ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

গত ২১ মে, ২০১৫ তারিখে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে বিক্রয় সহকারী হিসেবে কর্মরত এক তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়।[১] ধর্ষকদের সংখ্যা দুই কিংবা তারও চেয়ে বেশি। তবে সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও এটা যে গণ ধর্ষণ এবং এটা অনেকটা পরিকল্পিত সে বিষয়ে পাঠক মহলে সন্দেহ নেই। অপরাধীদের দুজন ধরা পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জোর প্রচেষ্টায় বিশেষ করে র‌্যাবের তড়িৎ তৎপরতায় ঘটনার সাথে জড়িত দুজনই ধরা পড়েছে। তারা পুলিশের কাছে ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ঘটনার বিবরণও দিয়েছে।[২]বর্তমানে আসামীরা পুলিশ রিমান্ডে রয়েছে। আদালতে তার দোষ স্বীকারমুলক জবানবন্দী দিবেন কিনা তা কদিন পরেই জানা যাবে।

 

প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীতে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু পুলিশ এধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সক্ষম হচ্ছেনা। এ অভিযোগ খাঁটি বটে। কারণ, যে কোন অপরাধ নিবারণের দায়িত্ব পুলিশের রয়েছে। চুরি-ডাকাতি-দস্যুতা-অপহরণ হোক আর খুন-জখম বা ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানিই হোক, কোন অপরাধ নিবারণ করতে না পারলে পুলিশকে সমালোচনার মুখোমুখি হতেই হবে। তবে এর সাথে এটাও মনে রাখতে হবে, শত চেষ্টা করলেও কিছু অপরাধ পুলিশ নিবারণ করতে পারেনা। পরিকল্পিত ও আবেগবসত হত্যা, পরিচিত বা স্বল্প পরিচিত পুরুষ কর্তৃক নারী ধর্ষণ– ইত্যাদি কিছু অপরাধ আছে যেগুলো রাস্তার চুরি ছিনতাই থেকে একেবারেই আলাদা। এগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত অপরাধীগণ ভিকটিমদের বিশ্বাস অর্জন করেই অপরাধটি সংঘটিত করে।

 

যেমন রাস্তায় বা পার্কে বসা প্রেমিক-প্রেমিকা যুগোলকে চ্যালেঞ্জ করা পুলিশের পক্ষে কঠিন। এতে তারা মাইন্ড করতে পারে। সাধারণ মানুষ তাদের সন্দেহ করে না। আবার এমনও হয় যে মেয়েটি জানেই না যে তার পরিচিত ব্যক্তিটির ভিতরে ধর্ষণের ইচ্ছা আছে। কিন্তু অনুকূল পরিবেশে যখন পুরুষটি ভিতরের পশুটি খলবলিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন পুলিশ থাকে অনেক দূরে, মেয়েটি থাকে অসহায়। তাই এ ধরণের ধর্ষণ প্রতিরোধ করা প্রায় ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়না। এমনিভাবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী খুন, ব্যবসায়ীক অংশীদার কর্তৃক অন্য অংশীদারকে খুন, প্রেমিক কর্তৃক প্রেমিকাকে খুন– এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সুযোগ কোথায়?

 

তবে এজাতীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ যদি তাদের তদন্ত প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত ও বস্তু নিষ্ঠ করতে পারে, অপরাধীগণ যদি স্বল্প সময়ের মধ্যে শানাক্ত হয় এবং তাদের বিচার প্রকিয়াও দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তির বিধান কার্যকর করা যায়, তাহলে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আসে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যে সব এলাকায় পুলিশের তদন্ত তথা অপরাধ উদ্ঘাটনের হার যাত বেশি, সেইসব এলাকায় অপরাধের হার ততো নিম্ন[৩]।

 

প্রশ্ন উঠেছে যে পুলিশ এ মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল। সাধারণ জনউপলব্ধিতে অভিযোগটি বিশ্বাসযোগ্য হতেই পারে। কারণ মামলা গ্রহণে পুলিশের গড়িমসির অনেক উদাহরণ মানুষের সামনে রয়েছে। তাই বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুসন্ধান করেছি। আমি সংশ্লিষ্ট তিনিটি থানার অফিসার-ইন-চার্জ এবং গুলশান জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের সাথে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছি।

 

জানা গেল, ভিকটিম তরুণী অতি ভোরে মামলা করার জন্য তুরাগ থানায় যান। থানার ডিউটি অফিসারের মতে ভিকটিম তুরাগ থানায় সকাল সাড়ে চারটায় উপস্থিত হয়েছিলেন। ভিকটিম যেহেতু তুরাগ থানা এলাকায় বসবাস করেন, তাই তিনি নিকটবর্তী থানাতেই গিয়েছিলেন। নাগরিক প্রত্যাশা মতো এটাই কাম্য। তবে মামলার ঘটনাস্থল ছিল অন্য থানায়। ডিউটি অফিসারের ভাষ্যমতে, অপরাধস্থলটি পড়ার কথা গুলশান থানা এলাকায়। তাই ভিকটিমকে গুলশান থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

 

ভিকটিম তার আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে গুলশান থানায় আসেন সকাল সাড়ে ছয়টায়। ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে গুলশান থানার ডিউটি অফিসার টহল গাড়িকে ডেকে ভিকটিমসহ ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দেন। গুলশান থানার টহল অফিসার বুঝতে পারেন ঘটনাস্থল গুলশান থানার কাছাকাছি হলেও সেটা আসলে ভাটারা থানাধীন। তাই প্রাথমিক তদন্ত শেষেই তিনি ভিকটিমকে টহল গাড়িতে করে ভাটারা থানায় নিয়ে যান।

 

ভাটারা থানায় ভিকটিম পৌঁছে সকাল সাড়ে সাতটায়। ডিউটি অফিসার ঐ সময় থানায় অফিসার-ইন-চার্জ ছিলেননা। ( না থাকারই কথা। কারণ তারা সারারাত পাহারায় থেকে ভোরে ঘুমাতে যান)। ডিউটি অফিসার ওসিকে জানালে তিনি থানার টহল অফিসারকে দিয়ে ভিকটিমকে পুনরায় ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় তদন্ত শুরু ও আসামীদের গ্রেফতারের কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন। ভাটারা থানাসহ ডিএমপির স্থানীয় সকল ইউনিট ঘটনার অনুসন্ধান ও অপরাধীদের শনাক্ত করে  গ্রেফতারের কার্যক্রম শুরু করে।  ভাটারা থানার অফিসার-ইন-চার্জ সরাসরি ঘটনাস্থলে অন্যান্য তদন্তকারী অফিসারদের সাথে যোগদেন প্রায় সকাল সাড়ে আটটার দিকে। যদিও কাগজে কলমে মামলাটি দুপুর ১২:৩০ মিনিটে রুজু হয়, মামলার তদন্ত শুরু হয় মূলত ভোর সাড়ে ছয়টার পর থেকেই যখন গুলশান থানায় ভিকটিম রিপোর্ট করেন। মামলা রুজু করতে এ বিলম্ব পুরোটাই সংশ্লিষ্ট সকল থানার জিডি বইতে লিপিবদ্ধ রয়েছে যা আদালতে গ্রহণযোগ্য।

 

ভিকটিম কর্তৃক প্রথম পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা থেকে শুরু করে মামলা রুজু এবং তারও পরে আসামীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার পর্যন্ত যদি পুলিশি কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যাবে  এ ক্ষেত্রে শুধু তুরাগ থানাপুলিশ সামান্য  উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। ঘটনাস্থল যে কোথাও হোকনা কেন, কোন ভিকটিম যখন নিকটবর্তী কোন থানায় রিপোর্ট করেন, তখন স্থানীয় থানার কর্তব্য হল, ভিকটিম বা বাদীর কাছ থেকে একটি এজাহার/আবেদন লিখে নিয়ে  বিষয়টি জিডিভুক্ত করে একজন বিশেষ দূত মারফত সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠিয়ে দেয়া। এর সাথে ভিকটিম বা বাদী যেতেও পারেন, নাও যেতে পারেন।

 

তবে পথের দূরত্ব যখন খুবই সামান্য, তখন এক থানাপুলিশ অন্য থানাপুলিশকে বিষয়টি সহজেই অনানুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করতে পারে। অর্থাৎ ভিকটিম বা বাদীকে সরাসরি নিজ ব্যবস্থাধীনে যথাযথ থানায় পাঠিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করতে পারে। বলাবাহুল্য, উল্লেখিত ঘটনায় গুলশান থানাপুলিশ বিষয়টি ঐরূপই করেছিল। কিন্তু তুরাগ থানাপুলিশ কিছুটা উদাসীনতা দেখিয়েছিল। এটা হতে পারে গুলশান থেকে তুরাগ থানা কিছুটা দূরে কিংবা ডিউটি অফিসারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন প্রবণতা। ডিউটি অফিসার চাকরিতে নতুন কিংবা এএসআই পদের কর্মকর্তা হলে, পদ্ধতিগত বিষয়টি তার নাও জানা থাকতে পারে।

 

পত্রপত্রিকায় বা টিভি টকশোতে গারো তরুণীর ধর্ষণ ঘটনা নিয়ে পুলিশের যে উদাসীনতার কথা ঢালাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং একমাত্র তুরাগ থানা ছাড়া বাকি থানাগুলো যথাযথভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। আর ঘটনাটির গুরুত্ব বিচারে পুলিশ ইতোমধ্যেই যে তৎপরতা দেখিয়েছে তার ফলেই আসামীগণ শুধু শনাক্তই হয়নি, গ্রেফতার পর্যন্ত হয়েছে। (৩১ মে, ২০১৫)

সূত্রাবলীঃ

১. http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/53521

২. http://www.jugantor.com/last-page/2015/05/30/271315

৩.The Psychology of Crime: A Social Science Textbook(1993); Philip Feldman, Maurice Philip Feldman Cambridge University Press