ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

আমি তখন নিউমার্কেটে একটি ফার্স্টফুডের দোকানে। (দুপুর ১২:১১ মি, ২৪ এপ্রিল, ২০১৫)। ১৮ শ বিসিএস(অর্থনীতি) ক্যাডারের এর ব্যাচমেইট নূর আহম্মদের সাথে কফি খেতে ব্যস্ত। হঠাৎ মনে হল আমাদের টেবিলটি যেন নড়ছে। বিষয়টি আগে নূরই টের পেয়েছিল। এরপর তড়িঘড়ি করে আমরা দোকানের বাইরে বের হলাম। আমাদের দোকানটি ছিল নিচ তলা । আমরা ছিলাম ঠিক মাটির উপরে। তারপরও টেবিলটি কাঁপছিল। বাইরে এসেই দেখি, সকল দোকানের কর্মচারী ও গ্রাহকগণ খোলা আকাশের নিচে। ততোক্ষণে অবশ্য কম্পন থেমে গেছে।

এটা আমার জীবনে সর্বাধিক টের পাওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে তৃতীয়। প্রথমটি ছিল ২০০১ কিংবা তার কাছাকাছি সময়ে। রংপুরের বাসায় দিনের বেলা এ ভূমিকম্পের সময় আমার শিশুপুত্র সাত্ত্বিককে কমোডে প্রাকৃতির কর্ম সারার সময় আমি কোলে তুলে দিয়েছিলাম বাইরে দৌড়। দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল ২০১২ সালে। তখন বিকেল বেলা আমি বগুড়ার পুলিশ অফিসার্স মেসে ছিলাম। ভূমিকম্প টের পেয়ে বাইরে এসে দাাঁড়লাম। বুঝতে পারলাম, আমার পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। আমি পড়ে যাই যাই অবস্থা!

স্ত্রীর কাছে ফোন দিলাম। সে হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিল, তারা সবাই বাসা ছেড়ে মাটিতে নেমে পড়েছে। অবাক হলাম, এগার তলা থেকে কিভাবে তারা এত দ্রুত নিচে নেমে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল! বেলা একটার দিকে ফোন দিলাম, এখন ওরা কি করছে। শুনলাম ওরা আবার নিচে নেমে এসেছে। কারণ আবার ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু ভূমিকম্প যদি সত্যিই ভয়াভয় হয়, তবে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার মতো সুযোগ তারা পাবে না। কারণ ১১ তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে ওদের কমপক্ষে তিন মিনিট সময় লাগবে। আর তিন মিনিটের ভূমিকম্পে একটি গোটা শহর সমতলে পরিণত হওয়া সম্ভব।

ভূমিকম্পের মাত্রা নাকি ছিল রিখটার স্কেলে ৭.৫। এ মাত্রার ভূমি কম্প অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে ভূমিকম্পের মাত্রার চেয়েও এর স্থায়ীত্বের উপর এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে। অল্পমাত্রার ভূমিকম্পও যদি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়, তবে তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে মারাত্মক হতে পারে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র নাকি ছিল নেপালে যা বাংলাদেশ থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূতাত্ত্বিক গঠনে বাংলাদেশ ভূমিকম্পন জোনের মধ্যে অবস্থিত। অদূর অতীতে এদেশে ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নেই। তবে অতীতে এমনকি তিনশ বছর পূর্বেও এখানে ভূমিকম্পের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। সে সময় দেশের ভূমিরূপের বিভিন্ন স্থানে বেশি কিছু পরিবর্তন আসে। ধারণা করা হয় ব্রহ্মপুত্রের গতিপথেও এ ভূমিকম্পের কিছুটা ভূমিকা থাকতে পারে।

আমাদের দেশে নগরায়নের হার যাই হোক না কেন নগরায়ণ পরিকল্পিত নয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সকল বড় বড় শহরেই যাচ্ছেতাইভাবে ঘরবাড়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ রেগুলেটরি সংস্থাগুলোর নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতা, অক্ষমতা, অদক্ষতা কিংবা দুর্নীতিকেই দায়ি করেন। বৃহৎ শহর মানেই এখন সুবৃহৎ মৃত্যু ফাঁদ। শহরে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী অট্রালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত বিধিবিধান মেনে চলা হয় না। এক বাসা থেকে আর বাসার মাঝে রাজউক/চউক/কেডিসি অনুমোদিত শূন্যস্থান রাখা তো দূরের কথা এখানে অনেক বৃহৎ স্থাপনাগুরোর মধ্যে একটি বিড়াল যাতায়াতের মতো ফাঁকা স্থানও নেই।

আামর সবচেয়ে ভয় হয়, ঢাকা শহরের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। আমাদের গৃহিনীদের অভ্যাস হল, একটি ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য সার্বক্ষণিক গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা। এতে বাড়তি খরচ নেই। ঢাকা শহরের গ্যাস ও পানির জন্য নির্ধারিত খরচ হল যে যত পারে করুক। মাস শেষে একটা থোক টাকা পেলেই হল। পানির ব্যাপারে তবুও কিছুটা সংযম আছে। কারণ পানি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এক ফ্লাটে পানির বেশি ব্যবহার হলে অন্য ফ্লাটের লোকজন অভিযোগ করেন। নিচ থেকে উপরে পানি ওঠাতে বিদ্যুতের খরচ হয়, এতে বিদ্যুতের বিল বেড়ে যায়। কিন্তু গ্যাসের ব্যবহার যাচ্ছেতাই। তাই সারাক্ষণ গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখতে কারো ব্যক্তিগত ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভূমিকম্পে যখন বাড়িঘর ভেঙ্গে যাবে তখন প্রথম দফাই গোটা ঢাকা শহরে আগুন লেগে যাবে। তখন উদ্ধার কর্মীরা কোন উদ্ধারও করতে পারবে না।

আমাদের সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিস প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর লোকবল, অর্থবল, লজিস্টিক সবই হয় সেকেলে কিংবা একটি বড় শহরে উদ্ধার কাজ চালানোর মতো যথেষ্ঠ নয়। তাই যদি বড় ধরনের কোন ভূমিকম্প হয়, তাহলে সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক উদ্ধার হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই নিতে হবে। আজকের ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় আমার পরিবারের মতো শতশত পরিবার বহুতল অট্রালিকাগুলো থেকে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে খোলা আকাশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল। কিন্তু ভূমি কম্প থেকে বাঁচার জন্য এ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা অন্তত বহুতল ভবনগুলোর জন্য উপযোগী নয়। তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে করণীয় ও বর্জণীয় বিষয়ে ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা তৈরি করা দরকার।