ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যদিও পুলিশিং এর ধরন গত কয়েক বছরে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও আমাদের জনগণ ও পুলিশ অফিসারদের মন থেকে এখনও  সেই সনাতনী ধারণার অবসান ঘটেনি। কোন এক সময় পুলিশিং বলতে রাস্তার পুলিশিংকেই বোঝান হত। রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অপরাধী বা সন্দিগ্ধদের গ্রেফতার, তদন্ত, জনতা নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা, ভিভিআইপির সফরে নিরাপত্তাদান ইত্যাদিই কোন এক সময় পুলিশিং বলে মনে করা হত। তখন মনে করা হত, পুলিশিং মানেই রাস্তায় গিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন কিংবা ঐ জাতীয় কোন কাজে ব্যস্ত থাকা।

 

কিন্তু কালের প্রবাহে সেই দিন আর নেই। পাশ্চাত্য জগতে পুলিশিং বলতে এখন আর মারামারি, কাটাকাটি কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পিছনে ঝুঁকিপূর্ণ সহিংস ধাওয়ার কাজকেই শুধু বোঝায় না। এখানে পুলিশিং বলতে মানুষকে কতিপয় জরুরি ও পুলিশ ছাড়া চলে না এমন ধরনের বিকল্পহীন সেবাপ্রদানকেই বোঝায়। ঐসব দেশে পুলিশিং এখন আর এক তরফা সরকারি কর্মকা- নয়, এটা এখন পুলিশ ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্বের অপরাধ প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবসা। এই যৌথ অংশীদারিত্বমূলক পুলিশিং এর নাম দেয়া হয়েছে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’।

 

আমাদের দেশের পুলিশিং কোন এক সময় সম্পূর্ণ জেলা নির্ভর ছিল। জেলার এসপি ছাড়া অন্যকোন ঊর্ধ্বতন অফিস ও অফিসার জনগণের কাছে ছিল অপরিচিত। কিন্তু বর্তমানে পুলিশিং শুধু জেলা বা তার অধীন থানার কাজ নয়। পুলিশিং এখন নানা মাত্রা নিয়ে, নানা দিকে, নানা সংগঠনের মধ্যে বিভক্ত হয়েছে। থানা পুলিশ ছাড়াও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং অতি সম্প্রতি পুলিশ বুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর মধ্যেও বিভাজিত হয়েছে। অর্থাৎ যে সেবাটি পূর্বে থানা/জেলার বাইরে পাওয়া যেতনা, সে সেবাটি এখন অন্যদের কাছ থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। তবে এটা এখনও অনস্বীকার্য যে বিশেষায়িত এসব সংস্থার বাইরে থানা/জেলা পুলিশ এখনও পুলিশিং এর মূল ধারাটি বহন করছে। কেননা, প্রায় দুই/তিনশত বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান থানা এবং তাকে ঘিরে যে পুলিশিং পদ্ধতি গড়ে উঠেছে তাকে ম্লান করার মতো অন্যকোন প্রতিষ্ঠান সত্যিই তৈরি করা দুরুহ।

 

পুলিশ সংগঠন পূর্বে ছিল অতি ক্ষুদ্র। মাত্র চৌত্রিশ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশের পুলিশিং শুরু করেছিল। স্বাধীনতার পরেও অনেক দিন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি কক্ষেই সম্পন্ন হত। কিন্তু সংগঠনের ব্যপ্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া এবং অতি সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনকে একটি শক্তিশালী কাঠামোতে দাঁড় করানোর সরকারি প্রচেষ্টায় পুলিশের জনবল দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ পুলিশের জনবল ২০ হাজারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।  এখন বাংলাদেশ পুলিশের জনবল প্রায় এক লাখ চৌয়ান্ন হাজার। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী পাঁচ বছরে এ জনবল প্রায় দুই লাখে পৌঁছাবে।

 

এ বিপুল সংখ্যক সদস্যের একটি সংগঠনের অপারেশনাল কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে এর প্রশাসনিক কার্যক্রমও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আমরা বর্তমানে ফিল্ডে, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে বা মেট্রোপলিটন পুলিশ পর্যায়ে যত জনবল, বিশেষ করে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখতে পাই, তার চেয়ে অনেক বেশি সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বিশেষায়িত ইউনিট ও প্রশাসনিক ইউনিটগুলোতে কর্মরত রয়েছে।

 

কোন সংগঠন একটি সুবৃহৎ মেশিনের মতো যার একদিকে রয়েছে ইনপুট দেয়ার ব্যবস্থা, অন্যদিকে রয়েছে আউটপুট বা ফলফল পাওয়ার প্রত্যাশা। ইনপুট ও আউটপুটের মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে হাজার হাজার কলকব্জা যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান হয় না। বাইরে থেকে আমরা মেশিনের বহিরাবরণটুকুই দেখি। আর সবচেয়ে চোখে পড়ে আমাদের আউটপুটটুকু। আউটপুটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা মেশিনের ভিতরের কলকব্জাই শুধু নয়, ইনপুটের বিষয়টিও ভুলে যাই।

 

পুলিশ সংগঠনটির ক্ষেত্রেও জনগণের ধারণা এমনি হয়েছে। জনগণ মনে করেন, মাঠের পুলিশিং ছাড়া মনে হয় পুলিশের আর কোন কাজ নেই। আর যদি থেকেও থাকে তা ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু একটি মেশিনের ভিতরের সামান্য মূল্যের একটি পার্টস নষ্ট হয়ে গেলে কিংবা এর অভাব হলে যেমন পুরো মেশিনটি অকেজো হয়ে যায়, তেমনি পুলিশ সংগঠনের ভিতরের পোস্টিংগুলোতে অফিসার বা জনবলের স্বল্পতা হলেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

 

এ বিষয়টি  অদূর অতীতেও গুরুত্ব পেত না। কিন্তু বর্তমানে এটা আর উপেক্ষণীয় নয়। আমাদের জনগণকে বিষয়টি যেমন বুঝতে হবে, তেমনি বুঝতে হবে পুলিশ অফিসারদেরও। প্রশাসনিক পদগুলোতে কাজ করার অর্থই হল, গোটা পুলিশকে সচল রাখার জন্য কাজ করে যাওয়া। পুলিশের অপারেশনের পিছনের অপারেশনটুকু চালিয়ে রাখতে না পারলে সামনের অপারেশন দ্রুতই বন্ধ হয়ে যাবে। নীতি নির্ধারণ, কৌশল নির্ধারণ, রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং দেশি-বিদেশি অংশীদারদের সাথে ঊচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এখন অপারেশনাল ইউনিটগুলোর চেয়ে প্রশাসনিক পুলিশ ইউনিটগুলোর কর্মক্ষমতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আর সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে এসব ইউনিটে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেধাবী অফিসারদের পদায়ন করা। কেননা উচ্চ পর্যায়ের কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার উপর মাঠ পর্যায়ের পুলিশিং এর শক্তির বহুলাংশেই নির্ভর করে। তাই সকল স্তরের পুলিশ সদস্যদের প্রশাসনিক ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোতে কাজ করার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।( ৭ মে, ২০১৫)