ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

১.অবতারণিকা

রবীন্দ্রনাথকে বাঙালি থেকে পৃথক করলে বাঙালিরা সমান দুভাগে ভাগ হবেন যার একদিকে রবীন্দ্রনাথ, অন্যদিকে রবীন্দ্রহারা গোটা বাঙালি জাতি। বস্তুত আধুনিক বাংলা সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, তা দুজন সাহিত্য-পুরুষের যৌথ প্রযোজনায় একটি বিশাল অবয়বের মঞ্চ নাটক। এ প্রযোজকদ্বয় হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজি নজরুল ইসলাম। বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যকলায় রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল ছাড়া আমরা কিছু ভাবতেই পারি না। আমাদের কোন সাংস্কৃতির অনুষ্ঠান শুরু হয়না, শেষেও হয়না রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল ছাড়া। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা, আদেশ-উপদেশ, গল্প-খোসগল্প, আনন্দ-বেদনা, উচ্ছ্বাস-উদ্যম, প্রেম-ভালবাসা সব কিছুই যেন এ দুজন সাহিত্য, সঙ্গীত আর সুরস্রষ্টার ছায়াতলে স্থিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চক্রান্ত কম হয়নি। রবীন্দ্রবিরোধী একটি গোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশা থেকেই তৎপর ছিল। এরা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানা ধরনের বিরূপ সমালোচনা ও চরিত্র হননের প্রচেষ্টায় লিপ্ত। আমার এ নিবন্ধে আমি এ জাতীয় কিছু সমালোচনার আমার মতো করে উত্তর দিব।

২. রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পাক-ষড়যন্ত্রঃ

আমাদের জাত-শত্রুরা জানতেন, বাঙালিদের জাতীয় অস্তিত্ব কতটা রবীন্দ্র নির্ভর। তাই তারা আমাদের রবীন্দ্রনাথ থেকে পৃথক করে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আমাদের ভাষার প্রতি নগ্ন হামলার ফলে আমরা যখন আরো বেশি ভাষা প্রেমি হয়ে উঠলাম, আমরা যখন নিজেদের আরো বেশি করে আবিষ্কার করা শুরু করলাম, প্রতিক্রিয়াশীল পাক সরকার তখন আমাদের কাছে ভাষার প্রশ্নে পরাস্থ হয়েও সংস্কৃতির গোড়া কেটে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা আঘাত করে রবীন্দ্র সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের কাছে উপস্থাপনের এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা শুরু করে তারা। প্রচার মাধ্যম থেকে রবীন্দ্রনাথকে তারা নির্বাসিত করে। রেডিও, টেলিভিশনে তারা রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো বাঙালির হৃদয়ে, বাঙালির অস্তিত্বের কেউ। বাঙালির এ অস্তিত্ব পাক-জান্তাগণ নিয়ন্ত্রিত কোন প্রচার মাধ্যমের মধ্যে সীমিত নয়। তাই পাক শাসনের দ্বিতীয় দশকেই রবীন্দ্রনাথ ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। কারণ এ যে সাহিত্যের আবেদন, এ যে সংস্কৃতির আবেদন, এ যে আমাদের চেতনার আবেদন, তাই ‘এ আগুন ছড়িয়ে পড়ল সবখানে’ ।

৩. স্বাধীন বাংলায় রবীন্দ্র বিদ্বেষ

পাক আমলে তো বটেই, এমন কি স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়াশীলগণ রবীন্দ্রনাথকে আমাদের চেতনা থেকে সরানোর কম প্রচেষ্টা করেননি। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবেগের অনুগামী, তাই সরকারি যন্ত্র প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধী অবস্থান নিতে সাহস পায়নি। কিন্তু এক শ্রেণির প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িক বানাবার জন্য উঠে পড়ে লাগে।

সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রথম সূত্রই হল, রবীন্দ্রনাথকে নজরুলের সাথে তুলনা করে নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় করে প্রচার করা এবং নজরুলের সাথে রবীন্দ্রনাথের একটি কাল্পনিক শত্রুতার সম্পর্ক আবিষ্কার করে তা আরো বেশি নেতিবাচক করে প্রচার করে ধর্মপ্রাণ বাঙালিদের স্বচ্ছ মনকে অস্বচ্ছ বানান।  প্রথমেই তারা বলার চেষ্টা করেন যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হিন্দু। তিনি তার সাহিত্যে হিন্দুত্ববাদের প্রচার করেছেন এবং ইসলাম ধর্মকে উপেক্ষা করেছেন। এরা অবশ্য সোজা করে বলার সাহস পায়নি যে রবীন্দ্রনাথ ইসলাম বিদ্বেষী ছিলেন। কারণ রবীন্দ্রনাথের এমন কোন লেখা বা বাণীকে তারা বিশ্ববাসীর কাছে হাজির করতে পারেননি যেখানে রবীন্দ্রনাথ ইসলামকে সামান্যতমও খোঁচা দিয়েছেন।

তাই তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ তার কোন লেখনিতে মুসলামানকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আনেননি। যে দুএকটা চরিত্র তার ছোটগল্পে পাই তাও আবার নিম্ন মানের চরিত্রে। রবীন্দ্রনাথের লেখনিতে ব্যবহৃত শব্দগুলোতে ইসলামি বা আরবি, ফারসি শব্দ নেই। অপরপক্ষে নজরুলের লেখায় হিন্দু মিথের ছড়াছড়ি। নজরুল শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন, কির্তন লিখেছেন, তার গল্প-উপন্যাসে হিন্দুরা কেন্দ্রীয় চরিত্রে এসেছে।

কিন্তু এসব  সাম্প্রদায়িক তর্কজীবীগণ বুঝতে চাননা যে কোন লেখক তার নিজস্ব পরিবার, কর্মক্ষেত্র, মিথস্ক্রিয়া ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে তার সাহিত্যের ভাষা ও চরিত্র গ্রহণ করেন। নজরুল যেমন ইসলামি পরিমণ্ডলের বাইরেও হিন্দু পরিমণ্ডলে বিচরণ করেছেন, তার মিথস্ক্রিয়া যেমন ছিল মুটে মজুরদের কর্মক্ষেত্র থেকে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সেরূপটি ঘটেনি। তাই ভাষা ব্যবহার ও চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে নজরুলের যে বৈপ্লবিক বহির্মুখিতা দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়না। কিন্তু তাই বলে রবীন্দ্রনাথ যে কোন ধর্মকে বড় করে দেখে অন্য কোন ধর্মকে খাট করে দেখে তার সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, এমন কোন প্রমাণ তো নেই।

৪. নোবেল বিতর্ক

এক সময় একাধারে একটি হাস্যকর ও ভয়ংকর অভিযোগ শুনতাম রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে। ছোটকালে তো বটেই, এমনকি ১৯৮০ ও ৯০ এর দশকেও শুনতাম, রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুলের চেয়ে নিতান্তই ছোট কবি। গীতাঞ্জলি কাব্যখানা নাকি আদতে নজরুলের লেখা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নজরুলের পাণ্ডুলিপিখানা চুরি করে নোবেল কমিটির কাছে জমা দিয়েছেন। নোবেল কমিটি তাই ভুল করে নজরুলের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথকেই নোবেল পুরস্কারখানা প্রদান করেছিলেন। অধিকন্তু মুসলমান হওয়ায় নজরুলকে খ্রিস্টান-ইহুদি নিয়ন্ত্রিত নোবেল কমিটি পুরস্কার দিতে চাননি।

কী বালখিল্যপূর্ণ তথ্য ও যুক্তিরে বাবা! রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৯৬১ সালে। নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে। রবীন্দ্রনাথ  ১৯১৩ সালে যখন নোবেল পুরস্কার পান, আমাদের বিদ্রোহী কবি নজরুল তখন সবেমাত্র ১৪ বছরের বালক। তিনি তখন আসানসোলে দিনের বেলা কোন রুটির দোকানে কাজ করে রাতের বেলা পুলিশের দারোগা রফিক উদ্দিনের বাসার সিঁড়ির নিচে ঘুমান। বলাবাহুল্য, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে নজরুলের কবি বলে কোন পরিচয় ছিলনা। নজরুল বাংলার সাহিত্যাঙ্গণে প্রবেশ শুরু করেন সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন, আগে নয়।

৫. প্রমীলার সাথে ঠাকুর পরিবারের সম্পর্ক

আর একটি বড় অভিযোগ হল, নজরুলের হিন্দু স্ত্রী গ্রহণ করা। সাম্প্রদায়িকগণ বলেন, নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী রবীন্দ্রনাথের ভাসতি বা নাতনি। নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথকে প্রতিভায় ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন রবীন্দ্রনাথ সুকৌশলে তার নাতনিকে দিয়ে নজরুলকে ফাঁদে ফেলেন এবং তাকে বিয়ে দিয়ে নানা কৌশলে কাব্যচর্চা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তা স্ত্রী (রবীন্দ্রনাথের নাতনি)কে দিয়ে ধুতরা জাতীয় কোন বিষ খাইয়ে তাকে বিকৃতমস্তিষ্ক বানিয়ে দেন। তিনি অকালে কাব্যচর্চার ক্ষমতা হারান। তাই রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকবির খেতাবটি অক্ষুণ্ন  থাকে।

কতবড় আনপড়, মূর্খ ও রবীন্দ্রবিদ্বেষী ও সম্প্রদায়িক হলে মানুষ একজন কবির পক্ষে এবং অন্য একজন কবির বিপক্ষে এতবড়  ডাহা মিথ্যা তথ্য দিয়ে এতবড় একটা আষাঢ়ে গল্পের অবতারণা করতে পারে! রবীন্দ্রনাথের জমিদার পরিবারের কোন মেয়ে কোন মুসলমান স্বামী গ্রহণ করেছিলেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ নেই। অন্যদিকে ঠাকুর পরিবারের সাথে নজরুলের যে সখ্য গড়ে উঠেছিল তা রবীন্দ্রনাথের মহানুভবতার জন্যই। একজন উদীয়মান কবি হিসেবে নজরুল ছিলেন যেমন রবীন্দ্র ভক্ত, তেমনি রবীন্দ্রনাথও ছিলেন নজরুলের নিষ্ঠাবান পৃষ্ঠপোষক ও প্রেরণাদাতা। ঠাকুর বাড়িতে নজরুলের ছিল অবাধ যাতায়াত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলের সম্পর্ক যাই থাকুক নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবীর পরিবারের সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সামান্যতম সম্পর্কও ছিলনা। এমনকি প্রমীলার পরিবারকে রবীন্দ্র পরিবারের কেউ চিনত বলেও ইতিহাসে প্রমাণ নেই।

৬. রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক

রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের সামান্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ জানতেন, তিনি একটি পরাধীন দেশের নাগরিক। তার দেশ থেকে বিদেশিদের তাড়ান দরকার। কিন্তু তার লেখনি ক্ষমতা এতটাই নৈর্ব্যক্তিক ও স্বর্গীয় ভাবাদর্শে পরিপূর্ণ যে তা দিয়ে মানুষের মনের হতাশা দূর করা যায়, মানুষকে অসাম্প্রদায়িক বিশ্বনাগরিক হওয়ার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা যায়, কিন্তু একটি পরাধীন দেশের আপামর জনগণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে কোন বিপ্লব শুরু করার জন্য তা নিতান্তই অপ্রতুল। কিন্তু নজরুল এমনি একজন শব্দকুশলী ও স্বদেশি চেতনার ব্যক্তি যিনি সরাসরি ভারতবাসীকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শুধু স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবীতই করেননিা, যুবকদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ার তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, নজরুল বঙ্গভারতের জন্য একজন অপরিহার্য কবি। নজরুলকে তাই লালন করতে হবে, তাকে তার অগ্নিঝরা কবিতা সৃষ্টির সুযোগ করে দিতে হবে।

আনন্দময়ীর আগমনী কবিতা লিখের নজরুল যখন জেলে যান, তখন ইংরেজ সরকার চেয়েছিল নজরুলের মতো বিপ্লবী কবিদের দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিতে। তারা জেলখানায় নজরুলের সাথে অমানবিক আচরণ শুরু করে, নজরুলকে অমানুষিক নির্যাতন করে। নজরুল এর  প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন। কোন দিক থেকেই কেউ নজরুলের অনশন ভাঙ্গাতে সমর্থ হল না। তখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার লেখা গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ নজরুলকে উৎসর্গ করে তার এক কপি নজরুলের কাছে জেলখানায় পাঠিয়ে দিয়ে পত্রের মাধ্যমে অনুরোধ করে বললেন, তুমি অনশন ভঙ্গ কর। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বিদ্রোহ করে আত্মাহুতি দেবার জন্য অনেক ভারতবাসীকে পাওয়া যাবে। কিন্তু অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতবাসীকে সচেতন করা, উদ্বুদ্ধ করা ও বিপ্লবীদের জন্য কবিতা লেখার জন্য কবি ভারতে পাওয়া যাবে না। নজরুল কবিগুরুর অনুরোধে আমরণ অনসন ভঙ্গ করলেন। কবিগুরু নজরুলকে যেমন বই উৎসর্গ করেছিলেন, নজরুলও তেমনি তার অগ্রজ গুরুকে তার ‘সঞ্চিতা’ নামক নির্বাচিত কাব্যগ্রন্থখানা উৎসর্গ করেছিলেন। বস্তুত এ দুই বাঙালি সাহিত্য-দিকপালের সম্পর্ক চিরকলিই ছিল গুরু-শিষ্যের, চিরকালই স্নেহ ও শ্রদ্ধার। তাই যারা নজরুল-রবীন্দ্রনাথের মধ্যকার কাব্য-ঈর্ষার কাল্পনিক তত্ত্ব তালাশ করে সাধারণ বাঙালি বিশেষ করে মুসলমান বাঙালিদের বিভ্রান্ত করতে চান, তারা কোন কালেই মনে প্রাণে বাঙালিও নন, গুণ বিচারে মুসলমানও নন; তারা নিতান্তই সাম্প্রদায়িকতার বিষে ভরা কাল সর্প বিশেষ।

৬. রবীন্দ্রনাথ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক

কতিপয় অন্ধ লোক বলেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন। তাই রবীন্দ্রনাথকে পরিত্যাগ করা উচিৎ। আমি জানি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে রবীন্দ্রনাথ বিরোধীতা করেছিলেন। কোন জাতিকে নানাভাবে বিভাজিত করে তাদের দুর্বল করে শাসন নিশ্চিত করার যে কৌশল তা বিশ্ববাসির জানা। বিশাল ভারতে সূচের মতো ঢোকার জন্য ইংরেজরা যেমন বাংলাকেই তাদের প্রবেশপথহিসেবে বেছে নিয়েছিল, তেমনি ভারতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে তার অগ্রভাগে ছিল বাঙালিরাই। আমরা আপাতত দৃষ্টিতে জানি যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে ভারত স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামেরও যে নানাবিধ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল সেটাও একই সাথে প্রণিধানযোগ্য। বলাবাহুল্য, ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বা সশস্ত্র আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল এ বাংলাই।

হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালিরা তাই একতাবদ্ধভাবে ইংরেজ শাসনের জন্য ছিল তাৎক্ষণিক হুমকি। ইংরেজগণ কোনভাবেই একতাবদ্ধ বাঙালিদের ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদী/বিপ্লবী আন্দোলনের কাছে আর্মি-পুলিশ-গোয়েন্দাদের সমন্বয়েও পেরে উঠছিলেন না। তাই তারা কৌশলে বাংলাকে ভাগ করে বাঙালি জাতিকে দ্বিধাভক্ত করার চেষ্টা করে। তাদের এই চেষ্টায় ইতিবাচক ফল অনুমান করে বাংলার মুসলমান নেতাগণ।তাই তারা বঙ্গভঙ্গের ধারণাকে লুফে নেন। ক্রমশই বাংলা ভাগের দিকে মুসলমানদের সমর্থন লক্ষ করা যায়। একদিকে মুসলমানদের সমর্থন অন্যদিকে বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করে ইংরেজ শাসনকে দীর্ঘায়িত করার সমূহ সম্ভাবনা —  এ দুয়ে মিলে ১৯০৫ সালে বঙ্গকে ভেঙ্গে দুই ভাগ করা হয়।

বলাবাহুল্য, ঐক্যপন্থী অনেক নেতার মতো রবীন্দ্রনাথও ইংরেজদের এ ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির ঘোর বিরোধীতা করেছিলেন। তিনি বাঙালি ঐক্যের সমর্থনে গান, কবিতা লিখেছিলেন। তার প্রচেষ্টায় অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখা দেশাত্ববোধক গান ও কবিতাগুলো মূলত এই বঙ্গভঙ্গ রোধ আন্দলন কালেই রচিত হয়েছিল।

প্রবল গণআন্দোলনের মুখে বঙ্গভঙ্গ রদ হল ১৯১১ সালে। প্রায় পাঁচ বছর পৃথক থাকার পর বাংলা পুনরায় এক হল। কিন্তু এই যে ভাঙ্গনের সূচনা তা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু তখনও বঙ্গভঙ্গকারী বাঙালি মুসলমানদের তেমন কোন লাভ হয়নি। তাই ১৯৭১ সালে পুনর্বার পূর্ব বঙকে স্বাধীন করতে হয়েছিল।

বঙ্গ ভঙ্গের ফলে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের তাৎক্ষণিক লাভ হয়েছিল। এখানে প্রাদেশিক রজাধানী হওয়ায় একটা উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ হলে তাতে ভাঁটা পড়ে। এরই প্রেক্ষাপটে ইংরেজ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ বিরোধী বাঙালিরা এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ইংরেজদের অন্য কোন চক্রান্ত বলে ধরে নেয় এবং এর বিরোধীতা করে বলে কথিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীদের সাথে বিশ্বকবি  রবীন্দ্রনাথ কতটা সম্পৃক্ত ছিলেন তা অবশ্য তর্কের বিষয়। কিন্তু রবীন্দ্র বিরোধী বুদ্ধিজীবীরা প্রায়সই বলার চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় নাকি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, বঙ্গভঙ্গ বলেন,আর ইংরেজ বিরোধী বলেন, কোন আন্দোলনেই রবীন্দ্রনাথ কোন দিন নেতৃত্ব পর্যায়ে ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির ঐক্যের সহগামী একজন কবিমাত্র। তিনি কোন রাজনীতিবিদ বা নেতা ছিলেন না।  তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতার বিরোধীদের নেতৃত্ব দেবার প্রশ্নই ওঠে না। অধিকন্তু যারা এ অপবাদটি নিয়ে আসেন তারা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটটি যেমন বিবেচনায় নিয়ে আসেন না, তেমনি রবীন্দ্রনাথের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতার তেমন কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণও হাজির করতে পারেননা। তাই আমি মনে করি, এটা রবীন্দ্র ব্যক্তিত্বের উপর কালিমা লেপনের ব্যর্থ চেষ্টার অতিরিক্ত কিছু নয়।

৭. উপসংহারে

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আমাদের জাতীয় জীবনে অপরিহার্য দুটো নাম, দুটো পরিচয়, দুটো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চেতনা। বাঙালি সাহিত্যের উত্তরাধুনিকতার যুগেও এ দুই কবি আমাদের জন্য শতভাগ প্রাসঙ্গিকরূপে বিরাজ করছেন। বাঙালির বলা-কওয়া, চাওয়া-পাওয়া ও নিজেকে ও অপরকে বর্ণনার জন্য রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল অতীব প্রয়োজন। এ দু সাহিত্য দিকপালের কাব্যের দুটি পৃথক ধারার উৎপত্তি স্থানের সামান্য পার্থক্য থাকলেও এদের মিলিত ধারা কিন্তু আমাদের বঙ্গোপসাগরেই পড়েছে। তাই বঙ্গোপসাগরের জল থেকে সৃষ্ট জলীয় বাষ্পের যে বৃষ্টি হয়, তা অভিন্ন চেতনায় আবার গোটা বঙ্গকেই সিক্ত করে। রবীন্দ্রনাথ যেমন, তেমনি নজরুলও আমাদের চেতনার রঙ্গে মিশে আছে। (৯ মে, ২০১৫)