ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রথমেই একটি গবেষণালবব্ধ তথ্য দিব পাঠকদের। সারা বিশ্বের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গরমকালে অপরাধ বাড়ে। বাংলাদেশে এপ্রিল, মে ও জুন অসহনীয় গরমের মাস। তবে সবচেয়ে বেশি গরম পড়ে মে মাসে। মে মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আমি দেখেছি প্রায় ১২ বছরেই  বাংলাদেশে সর্বোচ্চ অপরাধ ছিল মে মাসে।  তাই চলতি মে মাসে অপরাধ নিয়ে এত বেশি কথা  হওয়া স্বাভাবিক। আমরা অসচেতনভাবেই ভুলে যাই যে প্রত্যেক বছরই মে মাসে অপরাধ বৃদ্ধি নিয়ে প্রচার মাধ্যমগুলো সোচ্চার হয় আর এদের উল্টাপাল্টা বিশ্লেষণে পুলিশকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

 

এ মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নারী নির্যাতন। পহেলা বৈশাখে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেইটে নারীদের শ্লীলতাহানী, এর প্রতিবাদে মিছিলে পুলিশের কয়েকজন নিম্ন পদস্থ সদস্য করতৃক এক নারীকে অযাচিতভাবে নির্যাতন এবং অতি সম্প্রতি রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের দোকানে কর্মরত এক গারো নারীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে দলগত ধর্ষণ করে তাকে উত্তরায় ফেলে দেওয়ার খবর নিয়ে আমাদের মিডিয়াগুলো এখন সরব। মিডিয়ার সাথে সাধারণ মানুষও এ বিতর্কে আটপৌরে আড্ডা থেকে শুরু করে সোসাল মিডিয়া পর্যন্ত উত্তপ্ত রেখেছে। এমনকি পুলিশের অনেক বড় করতাকেও আমি বলতে শুনেছি, রেইপ আসলে অসহনীয়ভাবে বেড়ে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্লেষণে এটা আগের মাসগুলোর তুলনায় বাড়তে পারে, কিন্তু চিরাচরিত ঘটনা হিসেবে স্বাভাবিক।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ফ্রেন্ড ছোটবোন রুদাবা শ্রাবণী তার স্টাটাসে একটি মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। তার স্টাটাসটা হল,Do every man has a rapist mind?? I am confused!!! । রুদাবার প্রশ্নটি যে সম্পূর্ণ নতুন বা মৌলিক তা অবশ্য নয়। ইতোপূর্বে অনেক নারীবাদী লেখক একই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। এ ধরনের নারীরা মনে করেন এবং তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এটা মনে করাই স্বাভাবিক, যে পৃথিবীর সকল পুরুষই মূলত, সম্ভাব্য ধর্ষক। শুধু সুবিধা বা অনুকূল পরিবেশের অভাবেই তারা ভাল মানুষ বা নারী-ত্রাতা।

 

এ ব্যাপারে মনোবিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞান পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। তবে অপরাধ বিজ্ঞানের পাঠ নিয়ে আমি নিজেও অনেকটা দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছি। যৌক্তিক নির্বাচন কিংবা আটপৌরে আচরণ তত্ত্বানুসারে অপরাধ মানুষের দৈনন্দিন সাধারণ বা আটপৌরে আচরণগুলোর বাইরে কিছু নয়। যৌক্তিক নির্বাচন তত্ত্বানুসারে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে তার প্রতিটি কর্মেরই লাভালাভ হিসেব নিকেষ করে। আরচণগতভাবেই মানুষ সুখান্বেষী। বেন্থামের মতে,  প্রকৃতি মানুষকে সুখ ও দুঃখ নামের দুটি সার্ভোম প্রভুর নিয়ন্ত্রণাধীন করে সৃষ্টি করেছেন[১]। প্রত্যেক কাজের মাধ্যমেই মানুষ তার সুখবৃদ্ধি করতে চায়, আর দুঃখকে পরিহার বা যত দূর সম্ভব কম করতে চায়।

 

অর্থনৈতিকভাবে বললে বিষয়টি এমন হবে যে, পারথিব সরব প্রকার  লেনদেনে মানুষ চায় তার লাভকে সর্বাধিক করতে ও ক্ষতিকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে। লাভালাভের বিচারে কোন লেনদেন ক্ষতি ডেকে আনবে বলে বুঝতে পারলে মানুষ সে লেনদেনে যাবেনা কিংবা যত কম যাওয়া যায় তার চেষ্টা করবে।

 

মানুষের আটপৌরে বলে মহৎকাজের মতো অপরাধ কর্মও মানুষের নৈমিত্তিক আচরণ বৈ কিছু নয়। তবে মানুষের আচরণগুলোর সবই সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত বা প্রশংসিত হয়না। মনুষ্য আচরণের যেগুলো সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত নয়, সেগুলোকে আমরা অস্বাভাবিক বা বিচ্যূত আরচণ বলি। বিচ্যূত আচরণগুলোর মধ্যে যেগুলো সমাজ কর্তৃক তীব্রভাবে অস্বীকার বা অসহ্য করা হয় কিংবা যেগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি শাস্তির ব্যবস্থা আছে সেগুলোই হল অপরাধ।

 

ধর্ষণ একটি সমাজ-নিন্দিত বা অস্বীকৃত আচরণ। এর বিরুদ্ধে যথাযথ আইন আছে। আইনে যথাযথ শাস্তির বিধান আছে। তাই চুরি-ডাকাতি-হত্যার মতো মানুষ ধর্ষণকেও এড়িয়ে চলবে। কিন্তু আটপৌরে তত্ত বলে ধর্ষণ আসলে সমাজ কর্তৃক ধিকৃত ও আইনের মাধ্যমে শাস্তির বিধানকৃত একটি আটপৌরে আচরণ।  সাদামাটা চোখে ধর্ষণ এক প্রকার যৌন মিলনই বইকি। সাধারণ যৌনক্রিয়া থেকে এর পার্থক্য হল, এখানে স্ত্রীলোকটির সম্মতি থাকেনা কিংবা স্ত্রীলোকটি সম্মতি দিলেও তার সম্মতির আইনগত ভিত্তি থাকেনা।। তাই তার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করা হয়। এটা একজন মানুষের(স্ত্রীলোকটির) মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এখানে স্ত্রীলোকটির মানসিক, দৈহিক ও সামাজিক ক্ষতি করা হয়।

 

ধর্ষণ ক্রিয়ার মতো অসম্মতিতে জোর করে যৌন মিলনের ঘটনা স্বামী-স্ত্রীতেও হতে পারে। কোন কোন দেশে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী ধর্ষণের অভিযোগও সহজে নিয়ে আসতে পারে। (অবশ্য বাংলাদেশেও বিষয়টির অস্তিত্ব আছে। তবে সেটা সহজ নয়।) অসম্মতি, বল প্রয়োগ এবং অমানবিক আচরণ বলেই নারীর অক্ষমতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া যায়।

 

যৌনতা যদি মানুষের স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পড়ে এবং প্রত্যেকটি সক্ষম পুরুষই যদি যৌনতাকে উপভোগ করে এবং আমরা যদি যৌক্তিক নির্বাচন ও আটপৌরে আচরণ তত্ত্বকে আমলে আনি, তাহলে প্রত্যেকটি পুরুষকে সম্ভাব্য ধর্ষক হিসেবে ভাবতে অসুবিধা নেই। আমার উল্লেখিত তত্ত্বগুলো অনুসারে একজন চোর যেমন সময়-সুযোগ মতো কোন পাহারাহীন মূল্যবান বস্তুকে কাছে পেলে চুরির সুযোগটুকু হাতছাড়া করবেনা, তেমনি একজন পুরুষও একটি অসহায় নারীকে নির্জন স্থানে একলা পেলে তার উপর বলৎকার করতে কার্পণ্য করবেনা।

 

কিন্তু যৌক্তিক নির্বাচন তত্ত্বের মূল যদি হয় মানুষের লাভালাভের ধারণা —  যে কাজটি মানুষকে লাভবান করবে, মানুষ তা করবে, অন্যদিকে একজন বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে যা অলাভজনক তা থেকে সে বিরত থাকবে — তাহলে একজন মানুষ যদি ইতর প্রাণিভুক্ত না হন, তাহলে তিনি তার লাভালাভকে কেবল স্থূলভাবে ইন্দ্রিয়সুখের নামান্তর ভাববেননা।

 

মানুষের মধ্যে বিবেক আছে। বিবেকই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে তাকে বিশ্বজগতে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে। তাই মানবিক গুণের দিকটিও তো মানুষের জন্য একটি মূল্যবান প্রেষণা ও প্রেরণা। ইতর প্রাণিকূল ক্ষুধার জ্বালায় নিজ সন্তানকে গলধঃকরণ করে। কিন্তু মানুষ নিজে না খেয়ে তার সন্তানকে লালন করে। বৃদ্ধ পিতামাতাকে আবর্জনা ভেবে অনেক সন্তানই রাস্তায় ছুড়ে মারছে। কিন্তু এ জগতে তো এমনও ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে যে অপরের পিতামাতাকে রক্ত সম্পর্কহীন মানুষও দেবতাতুল্যভাবে ভরণপোষণ করছে। মানুষের সুখ ও শান্তির জন্য জগতে তো অজস্র মানুষ নিজ নিজ জীবন উৎসর্গ করছে।

 

ইতর প্রাণিতুল্য ধর্ষক পুরুষের হাত থেকে তো অনেক নারীকে অন্য পুরুষরাই উদ্ধার করছে। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীদের উন্নতি ও নারীদের জন্য একটি নির্ভয় পৃথিবী গড়ার যে আন্দোলন, সে আন্দোলনে তো নারীরা একা নয়। সেখানে পুরুষদের সমান এবং অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রয়েছে। এ বঙ্গদেশেও যখন সমাজ নারীদের আধুনিক শিক্ষার ঘোর বিরোধী ছিল তখনও তো সেই সমাজেরই পুরুষরা নারীদের শিক্ষিত করতে এগিয়ে এসেছে। যদি ভাই ইব্রাহিমের সাহায্য সহযোগিতা কিংবা স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের উৎসাহী প্রেরণা না পেতেন, আমরা আজ বেগম রোকেয়ার মতো কোন নারীকে কি পেতাম?

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। পৃথিবীর বিবর্তন ধারায় যত উত্থান-পতনই দেখি, যত ভাল-মন্দ, উন্নতি-অবনতিই দেখি, তার সবগুলোতেই নারীপুরুষ তাদের নিজ নিজ মানবতা দেখিয়েছে। পুরুষ যদি নিখাঁদ ইতর প্রাণিতুল্যই হত, তাহলে পৃথিবী শুধু নরকরূপেই বিবর্তিত হত। কিন্তু তা তো হয়নি। পৃথিবীতে যত অনাসৃষ্টি বা অপকর্ম দেখি, চূড়ান্ত বিচারে তার চেয়ে সৃষ্টি ও সুকর্মই বেশি। বিবর্তনের পথে নারী-পুরুষদের অনেকেই পশুতুল্য আচরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে অনেকবার নরকতুল্য অবস্থা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তাই বলে নারী-পুরষ সামগ্রিকভাবে কখনই নিখাঁদ রিপুর দাশ ছিলনা। হাজারও অমানবিকতার মধ্য দিয়েও পৃথিবী যে এখনও মানবিক — তা তো মানুষেরই সৃষ্টি; পশুদের নয়। তাই প্রত্যেক পুরুষ ধর্ষক নয়। বরং প্রত্যেক পুরুষকে ধর্ষকদের প্রতিরোধ ও শাস্তিদান ও ধর্ষিতা তথা নারীদের রক্ষক হিসেবেই ভেবে নেয়া যৌক্তিক বলে মনে করি। (২৯ মে, ২০১৫)

সূত্রাবলীঃ

১. Nature has placed mankind under the governance of two sovereign masters, pain and pleasure (Bentham, 1970);  A General Theory of Crime; Gottfreson and Hirschi;