ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট যখন তার এক দার্শনিক বন্ধুর  সাথে তর্কালাপে একটার পর একটা যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অসার প্রমাণ করছিলেন, ঈশ্বর বিশ্বাসী তার ভৃত্য বেচারা তখন অতি মিনতিভরা করুন চোখে এই দার্শনিকের দিকে অপলক চেয়েছিলেন। ভৃত্য তেমন শিক্ষিত নয়। তবে কান্টের যুক্তিগুলো বুঝতে পারে না –এমন  গণ্ডমূর্খও ছিলনা। তাই ভৃত্য সন্দেহ করল, হয়তোবা ঈশ্বর নেই।

 

তর্কালাপ শেষে কান্টের বন্ধু দার্শনিক চলে গেলে ভৃত্য কান্টকে জিজ্ঞাসা করল, -হুজুর, সত্যিই কি ঈশ্বর নেই?

 

ধর্মপ্রাণ হতাশ ভৃত্যের দিকে তাকালেন, দার্শনিক কান্ট। এ ভৃত্যের ঈশ্বরপ্রীতি এতটাই প্রবল ছিল যে ঈশ্বর না থাকার শূন্যতায় সে যেন পুরোদস্তর একটা ফানুসই পরিণত হয়ে পড়েছিল। ভৃত্যের দিকে চেয়ে দার্শনিকের মায়া হল। তিনি ভাবলেন, আমার জন্য না হয় ঈশ্বরের সপক্ষে যুক্তি থাকার দরকার নেই, কিন্তু এ নির্ভেজাল ঈশ্বরপ্রেমী ভৃত্যটির জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে অন্তত একটি  যুক্তি সংগ্রহ করা দরকার। ইমানুয়েল কান্ট এ ভৃত্যের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে যে যুক্তিটি তুলে ধরেছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে সেটাই এখন পর্যন্ত সর্বাধিক অকাট্য দার্শনিক যুক্তি বলে ঈশ্বরপ্রেমী দার্শনিকগণ মেনে নিয়েছেন।

 

কান্ট তার ভৃত্যের দিকে চেয়ে বললেন, হ্যাঁ, ঈশ্বর আছে।

 

সম্বিত ফিরে পেল ভৃত্য। আঁ, ঈশ্বর আছেন, হুজুর? সে জানতে চাইল।

 

কান্ট বললেন, দেখ পৃথিবীতে যদি কারো  ক্ষুধা না থাকত তাহলে কি হত?

 

কি হত, হুজুর? ভৃত্যের আকুতিভরা পাল্টা প্রশ্ন।

 

যদি কারো ক্ষধা না থাকত তবে পৃথিবীকে খাদ্যেরও কোন অস্তিত্ব থাকত না। ক্ষুধার অস্তিত্ব তাই খাদ্যের অস্তিত্বের অনুগামী।

 

পৃথিবীর আদি থেকে এখন পর্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ এক বা একাধিক ঈশ্বরের সন্ধান করেছে। ঈশ্বরকে খোঁজার জন্য মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে। ঈশ্বরকে পাবার জন্য মানুষ কঠিন সাধনা করেছে। অনেকে নিজেদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছে। ঈশ্বরের জন্য আবহমানকাল থেকে মানুষের মনে যে আকাঙ্খা, এই আকাঙ্খা ঈশ্বরের জন্য ক্ষুধারই নামান্তর। এমন কোন সমাজ নেই, এমন কোন জনবসতি নেই, এমনকি জনবসতি সম্পন্ন এমন কোন ভূখণ্ডেরও অস্তিত্ব নেই, যেখানে মানুষের মনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। তাই পৃথিবীতে খাদ্যের উপস্থিতি যেমন ক্ষুধার অস্তিত্ব প্রমাণ করে, তেমনি ঈশ্বরের জন্য মানুষের মনের নিরবিচ্ছিন্ন  আকুতি বা আকাঙ্খাই  ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।

 

এবার দার্শনিক কান্টের ভৃত্যের মনে স্বস্তি ফিরে এল। দুই চোখ দিয়ে তার অশ্রু ঝরতে লাগল।

 

মনে মনে সে আওড়াতে থাকল, আছেন, ঈশ্বর আছেন। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট যখন বলছেন, তখন সত্যিই ঈশ্বর আছেন। একটি পর্থিব ভোজের মতোই তিনি ঈশ্বরভোজে তৃপ্ত হলেন।