ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বাংলা থেকে ইংরেজিকে বিদায় করে দেয়ার একটি প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাংলাকে বিকৃত করার একটি স্পষ্ট প্রচেষ্টাও ইদানীং লক্ষ করা যায়। যেখানে যতটুকু ইংরেজি আছে, ইংরেজিকে মুছে ফেলার সেখানে ততোটুকু প্রচেষ্টাও চালাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু এ বৈশ্বিক রঙ্গমঞ্চে সঠিকভাবে অভিনয় করতে হলে ও সেই অভিনয়কে অন্যদের কাছে বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করতে হলে আমাদের ইংরেজিকে বিসর্জন দিলে যে চলবে না তা যে কোন সাধারণ বুদ্ধিমত্তার আদমও বুঝতে পারে।

আমাদের অফিস আদালতের ভাষা অবশ্যই বাংলা। কিন্তু বাংলা, বাংলা করে ইংরেজির বারটা বাজান সঠিক হবে বলে মনে করি না। কারণ ইংরেজি ভাষা জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকর। ইংরেজি বিশ্বভাষা হিসেবে নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি পেয়েছে সেটা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা। এক বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এসে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকা উচিৎ নয়। আমাদের পৃথিবী ইতোমধ্যেই একটি বৃহত্তম গ্রামে পরিণত হয়েছে। তাই এ গ্রামের জন্য একটি সাধারণ ভাষা থাকা দরকার। আমাকে জেনে হোক, না জেনে হোক; বুঝে হোক, না বুঝে হোক এ বৈশ্বিক গ্রামে প্রবেশ করতেই হচ্ছে। আর এ গ্রামে আমাকে বসবাস করতে হলে অন্যের পণ্য যতটুকু কিনব তার চেয়েও বেশি বড় বিষয় হল, আমার পণ্য অন্যদের কাছে কিভাবে বিকাব। তাই নিজেদের সব কিছু অন্যদের কাছে তুলে ধরার জন্য আমাদের অবশ্যই ইংরেজির প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার জন্য যে বিরাট সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, সেটা কিন্তু ইংরেজির মাধ্যমে। তার গীতাঞ্জলির অনুবাদ বস্তুত তিনি নিজেই করেছিলেন।অন্য একজন তার কবিতাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করার পর কবি তা পড়ে দেখে বুঝতে পারলেন, এতে তার কবিতার মূলভাবের অনেক কিছুই পরিবর্তিত কিংবা স্থূল অবয়ব ধারণ করেছে। তাই তিনি সে অনুবাদকের অনুবাদ বাদ দিয়ে সেগুলোর নিজেই অনুবাদ করেন। এমন হতে পারত যে রবীন্দ্রনাথের নিজ অনুবাদ না হলে নোবেল কমিটি এগুলোকে পুরস্কারের যোগ্যই মনে করতেন না। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষাটা ভালভাবে না জানলে এটা সম্ভব হত কি?

তবে হ্যাঁ, ইংরেজির নাম বাংরেজিটাকে প্রশ্রয় দেয়া যায় না। এটা খোদ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথও দেনিনি। একবার এক বাঙালি ছেলে রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করার সময় ইংরেজি বলা শুরু করলে কবি বললেন, ‘বাঙালি ছেলে বাংলা রেখে ইংরেজি বলছ কেন?’ ঐ বালক গর্ব ভরে গদগদ হয়ে উত্তর দিল, ‘ইংরেজি শিখতে গিয়ে বাংলাটা ভুলে গেছি।’ রসিক কবি নববাবু অজ্ঞ বাঙালি বালকের প্রতি বিজ্ঞ মন্তব্য করলেন, ‘বাংলাটা ভুলে গেছ তাতে কোন দুঃখ নেই। কিন্তু দুঃখ হল, তুমি বৎস, ইংরেজিটাও ভাল করে শিখতে পারনি।’

শখ করে বাংলা ভুলে ইংরেজি নিয়ে বাড়াবাড়ি করার একটা প্রবণতা আমরা কতিপয় শহুরে শিক্ষিত বালক-বালিকার ভিতর লক্ষ করি। তারা একটা বিশেষ বিকৃত উচ্চারণে যেমন ইংরেজি বলে, তেমনি বাংলার মধ্যে যাচ্ছেতাই ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের মুখের ভাষাটাকে একটা জগাখিচুড়ি কিছু বানিয়ে ফেলে।

একবার লিফট বেয়ে ওঠার সময় প্রতিবেশি এক কিশোরীকে তার বান্ধবীর সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে শুনলাম। এ কিশোরী ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রী। আমাকে দেখে ওরা আরো বেশি বেশি করে ইংরেজি বলা শুরু করল। ওদের ভাবখানা এই যে, ‘এ আদাম তো আর ইংরেজি জানে না; বোঝেও না। এর সামনে যাচ্ছেতাই বলা যায়।’ এক সময় প্রতিবেশি কিশোরীর বান্ধবি তার কথার মধ্যে ‘ফাক’ শব্দটি উচ্চারণ করল এভাবে, ‘শি’জ গনা ফাক মি’। প্রতিবেশি কিশোরী তার বান্ধবিকে হাত টিপ দিয়ে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। কারণ প্রতিবেশি মেয়েটি জানত আমি কে; কিন্তু তার বান্ধবিটি হয়তো মনে করেছিল, আমি নিতান্তই ইংরেজি-জ্ঞানশূন্য কেউ।

ইদানীং বেসরকারি টেলিভিশন ও এফএম রেডিওগুলোতে জগাখিচুড়ি ইংরেজির একটা মহামারি লেগেছে। অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থাপক বালক-বালিকাগুলোও এ ধরনের মেকি আচরণ করে। অনেক দর্শক শ্রোতাও আবার তাদের চেয়েও বেশি করে কষ্টকর কসরতে ইংরেজি-বাংলায় তাদের মতামত প্রকাশ করে। জানিনা, অন্যদের মনে কি ধারণা হয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এরূপ ভাষা-অজ্ঞদের মুখে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলি, ‘বাপধন, পারলে ইংরেজি বল, নইলে তোমার মায়ের ভাষাটা ভাল করে বল। বাংরেজি দিয়ে তুমি নিজেকে একটি আজব চিজে পরিণত কর না। তুমি যে ইংরেজি ও বাংলা দু ভাষাতেই অর্ধশিক্ষিত এটা আমরা বুঝি।’

একবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আড্ডায় বসে স্বনামধন্য সাহিত্যিক মরহুম হুমায়ূন আজাদ স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘স্যার, মানুষ এভাবে বাংলা বলতে ইংরেজি শব্দের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘বাবারে, যাদের সংগ্রহে ভাষার শব্দ সম্ভার কম, তারা কথা বলার সময় যথাশব্দটি খুঁজে পায় না। তাই ভিন্ন ভাষা থেকে দু একটি শব্দ এনে বাক্যের মধ্যে শব্দের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে। তবে আসল সত্য হল, যাদের ভাণ্ডারে বাংলার দৈন্য আছে, তাদের ভাণ্ডারে ইংরেজির প্রাচুর্য থাকাটাও অস্বাভাবিক। তাই এ জগাখিচুড়ির আবির্ভাব।’

তবে বাংলা বলতে যে নিখাঁদ বাংলাই হবে, এমনটি অবশ্য নয়। কারণ একটি আধুনিক ভাষা কোন কালেই নিজের আদি বা বিশুদ্ধ রূপটি ধরে রাখতে পারেনা। টিকে থাকার খাতিরেই তাকে ভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ, শব্দমালা কিংবা ধারণা ধার করতে হয়। যে ইংরেজিকে আমরা এত সম্মৃদ্ধ, এত সার্বজনীন বলছি এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বদেশি ভাষার চেয়ে উপরে স্থান দিচ্ছি, সে ইংরেজিও কিন্তু বিশুদ্ধ ও আদি ভাষা নয়। অ্যাংলো-স্যাকসনদেন আদি ভাষা নরম্যান বিজয়ের পর দ্রুত বিকৃত হয়। রোমান বিজয়ের পর তারা ল্যাটিন ভাষার সাথে পরিচিত হয়। অন্যদিকে একাদশ শতাব্দীতে ফরাসি দখলে ইংরেজদের নিজ ভাষার বিশুদ্ধতা খুঁজে পাওয়াই ভার। এই যে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব থেকে ইংরেজদের মূলভূখণ্ডে বিদেশি আক্রমণ- এ সবই ইংরেজি ভাষাকে নিঃস্ব নয়, বরং সম্মৃদ্ধ করেছিল। আদি কালের চেয়ে আধুনিককালেই ইংরেজি ভাষায় বিদেশি শব্দ ঢুকে পড়ছে বেশি করে। সারা পৃথিবী থেকেই এখানে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত খৈ, লাঠি, ঘেরাও, পায়জামা, গুরু, পণ্ডিত,মন্ত্র সবই ঐ ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। আর যেহেতু বাংলাও একটি গতিশীল ও আধুনিক ভাষা, তাই বাংলাও অন্যান্য ভাষা থেকে অনায়াসেই নতুন নতুন শব্দ আত্তিকরণ করেছে। এ ভাষা থেকে এখন ‘আনারসকে’ পর্তুগালে কিংবা ‘চা’ কে চায়নায় রপ্তানি করার প্রচেষ্টা ফলপ্রুসূ হবে না।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে নিজ ভাষার উন্নতির জন্য অন্য ভাষার পঠন-পাঠন ও চর্চা আমাদের অব্যহত রাখতে হবে। ইংরেজি এখন বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন ভাষা। তাই এর চর্চা অবশ্যই আমাদের করতে হবে। একই সাথে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভাষায় সবকিছু বোঝার ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষার অধিকারটুকু দিতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষার মাধ্যম অবশ্যই বাংলা বা মাতৃভাষায় হবে। তবে উচ্চতর শিক্ষায় ইংরেজিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানার্জন করতে হলে আমাদের বিশ্বভাষা ইংরেজিকে নির্বাসন দিলে চলবে না। বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। কেননা, গবেষণা জ্ঞান সৃষ্টি করে। আমাদের নিজস্ব সৃষ্ট জ্ঞানকে বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য অবশ্যই বিশ্বজনীন ভাষা ইংরেজিকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে হবে।