ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অপব্যবার বলতে সাধারণত কোন প্রকার ব্যক্তিগত বা আর্থিক লাভালাভ ছাড়াই কোন পুলিশ অফিসার কর্তৃক কোন নাগরিকের শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ক্ষতি কিংবা আইনগত অধিকার হরণকে বোঝায়। যখন কোন পুলিশ অফিসার তার ব্যক্তিগত লাভের জন্য তার আইনসিদ্ধ ক্ষমতাকে ব্যবহার করে, সেটাকে আমরা দুর্নীতি বলে অবিহিত করি। কিন্তু যখন তার কর্তৃত্ব ব্যবহারে ব্যক্তিগত লাভ হয়না, অথচ কোন ব্যক্তির ক্ষতি সাধিত হয়, তখনই সেটাকে আইনগত কর্তৃত্বের অপব্যবহার বলা হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি ঘটনা ঘটতে পারেঃ-

১. পুলিশ অফিসার প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে কোন ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে তার ক্ষতি করতে পারে

২. পুলিশ অফিসার কোন নাগরিককে মৌখিক বা মানসিকভাবে আক্রমণ, হয়রানি কিংবা তাকে উপহাস করে মানসিকভাবে কষ্ট দিতে পারে, এবং

৩. আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে কোন পুলিশ অফিসার কোন নাগরিককে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে কিংবা কোন মামলায় অহেতুক জড়িয়ে তাকে হয়রানি করতে পারে।

পুলিশের কর্তৃত্বের অপব্যবহার যতটা না কোন পুলিশ বিভাগের অফিসারদের ব্যক্তিগত বিষয় তার চেয়েও বেশি সামষ্টিক বা বিভাগীয় বিষয়। এটা সাধারণত কোন পুলিশ বিভাগের কর্মচারীদের উপ-সংস্কৃতির মধ্যে ক্রমান্বয়ে এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে যে বাইরে থেকে শত চেষ্টাতেও এ ক্ষমতার বা কর্তৃত্বের অপব্যবহার থেকে অফিসারদের ফিরিয়ে আনা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় নীতি পুলিশের কর্তৃত্বের অপব্যবহারে উৎসাহিত করে। যেমন, যে পুলিশ বিভাগের দক্ষতা মূল্যায়নের প্রধানতম মাপকাঠী হয়, উদ্ধার, গ্রেফতার, মামলাদান ইত্যাদি। সেই বিভাগের অফিসারগণ নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের জন্য বেশি বেশি করে গ্রেফতার, উদ্ধার কিংবা মামলা বাড়ানোর তালে ব্যস্ত থাকবে। দিন শেষে গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অফিসারগণ সামান্য অপরাধের অভিযোগে নিরীহ মানুষকেও গ্রেফতার করবে। কোন মামলায় প্রয়োজনীয় না হওয়া সত্বেও এজাহারভূক্ত বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের পাইকারী হারে গ্রেফতার করবে।

কোন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অফিসারদের দক্ষতা মূল্যায়নের মাপকাঠি যদি দিন শেষে কতটি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করা হল, কিংবা কতটি গাড়িকে রেকার দিয়ে টেনে ডাম্পিং প্লেসে নিয়ে যাওয়া হল তার উপর নির্ভর করে, তবে সেই বিভাগের অফিসারগণ তাদের দক্ষতা প্রমাণের জন্য যাচ্ছেতাই অভিযোগে গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিবেন কিংবা গাড়িতে রেকার লাগাবেন।

কোন পুলিশ বিভাগ তার অফিসারদের উগ্র ধরনের পুলিশিং করতে উৎসাহিত করলে, সেই পুলিশ বিভাগের অফিসারগণ জনগণের সাথে কখনই নম্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে না। এটা একটি গোটা সাংগঠনিক বিষয়। এক্ষেত্রে আমরা ১৯৮০ এর দশকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের লজ এন্জেলস পুলিশ বিভাগের পুলিশিং ধরনকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি।

১৯৭৮ সালে লজ এনজেলস পুলিশের কমিশনার নিযুক্ত হন মি. ডেরিল এফ. গেইট। তিনি লজ এনজেলস পুলিশে অত্যন্ত উগ্র অফিসার বলে ইতোমধ্যেই দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন। তিনি লজ এনসেলস পুলিশকে মানবিক হওয়ার চেয়ে যান্ত্রিক হওয়ার উপরই বেশি জোর দিতেন। তিনি পুলিশের সাধারণ অস্ত্রের অতিরিক্ত সামরিক অস্ত্রেও সজ্জিত করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, উগ্রতাপূর্ণ পুলিশিং স্টাইলই পুলিশের সাফল্যের মাপকাঠী। তার বিভাগীয় নীতির অনুসারী পুলিশ অফিসারদের তিনি এমনভাবে মূল্যায়ন করতেন যে পুলিশ অফিসার যত বেশি আগ্রাসী আচরণ করত, তিনি ততো বেশি ভাল অফিসার হিসেবে চিহ্নিত হতেন ও প্রকারান্তরে পুরস্কৃত হতেন।

১৯৮২ সালের দিকে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রেল লজ এনজেলস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার কমিশনার ডেরিল এফ. গেইটস এর নেতৃত্বে অভিযুক্তদের গলাটিপে ধরার মতো কৌশলে গ্রেফতার অবলম্বন করে। এ সময় মানুষের দম বন্ধ হয়ে প্রায় ১৬ জন মানুষ মারা যায় যাদের অধিকাংশই ছিল কালো চামড়ার। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে পুলিশ প্রধান মন্তব্য করেছিলেন, কৃঞ্চাঙ্গদের শিরা-ধমনীগুলো সাধারণ আমেরিকানদের মতো নয়। এগুলো সহজে খোলে না বলেই গ্রেফতারের সময় কৃঞ্চাঙ্গরা বেশি করে মারা যায়। বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে পুলিশ কমিশনার মত প্রকাশ করতেন যে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের প্রকাশ্য গুলি করে মারা দরকার। পুলিশ কমিশনারের এহেন নীতির ফলে ১৯৯১ সালে রুডনি কিং এর মতো ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় লজ এনজেলস পুলিশের কয়েকজন অফিসার রুডনি কিং নামে একজন কৃঞ্চাঙ্গ যুবককে নির্দয়ভাবে প্রহার করে যার দৃশ্য একজন নাগরিক গোপনে ভিডিওতে ধারণ করে প্রচার মাধ্যমে ছেড়ে দেন। এর ফলে সারা বিশ্বে তোলপাড় ওঠে। পরবর্তীতে পুলিশ অফিসারগণ রাষ্ট্রীয় বিচারে বেকসুর ছাড়া পেলে লজ এনজেলস শহরে ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ অফিসারদের বৈধ কর্তৃত্বের অপব্যবহার যদিও একটি বিভাগীয় উপ-সংস্কৃতির ফসল, তবুও ব্যক্তি অফিসারের নিজস্ব স্টাইলের উপর এর বাহ্যিক প্রকাশ অনেকাংশে নির্ভর করে। এমতাবস্থায়, এ অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে বিভাগীয় নীতিকে মানবিকতার মানদণ্ডে ঢেলে সাজাতে হবে। একই সাথে ব্যক্তি অফিসারদের আচরণ পর্যবেক্ষণ, পরীবিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ঠ বিভাগীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য যেমন ঘটনা উত্তর অনুসন্ধান, তদন্ত ও প্রসিকিউশান ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে তেমনি ঘটনাপূর্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে।

 

(৩০ এপ্রিল, ২০১৫)