ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ধর্মান্ধতার একটা সার্বজনীন রূপ রয়েছে। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন ধর্মের অন্ধ লোকজন মূলত একই ধরনের; কম বেশি একই মানসিকতার হয়ে থাকেন। এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এরা নিজ নিজ ধর্ম ভিন্ন অন্য কোন ধর্মকে ধর্মই বলে মনে করেন না। অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হল, এরা ধর্মের নামে যাচ্ছেতাই করতে পারে। ধর্মের নামে যেমন অধর্ম করতে পারে, তেমনি ধর্মের নামে গোটা জগৎকে ধ্বংসও করতে পারে। যদিও কোন ধর্মেই নির্দোষ মানুষকে হত্যা বা কষ্ট দেয়ার কোন নিয়ম বা আদেশ নেই, তবুও তারা নির্দোষকে হত্যার জন্য তাদের নিজ নিজ স্রষ্টার আদেশ তুলে ধরেন জগদ্বাসীর কাছে।

আমাদের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা মৌলবাদকে শুধু ইসলামের দিকেই ঠেলে দিতে চান। তারা মৌলবাদী বলতে ধর্মভীরু মুসলমানদেরই চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু মৌলবাদ, ধর্মভীরুতা ও ধর্মান্ধতা এক বস্তু নয়। একজন মানুষ যদি তার ধর্মের আদি মূলনীতিগুলোর উপর আস্থাবান হন, তাকে মৌলবাদী বলে গালি দেবার কোন কারণ নেই। তবে যারা ধর্মের আদি বিধানগুলোকে আধুনিক জগতের সমস্যা সমাধানের জন্য কোন প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই প্রয়োগ করতে চান এবং সেটা করতে গিয়ে অশান্তির জন্ম দেন, তাদের মৌলবাদী নয়, বরং ধর্মান্ধ বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

যে বিষয়গুলো হাজার বছর আগের পৃথিবীতে যেরূপ ছিল, আজকের জমানায় সেগুলো তদ্রুপ থাকার বিষয়টি অকল্পনীয়। কিন্তু ধর্মান্ধরা বলতে চান, ধর্মে আদি আর আধুনিক বলতে কিছু নেই; সবই এক, সবই আদি। পূর্বে যা ছিল তাই আধুনিক, বর্তমানের সবকিছু বেদাত বা দুষনীয় সংযোজন।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে গত শতাব্দীর সেই আশির দশক থেকেই ধর্মান্ধতার হাওয়া লেগেছে। রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ বা আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টির ধর্মান্ধতার আক্রমণ এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা থেকে শুরু করে, হাল আমলের খ্রিস্টানদের হিন্দু বানানোর মতো কর্মে তাদের সমর্থন দেখা যায়। কিন্তু সম্প্রতি নেপালের প্রলঙ্করী ভূমিকম্পের কারণ নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির এমপি সাক্ষী মহারাজ যে মন্তব্য করেছেন তা ভারতের ক্ষমতাসীন দলের ধর্মান্ধতার কথা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

এই ধর্মান্ধ এমপি নেপালে ভূমিকম্পের জন্য কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীকে দায়ি করে দাবি করেছেন যে, ‘গরুর গোশত খেয়ে নিজেকে শুদ্ধ না করেই পবিত্র কেদারনাথ মন্দির ভ্রমণ করার জন্য নেপালে ভূমিকম্প হয়েছে!’ খবরে প্রকাশ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গত সপ্তাহে নেপালের কেদারনাথ মন্দির দর্শনে গিয়েছিলেন। রাহুল গান্ধী মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে মন্দিরের ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটান। সেখানে পুজো দেয়ার পর তিনি মন্দিরের আশপাশে ঘুরে দেখেন এবং মাটিতে শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামও করেন।

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভূমি কম্প কেন হয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এসব কারণ বৈজ্ঞানিক যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। তবে খোদার গজব বলে একটি প্রবচন প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এই গজবের জন্য কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায় দায়িও তাও বলার উপায় নেই। কিন্তু এ গজবের জন্য বিজেপি এমপি রাহুলের গরুর মাংস খাওয়াকেই দায়ি করেছেন। গরুর মাংস খেয়েছেন কংরেস নেতা রাহুলগান্ধী, আর তার পাপের প্রায়শ্চিত্য করছেন নেপালের জনগণ। কি চমৎকার যুক্তি! বলা বাহুল্য,ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভোটারগণ এমনিই ধর্মান্ধদের সংসদে পাঠাচ্ছেন। এরা অদূর ভবিষ্যতে যদি ভারতে হিন্দু ভিন্ন অন্যধর্মের অনুশীলন নিষিদ্ধ করে লোকসভায় বিল নিয়ে আসেন, তবে তা পাশ হলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

সূত্র:
আমাদের সময়, 29/04/2015
http://timesofindia.indiatimes.com/india/Rs-50-lakh-to-bring-back-home-converted-Hindus/articleshow/43110371.cms