ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার শেইক্সপিয়রের রোমিও ও জুলিয়েট নাটকের নায়িকা জুলিয়েট হল ক্যাপিউলেট পরিবারের কণ্যা। অন্যদিকে, তার প্রেমিক রোমিও হল মন্টেগু পরিবারের ছেলে। বংশনুক্রমিক বিবাদের মাঝেও দুই পরিবারের দুই যুবক-যুবতী প্রেমে মত্ত হয়। কিন্তু জুলিয়েট রোমিওর বংশ পরিচয় জানার পর চিন্তিত হয়ে পড়ে। কেননা, এ দুই পরিবারের কেউই তাদের প্রেমকে মেনে নেবে না। তবে ভাল হত যদি তারা উভয়েই একই বংশের সনত্মান হত। গভীর রাতে অভিষার শেষে জুলিয়েট তাই নির্জন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে স্বগোক্তিতে বলে, ‘নামে কি আসে যায়? গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, সে তো গন্ধ ছড়াবেই। রোমিও কেন ক্যাপিউলেট না হয়ে মন্টেগু হল? সে কি তার পরিচয় পরিবর্তন করে ক্যাপিউলেট হতে পারে না? তার বিনীত অনুরোধ, রোমিও, তুমি তোমার পিতৃ পরিচয় পরিত্যাগ কর এবং একজন ক্যাপিউলেট হয়ে যাও’।

হ্যাঁ, সত্যি নামে কিছু আসে যায় না। নাম নৈর্ব্যক্তিক নয়- ব্যক্তি-নির্ভর; বস’র বা ব্যক্তির নাম মানুষের দেয়া। সুগন্ধযুক্ত ফুল গোলাপের নাম ‘গোলাপ’ না হয়ে ‘জবা’ হতে পারত; কিংবা ‘জবা’ হতে পারত ‘গোলাপ’। তখন গোলাপ নয়, জবা ফুলই গন্ধ ছড়াত। তাই, মানুষের দেয়া নামই গোলাপকে ‘গোলাপ’ করেছে কিংবা জবাকে ‘জবা’।

কোন প্রতিষ্ঠিত বস্তুর নামকে ভিন্ন নামে ডাকলে তার অন্তর্নিহিত গুণের কোন পরিবর্তন হবে না। কিন্তু কোন নৈর্ব্যক্তিক ধারণা বা দার্শনিক মতবাদের নাম বিভ্রাট ঘটলে তার বাস্তব প্রয়োগ ভিন্নতর হতে পারে। কমিউনিজম, ক্যাপিটালিজম বা বস্তুবাদকে ভাববাদের স্থলাভিষিক্ত করা হলে বাস্তব জগতে এর প্রতিক্রিয়া ভিন্নরূপ হতে পারে। যেমনটি হতে পারে কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের ক্ষেত্রে। এ দর্শনের ব্যবহারিক প্রয়োগটি তার মুল দর্শনের অনুরূপ না হয়ে ভিন্নরূপ হতে পারে যদি আমরা ‘পুলিশ’ আর ‘পুলিশিং’ প্রত্যয় দুটির মধ্যে পার্থক্য বা সীমারেখাটুকু স্বীকার করে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তা মেনে না চলি।

‘কমিউনিটি পুলিশিং’ আর ‘কমিউনিটি পুলিশ’ — এ দুইয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যারা বোদ্ধাজন তারা অন্তত এ দুইটি প্রত্যয়ের ব্যাকরণগত পার্থক্যটুকু বুঝবেন। কিন্তু যারা সাধারণ মানুষ, ব্যাকরণের সুক্ষ্‌ণ পার্থক্য যারা বোঝেন না, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুতর বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।

‘পুলিশ’ বলতে আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধের তদন্তসহ কতিপয় জরুরি সেবা প্রদানকারী সরকারি কোন সংগঠনকেই বুঝি। ‘পুলিশ’ শব্দটি তাই একটি সমষ্টিবাচক বিশেষ্য। তবে অনেক ক্ষেত্রে অপভ্রংশ হিসেবে অনেকে ‘পুলিশ’ বলতে পুলিশ সদস্যদেরও বুঝিয়ে থাকেন। কিংবা ইংরেজিতে ‘চড়ষরপব গধহ’ শব্দমালা থেকে ‘গধহ’ বা ‘ঙভভরপবৎ’ শব্দটি ঝরে পড়ে হয়ে যেতে পারে শুধুই ‘পুলিশ’। অর্থাৎ ‘পুলিশ’ বলতে ‘পুলিশ সার্ভিস্তু বা ‘পুলিশ বাহিনী’ এবং পুলিশ সদস্য উভয়ই বোঝানো যেতে পারে।

অন্যদিকে, ‘পুলিশিং’ প্রত্যয়টি একটি গুণবাচক বিশেষ্য। পুলিশ কর্তৃক অনুসৃত নীতি, কর্মপদ্ধতি বা দর্শনকে পুলিশিং বলা যেতে পারে। পুলিশ যেখানে ব্যক্তি, পুলিশিং সেখানে একটি ধারণা, নীতি বা দর্শন।

কমিউনিটি পুলিশিং তাই একটি দর্শন, নীতি বা কর্মসম্পাদনের বিশেষ ধরন। ‘পুলিশিং’ বলতে আমরা যেখানে সনাতনী পুলিশিং ব্যবস্থাকে বোঝাই, কমিউনিটি পুলিশিং বলতে সেখানে বিশেষ এক ধরনের পুলিশিং ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়। এ ব্যবস্থায় পুলিশ সদস্যগণ সম্পূর্ণ এককভাবে অপরাধমূলক ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবেলার পরিবর্তে কমিউনিটির সদস্যদের সাথে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমজাতীয় অপরাধমূলক ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধান করে সেগুলো দূর করে সম্পূর্ণ সমস্যাটির মূলোৎপাটনে সচেষ্ট হয়। অপরাধমূলক সমস্যার কারণ খুঁজেত গিয়ে পুলিশ অফিসারগণ অপরাধ বহির্ভূত সামাজিক সমস্যা বা বিশৃঙ্খলাগুলো নিয়েও কাজ করে।

এর অর্থ হচ্ছে ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলতে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি তথা সংগঠনের অসিত্মত্ব নেই। পুলিশ সদস্য বা পুলিশ সংগঠন বলতে পুলিশ শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলতে কাদের বোঝাবেন? কোন ব্যক্তিকে কিংবা কোন পুলিশ সংগঠন বা পুলিশ ইউনিটকে? পুলিশিং যদি একটি দর্শন বা কর্মপদ্ধতি হয়, তাহলে, ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলতে কি বোঝাব আমরা?

‘কমিউনিটি পুলিশিং’ আর ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নিয়ে শুধু সাধারণ মানুষ কিংবা অধঃস্তন পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই নয়, এ বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তিতে ভোগেন ঊর্ধ্বতন পদের বিপুল সংখ্যক পুলিশ অফিসারও। মাঠ পর্যায়ের অনেক পুলিশ কমান্ডার ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ বাস্তবায়ন না করে ‘কমিউনিটি পুলিশ’ গঠন করেন। অনেকে রাস্তাঘাটের শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাত্রিকালীন পাহারা দেয়ার কাজে তথাকথিত ‘কমিউনিটি পুলিশদের’ নিয়োগ করেন।

২০০৬/২০০৭ সালে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার সাংগঠনিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরই সারাদেশে পাড়ায়-মহল্লায়, গ্রামে-গঞ্জে, ওয়ার্ডে-ইউনিয়নে কমিটি গঠন করার হিড়িক পড়ে যায়। এসব কমিটি থেকে পাহারাদানের জন্য নিম্ন আয়ের কিছু লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সব লোকের শরীরে চড়িয়ে দেওয়া হয় বাহারী জ্যাকেট বা ইউনিফর্ম। সেখানে লেখা হয় ‘কমিউনিটি পুলিশ’। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশ অধীক্ষেত্রের বিভিন্ন পয়েন্টে আপনার চোখে পড়বে ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বা ‘কমিউনিটি ট্রাফিক পুলিশ’। অনেক সময় কোন বিশেষ অনুষ্ঠানে, যেমন, বার্ষিক পুলিশ সপ্তাহ কিংবা কোন পুলিশ ইউনিটের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে দীর্ঘ ব্যানারে লেখা থাকে নানা ধরনের শ্লোগান। এসব শ্লোগানেও ভুলভাবে কমিউনিটি পুলিশিং কে ‘পুলিশ’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যেমন- ঢাকা মেট্রপলিটন পুলিশের কোন এক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সুবৃহৎ এক ব্যানারে লেখা হয়েছিল, ‘দিনের আলো রাতের আঁধারে, কমিউনিটি পুলিশ ঘরে ঘরে’। এ শ্লোগান থেকে বোঝা যাবে দিনে রাতে যেসব নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বল্প বেতনে পাহারা দেওয়ার কাজে নিয়োগ করা হয়, ওদের বলা হয় ‘কমিউনিটি পুলিশ’।

আমাদের সিনিয়র পুলিশ অফিসারগণ ডাকাতি রোধ করতে থানার অফিসার-ইনচার্জদের নির্দেশ দেন-‘পাহারা বাড়াও, ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নিয়োগ কর।   আমাদের করিতকর্মা অফিসার-ইন-চার্জগণ কিছু নিম্ন আয়ের মানুষকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে এনে গভীর রাতে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে পাহারাদানে বাধ্য করেন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের কাছে অফিসার-ইন-চার্জগণ গর্বভরে বলেন, ‘স্যার, ‘কমিউনিটি পুলিশ’ ভাল কাজ করছে’। আমাদের করিৎকর্মা অফিসারগণ মুখে যা বলেন না তা হল, ‘ কিছু ক্ষমতাহীন, প্রতিবাদে অক্ষম মানুষ এখন রাস্তা পাহারা দিয়ে আমাদের চাকরি বাঁচাচ্ছে। ওরা পাহারা দেয়, আমরা থানায় থাকি’; আরাম করি।

ঢাকার উত্তরখানে কয়েকজন দিন মজুরকে দৈনিক ভাতার বিনিময়ে এলাকাবাসী রাত্রি বেলায় পাহারার কাজে নিয়োগ করে। আমি সেখানে একটি কর্মশালা পরিচালনার জন্য যাই। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যগণ নিজেদের পরিচয় দিয়ে নিজ নিজ পেশার কথা বললেন। এক সময় এ দিন-মজুরদের পরিচয়ের পালা এল। তারা নিজেদের নাম বলে পেশা হিসেবে জানালেন, তারা পেশায় ‘কমিউনিটি পুলিশ’। তার অর্থ হচ্ছে উত্তরখানে পুলিশ ও জনগণ মিলে একটি নুতন পেশার জন্ম দিয়েছে – সেটা হল ‘কমিউনিটি পুলিশ’। এখন কমিউনিটি পুলিশ হল একটি রুটি-রুজির পথ।

ঢাকা মহানগরীর উত্তরার প্রত্যেকটি সেক্টরে নিরাপত্তা কমিটি বা কল্যাণ সমিতি রয়েছে। এসব সমিতি তাদের নিজ নিজ সেক্টরের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক গার্ড নিয়োগ করেছেন। ২০০৭/২০০৮ সালে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার পূর্বেও এসব স্থানে নাইট গার্ড থাকত। উত্তরার বাসার মালিকগণ নিজেরা চাঁদা দিয়ে নাইটগার্ডদের বেতন দিয়ে থাকেন। কিন্তু সমপ্রতি এসব নাইট গাডের্র নাম দেওয়া হয়েছে ‘কমিউনিটি পুলিশ’।

গত ২০ মে, ২০১১ তারিখে উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের পাহারাদারদের বসবাসের জন্য একটি ব্যারাক উদ্বোধন করা হয় । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিসহ পুলিশ-অপুলিশ অনেক সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যারাকের নাম দেওয়া হয়েছে ‘কমিউনিটি পুলিশ ব্যারাক’। অর্থাৎ উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে কমর্রত সকল নাইট গার্ড এ ব্যারাকে থাকবে। এখন যদি এ ব্যারাকের নাম ‘কমিউনিটি পুলিশ ব্যারাক’ হয়, আর এ সব নাইট গার্ড ‘কমিউনিটি পুলিশ’ হয়, তাহলে একত্রিতভাবে বসবাস করে এদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সহানুভূতির সৃষ্টি হবে। এমনও হতে পারে, কোন এক দিন এরা সাধারণ শ্রমিকের মতো বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য আন্দোলনে যাবে, তখন পত্রিকার শিরোনাম হবে ‘বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে উত্তরায় কমিউনিটি পুলিশদের ধর্মঘট’। কী ভয়ানক ব্যাপার! বাংলাদেশের কিছু পুলিশ শেষ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য ধর্মঘট শুরু করেছে? সরকার তাহলে পুলিশদের ব্যাপারে এতটাই উদাসীন? সুস্তু মাথায় ভাবুন তো গণতান্ত্রিক একটি সরকারের জন্য এ ধরনের একটি পত্রিকার হেডলাইন কেমন বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করবে?

আমি বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার জন্য উত্তরা জোনের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার জনাব আল মামুনকে অনুরোধ করি। মামুন শেষ পর্যন্ত এর নাম ‘কমিউনিটি পুলিশিং ব্যারাক’ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। পুলিশের স্থানে তখন যুক্ত হল পুলিশিং। কিন্তু নামটা যেভাবেই দেওয়া হোক, নাইট গার্ড বা কোন পাহারাদারদের থাকার ব্যারাককে কমিউনিটি পুলিশিং অভিধায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। কারণ, নাইট গার্ড কমিউনিটি পুলিশিং দর্শন বাস্তবায়ন করে না। তারা অর্থের বিনিময়ে পাহারা দেয়। কমিউনিটি পুলিশিং অর্থ অন্যকে দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর পাহারা দেওয়া নয়, কমিউনিটি পুলিশিং মানে হল, নিজেদের বাড়িঘর নিজেরাই পাহারা দেওয়া। অর্থের বিনিময়ে অন্যদের দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাহারা দেওয়াকে কমিউনিটি পুলিশিং বলে চালিয়ে দেওয়া হলে, সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো হবে কমিউনিটি পুলিশিং এর বড় ধ্বজাধারী।

আমি নোয়াখালী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন উচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নোয়াখালী জেলা ভ্রমণ করেন। এ সময় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে উক্ত জনপ্রতিনিধি তার ভাষণে কমিউনিটি পুলিশিং প্রসংগে এলে মন্তব্য করেন-‘পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশ ও জনগণ — এ তিনে মিলেই সমাজকে অপরাধ মুক্ত করবে। মাননীয় জনপ্রতিনিধির ভাষণ থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামের একটি তৃতীয় সত্ত্বা বা বাহিনীর কল্পনা করছেন।

গত ৩০ অক্টোবর, ২০১১ তারিখে দৈনিক ডেসটিনি পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘চট্টগ্রামে কমিউনিটি পুলিশ’ নিয়োগে বিজিএমইর সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ চট্টগ্রামে বিভিন্ন পোশাক শিল্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিসি’তি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহযোগিতা করতে কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই প্রতিবেদন থেকে বোঝা যাবে সিকিউরিটি কোম্পানী কিংবা কিছু দিন মজুরকে পাহারার কাজে লাগানোকে তারা কমিউনিটি পুলিশিং বলে মনে করেন। আর এই পাহারাদারগণ হল, কমিউনিটি পুলিশ।

কুষ্টিয়া ভিত্তিক একটি অনলাইন-পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল এমন, ‘কুষ্টিয়ায় ৩০ হাজার কমিউনিটি পুলিশ বেকার’ – এই শিরোনাম থেকেও বোঝা যায়, পত্রিকার সাংবাদিকগণ ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামে একটি নতুন বাহিনীর অস্তিত্ব কল্পনা করেছেন যার সদস্যরা হলেন খেটে খাওয়া দিন মজুরগণ। পূর্বে এরা কাজ করত। বর্তমানে এদের পুলিশের চাকরি নেই এরা বেকার।

 

২০১০-২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ, কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম সদস্য, পুলিশের নিম্ন থেকে উর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত বহুজনকে কমিউনিটি পুলিশিং এর উপর প্রশিক্ষণ দেয়া কিংবা কর্মশালা পরিচালনার সুবাদে আমি শত শত পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ‘পুলিশ’ আর ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এর পার্থক্যটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার বক্তব্যের ফলে বেশ কিছু স্থানে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন এলেও পুলিশের সব পর্যায়েই এখনও একই ধরনের ও একই মাত্রার বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।

‘কমিউনিটি পুলিশিং’ আর ‘কমিউনিটি পুলিশের’ মধ্যে পার্থক্য না করার পরিণতি হিসেবে কিছু কিছু কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকগণ নিজেদের রীতিমত পুলিশ অফিসার বলে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তাদের কেউ কেউ নিজেদের ‘বিকল্প পুলিশ সুপার’ কিংবা থানার ‘রিজার্ভকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে দাবি করছেন বা প্রচার করছেন। কেউ কেউ নিজেদের স্থানীয় ‘পুলিশের প্রতিনিধি’ হিসাবে দাবি করছেন। এমনও শোনা যায়, কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সদস্যগণ দাবিনামা পেশ করছেন যে তাদের অধীক্ষেত্রে কোন অভিযানে গেলে পুলিশ অফিসারগণ যেন তাদের অনুমতি গ্রহণ করেন। কেউ কেউ বলছেন, তাদের অনুমতি ব্যতীত থানা পুলিশ যেন কোন মামলার তদন্ত সমাপ্ত না করেন।

এ কথা ঠিক যে, কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের আওতায় বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হতে পারে। কিন্তু এ সব স্বেচ্ছাসেবক কোন ক্রমেই ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামে পরিচিত হতে পারবে না। স্বেচ্চাসেবকদের বিশেষ পোষাক দেওয়া যেতে পারে। তবে তা পুলিশের পোশাকের অনুরূপ হবে না। স্বেচ্ছাসেবকদের কিছু কিছু আর্থিক সুবিধাও দেওয়া হতে পারে। তবে এ সুবিধাকে পারিশ্রমিক নয়, সম্মানী বলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হল, এ পারিশ্রমিকের উৎস বেসরকারি বা স্থানীয় খাত থেকেই মেটাতে হবে।

অনেকে ব্রিটেনসহ অনেক দেশের ‘কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসারদের’ ‘কমিউনিটি পুলিশ’ বলে চালিয়ে দেন। কিন্তু কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের সাথে কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসারদের কোন সম্পর্ক নেই। এরা মুলত সরকারি খরচে খ-কালীন শ্রমিক, যারা পুলিশ কর্তৃক প্রদেয় সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এরা আমাদের পুলিশ আইন-১৮৬১ এর অধীন বিশেষ পুলিশ অফিসারও নয়। কারণ, বিশেষ পুলিশ অফিসারগণ পুলিশের সকল ক্ষমতাই প্রয়োগ করতে পারেন। তাদের শৃঙ্খলাও পুলিশ আইনে নিধারিত। কিন্তু কমিউনিটি সাপোর্ট অফিসারগণ এসবের বাইরে। এরা পুলিশ ভিন্ন অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে নিয়োজিত দিন মজুর বৈ অন্য কিছু নয়।

পরিশেষ বলব, কমিউনিটি পুলিশিং ধারণাটিকে বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই বহুলাংশে দুষিত করা হয়েছে। যদি প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশ পুলিশ তাদের সংগঠনকে কমিউনিটি পুলিশিং ভাবধারায় পরিচালিত করতে চায়, তাহলে, এ ধারণাকে আর বেশি কলুষিত হতে দেওয়া সমীচীন হবে না। এ ধারণার আড়ালে এমন কোন শব্দাবলীর প্রচলন করা উচিত হবে না যাতে সাধারণ মানুষ ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামে একটি সমান্তরাল পুলিশ বাহিনীর অসিত্মত্ব কল্পনা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। গোলাপকে যে নামেই ডাকি না কেন সে গন্ধ ছড়ালেও শুধু নাম বা বংশ পরিচয়ের কারণেই রোমিও জুলিয়েটকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। তাই শেইক্সপিয়র প্রমাণ করেছেন, নামে আসলে অনেক কিছুই আসে যায়। তাই, এ নাম-বিভ্রাটই কমিউনিটি পুলিশিং দর্শনের আড়ালে ‘কমিউনিটি পুলিশ’ নামের কোন পৃথক বাহিনীর ধারণা তৈরি করে মূল দর্শনকে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অকার্যকর করে তুলবে। (০২/০৮/২০১৩)