ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

নারী নির্যাতন বা নারীর শ্লীলতাহানী সংক্রান্ত কোন আলোচিত ঘটনা ঘটলেই এক শ্রেণির মানুষ বিষয়টিকে নারী স্বাধীনতার বিষম ফল বলে প্রচার করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। তারা বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, নারী স্বাধীনতার জন্যই নারীগণ নির্যাতিতা বা ধর্ষিতা হচ্ছেন। আর যেহেতু এটা স্বাধীনতার অপব্যবহারের ফলেই ঘটেছে, তাই এর জন্য দায়ি হল ধর্ষিতা বা নির্যাতনের শিকার নারীটিই। যেহেতু ধর্ষণের ঘটনার জন্য ধর্ষিতাই দায়ি, তাই এটা প্রতিকারযোগ্য তেমন কোন ঘটনাই নয়। তাই এর জন্য কাউকে বিচারের সম্মুখিন করার দরকারও নেই। তবে এটার একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিকারের পরামর্শ তারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিতে থাকেন, সেটা হল, নারীদের পুরুষের অধীন করে দেন, তাদের অন্তঃপুরে বন্দী করে রাখেন, তাহলে আর কখনও কোন নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হবে না। কারণ, খোয়াড়ের মুরগীকে কি আর শেয়ালে ধরতে পারে?

বিষয়টিকে মুক্ত চিন্তার মানুষগণ ধর্ষণ সংস্কৃতির অংশ বলেই মনে করেন। ধর্ষণ সংস্কৃতি সারা পৃথিবীতে একটি বহুল গ্রাহ্য সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মূল কথাই হল, ধর্ষণ বলতে দুনিয়ায় তেমন কিছু নেই। পথে ঘাটে বা বাসা বাড়িতে যে ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমরা দেখি, শুনি বা পত্রিকায় পড়ি, সেগুলো মূলত বাড়াবাড়ি ধরনের অসত্য সংবাদ। বস্তুত নারীগণ নিজেরাই ধর্ষিতা হতে চান। তারা ধর্ষিতা হবার অভিজ্ঞতা উপভোগ করেন। কালেভদ্রে কোন নারী হয়তো জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকারও হন। তবে এরূপ ঘটনার সংখ্যা লিখে রাখার মতো কিছু নয়। আসলে পুরুষের অধীনে বসবাস করা নারী যৌনকাজে ব্যবহৃত হয়; ধর্ষণের কাজে নয়। মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের শোষণ যেমন কোন এক সময়, এমনকি এখনও কোন অপরাধ নয়, তেমনি পুরুষ কর্তৃক নারী উপভোগ করা তা নারীটির  সম্মতিতে হোক বা জোরপূর্বক হোক, সেটা কোন অপরাধই নয়।

মাঝে মাঝে সামাজিক মিডিয়াগুলোতে মজার মজার স্টাটাস পাওয়া যায়। এগুলো কোন এক ব্যক্তির সরল মতামত হলেও এ সব মতামতে মানুষের মনের গূঢ় বিশ্বাসটি অন্যের কাছে ধরা পড়ে। তাছাড়া এসব কৌতূহলোদ্দীপক স্টাটাসের পক্ষে অগণিত ‘লাইক’ কিংবা মতামত দেখে বোঝা যায়, এগুলোর পক্ষে কত বিপুল সংখ্যক মানুষ রয়েছেন। একবার একজন স্টাটাস দিলেনঃ

 ‘‘যে সব মেয়ে আঁট-সাট ও আকর্ষণীয় পোশাক পরে বাইরে বেরোয়, তাদের ধর্ষণ করার জন্য পুরুষদের অধিকার দেয়া হোক।’’

কী ভয়ংকর আব্দার ও দুর্বিনীত দাবি! আর তার বন্ধুদের মধ্যে সহস্রজন নিযুতবার এখানে ‘লাইক’ মারছেন; শত শতবার তার এ স্টাটাসটি ‘শেয়ার’ও হচ্ছে। একবার এক স্টাটাস দেখলামঃ

‘‘নারীরা হল, মওসুমি ফলের মতো। এগুলো মওসুমে বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রয় করা যায়। তবে এ সব ফল অক্ষত অবস্থায় বাজারে বিক্রয় করা হয়। যেমন, কলা যতই সুস্বাদু ফল হোক, এটা বিক্রেতা খোসা ছড়িয়ে বাজারে বিক্রয় করতে নিবেন না। কারণ, ‘ছিলা কলার’ বাজার মূল্য নেই।  এ স্টাটাসদাতার মতে, স্বকীয় পরিচয়ের আধুনিক মেয়েরা হল, ‘ছিলা কলার’ মতো। তাই এতে মাছি পড়লেও, কোন ক্রেতা কিনবেন না।’’

 

একটি সাম্প্রতিক স্টাটাসে একজন লিখেছেন,  সকল শিয়ালই মুরগীর স্বাধীনতা চায়। এর কারণ হল, শেয়ালরা মুরগীদের বাড়ির বাইরে এনে ভক্ষণ করতে চায়। নারী স্বাধীনতার ধারক-বাহক-সমর্থকগণও তাই। তারা আসলে কোন মহৎ উদ্দেশ্যে নারীদের স্বাধীন দেখতে চান না। তারা নারীদের স্বাধীন করে বাড়ির বাইরে আনতে চান শুধু তাদের ধর্ষণ করার মানসেই। তাই সম্প্রতি পহেলা বৈশাখের দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে ভীড়ের মধ্যে যে নারীরা শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছেন, তারা স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করা কুক্কুটতুল্য। আর তাদের যারা লাঞ্ছিত করেছেন, তারা সবাই নারী স্বাধীনতার সমর্থক। তারা নারীদের স্বাধীনতায় সমর্থনের প্রতিদানস্বরূপ নারীদের ধর্ষণের অধিকার লাভ করেছেন।

 

ধর্ষণ সংস্কৃতি আমাদের সমাজে বড় বেশি ক্রিয়াশীল। এখানে এক বিরাট সংখ্যক মানুষ ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতাদেরই দায়ি করেন। এখানে নারী নির্যাতনকে নারীদের স্বাধীনতার বিষম ফল হিসেবেই দেখা হয়। এখানে ধর্ষিতা নারী শুধু সতিত্ব ও স্বাস্থ্যই হারান না, সামাজিক সম্মানও হারান। এখানে ধর্ষিতা নারীকে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য সমাজপতিরা বিচার করে সর্বমম্মত রায় দেন। এখানে ধর্ষণের অপরাধীকে তার প্রার্থীত নারীকে দিয়ে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা হয়। এদেশে ধর্ষণের শিকার নারীকে নষ্টা ও কূলটা আখ্যা দিয়ে সমাজচ্যূত করা হয়। আর ধর্ষণকারীকে নায়কের মর্যাদা দেয়া হয়। এদেশে নারীর শরীরে দোররা ওঠে আর ধর্ষক পুরুষকে ‘বাপের বেটা ছাদ্দাম’ বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

 

ধর্ষণ সংস্কৃতির একটি প্রধানতম বহিঃপ্রকাশ হল, আটপৌরে আড্ডায় পুরুষদের নারী নিয়ে আলোচনা। আমাদের সমাজে কয়েকজন সমবয়সী পুরুষ একত্রিত হলেই নারীর শরীর নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন। এখানে পুরুষ সহপাঠীগণ, মেয়ে সহপাঠিনীদের শরীর নিয়ে গল্প করেন, পুরুষ সহকর্মীরা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলটি রেখে তাদের নারী সহকর্মীদের শরীরের ফাইলে ঢুকে পড়েন।  আমাদের দেশের পুরুষরা এখন পুরুষ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন চান। তাদের মতে, নারীরাই তাদের উত্তেজিত করে তাদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। আবার সেই নারীরাই তাদের বিরুদ্ধে যখন তখন মামলা দিচ্ছেন। তাই এ থেকে বাঁচার একটা উপায় থাকা চাই।

বিশেষ বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাদের সমাজ যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সচেতন হয়ে ওঠে তেমনি বিশেষ বিশেষ সময়ে সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল অংশটাও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে অজ্ঞাত বখাটেগণ কর্তৃক অজ্ঞাত নারীদের শ্লীলতাহানীর ঘটনায় আমাদের সমাজ বর্তমানে বেশ সচেতন হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সাথে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল অংশটি। একটি আটপৌরে অপরাধের ঘটনাকে পূঁজি করে তারা আমাদের আবহমান ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালাকে যেমন বন্ধ করতে পায়তারা করছেন, তেমনি আমাদের সামাজিক অগ্রগতির প্রধানতম উপাদান নারী স্বাধীনতাকেও স্তব্ধ করতে চান। তাই  এ বিষয়ে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

পহেলা বৈশাখের ঘটনাগুলো যত ক্ষুদ্রই হোক সেগুলোর সাথে জড়িত বখাটেদের খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। একটি হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচনা করা না গেলে হয়তো জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে তেমন কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার হত্যার ঘটনা ঘটে। কিন্তু পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নারীর শ্লীলতাহানীর মতো ঘটনা ঘটে কদাচিৎ। অথচ কদাচিৎ ঘটা এরূপ ঘটনাই আমাদের গোটা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে টেনে নিতে পারে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন-অগ্রগতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। (১৮ এপ্রিল,২০১৫)