ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের বহুল আলোচিত নারীর শ্লীলতাহানির ভিডিও ক্লিপটি এখন অনেকের হাতে পৌঁচেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে টিডি চ্যানেলগুলোও এ ভিটিও ফুটেজ প্রচার করেছে। আমিও একটি সূত্রে ভিটিওটি দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। অদম্য কৌতূহল নিয়ে সেই সিসিটিভির ফুটেজটি অনেকক্ষণ ধরে দেখেছি। কিন্তু অনেকবার দেখার পরেও এখানে এমন কোন দৃশ্য পেলাম না যেখানে মেয়েদের শালিনতাহানীর গুরুতর কোন বিষয়ের অবতারণা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু সস্তা ধরনের অনলাইন পত্রিকায় যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর সাথে এ ভিডিও ফুটেজের কোন মিলই নেই। এ ভিডিও ফুটেজে কোন স্ত্রীলোক তো দূরের কথা কোন পুরুষকেও বিবস্ত্র করার কোন দৃশ্য চোখে পড়ল না।

 

ঘটনার পরদিন ফেইসবুকে একটি পিঠখোলা ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল। এখানে প্রায় বব ছাঁটের মতো লম্বা চুলের একজন আদম সন্তানকে হেস্তনেস্ত করা হচ্ছে। আদমের পরনে প্যান্ট, পায়ে জুতো। তার পিঠ খোলা। দেখেই আমি ধারণা করেছিলাম, এটা কোন পুরুষের ছবি। কারণ পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের সামনে কোন নারীকে এভাবে বিবস্ত্র করা সম্ভব নয়। নারী হলে, তিনি শাড়ি বা সেলোয়ার-কামিস যাই পরুক, তার ভিতরে ব্লাউস ও ব্রা থাকবে। শাড়ি টেনে, ব্লাউস খুলে তারও পরে ব্রা খুলে কোন নারীর ঊর্ধ্বঙ্গ টিএসসির মতো স্থানে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করা হবে, এমনটি ঘটা ও তা ঘটতে দেয়ার মতো পরিবেশ বাংলাদেশে বর্তমানে নেই, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না।

 

পরে জানা গেল, এ দৃশ্য আসলে অন্য স্থানে। একটি অনলাইন পত্রিকার এক ফটো সাংবাদিকের নগরীর নাজিম উদ্দিন রোড থেকে তোলা এ ছবিটি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বাসে একজন বখাটে ছাত্র ছাত্রীদের উত্যক্ত করা শুরু করলে সাধারণ ছাত্রগণ তাকে এভাবেগণ ধোলাই দেয়।

 

এ ছবির বাইরেও বেশ কিছু ছবি নানা ভাবে না না মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনটার সাথেই সোহরাওয়াদী উদ্যানের টিএসসি ফটকের ভিডিও চিত্রে ধারণ করা ছবির মিল নেই। আসলে ঐদিন টিএসসি গেটে অস্বাভাবিক ভীড় হয়েছিল। কতিপয় বখাটে এ ভীড়ের মধ্যে কিছু তাৎক্ষণিক যৌনবাসনা পূরণে সচেষ্টও ছিল। যখনই কোন মেয়ে গেইট দিয়ে বের হতে শুরু করে কিংবা কাছাকাছি স্থানে চলে আসে এসব যুবক গেইটের ভীড়কে আরো বাড়িয়ে দিত। এতে কয়েক জন মেয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে। তাদের অভিভাবকগণ তাদের আগলিয়ে ভীড়ের বাইরে নিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কতিপয় যুবক মেয়েদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তাদের এ স্বেচ্ছাসেবার ফলে অনেকেই চটে যান। কারণ তারা প্রকৃত দুষ্টদেরই শুধু নয়, ভাল মানুষদেরও তাড়াতে শুরু করেন। এর ফলে সেখানে সময় সময় ধ্বস্তাধ্বস্তিও হয়।

 

অস্বাভাবিক ভীড়ের মধ্যে ফটকের অদূরে দাঁড়ানো পুলিশ সদস্যদের তেমন কিছু করার ছিল না। তবে অনেক সময় তারা জনতার উপর চড়াও হয়েছিল। এতে ভীড়ের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা গেল এক সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে জনতা এদিক ওদিক ছুটতে শুরু করে। তখন মোটর সাইকেলে থাকা আরোহীগণ শিশু-মহিলাসহ পড়েও যান। দশ-পনেরটি মোটর সাইকেল এভাবে পড়ে যায়। ভাগ্যিস এতে কেউ আহত হয়নি। এর চেয়ে বেশি কিছু হলে যদি মোটর সাইকেলের নিচে পড়ে কেউ বিশেষ করে কোন বাচ্চা নিহত হত, তাহলে নারীদের যৌন নির্যাতন ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্যই শুধু নয়, পুলিশের বিরুদ্ধে শিশু হত্যার জন্যও হয়তো মামলা হত।

 

পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়াদী উদ্যানের টিএসসি গেইটে যা ঘটেছিল তা ছিল অত্যধিক ভীড়ের মধ্যে সুযোগ সন্ধানী কিছু বখাটের যৌন হয়রানির প্রচেষ্টা মাত্র। এধরেনর ঘটনা নগরির শপিং মলগুলোতে ঈদের এমনকি অনেক সময় স্বাভাবিক ছুটির দিনেও হতে পারে। এতে অনেক নারী ও বালিকা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারে। অনেকে যৌন হয়রানির সুযোগের সন্ধানেও থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে যৌন হয়রানির জন্য কোন নারী অভিযোগ করবে বলে মনে হয় না। অন্তত ভিডিও ফুটেজগুলো তাই বলে।

 

কিন্তু তারপরও বিষয়টিকে অত্যন্ত বড় করে ফেলা হয়েছে। এ বড় করার বিষয়টি প্রগতিশীলগণ নিজেদের অজান্তেই করেছেন। এ সুযোগে তারা পুলিশকে একচোট দেখে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে সামান্য ঘটনাকে বড় বানিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলগণ পহেলা বৈশাখ তথা বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির জনপ্রিয় আচারগুলোর বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই প্রচারণা চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

 

বেচারা পুলিশ পড়ছে বিপাকে। ভিডিও ফুটেজ থেকে হয়তো কিছু বখাটেকে শনাক্ত করা যাবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ করার মতো কোন অভিযোগ আনা ও সেগুলোর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হবে। কারণ ভিডিও ফুটেজে কিংবা এর বাইরে থাকা কোন নারী এত সামান্য ঘটনা নিয়ে অজ্ঞাত বখাটেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য উৎসাহিত হবেন না। কারণ এ সমাজে যৌন হয়রানির শিকার কোন নারীর এমন ধরনের বহুল আলোচিত বিষয়ের অন্যতম অনুসঙ্গ হয়ে জনসম্মুখে আসার ঘটনায় পাওয়ার চেয়ে হারাবার ভাগই বেশি হবে। আমাদের সমাজে নারীদের ভিকটিমগণ হওয়া সহ্য করা হয় না। এখানে ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষিতাকেই হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। ১৯৯৯ সালের বহুল আলোচিত বাঁধনের ঘটনায় মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো শেষ পর্যন্ত বাঁধনকে আইন ও প্রতিবাদের বাঁধনে বাঁধতে পারেনি।

এক কথা অনস্বীকার্য যে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। স্বাধীনতার পরে একটি স্বাধীন জাতি হলেও এ ষড়যন্ত্র কিন্তু বন্ধ হয়নি বরং ষড়যন্ত্রকে তীক্ষ্নতর করা হয়েছে।  আমাদের আবহমান আচরগুলোক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ভ্রান্তি ছিল, বর্তমানে ডিজিটাল যুগে সেগুলোক রীতিমত বিভ্রান্তিতে পরিণত করা হয়েছে। গত পহেলা বৈশাখে নারীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগ ও সে সম্পর্কে উল্টাপাল্টা প্রচার ও বক্তব্যগুলো এ ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তিরই ধারবাহিকতা বলে অনুমিত হয়। আমার মতে এখানে দু প্রকারের লিলা রয়েছেঃ

 

১. কোন পক্ষ পহেলা বৈশাখকে বিজাতীয় শরীয়া বিরোধী প্রমাণের জন্য পরিকল্পিতভাবে একটা কিছু করার ধান্দায় থাকতে পারে। তারা নারীর শ্লীলতাহানীর মাধ্যমে এটাকে বন্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারে। তবে ঘটনাস্থলে তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেই মনে হয়।

 

কিন্তু ঘটনাস্থলে তাদের ষড়যন্ত্র সফল না হলেও ঘটনাস্থলের বাইরে প্রচার মাধ্যমে তারা অনেকটাই সফল। প্রথমত, তারা ঘটনাস্থলের বাইরের কিছু অপ্রাসঙ্গিক ছবি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করা চেষ্টা করেছেন যে পহেলা বৈশাখে একটা জঘন্য কিছু ঘটেছে। এক বা একাধীক নারীকে বিবস্ত্র করা হয়েছে। এ বিবস্ত্র করার ঘটনায় পুলিশ কিছুই করেনি। এর সাথে তারা আরও একটি বিষয় প্রমাণের ক্ষেত্রে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে যে এদেশের প্রগতিশীল বা বাঙালি পুরুষরা আসলে নপুংশক। তাদের সামনে যে কাউকে বিবস্ত্র করা যায়। এরা কিছু বলে না, করে না। এরা শুধু পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বরত ব্যক্তিদের দোষারোপ করে।

 

২. ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল, বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধীগণ তাদের প্রাথমিক কর্মটি সমাধান করলে দ্বিতীয় পর্বটি তাদের আর নিজেদের করতে হবে না। এটা প্রগতিশীল নামধারীগণই করবে। এটা অবশ্য চলছে। ঘটনার ভিটিও কাভারেজের বাইরে কি ঘটেছিল সেটা প্রতক্ষদর্শীগণ ছাড়া অন্যরা হয়তো জানবেন না। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে যা আছে তাতে কোন নারীকে বিবস্ত্র করার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। যা ঘটেছে তাও ভীড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি ও সেই ঠেলাঠেলিকে কিছু বখাটের কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার প্রচেষ্টা। বিষয়টি সেই সময়েই কতিপয় সাহসি ও পরোপকারী যুবকের নজরে এলে এটা তারা নিজেরাই প্রতিরোধের চেষ্টা করে । এক সময় পুলিশ সেখানে হস্তক্ষেপও করে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আপত্তিকর। তাই এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়ে দোষিদের শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ।

 

কিন্তু এ ঘটনাকে পুঁজি করে কতিপয় সংগঠন যা বাড়াবাড়ি করছে তাতে মনে হয়, তারা প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপটির পক্ষে ভাড়ায় কাজ করছেন। বিষয়টিকে এমনিভাবে উপস্থাপন করছেন যে পহেলা বৈশাখের দিন হাজার হাজার মেয়েকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল। তারা এজন্য পুলিশকে ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শুধু তুলোধুনোই করছেন না, বিষয়টিকে জঘন্যতম ঘটনার অন্যতম বলেও মন্তব্য করছেন। একেরপর এক কর্মসূচি দিচ্ছেন। এ সব কর্মসূচিতে তুখোড় বক্তারা যাচ্ছেন। তারা ঘটনার আগামাথা তেমন কিছুই জানেন না। ঘটনাস্থল তো দূরের কথা ঐদিন হয়তো ঢাকাতেই ছিলেন না। কিন্তু বক্তৃতার মঞ্চে উঠে অন্তত আধা ঘন্টা তো কিছু বলতে হবে। তাই তারা অনেকে মহাভারতের দ্রৌপদির বস্ত্র হরণের মতো গল্পের অবতারণা করছেন। আর এসব গল্পের ভিলেন হিসেবে পুলিশকেই দুর্যোধনের আসনে বসাচ্ছেন।

 

বলাবাহুল্য, ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীগুলো কিন্তু এমনটিই চেয়েছিল। তারা বিষয়টিকে এত বেশি ভয়ংকর বলে প্রচার করতে চেয়েছিল যে ভবিষ্যতে আর কোন মেয়ের অভিভাবক যেন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য তাদের মেয়েদের বাড়ির বাইরে যেতে না দেয় এবং যারা আয়োজক তারাও যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে নিরুৎসাহিত বোধ করে। দ্রৌপদির পক্ষে পঞ্চপাণ্ডবগণ যুদ্ধ করেছেন। সেই যুদ্ধে সকল সৈন্য-সামর্থ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন দ্রৌপদির পিতা পাঞ্চাল রাজ দ্রৌপদ। কিন্তু আমাদের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী মেয়েগুলোর বাবারা তো আর রাজা বাদশা নয় কিংবা তাদের স্বামীরাও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়লাভের মতো কোন বীরও নয়। তাই তাদের ভবিষ্যতের সতর্কতা হবে মেয়েদের এ ধরনের অনুষ্ঠানে আসতে না দেয়া যেটা প্রতিক্রীয়াশীলরা মনে প্রাণেই চায়।

 

ঘটনা যত সামান্য ঘটুক, এটাকে কোনভাবেই অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারহীনভাবে যেতে দেয়া যাবে না। কিন্তু তাই বলে ছোট ঘটনাকে অতি বড় করে তোলার কোন অর্থই হয়না।  অথচ তিলকে তাল বানিয়ে আমাদের প্রগতিশীলগণ যে প্রতিক্রীয়াশীল গোষ্ঠীর স্বার্থই উদ্ধার করছেন, সেটা বোঝার মতো যথেষ্ঠ প্রগতিশীল তারা নয় বলেই আমি মনে করি।

 

বি.দ্র. আমার এ মতকে অনেক প্রগতিশীলও পছন্দ করবেন না। কারণ তাদের উপলব্ধি এতদূর নাও যেতে পারে।