ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

শিক্ষার প্রধানতম উদ্দেশ্য হল কোন আদম সন্তানকে সামগ্রিকভাবে মানুষ করে তোলা। আর প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হল, কোন মানুষকে বিশেষ কোন কাজের জন্য বিশেষভাবে যোগ্য করে তোলা। বিদ্যাতয়নিক শিক্ষাকে একটা নির্দিষ্ট স্তর  পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যাল স্তরে গিয়ে তা বিশেষ বিশেষ ধারায় বিভাজিত হয়।  হাজারও কারণের মধ্যে এর  অন্যতম কারণ হল, এ জ্ঞান সাগরের সকল দিকে সাঁতার দিয়ে কোন মানুষের পক্ষেই কুলে পৌঁছান সম্ভব নয়। তাই সীমিত সময়ে কুলে পৌঁছানোর জন্যই মূলত আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ করি; একটা বিশেষ বিষয়ের উপর কোন ডিগ্রি অর্জন করি।

আমরা যা শিখি তার সবটাই যে সমানভাবে ও প্রত্যক্ষভাবে কাজে লাগবে এমনটি কখনও হয় না। অনেক বিষয় আছে যেগুলো প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারিক জীবনে কোন কাজই দেয় না। কিন্তু এগুলোর কিছু কিছু বিষয়ে আবার আমাদের আগ্রহ, প্রাত্যহিক কাজে লাগে, এমন সব বিষয়ের চেয়েও বেশি। কবিতার রাজ্যে আড্ডা দিয়ে যারা জীবন অতিবাহিত করেন, যদি তারা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়ে কিংবা অন্য কোনভাবে কবিতা শিক্ষা দিয়ে দু পয়সা রোজগার করতে না পারেন, তাহলে তার কবিতা পড়া আপাতত দৃষ্টিতে বৃথাই মনে হবে। কিন্তু এ বৃথা কাজেও তো অনেকেই দিনের পর দিন কেটে দেন। আমি এমন একজন কবিকে জানি, তিনি যা লিখেন, কবিতার ব্যাকরণে এগুলোর তেমন কোন মূল্য নেই। তার কবিতার পাঠক নেই বললেই চলে। কিন্তু তারপরও দিনের পর দিন তিনি কবিতা লিখছেন। তার বই কেউ কেনেনা, কিনবেন না—এটা জানার পরও তিনি প্রতি বছরই নিজ খরচে বই  ছাপাচ্ছেন; ছেপেই চলছেন।

 

কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর উচ্চতর ডিগ্রি শুধু সরকারি চাকরিই নয়, বেসরকারি বিশেষজ্ঞ কোম্পানিগুলোতেও কাজে নাও লাগতে পারে। কোন মানুষ উচ্চতর শিক্ষার জন্য নিম্নতর স্তরের অনেক আশাই তাৎক্ষণিকভাবে পরিত্যাগ করতে পারেন। এতে যেমন থাকে উচ্চর ডিগ্রি লাভের পর উচ্চতর মর্যাদার পেশায় নিয়োজিত হওয়ার খায়েস, তেমনি এখানে বিবেচনা থাকতে পারে নিরেট উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নিজেকে শিক্ষিত ও মর্যাদাবান সমাজের অন্তর্ভুক্ত করা। তাই উচ্চতর ডিগ্রি যে উচ্চতর সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দিবে, এমন কোন কথা নেই। সামান্য কতিপয় প্রফেশনাল পেশা ছাড়া বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের ক্যাডার পদে প্রবেশের সর্বোচ্চ যোগ্যতা হল, যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি থাকা। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার বাহার বাংলাদেশে এতটাই যে সিভিল সার্ভিসের ক্যাডার পদেই শুধু নয়, বেশামরিক সার্ভিসের পিওন পদেও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও দরখাস্ত করছেন, এবং চেষ্টা, তদবির এমনকি উৎকোচের বিনিময়েও সে ধরনের চাকরিতে প্রবেশ করছেন। যেখানে নিম্নতম বা প্রাথমিক যোগ্যতা এইচএসসি পাশ, সেখানে মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরাও অবলিলায় এসব চাকরির জন্য প্রার্থী হচ্ছেন। এতে কর্তৃপক্ষের কি করার  আছে? তারা তো তাদের অফিসে কোন পণ্ডিত ব্যক্তি চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেননি। কিন্তু কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যদি আপনা আপনি এসেই যায়, তারা তো সেটা নিবারণও করতে পারেন না। কারণ চাকরির শর্ত নিম্নতম যোগ্যতার  কথা লিখা থাকে; উচ্চতর যোগ্যতা নয়। তাই কেউ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী হয়েও পিয়ন পদে চাকরি করতে চাইলে চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষতো তাকে মাস্টার্স ডিগ্রিখানা পরিত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে পারেন না। প্রত্যেক দেশেই সরকারি পদগুলোর কিছু না কিছু বিশেষায়ণ থাকে। তবে অধিকাংশ পদেই সাধারণ যোগ্যতার সাধারণ  কর্মের লোকদেরকেই নিয়োগ করা হয়। বিশেষ কিছু পদের বাইরে তো উচ্চ শিক্ষার আবশ্যকতা নেই।

 

তাই বলে এটা আমি বলছি না যে উচ্চ শিক্ষা মূল্যহীন বা অনাবশ্যক। উচ্চ শিক্ষার অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু তাই বলে পাইকারি হারে দেশের সবাই উচ্চ শিক্ষার দিকে পা বাড়াবেন সেটাও কাঙ্খিত নয়। আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষ মনে করেন, উচ্চ শিক্ষা হলেই বুঝি সরকারি চাকরি নিশ্চিত হবে। অন্য দিকে কারিগরী শিক্ষা শুধু মেকানিক বা কেরানিদের জন্য নির্দিষ্ট। তাই সবাই উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য সাধারণ শিক্ষার দিকেই ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার যে চরম লক্ষ হল শ্রেফ বিদ্যাতয়নিক, সেটা অনেকেই মানতে চান না। সাধারণ শিক্ষা মানুষের মধ্যকার মানবিক গুণাবলীকে বিকশিত করে, দেশ, সমাজ ও পরিবেশ-প্রতিবেশকে অধিকতর স্বচ্ছতার সাথে জানতে সাহায্য করে। সাধারণ উচ্চশিক্ষা মানুষের সামগ্রিক জীবনের প্রতি বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে সহায়তা করে। কিন্তু এ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই যদি একটি উচ্চপদের সরকারি চাকরি পেয়ে পেটের ভাত যোগাড় করা হয়, তবে সেটা কালক্রমে হতাশার কারণ হয়ে ওঠে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ-ইউনিটের’ ভর্তি পরীক্ষায় আমার এক পরিচিতজন প্রথম পঞ্চাশ জনের মধ্যেই তালিকাভূক্ত হয়। আমাকে বিষয় পছন্দের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে আমি তাকে আইন বিষয়ে পড়ার পরামর্শ দেই। কারণ, আমি জানি, আমার সেই পরিচিতজন উচ্চ শিক্ষা লাভ করে তার পেটের ভাতই যোগাড় করবেন। মানে তাকে বিদ্যা দিয়েই রুটিরুজি রোজগার করতে হবে। তাই আইন পড়লে সরকারি বেসরকারি কোন চাকরি না পেলেও সে অন্তত আইন ব্যবসা করে কিছু না কিছু রোজগার করতে পারবে। কিন্তু আমি অবাক  হয়ে দেখলাম, সেই পরিচিতজন ভর্তি  হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। এ বিভাগে ভর্তির কারণ হিসেবে সে জানাল, এটাতে দেশে-বিদেশে সব খানেই চাকরি পাওয়া যাবে। আর সরকার বিদেশি মিশনগুলোতে চাকরির জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জানা লোকদেরকেই তো নিয়োগ দিবে। তার যুক্তি শুনে আমার তো চক্ষু চড়ক গাছ! বলে কি ব্যাটা? বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিভাগের চাকরি যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্রদের জন্য নিদিষ্ট বা এ বিভাগের ছাত্রদের কোনভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, তা কস্মিনকালেও তো শুনিনি। পরে জানলাম, এক প্রাচীন আত্মীয়ই নাকি তাকে এ ‍পরামর্শ দিয়েছিলেন।

 

সম্প্রতি বিডিনিউজ২৪.কম ব্লগের একজন লেখক উচ্চশিক্ষার সাথে সরকারি চাকরির সম্পর্কের অসঙ্গতি সম্পর্কে লিখেছেন। তার মতেঃ

 ‘‘সামান্য টেনেটুনে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করা একটা ছাত্র আর্মীর অফিসার হয়ে যাচ্ছে অথচ অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করা একটা ছাত্র বেকার হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে । কোন উপায় না পেয়ে হয়তো কেউ আত্বহত্যা করছে ।এভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে দেশের কিছু উজ্বল ভবিষ্যত । এসএসসি পাশ করা একটা ছাত্র হয়তো পুলিশের সৈনিক হয়ে গেল অথচ উচ্চশিক্ষিত বিবিএ এমবিএ করা একটা ছাত্র হয়তো কোন ছোটোখাটো কোম্পানির ভ্যানের পিছনে থেকে মাল ডেলিভারি দিচ্ছে ।’’

 

ব্লগারের মন্তব্যটি বিজ্ঞচিত হয়নি বলে আমি মনে করি। এর কারণ নিবন্ধের শুরুতেই আমি ব্যাখ্যা করেছি। আমার জানা মতে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য যেখানে যত প্রকার ব্যবস্থা রয়েছে তাদের যে কোনটির চেয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীতে রিক্রুটমেন্ট সবচেয়ে বেশি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর যে আইএসএসবি (ইন্টার সার্সেস সিলেকসন বোর্ড) এর কাছে প্রার্থীদের উপস্থাপন করা হয়, তার পদ্ধতি বিশ্বমানের। এখানে সশস্ত্রবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পারবে বা নেতৃত্ব দেবার মতো করে গড়ে তোলা যাবে এমন ধরনের তরুণদেরই বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে যেমন, ব্যক্তিগত সততার বিষয়টি দেখা হয়, তেমনি দেখা হয় বুদ্ধিমত্তাও। তাই গড়পড়তা আইকিউ এর চেয়ে কম তো নয়ই, এমনকি গড়পড়তা আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তার প্রার্থীরাও নির্বাচিত হতে পারে না। এখানে উচ্চ বুদ্ধিমত্তার প্রার্থীদেরই খুঁজে বের করা হয়। এমনও ঘটনা ঘটতে পারে যে নির্দিষ্ট মানসম্পন্ন প্রার্থী না পাওয়া গেলে কোন প্রার্থীকে রিক্রুট পর্যন্ত করা হয় না।

 

সশস্ত্র বাহিনীর কমিশনড পদের অফিসারগণ চাকরিতে প্রবেশের সময় সামান্য এইচএসসি পাশ হয়ে থাকলেও তারা প্রশিক্ষণকালীনই কিন্তু স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন । এ স্নাতক ডিগ্রি সাধারণ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডিগ্রির চেয়েও মানসম্মত। কারণ তাদের শিক্ষকগণও মানসম্মত। সার্বক্ষণিক কায়িক প্রশিক্ষণের বািইরেও তাদের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পরও এরা কিন্তু শিক্ষা বন্ধ করেন না। তারা হয়তো মধুসূধন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, শেইক্সপিয়রের নাটক কিংবা হিউম-রাসেল-কেমুর দর্শন পড়েন না, কিন্তু তাই বলে তারা আনপড় থাকেন না। সশস্ত্রবাহিনীর প্রত্যেকটি পদোন্নতির বিপরীতে অফিসারদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক থাকে।

 

একই রকম ঘটনা ঘটে পুলিশের ক্ষেত্রে। পুলিশের কনস্টেবল পদে সর্বনিম্ন এসএসসি পাশ প্রার্থীদের নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী ধাপসমূহ যথা এএসআই থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত প্রত্যেক ধাপেই সুনির্দিষ্ট পড়াশোনা করা দরকার। এ পড়াশোনার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তারা পরবর্তী পদোন্নতির জন্য মনোনীত হন। সেনাবাহিনীর মতো পুলিশের অফিসারদের হয়তো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়া হয় না। কিন্তু তাদের বিভিন্ন আইন কানুন, সরকারি চাকরির নিয়মকানুন ইত্যাদির উপর পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন করতে হয়। একই ভাবে প্রত্যেকটি পদোন্নতির পরে তাদের বাধ্যতামূলক কিছু প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হয়। সম্প্রতি পুলিশের এএসপিদের মৌলিক প্রশিক্ষণকালে তাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধীন মাস্টার অব পুলিশ সাইন্স(এমপিএস) ডিগ্রি দেয়া হয়।

 

অনেকে বলবেন, চাকরির প্রশিক্ষণ কি আর সাধারণ শিক্ষার সমতুল্য হয়? আমি বলব যে ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর পোস্ট গ্রাজুয়েট বা পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন, তিনি বাংলাদেশ সরকারের কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়ে তার শিক্ষাকে কিভাবে কাজে লাগাবেন এটারও কোন সদুত্তর নেই। যদি চাকরির প্রয়োজনই প্রধান হয়, তবে শিক্ষণ নয়, প্রশিক্ষণই জরুরি ও কল্যাণকর। সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত যেসব যুবক কেবল সরকারি চাকরির পিছনে ছুটে বেড়ান এবং প্রবল প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে শেষে তাদের শিক্ষার সাথে অসামঞ্জস্য পেশা বেছে নেন, আমার মতে তারা সঠিকভাবে যোগ্য হয়ে ওঠেননি। কারণ তারা যদি যোগ্য হতেন, রিকসা ঠেলতেন না, রিকসা ঠেলার যোগ্য নিম্নযোগ্যতার ব্যক্তিদের জন্য তিনি নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারতেন। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কোন সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পিছনে না ছুটে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অনেক যুবক দেশের কর্মসংস্থান জগতে ভুরি ভুরি নজির সৃষ্টি করেছেন।(১৭ এপ্রিল, ২০১৫)