ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের দিকে দিয়ে বিবেচনা করলে পুলিশ  অবশ্যই একটি রাষ্ট্রীয় সংগঠন। কিন্তু দায়িত্ব পালন ও যোগাযোগের ধরনের দিক দিয়ে পুলিশ আগাগোড়াই একটি সামাজিক সংগঠন। সমাজ বা রাষ্ট্রে পুলিশের জরুরৎ কেন? কি কাজ করে পুলিশ?  এ প্রশ্নের হাজারটি উত্তর দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সকল উত্তরকে বাদ দিয়ে আমরা আধুনিক পুলিশের জনক স্যার রবার্ট পিলের একটিমাত্র উত্তরকে বিবেচনা করব: পুলিশের আসল কাজ হল অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা [১]আবার যদি প্রশ্ন করা হয়, পুলিশের কাজ বা কর্মদক্ষতাকে মূল্যায়ন করব কিভাবে? এ প্রশ্নেরও হাজার ধরনের উত্তর হতে পারে। কিন্তু আমরা পিলের একটিমাত্র বাক্যকেই এর সর্বোত্তম উত্তর হিসেবে গ্রহণ করব: পুলিশি দক্ষতার মাপকাঠি হল অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার অনুপস্থিতি; পুলিশের প্রদর্শিত অভিযান সংখ্যা নয়।[২]

 

অর্থাৎ পুলিশের অস্তিত্বের কারণ যেমন অপরাধ প্রতিরোধ, পুলিশের দক্ষতা মূল্যায়নের মানদণ্ডও তেমনি অপরাধ প্রতিরোধ কার্যাবলীর পরিসংখ্যান। তাই যে কোন পুলিশ বিভাগের প্রাত্যহিক কাজের একটি বড় অংশ থাকে অপরাধ প্রতিরোধ করা।  যে কোন পুলিশ বিভাগের কর্মক্ষম জনবলের প্রায় শতকরা আশি ভাগই কোন না কোন প্রতিরোধমূলক নিযুক্তিতে মোতায়েন থাকে। রাস্তায় রাস্তায় টহল, মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট, বাহির ও গমন পথে ইলেকট্রিক আর্চওয়ে স্থাপন, মেটাল ডিটেকটর কিংবা কুকুর দিয়ে সুইপিং অথবা মোবাইল গাড়ির সাইরেন বাজান –সবই অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল।

 

কিন্তু টহল বা চেকপোস্ট কার্যক্রমে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র কিংবা অবৈধ বস্তু উদ্ধার হলেও এসব কার্যক্রমকে সাধারণের দৃষ্টিতে বাহুল্যই মনে হয়। এমনকি কিছু কিছু গবেষণাতেও পুলিশের প্রতিরোধমূলক টহলের ফলে অপরাধ কমানোর বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে[৩]। কিন্তু তাই বলে এসব টহল বা তল্লাশির কাজ কোন দেশের পুলিশই এক দিনতো নয়ই এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ করেনি। কারণ, তথাকথিত প্রকৃত অপরাধ প্রতিরোধের বাইরেও এসব পুলিশি কর্মকাণ্ডের সাথে জনগণের অপরাধ-ভীতি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে।

 

রাস্তায় টহলরত পুলিশটি কোন দিন কোন অপরাধ সংঘটিত হওয়া অবস্থায় (Crime in progress) কোন অপরাধীকে ঝাপটিয়ে ধরে ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে — এমন খবর একেবারেই বিরল। তাই পুলিশের উপস্থিতিতে কিংবা অদূরে পুলিশ টহলরত থাকার পরেও কোন অপরাধ সংঘটিত হলে পত্রিকা বা প্রচার মাধ্যমগুলো যেমন পুলিশের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই লিখতে শুরু করে, সাধারণ মানুষও তেমনি পুলিশের লাগামহীন মুণ্ডুপাত করে। কেউ পুলিশের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করেন, কেউ পুলিশকে সংবেদনহীন বলেন, কেউ পুলিশকে অদক্ষ ও অকর্মন্য বলেন। কিন্তু একটা বিষয়ে সবাই একমত থাকেন যে, যত অপারঙ্গম বা অকার্যকর বলে মনে করা হোক না কেন, পুলিশকে বিলুপ্ত করা তো দূরের কথা শহরের রাস্তা থেকে পুলিশের টহল উঠিয়ে নেয়ার জন্য কেউ মতামত ব্যক্ত করেন না। বরং যে পুলিশের অকার্যকারিতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন  সেই পুলিশকে অধিক সংখ্যায় ও অধিক সংখ্যক স্থানে মোতায়েনের সুপারিশ করেন। নিজেদের কাছাকাছি পুলিশ থাকাটা অন্তরে অন্তরে পছন্দই করেন।

 

সম্প্রতি রাজধানীর বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুর রহমান নামে একজন যুবক খুন হয়েছেন। তিনি একজন ব্লগার বলে প্রচারিত। তবে ব্লগার হিসেবে কতটুকু সফল বা পরিচিত তা আমার জানা নেই। আমি তার ব্লগ কখনও পড়িনি। তবে এ নিয়ে অনেক হৈচৈ হচ্ছে। নিহত ওয়াসিকুর রহমান নাকি ধর্ম ও আল্লাহ বিরোধী লিখা লিখতেন। তাই তাকে কতল করার সিদ্ধান্ত নেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গিরা।  ২৭ মার্চ, ২০১৫ তারিখ সকালে অফিসে যাবার পথে তিন জঙ্গি তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে । পরে হাসপাতালে ওয়াসিকুর মারা যায়।[৪]

কিন্তু খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা ও টহল পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। স্থানীয় বলতে এখানে আরো সংকীর্ণ করে বললে বলতে হবে কয়েক জন হিজড়া কর্তৃক ধাওয়া খেয়ে খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সোরগোল ওঠে। সবাই সচেতন হয়। পাশের টহল পুলিশও সক্রিয় হয়। এরপর তারা চাপাতি ও অন্যান্য আলামতসহ ধরা পড়ে। খুন করে পলিয়ে যাওয়ার সময় খুনিদের গ্রেফতার, তাও আবার চরমপন্থি জঙ্গিদের গ্রেফতার! সত্যিই এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রশংসনীয় ঘটনা। এ তিন খুনিকে গ্রেফতারের ফলে অনেক অজানা খুনের রহস্য হয়তো উদ্ঘাটিত হবে।

নিবন্ধটি শুরু করেছিলাম পুলিশের প্রতিরোধ কর্মকাণ্ডের পরিমাপ নিয়ে। এ পরিমাপটির কিয়দংশ আমরা উপরের ঘটনা থেকে গ্রহণ করতে পারি। পত্রিকার খবর মতে:

জঙ্গিরা ওয়াশিকুরকে হত্যার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার পর ২৩ মার্চ দিন নির্ধারণ করে। পরিকল্পনা ছিল, হত্যার পরই যে যার মতো পালিয়ে যাবেন। এ জন্য অভিযানে বের হওয়ার আগে তারা যে বাসায় ভাড়া থাকত তাও ছেড়ে দেন। ২৩ তারিখের পরিকল্পনায় তাদের কাছে চাপাতির পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। কিন্তু ওয়াশিকুরকে হত্যার জন্য আসার পথে হত্যাকারি দলটি পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির কবলে পড়ে। সন্দেহভাজন হিসেবে তাদের দলের অন্যতম সদস্য সাইফুলকে তল্লাশি করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। এ সময় তার কাছে অস্ত্র-গুলি ও চাপাতি পাওয়া গেলে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এতে হত্যাকারীগণ সেদিনের অভিযানটি বাতিল করে।  দলের অন্যরা পালিয়ে গিয়ে ফের সংগঠিত হয়ে হত্যার নতুন তারিখ নির্ধারণ করে ২৭ মার্চ।[৫] এ যাত্রায় তারা সফল হন। অন্তত এই ক্ষেত্রে পুলিশ পরিসংখ্যানে একটি খুনের অপরাধ কয়েক দিনের জন্য প্রতিরোধ করার তথ্য সন্নিবেশিত করা যায়। তবে মজার বিষয় হল, শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর কোন দেশেই কতটি অপরাধ নিবারিত হল, তার কোন পরিসংখ্যান রাখা হয় না বা সম্ভব হয় না।

 

পুলিশের তল্লাশির ফলে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি সাইফুল হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। অন্যদিকে সাইফুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে যে অন্য জঙ্গিরা থেমে ছিল তাও নয়। সেই সময় যদি জানা যেত গ্রেফতারকৃত সাইফুল একজন জঙ্গি এবং সে ব্লগার ওয়াসিকুরকে হত্যার অভিযানেই যাচ্ছিল, তাহলে হয়তো ওয়াসিকুরকে সচেতন করা যেত। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশের তল্লাশি অভিযানের সফলতা একজন মানব সন্তানকে অন্তত চারটি দিন বেশি এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে সহায়তা করেছে– এটা কম কিসে?

 

অপরাধ প্রতিরোধ একটি ব্যাপক বিষয়। এ নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে।  তবে একটি বিষয় সবাই একমত যে অপরাধ প্রতিরোধ মূলত একটি ব্যক্তিগত দায়। কোন ভিকটিমের কিংবা বস্তুর মালিকেরই প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে তাকে বা তার সম্পত্তিকে রক্ষা করা। তার ব্যক্তিগত দায় ক্রমান্বয়ে সমষ্টিগত হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত কোন বিষয়ের সমষ্টিগত হয়ে ওঠার পিছনে থাকে অনেক কারণ। সামাজিক জীবনের জটিলতা বৃদ্ধি,  শ্রম বিভাজন, রাষ্ট্রীয়করণ, বিশ্বায়ন এ ধরনের নানাবিধ কারণ রয়েছে। ক্রমান্বয়ে ব্যক্তি তার নিজস্ব বিষয়গুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সমাজ বা রাষ্ট্র আবার সে বিষয়গুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠেনি। তাই তার নিরাপত্তার হানির আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

প্রচার মাধ্যমের উৎকর্ষের ফলে বাস্তবে অপরাধের শিকার হওয়ার চেয়ে অপরাধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তথা অপরাধ-ভীতি বাড়ছে। যে অপরাধ আমার সমাজে বা দেশে হয় না, প্রচার মাধ্যমের বাহারী প্রচারণায় আমি তারও ভয়ে ভীতু থাকি। দিনের বেলা ভূতের গল্প পড়ে শিশু কিশোরগণ রাতের বেলা যেমন ভয়ে জড়সড় থাকে, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে দূর দেশে সংঘটিত সহিংস অপরাধের খবর পড়ে, তার বিভৎস ছবি দেখে আমরা নিজেদের মধ্যেই সারাক্ষণ জড়োসড় হয়ে থাকি। তাই ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিগত অসহায়ত্ব আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অসহায়ত্ব ব্যক্তিকে তার নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলছে। মানুষ এখন শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রের উপরই নয়, নিজেদের উপরও আস্থা হারাতে বসেছে।

 

উন্নত দেশগুলো মানুষের হারান আস্থা বা বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার জন্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের একক শক্তির উপর ভরসা না করে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য তারা সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এসব কর্মসূচির মূল কথাই হচ্ছে, সমাজের সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বিত উপায়ে বা কৌশলে অপরাধ প্রতিরোধ করা। এজন্য প্রথাসিদ্ধ বা সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসা হচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নয়; অপরাধ সমস্যার এখন কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা হচ্ছে। বর্তমানে কোন নির্দিষ্ট অপরাধী বা অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, পুলিশের সহায়, সম্পদ ও সময় নিযুক্ত করা হচ্ছে অপরাধের কারণগুলোর বিরুদ্ধে।[৬]

 

যাদের জন্য অপরাধ নিবারণ করি বা যাদেরকে পুলিশি সেবা দিতে চাই, তারা এখন আর শুধু নিবর গ্রহীতা থাকছেন না। তারা এখন অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছেন পুলিশের সমান অংশীদার। পাশ্চাত্য দেশে এ ধরনের পুলিশিং দর্শন বা কৌশলকে নাম দেয়া হয়েছে, ‘কমিউনিটি পুলিশিং’। বাংলাদেশও একই কৌশল অবলম্বনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। যদি পুলিশ ও জনগণ যৌথভাবে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য সত্যিকার অর্থেই কাজ করতে পারে, তাহলে, জঙ্গিবাদ থেকে শুরু করে ছিঁচকে চুরির মতো অপরাধগুলোও নিশ্চিহ্ন না হলেও কাঙ্খিত পরিমাণে কমে আসবে। (২এপ্রিল, ২০১৫)

সূত্রাবলী:
১.The basic mission for which the police exist is to prevent crime and disorder.

২.The test of police efficiency  the absence of crime and disorder, not the visible evidence of police action in dealing with it.

৩.

কানসাস সিটি প্রিভেন্টিভ প্যাট্রল গবেষণা কিংবা ফ্লিন্ট স্ট্রিট টহল গবেষণা এগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেখুন http://www.policefoundation.org/content/kansas-city-preventive-patrol-experiment-0

৪.দৈনিক সমকাল, ২ এপ্রিল, ২০১৫ http://www.samakal.net/2015/04/02/128575

৫.Crime prevention goes against the grain of contemporary police organizations. To carry it out, they would have to change their mission, structure, management, and organizational culture. For example, the police are deployed now to deal with the effects or crime. To be effective a agents of crime preventions, they would have to be deployed against the causes of crime. Reaction and anticipation might not fit together easily within a single organizations.( Parker 1954,Reiss 1982, Bittner 1990). (Police for the Future by David H. Bailey,p-129)