ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সম্প্রতি নারীদের যৌন হয়রানির উপর একটি গবেষণার ফল প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) । ২০ মে, ২০১৫, রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে ‘নিরাপদ নগরী নির্ভয় নারী’ প্রচারণার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ ফলাফল তারা তুলে ধরেন। ২০১৪ সালের মে-জুন মাসে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ৮০০ জন নারী ও কিশোরী এবং ৪০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিআইডিএস এর গবেষণা নিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তার শিরোনাম ছিল, পুলিশি হেনস্তার ভয়ে ৮৪ শতাংশ নারী থানায় যেতে চান না’

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশের ৯৫ শতাংশ নারী মনে করেন, পুলিশি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে হেনস্তার শিকার হতে হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৪ শতাংশ নারী এ ব্যাপারে কোথাও অভিযোগ করা দরকার বলে মনে করেন না। উত্তরদাতাদের ৬৫ শতাংশ মনে করেন, পুলিশ অভিযোগকারীকেই দোষারোপ করে। ৫৭ শতাংশের মতে মামলা নিতে পুলিশ গড়িমসি করে, ৫৩ শতাংশের মতে অভিযোগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। আর পুলিশ কর্তৃক পুনরায় হয়রানির আশঙ্কায় ৩০ শতাংশ নারীই কোনো অভিযোগ করেন না। কি কি কারণে হয়রানির শিকার নারীগণ কোথাও অভিযোগ করেন তারও এক সেট কারণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলোর অন্যতম হলো, লোকনিন্দার ভয়, পরিবারের সুনামের কথা চিন্তা, অভিযোগ করে কোনো কাজ হয় না, অভিযোগ করার জটিল পদ্ধতি ইত্যাদি।

 

নির্যাতিতা নারীদের কোথাও নালিশ না করার বিষয়টি এ দেশে ও এসমাজে নতুন কিছুই নয়। কিন্তু কেন কোথাও নালিশ করেন না তার কারণগুলোর মধ্যে যে পুলিশের হেনস্তার ভয় মুখ্য নয় সে বিষয়টি অনেকে বুঝতে চান না। পত্রিকার প্রতিবেদন তো বটেই মূল গবেষণা প্রতিবেদনেও যা বলা হয়েছে তাতে পুলিশের হেনস্তা হবার ভয় প্রধানতম নয়; অন্যতম।

 

এটা স্বীকৃত সত্য যে সমাজে যত অপরাধ সংঘটিত হয় তার সবটুকু তো নয় বরং অধিকাংশই পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ হয় না। একটি গড়পড়তা হিসেবে বলা যায় সাধারণত সমাজে বিরাজমান বা সংঘটিত অপরাধের মাত্র এক-চতুর্থাংশ পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। এটাকে অনেকে বলেন আন্ডার রিপোর্টিং, কেউ কেউ বলেন অপরাধ গোপনকরণ। আমাদের মতো উন্নয়নশীল সমাজে তো বটেই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোতেও সব অপরাধ পুলিশের কাছে যায়না।

 

এর কারণ নানাবিধ। তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হল, অপরাধ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পুলিশক তাত্ত্বিক কিংবা ব্যবহারিক কোন ক্ষেত্রেই প্রাথমিক কারক নয়।  অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রাথমিক দায়িত্ব ব্যক্তির নিজের, তারপর সমাজের নিকটজনগণ ও তারপর পরের অনেক স্তর পার হয়ে পুলিশ। তাই পুলিশ হল একটি দূরবর্তী অপরাধ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রক সংগঠন। আমরা  বলি, পুলিশ জনগণের বন্ধু। কিন্তু একই সাথে আমাদের এটাও বলা দরকার যে পুলিশ জনগণের নিকট-বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড নয়। অপরাধের শিকার ব্যক্তির কাছে তার নিকটতম বন্ধু হল, তার নিকটতম আত্মীয়গণই।

 

কিন্তু নারী নির্যাতন বা যৌনহয়রানির ক্ষেত্রে বিষয়টি যথেষ্ঠ হেঁয়ালীপূর্ণ। দেশি-বিদেশি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক হাজারও গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে, যারা নারীর যত বেশি কাছাকাছি তারা নারীকে ততো বেশি হয়রানি বা নির্যাতন করেন। শতকরা আশিভাগ নারী যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হয় তার পরিবারে। এর পর রয়েছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠি-সহকর্মী-সহযাত্রী-সহমর্মীদের দ্বারাই। শতকরা ৮৫ ভাগ নারী তৈরি পোশাক শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। যেখানে নারীর নিজ পরিবার নারীর জন্য নরকস্বরূপ সেখানে বাইরের জগৎ নারীর জন্য কতটা নিরাপদ?

 

নারী নির্যাতনের শিকার নারীদের কোথাও অভিযোগ না করা কিংবা আইনের আশ্রয় না নেওয়ার ঘটনা কেবল থানায় সীমাবদ্ধ নয়। যৌন হয়রানির শিকার নারী তার বঞ্চনার কথা নিজের ভিতরেরই রেখে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্নবোধ করেন। এটা তারজন্য লাভজনকও বটে। কারণ নির্যাতনের কথা বাইরে প্রকাশিত হলে তার পাওয়ার চেয়ে হারাবার পাল্লাই ভারি থাকে।  বিষয়টি কেবল বাংলাদেশি নয়, আন্তর্জাতিকও বটে। তাই পরিবারে নির্যাতিতা নারী  পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে  তার নির্যাতনের কথা  জানায়না। একইভাবে স্কুলের ছাত্রীগণ তাদের শিক্ষকদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রক্টরকে, অফিসের কর্মচারীগণ তাদের অফিস/শাখা প্রধানদের জানননা।

 

নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের নির্দেশে দেশের সরকারি-বেসরকারি-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ও জানা মতে এসব কমিটিতে হয়রানির শিকার কোন নারী কোন অভিযোগ করেন বলে মনে হয়না। দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেনদ মতে এসব কমিটি অনেকটাই কাগুজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালে গঠিত কমিটির কাছে গত ছয় বছরেও কোন নারী/ছাত্রী অভিযোগ করেননি।

 

তাহলে শুধু পুলিশকে উল্লেখ করা কেন? নারীরা পুলিশ কর্তৃক হেনস্তা হয়, বুঝলাম। কিন্তু যখন তারা নিজ বঞ্চনার কথা নিজ পরিবারকেই জানাননা, তখন পুলিশের কাছে কত বেশি আর আশা করতে পারেন? গবেষণাটি নিজেই বলছে যে নারীরা শুধু পুলিশকে নয়, তার সহকর্মীদেরও ভয় পায় । তারা নিজ আত্মীয়-স্বজনকেও ভরসা পায় না। আপন পরিবারই যখন বৈরি, তখন দূরবর্তী অবস্থানের পুলিশকে নারীরা বন্ধু ভাববেন, এটা প্রত্যাশা করাও বোকামী। যেখানে আপন পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক সত্যিকারভাবেই নারীরা হেনস্তা হচ্ছেন, সেখানে পুলিশ কর্তৃক হেনস্তা হবার ভয় অতি স্বাভাবিক।

 

তবে একটা কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে পুলিশ হল সকল অপরাধের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক। সাধারণভাবে কোন সমস্যার প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ পুলিশের কাছে আসেননা । পুলিশের কাছে যখন কোন মানুষ আসেন তখন তিনি তার সর্বস্ব খুইয়েই আসেন। তাই পুলিশ যদি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে মানুষের আর যাবার কোন স্থান থাকে না। `People call the police when everything else has failed’. একই ভাবে, মাতা-পিতা, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, কর্মক্ষেত্রের পরিচালক সবাইকে অতিক্রম করে যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে যখন কোন নারী থানায় আসেন, তখন তিনি থাকেন সবচেয়ে অসহায়। এমতাবস্থায় এ অসহায় নারীগুলোর নির্যাতনের প্রতিকার করতে না পারলে পুলিশ কেবল সাংবিধানিক, আইনি বা পেশাগত দায়িত্বকেই অবহেলার দোষে দায়ি হবে না, তারা অনৈতিকতার দোষেও দুষ্ট হবে। পুরো সমাজ যদি বখে যায়, পুলিশকে সমাজের অনুরূপ নয়; বিরূপ হতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

সূত্রাবলী:

১. http://www.prothom-alo.com/we-are/article/532915

২.http://www.truenewsbd.com/

৩. http://somoynews.tv/pages/details/

৪. http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/331375/

৫.The Police in America an Introduction (fourth edition); 2002 Samuel Walker and Charles M. Katz; McGrow Hill

৬.http://www.supremecourt.gov.bd/web/documents/276907_Writ_Petition_5916_08.pdf