ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

 
54_pohela+boishakh_preparation_09042015_0007

সংস্কৃতি কোন জাতির সামগ্রিক পরিচয়।  কোন জাতি বা জনগোষ্ঠীর লোকজন যা করেন, যেভাবে করেন; তারা যা দেখেন, যেভাবে দেখেন; যখন দেখেন তা যে মাধ্যমে বা যে আঙ্গিকে দেখেন; সেই জাতির মানুষ যা চিন্তা করেন এবং যেভাবে চিন্তা করেন; যাদের জন্য তারা চিন্তা করেন; কোন জাতির সদস্যরা যা পরেন, যেভাবে পরেন, যখন পরেন, যখন পরান ইত্যাদি হাজারও বিষয়আসশের সম্মিলনে সে জাতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তাই সংস্কৃতির পার্থক্যই এক জাতিকে অন্য কোন জাতি থেকে পৃথক করে দেখানোর সহজতম উপায়।

 

বাঙালি জাতির মধ্যে ইংরেজ জাতির যে পার্থক্য তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে আমরা তার ভাষা, পোশাক, খাবার, আতিথ্য ইত্যাদি দেখে বুঝতে পারব। ওরা ইংরেজি বলে; আমরা বাংলা বলি, ওরা কোর্ট-টাই বা স্কার্ট-সর্টস পরে, আমরা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-পায়জামা-ধুতি বা শাড়ি পরি। মদ্যপান ইংরেজদের  প্রাত্যহিক বিনোদন এবং যে কোন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাঙালিরা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মদ্যপান পরিহার করে। বাঙালির অতিথিসেবা পানশুপারি কিংবা চা বিস্কুট দিয়ে শুরু হয়; কিন্তু ইংরেজদের আতিথ্য মদের পেয়ালায় শুরু হয়।

 

সংস্কৃতির সকল দিক বা উপাদান স্থায়ী বা স্থিতিশীল নয়। কোন কোন উপাদান গতিশীল ও নিয়ত পরিবর্তনশীল। প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হয় সংস্কৃতির ধারা। পুরাতন প্রথা বা রীতির আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ পরিবর্তন সংস্কৃতিতে অতি সাধারণ বিষয়। নতুনের কাছে পুরাতনের পরাজয় ঘটে। নতুনের প্রভাবে পুরাতনও নতুন ভাবে নিজেকে সাজিয়ে নেয়। তাই সংস্কৃতির পুরাতন প্রথা বা আচারগুলো সহজেই নতুনকে স্থান করে দেয়। অনেক স্থানে সংস্কৃতির সদস্যরা  সচেতনভাবে আবহমান সংস্কৃতিতে নতুন উপাদান প্রবেশের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এতে কেউ কেউ সফল হন। কিন্তু অসফল হন বেশির ভাগই। সংস্কৃতিরও ধারণের একটি সীমা পরিসীমা রয়েছে। যখন কোন সংস্কৃতির একটি দিক বা উপাদান আপাতত সম্পৃক্ত অবস্থায় বিরাজ করে, তখন সেই দিকটির সাথে নতুন কিছুর অনুপ্রবেশ  ঘটান শুধু কষ্টকরই নয়, অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

উদারহণস্বরূপ, বাঙালি সংস্কৃতিতে ঘটা করে জন্ম দিন বা বিবাহ বার্ষিকী পালনের পুরাতন নজির নেই। কিন্তু ইংরেজি সংস্কৃতির প্রভাবে এটা এখানে প্রচলনের বেশ প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। কিন্তু এ সংস্কৃতির ধারাটি গ্রামাঞ্চলে এখনও শেকড় গাড়তে সক্ষম হয়নি। অতি আধুনিককালে শুরু হয়েছে প্রেম-ভালবাসার স্মৃতির সংস্কৃতি ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস্থ। কিন্তু এটাও হালে পানি পাচ্ছে না। অন্যদিকে বাঙালির আবহকালের পোশাক লুঙ্গি, ধুতি, পাঞ্জাবি অফিস আদালতেই শুধু নয়, শহরেও এক প্রকারে নিষিদ্ধ হয়েছে। নগরির গুলশান এলাকায় নাকি রিকসাচালকদেরও লুঙ্গি পরা নিষিদ্ধ হয়েছে। ইংরেজদের পোশাক প্যান্ট, শার্ট, কোর্ট, টাই এখন লুঙ্গি-পাঞ্জাবিকে পরাস্ত করতে বসেছে।

 

একইভাবে পাল্টে গেছে নবান্ন উৎসবের দিনক্ষণ। ফসলের নতুন জাতের আবির্ভাব ও সেগুলোকে আবাদের মধ্যে স্থান দেয়ার ফলে হেমন্তের অনেক আগেই কৃষকের ঘরে আমন ফসল আসে। তা ছাড়া আমন বাঙালি চাষাদের এখন আর প্রধান ফসল নয়। বোরো মওসুমের ইরি ধানই এখন বাঙালির আসল ফসলের মওসুম। তাই নবান্ন আর হেমন্তে নয়; গ্রীষ্মে হয়। আর এ জন্যই নবান্নের উৎসবে গ্রামেগঞ্জে ভাটা পড়েছে। কিন্তু একটি পুরাতন রীতিকে বাঙালি সহজে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দিতে পারে না। গ্রাম থেকে নবান্ন এখন শহরে এসেছে। যে নবান্ন উৎসব গ্রামের প্রান্তিক চাষিদের কুঁড়ে ঘরে থাকার কথা, সেই উৎসব এখন উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাসে।

 

প্রভাবশালী ও বহুল পালিত আচার বাঙালির হালখাতা। কিন্তু এখন বাঙালির হালখাতার মওসুমও পাল্টে গেছে। পূর্বে নববষই ছিল হালখাতার প্রধান মওসুম। কিন্তু বর্তমানে হালখাতার দিন, তারিখ, ক্ষণ ও ধরন পাল্টে গেছে। শহুরে ব্যবসায়ীগণ এখনও বাংলা বর্ষের প্রথম তারিখে হালখাতা করলেও গ্রামের হাটবাজার, দোকান মালিকগণ এটা করেন বৈশাখের শেষে ও জ্যৈষ্ঠের শুরুতে। এর কারণ হল, এসময় কৃষকদের ঘরে ধান আসে, তারা বকেয়া পরিশোধের সামর্থ্য অর্জন করে। একই ঘটনা ঘটে যাত্রা, সার্কাস বা অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে। গ্রামে গ্রামে এখন শীত কালের দিকে নয়; বরং গ্রীষ্মের শেষেই যাত্রা-সার্কাসের মওসুম চলে। একই কারণ, এসময় মানুষের হাতে টাকা থাকে। অর্থাৎ অর্থের সমাগমের মওসুমের সাথে সাথে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর সময় ও ধরনও পাল্টে যায়।

 

যতটুকু জানা যায়, পহেলা বৈশাখের শহুরে উৎসবের সূচনা করে গত শতাব্দীর যাটের দশকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বাঙালিদের ইসলামী বানানোর ঘৃণ্য অপচেষ্টার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বাঙালিদের মধ্যে নবচেতনার উদয় হয়েছিল। ঐ সময় ওরা আমাদের ভাষাকে তথাকথিত হিন্দুয়ানী আখ্যা দিয়ে তাকে গোসল উযু করিয়ে মুসলমান বানাতে চেয়েছিল। তারা আরবি হরফে বাঙলা লেখা, বাংলার লোকসংস্কৃতিকে তথাকথিত মুসলমানি রঙ দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল। মজার ব্যাপার হল, এদেশিয় কিছু ঘৃণ্য বুদ্ধিজীবী আবার তাদের কায়মনে মদদও দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে বিজাতীয় কবি আখ্যা দিয়ে তার সৃজিত সাহিত্যসম্ভারকে বাঙালিদের কাছ থেকে নির্বাসন দেয়ার জন্যও তারা ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল।

 

এখনও আমাদের দেশের এক শ্রেণির জ্ঞানপাপী মনে করে, বাংলা ভাষা সংস্কৃত নির্ভর। আর সংস্কৃত হল আর্যদের ভাষা। আরো বড় আপত্তি হল, হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থসমূহ যথা বেদ, স্মৃতি, ও সংহিতা-পুরাণগুলো সবই সংস্কৃত ভাষায় লেখা। তাই সংস্কৃত নির্ভর ভাষাকে মুসলমানি ভাষা বলা যাবে না। তাদের কাছে আরবি হল, একমাত্র মুসলমানি ভাষা। কিন্তু আরবির অবস্থান পবিত্র ধর্মগ্রন্থে  হলেও তা এদেশে কোনভাবেই স্থান করে নিতে পারেনি। এদেশ শাসনকারী কিংবা ধর্মপ্রচারকারীগণ কেউই আরবিতে কথা বলতেন বলে জানা যায় না। এমনকি তারা সরাসরি আরবদের বংশধরও ছিলেন না। ধর্ম প্রচারকগণ ছিলেন অধিকাংশই পারশ্যের অধিবাসী যারা ফারসি বা ইরানি ভাষায় কথা বলতেন। আর ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মাত্র কয়েক শত মাইল দূরে আরবির কেন্দ্র হলেও ফারসিকে আরবগণ বিতাড়িত করতে পারেননি। বরং কালের প্রবাহে ইতিহাসের ক্যারাভানে এক সময় ফারসিই ইসলামকে বহন করেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে যে শাসকগণ ইসলাম প্রচার, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োজিত ছিলেন, তারা কেউই আরব ছিলেন না। মোঘল, পাঠান আর  তুর্কিরাই এ উপমহাদেশের মুসলমান সাম্রাজ্যের ভিত স্থাপন করেছিলেন। তারাই পর্যায়ক্রমে সে ভিতের উপর একটি শাসন ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছিলেন। ফারসি ভাষার উৎকর্ষের জন্য কালক্রমে ফারসিই এ উপমহাদেশের শাসনের ভাষা হয়ে পড়ে।

 

কিন্তু মুসলমান শাসকদের সৈন্যবাহিনীতে নানা জাতের, নানা ভাষার এমনকি নানা ধর্মের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। এদের উচ্চপদস্থদের ভাষা ছিল হয় ফারসি, নয়তো তুর্কি। কিন্তু নিম্ন পদস্থ ও সৈন্যদের ভাষা ছিল মূলত স্থানীয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ স্থানীয় সৈনিক-কর্মচারীদের সাথে সংখ্যালঘিষ্ঠ শাসক সেনাপতিদের ভাব প্রকাশ তথা কর্ম সম্পাদনের বাস্তব প্রয়োজনে দেশি-বিদেশি, আরবি, ফারসি, তুর্কি, হিন্দি, সিন্ধি, ভোজপুরি, গুজরাটি, আফগানি, কররানি সব কিছু মিলে একটি কথ্য ভাষার জন্ম হয়। এ ভাষার জন্ম হয় মুলত যুদ্ধের মাঠে, যুদ্ধের শিবিরে; চলমান রাজ্যের যুদ্ধরত সৈনিকদের মধ্যে। এটাই হল আধুনিক উর্দুর জন্ম কথা। এই জন্ম থেকেই জগাখিচুড়ি ভাষাটিকে আমাদের পাকিস্তানি শাসকগণ খাস ইসলামী বা মুসলমানি ভাষারূপে দাবি করতে থাকলেন। তাদের এ দাবির প্রতি আমাদের স্বল্পজ্ঞানের অনেক আলেম ওলামামও যোগ দিলেন। তারা জিন্না-লিয়াকতের সাথে তাল মিলালেন। আর আমাদের এদেশের নবাব পরিবারের উর্দুভাষীরা এর স্থানীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। শুরু হল বাংলাকে নির্বাসন দেয়ার কাজ। কিন্তু তারা ঐতিহাসিক বিচারেই তাতে সফল হতে পারেনি।

 

এখানে বলা বাহুল্য হবে না যে, পাকিস্তানের শাসককুলের ভাষা কিন্তু উর্দু ছিল না। পাকিস্তানের জনক বলে খ্যাত মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর পূর্ব পুরুষ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী এবং ধর্মে ছিলেন অগ্নি উপাসক। ইসলাম গ্রহণের পর তারা ভারতে চলে আসেন এবং মুম্বাইতে বসতি গড়ে তোলেন। তারা মূলত ফার্সিভাষী। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ উর্দু-ফার্সি কোনটিই নয়, তিনি বক্তৃতা করতেন ইংরেজিতে।  অন্যদিকে পাঞ্জাবের ভাষাও উর্দু নয়। ইংরেজদের ভারত বিদায়ের পূর্বে বাংলার মতো পাঞ্জাবও দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান উভয়ই পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলত। বর্তমান ভারতীয় পাঞ্জাবের অধিকাংশ মানুষ শিখ  ধর্মমতের। এটা কোন ক্রমেই মুসলমানের একক ভাষা নয়।  তাই বলা যায়, পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের মূল শাসকদের ভাষাই খাঁটি ইসলামী নয়। অর্থাৎ পাঞ্জাবি ভাষাকে তারা একই সাথে ইসলামি ও হিন্দুয়ানিতে ভাগ করে নিয়েছেন। এখানে তারা সহঅবস্থানে রয়েছেন। পাঞ্জাবি ভাষায় শিখরা কথা বলে এ জন্য পাকিস্তান শাসকগণ কোন দিন পাঞ্জাবি ভাষাকে পাকিস্তান থেকে তাড়াতে উৎসাহী হয়নি। কিন্তু যুগযুগান্তর ধরে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন-গঠন-চলনে বাঙালি মুসলমানগণ আত্মনিয়োগ করলেও পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাকে হত্যা করতে উদ্যোগী হয়েছিল। তাই ইসলাম রক্ষা নয় বরং বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস করে তাদের শাসনকে চিরস্থায়ী করাই ছিল ওদের মূল লক্ষ্য।

 

একথা সুবিদিত যে বাংলা সন তারিখের প্রচলন এদেশে মুসলিম শাসকগোষ্ঠীই চালু করেছিল। এটাও হয়েছিল বাস্তব কারণে। বাংলার খাজনা আদায়ের মূল ভিত্তিই ছিল কৃষকদের ফসল। কিন্তু ফসলের উৎপাদন ও কাটামাড়াই চলত সৌর বৎসরের গণনায়। বার মাসের ষড় ঋতুর প্রভাব বাংলায় এতটাই প্রকট যে মুসলমানদের ব্যবহৃত চান্দ্র মাসের হিসেব এখানে অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে। কারণ চান্দ্র মাস হল,  ঊনত্রিশ বা সাড়ে ঊত্রিশ দিনে। তাই প্রতি বছরই সৌর বৎসরে আরবি নববর্ষ প্রায় পনের দিন এগিয়ে আসে। এমতাবস্থায়, চান্দ্র মাসের হিসেবে যদি প্রতি বছর পহেলা মহররমে খাজনার তারিখ নির্ধারণ করা হয়, তাহলে, দু এক বছর এটা ভাল কাজ দিলেও  দশ-বার বছর পর এমন এক সময় খাজনা সংগ্রহের তারিখ পড়ল যখন কৃষকদের ক্ষেতেও ফসল নেই, ঘরেও খবার নেই। তখন সৌর বৎসরের কার্তিক মাস, নয়তো চৈত্র মাস। এ পরিস্থিতিতে নিঃস্ব কৃষদের খাজনা পরিশোধ না করার অপরাধে হয়তো শাস্তি দেয়া যেত, কিন্তু খাজনা আদায় সম্ভব হত না। তাই মোঘল সম্রাট আকবরের বিজ্ঞ রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমলের পরামর্শে বাংলায় সৌর বৎসরের পঞ্জিকা চালু করা হয়।

 

অনেকে হয়তো ভাববেন, আকবরের বাংলা বা সৌরপঞ্জিকা গ্রহণের পূর্বে বাংলায় কোন পঞ্জিকাই ছিল না। এদেশের মানুষ হয়তো সন-তারিখ-সময় গণনাই করতে পারত না। কিন্তু বিষয়টি সেরূপ নয়। বাংলা ভূখণ্ডের সভ্যতা অনেক পুরাতন। সন-তারিখ-মাস গণনার মতো সভ্যতার আদি স্তরের বিষয়গুলোতেই শুধু নয়, এ ভূখণ্ডে উন্নত শহুরে সভ্যতারও সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলা বা সৌর বৎসরের পঞ্জিবার ব্যবার পূর্বেও ছিল। সম্রাট আকবর তাই বাংলা নববর্ষ চালু করেননি; বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই বাস্তব কারণেই গ্রহণ করেছিলেন মাত্র। তাই বাংলা নববর্ষের সরকারিকরণে মোঘল শাসকদের কৃতিত্ব থাকলেও এটার সৃজনে কোন ভূমিকা নেই।

 

আবহমান কাল থেকে বাঙালিরা সৌর বৎসরে তাদের দিন-ক্ষণ গণনা করে আসছেন। এটা তাদেরই উদ্ভাবিত পঞ্জিকা। আরও একটি কথা স্পষ্ট বলা দরকার। তাহল সম্রাট আকবর কিংবা মোঘলদের এদেশের শাসনভার গ্রহরে পূর্বেও এদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল। এদেশের মানুষ পূর্বকালে বিভিন্ন সময়ে তাদের ধর্মমত পরিবর্তন করেছে। আর এটা করেছে তাদের নিজেদের উপলব্ধিতে। জোর করে ধর্মমত পরিবর্তন তথা জোর করে মুসলমান বানানোর তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এদেশে ঘটেনি। ইসলামের মহান বাণী নিয়ে এদেশে এসেছিলেন সুফি সাধকগণ। সুফিবাদ আরব সংস্কৃতির কোন অংশ নয়। এটা ছিল পারস্য দেশিয়। সুফিবাদ ইসলামের একটি শক্তিশালি মতবাদ হলেও তা পারস্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশেই বিস্তার লাভ করেছিল। আরবের মূল ভূখণ্ডে সুফিবাদ প্রসার পায়নি।

এই সুফিবাদের ধারকবাহক সাধকগণই এদেশে ইসলাম প্রচার করেছেন। তারা এদেশে মুসলমান শাসনের গোড়াপত্তনের বহুপূর্বে এসেছিলেন। তারা শাসক ছিলেন না। তাদের সাথে যে শুধু সৈন্যবাহিনীই ছিল না তাই নয়, এ দূর দেশে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ স্বজনহীন, বান্ধবহীন। কিন্তু তাদের ইসলামী জ্ঞান ও সাধনার শক্তি ছিল প্রচুর। তাই তাদের প্রচারিত ইসলাম ধর্মে স্থানীয়রা দলে দলে দীক্ষিত হতে থাকে। ইসলাম প্রচার নিয়ে পৃথিবীর অন্য কোথায় কি হয়েছে তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে এটা ইতিহাস স্বীকৃত সত্য যে বাংলা, এমনকি এ ভারতীয় ভূখণ্ডের কোথাও তরবারির শক্তিবলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখানে ইসলাম এসেছিল সুফি সাধকদের অহিংস মত প্রকাশের মাধ্যমেই। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল, মুসলিম শাসকদের কেন্দ্র দিল্লির চেয়ে বাংলা কিংবা কেন্দ্রের দূরবর্তী অঞ্চলে মুসলমান জনগোষ্ঠীর আধিক্য। যদি অস্ত্রের বলেই ইসলাম প্রচার করা হত, তাহলে মুসলমান শাসকগণ আগে তাদের বিজিত এলাকা তথা দিল্লির জনগোষ্ঠীকেই ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। মুসলমান আমল থেকে শুরু করে এখনও দিল্লির তথা মুসলমান শাসকদের কেন্দ্রের দিকে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের পাশাপাশি অমুসলিম জনগোষ্ঠীও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিল। তারা মুসলিম আমলেও তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করতেন। এমনকি মুসলিম শাসকদের সভাসদগণও নিজ নিজ ধর্ম অক্ষুণ্ন রেখে রাজদরবারে আমাত্যগিরি করতেন। সম্রাট আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল যিনি তাকে বাংলা পঞ্জিকা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই টোডরমলও ছিলেন অমুসলিম।

 

বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষা অন্যান্য প্রভাবশালী ভাষা সংস্কৃতির মতোই একটি সজীব, সচল ও আত্মীকরণশীল। এই সংস্কৃতি যেমন বিভিন্ন ধর্মের মতের মানুষকে তাদের কোলে স্থান দিয়েছে, তেমনি বিভিন্ন ভাষা থেকে তার নিজের ভাষার উপাদানও গ্রহণ করেছে। তবে একথা সঠিক যে সংস্কৃত ভাষার প্রভাব বাংলা ভাষার উপর অনেকটাই প্রকট। এটা যে শুধু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেই সত্য তা নয়, এ উপমহাদেশের প্রায় সকল ভাষাই তা করেছে। কেননা এক কালে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার প্রধানতম মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। এ ভাষা ছিল সুনিয়ন্ত্রিত ও উচ্চ শ্রেণির মানুষের। সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্যই হল, উচ্চ শ্রেণির সংস্কৃতি নিম্ন শ্রেণির সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করবে। শাসকের ভাষা শাসিতরা গ্রহণ করে। তবে শাসিতদের ভাষা যদি এমন হয় যে তা শাসকদের ভাষাকে প্রভাবিত করতে পারে কিংবা শাসকগণ তাদের নিজ সংস্কৃতিকে শাসিতদের মধ্যে নিজ গুণে সঞ্চারিত করতে অপারগ হয়, তাহলে শাসকরাই শাসিতের ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করবে।

 

এ প্রকল্প অনুমানটির উৎকৃষ্ট উদারহণ বাংলাদেশেই রয়েছে। আমাদের বাংলা বহু বিদেশি শাসক দ্বারা শাসিত হয়েছে। মুসলমানগণ আসার পূর্বেও এখানে অনেক রাজবংশ শাসন করেছেন। এরা যেমন দেশিয় ছিল তেমনি ছিল বিদেশি। তারা এ উপমহাদেশের অন্য কোন স্থানের যেমন ছিল, তেমনি ছিল উপমহাদের শক্তি। তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিনের বাংলা বিজয়ের সময় এ দেশে সেন বংশের রাজত্ব ছিল। সেন রাজারা কিন্তু বাঙালি ছিলেন না। তারা ছিলেন ভারতের দক্ষিণাত্য তথা কর্ণাটক এলাকার লোক। কিন্তু কয়েকশ বছর শাসন করার পরেও তারা দাক্ষিণাত্যের সংস্কৃতি বাংলায় চালু করতে পারেননি। তাদের প্রচলিত বর্ণভেদ প্রথা বাঙালিদের অনেকটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ালেও বর্ণভেদ প্রথা বাংলায় বেঁচে থাকেনি। বর্ণভেদ প্রথা বর্তমানেও ভারতে প্রবল হলেও ভারতেরই অঙ্গরাজ্য পশ্চিম বঙ্গেও খুব একটা মানা হয় না। আর বাংলাদেশে তো বর্ণভেদ নেই বললেই চলে।

 

অপরপক্ষে বাংলায় ইসলামের বিস্তার মুসলমানগণ এদেশে আসার পূর্বেই ছিল প্রচণ্ড গতিশীল। তৎকালের বর্ণভেদ প্রথা, শাসকদের শোষণ, প্রচলিত ধর্মের স্থানীয়দের প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং একই সাথে ইসলামের সাম্য ও ঐক্যের নীতি স্থানীয়দের মুগ্ধ করেছিল। তাই কোন প্রকার কঠোরতা বা জোর জবরদস্তি ছাড়াই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তবে মুসলমান শাসন শুরু হওয়ার পর এর গতি নিঃসন্দেহে ত্বরান্বিত হয়েছিল।

 

আমরা বাংলা ভাষাকে আজকে যে অবস্থায় দেখি তার গোড়া পত্তন হয়েছিল মুসলমান শাসন আমলেই। স্বাধীন সুলতানি আমলেই অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় পঠনপাঠন ও লিখন শুরু হয়। এ অনুবাদ সাহিত্যগুলোর মধ্যে যেমন ছিল হিন্দু ধর্মগ্রস্থ রামায়ণ, মহাভারত, তেমনি ছিল ফারসি কাব্য সাহিত্যগুলো। শাসক-শাসিত, প্রজা-আমাত্য, সাহিত্যিক-পাঠক সবার প্রচেষ্টাই বাংলা ভাষা আধুনিকতায় প্রবেশ শুরু করেছিল। সর্বশেষ টাইপ বা গদ্যের স্টাইলে বাংলার আবির্ভাব তো খ্রিস্টান মিশনারিদের বদলৌতেই হয়েছে। তাই ঐতিহাসিক বিবেচনায় বাংলা একটি সার্বজনিন উৎসের ভাষা। এ ভাষায় আত্মীকৃত যেমন ধর্মীয় শব্দ নামাজ, রোজা, মহররম রয়েছে, তেমনি আনারস, চেয়ার, টেবিল কিংবা হুক্কা, এক তারার মতো ধর্ম নিরপেক্ষ শব্দ গুলোও রয়েছে। এ ভাষা ও সংস্কৃতি ধারণ করে খোদা, শয়তান, রাসুল, নবি ইত্যাদির মতো ইসলাম ধর্মের ধারণাগুলো, তেমনি এ সংকৃতিতে পাওয়া যাবে ইন্দ্র,  অসুর, রাম, রাবণ কিংবা মা লক্ষীর মতো হিন্দু ধর্মের ধারণাগত শব্দগুলো। একই ভাবে এদেশে সকল ধর্মই সমান গুরুত্বসহকারে ও সমান ভাবগাম্ভির্যের সাথে পালিত হয়।

 

কালের প্রবাহে বাংলা সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে । এ পরিবর্তন সতত চলমান। পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও আত্মীকরণ একটি আধুনিক সংস্কৃতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্টটি কে আমাদের স্বীকার করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, হেথায় আর্য-অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন কিংবা মোঘল, পাঠানদের এক দেহে লীন হবার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আর এজন্যই বাংলা একটি আধুনিক ভাষা; বাঙালিরা একটি আধুনিক সংস্কৃতির অধিকারী জাতি। (০৮ এপ্রিল, ২০১৫)