্বয়ং রাষ্ট্রই। তাই রাষ্ট্রের কাজ তার নাগরিকদের স্বাধীনতার সীমার মধ্যে ধরে রাখা এবং সীমা লঙ্ঘণকারীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা।

 

অন্যান্য বিষয়ের মতো ধর্ম নিয়েও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন মত থাকতে পারে। এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ধর্মকে স্বীকার  নাও করতে পারে। এক জনের প্রদর্শিত পথে অন্যজন নাও চলতে পারে। একের রীতিনিতি অন্যের কাছে  নাও ভাল লাগতে পারে। কিন্তু তাই বলে একজনের  স্বীকৃত ও পালনকৃত ধর্মকে তুড়ি মেড়ে  অন্যজন উড়ে দিব, একজনকে অন্যজন যাচ্ছে তাই করে বলবে, অন্যের উপর ও অন্যের ধর্মের উপর খিস্তি-খেউড় প্রয়োগ করবে এমনটি তো হতে পারে না। এক জনের যেমন ধর্ম পালন না করার অধিকার আছে, তেমনি অন্যের তার নিজ ধর্ম পালন করার অধিকার আছে।

 

একজনের বিশ্বাস তার কাছে যেমন পবিত্র মনে হয়, তেমনি অন্য জনের বিশ্বাসও তার কাছে পবিত্র। শুধু আমার টুকু পবিত্র, বাকী সবই অপবিত্র– এমনটি ভাবা যৌক্তিক নয়। যারা যুক্তি মানেন না, তারা প্রকৃতির আদি রাষ্ট্রের মতোই যেন নিজ ভিন্ন অন্যকে খুন করার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতে চায়। কিন্তু আমাদের একটি প্রতিষ্ঠিত আধুনিক রাষ্ট্র আছে। সে রাষ্ট্র কোন নাগরিককে তার আদিম স্তরের রাষ্ট্রহীন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দিতে পারে না।

 

ব্লগিং বা মত প্রকাশের সীমাহীন জগতে প্রবেশ করে অনেক ব্লগার কিংবা স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি মত প্রকাশের ক্ষেত্রে যেন সেই প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে গেছেন। ফেইসবুক, টুইটার, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্লগ ইত্যাদিতে তারা যাচ্ছে তাই লিখে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ইউটিউবের মতো ভিডিও সাইটেও অবাধে মিথ্যা, বানোয়াট, সত্য, অসত্য, অর্ধসত্য ভিডিও পর্যন্ত আপলোড করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, নিজেকে বিবস্ত্র করাই যেন স্বাধীনতা, কেউ কেউ ভাবছেন, অনকে হেনস্তা করাই যেন মানুষের মোক্ষ। আস্তিকরা ভাবছেন, তাদের নিজস্ব ধর্মমতের বাইরে পৃথিবীতে অন্য কিছুর অস্তিত্ব থাকা অপ্রয়োজনীয়। আবার নাস্তিকরা ভাবছেন, হয়তো ধর্মই স্বাধীনতার এক মাত্র শত্রু। তাই আগে ধর্মকেই আক্রমণ কর।

 

কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে সামাজিক চুক্তির সূচনা দিয়ে তিল তিল করে যে আধুনিক বিশ্ব তৈরি হয়েছে সেখানে ভিন্ন মতের উপস্থিতি সহ্য করা হয়েছে। প্রত্যের মতকেই শ্রদ্ধা করা ও তা প্রকাশ করার ধারণা স্বীকার করা হয়েছে। তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোন দিনই অবাধ ছিল না। এর একটা সীমা অবশ্যই সভ্যতার শুরুতেও ছিল বর্তমানেও আছে। এই সীমাটুকু সভ্যতার সুষ্ঠু বিকাশের জন্যই দরকার। যারা এ সীমা মানেন না, তারা অত্যাচারী। সীমা লঙ্ঘণ করে প্রকাশিত মত শুধু প্রকাশিতই হয়, এ মতের অনুসারী কেউ হয় না। তাই ক্রমান্বয়ে সেই মত বা মতবাদ যেমন নিশ্চিহ্ন হয়, তেমনি নিশ্চিহ্ন হয় মত প্রচারকারীও।