ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

গত  শতাব্দীর ষাটের দশকের ঘটনা। বাগেরহাটের খান জাহান আলী(র) মাজারের এক খাদেম হুজুরের এক শিশু সন্তান খুন হয়। খাদেমের স্ত্রী ছিল খাদেমের তুলনায় অনেক তরুণী। তরুণীও ছিল অন্য এক খাদেমের মেয়ে। মাজারের বার্ষিক ওরশের সময় সবাই যখন ওয়াজ নছিহত নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক এরই কোন এক ফাঁকে হুজুরের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঘাতক একটি দা দিয়ে শিশুটিকে জবাই করে হত্যা করেছিল।

 

স্থানীয় পুলিশ এ খুনের কোন রহস্য উদ্ঘাটনে বহু দিন পরিশ্রমের পরেও ব্যর্থ হয়। তারা এ নিষ্পাপ শিশুটিকে কে এবং কেনই বা হত্যা করবে তা ঠাহরও করতে পারছিলনা। হুজুর ও তার স্ত্রী ছিল নিরীহ মানুষ। তাদের সাথে কারো প্রকাশ্য বা গোপন লেনাদেনা বা অন্য কিছু নিয়ে বিরোধ ছিল — এমন তথ্যও কেউ দিতে পারছিলনা। চুরি করতে গিয়ে চোররা অনেক সময় খুন করে বসে। কিন্তু একটি অবুঝ শিশুকে চুরি করতে এসে খুন করার মতো কোন কারণও অনুমান করা যাচ্ছিল না।

 

এ সময় স্থানীয় সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মামলাটির তদন্ত তদারক করতে যান। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে খুনি বাইরের কেউ না, ভিতরেরই কেউ হবে। তিনি মাজারের আশেপাশে মাজারের খাদেম ও তাদের আশ্রিত ব্যক্তিদের দিকে নজর দিলেন। তাদের অতীত কর্ম বিশ্লেষণ করে জানতে পারলেন যে নিকটের এক যুবক একবার মাজারের ফুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল।

 

সার্কেল এ এসপি এবার ফুল চোরের দিকে নজর দিলেন। তার যুক্তি ছিল, যে পবিত্র মাজারের ফুল চুরি করতে পারে, তার পক্ষে খুন করাও সম্ভব। কিন্তু পূর্বে ফুল চুরি ভিন্ন যুবকের চরিত্রে তেমন কোন খারাপ দিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। তবুও ঝানু গোয়েন্দা সার্কেল এএসপি যুবকের প্রতি সন্দেহের তীর ছোড়া থেকে নিবৃত্ত হলেননা।

 

কিন্তু ফুল চোর সাদাসিদে যুবক কিছুতেই স্বীকার করল না। পরে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হল। কয়েক দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর সে স্বীকার করল যে সেই আসলে খুনি। তবে সে নিজের সন্তানকেই খুন করেছে, অন্য কাউকে নয়। বিষয়টির রহস্য আরো এক মাত্রা বেড়ে গেল। যুবকের ভাষ্য মতে, এ শিশুর মাকে সে ভালবাসত। গভীর ভালবাসার এক পর্যায়ে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। কিন্তু গর্ভবতী হলেও মেয়ের বাবা যুবককে দিয়ে তার বিয়ে দিতে রাজি হয়নি। প্রেমিকাও তাকে বেকার বলে বিয়ে করতে চায়নি। কিন্তু একটি গর্ভবতী মেয়েকে বাইরের কোথাও বিয়ে দেয়া যায়না। এতে ঘটনা জানাজানি হবে। বিষয়টি হুজুরের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে, এ সুযোগে বৃদ্ধ হুজুর খাদেম নিজেই গর্ভবতী মেয়েটিকে বিয়ে করে তার বাবাকে উদ্ধার করতে চাইল। হুজুরের ইচ্ছামত কাজও হল। অল্প বয়সী তরুণী এক শেষ বয়সী হুজুরের স্ত্রী হল।

 

কিন্তু ফুলচোর যুবকের মন থেকে প্রেমের আবেগ কোনদিনই অপশৃত হল না। সে মেয়েটিকে বারবার তার সাথে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিত। কিন্তু মেয়েটি হুজুরের স্ত্রী হওয়ায় অনেকটা নির্ভরতা পেয়েছিল। সে একজন বেকার যুবকের স্ত্রী হওয়ার পরিবর্তে একজন সম্মানিত হুজুরের স্ত্রী হয়ে নির্ভর জীবন যাপনেই স্বস্তিবোধ করল।যতবারই যুবক তাকে হুজুরকে ত্যাগ করার প্রস্তাব দিত ততোবারই সে সে প্রস্তাব ঘৃণাভবে প্রত্যাক্ষাণ করত।

 

কিন্তু এতে প্রেমিক যুবক কিছুতেই সন্তুষ্ট হলনা। সে নানাভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল। মেয়েটিকে বোঝানোর একটি উত্তম যুক্তি ছিল যে বৃদ্ধ হুজুর অল্পদিনেই মারা যাবে। তখন সে একজন যুবতী বিধবা হবে। তাই এক মরহুম বৃদ্ধের বিধবা হওয়ার পরিবর্তে তারা অন্য কোথাও পালিয়ে গিয়ে নতুন করে ঘর সংসার বাঁধতে পারে। তাদের সংসারের বন্ধন হতে পারে সেই সন্তানটি যে কিনা হুজুরের সন্তান হিসেবে পরিচিতি পেলেও প্রকৃতপক্ষে তারই (যুবকের) ঔরসজাত।

 

কিন্তু যুবকের প্রাক্তন প্রেমিকার শক্তির উৎসও ছিল সেই সন্তানটিই। সে বারবার বলত, বৃদ্ধ হুজুর যখন মারা যাবে, তখন তার ছেলে বড় হবে। তার এ ছেলেকে নিয়েই সে বাকি জীবন অতিবাহিত করবে। এ ছেলেটিই তার অহংকার। ছেলে আছে বলেই সে বৃদ্ধকে ত্যাগ করে তার মতো একটি বেকার যুবকের সাথে যাবে না।

 

তার ঔরসজাত ছেলেকে নিয়ে এমন অহংকার যুবকটি সহ্য করতে পারলনা। সে সিদ্ধান্ত নিল, যে ছেলেকে নিয়ে তার প্রাক্তন প্রেমিকার এত অহংকার, সেই ছেলেকে সে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিবে। দেখি, ছেলেহারা হয়ে তার শক্তি থাকে কোথায়?

 

যে কথা সেই কাজ। মাজারের বার্ষিক ওরস নিয়ে সবাই অত্যন্ত ব্যস্ত। ঘরের বেড়া ফাঁক করে চুপি চুপি ঘরে ঢোকে যুবক। যুবক দেখে তারই ঔরসজাত সন্তান গভীর ঘুমে মগ্ন। সে আবছা আলোতে ঘুমন্ত শিশুটি একবার দেখে নেয়। এরপর দায়ের এক কোপে নিষ্পাপ শিশুর মাথাটি ধড় থেকে আলাদা করে ফেলে। অপরাধস্থল থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে মাজারের পুকুরেই হাতে মুখে লেগে থাকা রক্তটুকু পরিষ্কার করে সে।  কেউ কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই  সে আবার  মাহফিলে ঢুকে পড়ে। পরদিন যখন শিশুটিকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, তখন কেউ সে যুবককে সন্দেহ করেনি। অন্যদিকে, যুবকের সাথে প্রাক্তন প্রেমের রহস্য যাতে পুলিশে জানতে না পারে, সেজন্য শিশুর মা-ও তার সন্দেহের কথা পুলিশ থেকে সযতেœ গোপন রাখে।

 

গ্রেফতারকৃত যুবক তার দোষ স্বীকার করে বলে, স্যার, যে সন্তান তার অহংকার ছিল তা আমারই সন্তান ছিল। এক বৃদ্ধ হুজুর রাতারাতি আমার ঔরসজাত সন্তানের পিতা হয়ে যাবে — এটা আমি কোন দিনই মেনে নিতে পারিনি। আমার প্রেমিকাও আমাকে ভুলে গিয়ে আমার যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দেয়। সন্তানটি দেখতে আমার মতোই। আমার কানের পিছনে একটি প্রবৃদ্ধি আছে। কি আশ্চর্য! আমার সন্তানের কানের পিছনেও একটি প্রবৃদ্ধি ছিল। পুলিশ নিহত বাচ্চাটির মায়ের সাথে কথা বলে জানতে পারল, ঘটনা সঠিক। সন্তানটির শারীরিক বর্ণনা তার গোপন পিতার শরীরের অনুরূপই ছিল।

 

একটি ফুল চুরির ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশ শুধু খুনিকেই শনাক্ত করল না, একটি চিরায়ত প্রেম-ভালবাসা ও তা থেকে উৎসারিত হিংসা-দ্বেষ ও রোমহর্ষক পরিণতির কথাও জানতে পারল। শুধু পার্থিব লাভালাভই খুনের মত জঘন্য অপরাধের কারণ নয়, নিছক ভালবাসাও পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধের উৎস ও কারণ হতে পারে। বস্তুত মুসলমানদের বিশ্বাস মতে, পৃথিবীর প্রথম খুনের ঘটনাটি ছিল মূলত ভালবাসার অপ্রাপ্তির হিংসাত্মক পরিণতি যেখানে আদমের এক সন্তান অন্য এক সন্তানকে তৃতীয়জনের প্রেমের কারণেই হত্যা করেছিল। পৃথিবী এমনি একটি স্থান যেখানে ফুলের কৌমার্য মুহূর্ত পরেই ঘাতকের কাঠিন্যে পরিণত হতে পারে।

 

বি.দ্র: জনপ্রিয় ব্লগার নুরুন্নাহার শিরীন আপার লেখা ফুলছিঁড়েছিঁড়েইএকজনঘাতক-এর প্রথম পাপের সূচনা

পোস্টের প্রতিক্রিয়া।