ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বদলির আদেশপ্রাপ্ত  বরগুনা জেলার এসপি জনাব সাইফুল ইসলাম আমার কোর্সমেইট এবং সারদার দীর্ঘ এক বছরের রুমমেইট। আমাদের কোর্সে তিনি বি-কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন। মানুষ হিসেবে তাকে চমৎকার বলে জানি। ইতোপূর্বে তিনি প্রত্যেকটি স্টেশনেই সুনামের সাথে চাকরি করেছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি(পোর্ট) ছিলেন জনাব সাইফুল। সেখানেও তার সুনাম রয়েছে। একাডেমিক ক্যারিয়ারে তিনি একজন ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ার।  বেশ কিছুদিন কাপ্তাই বিদ্যুৎ প্রকল্পেও কাজ করেছিলেন। পরে ২০তম বিসিএসএর মাধ্যমে পুলিশে এসেছেন। পারিবারিকভাবে একটি চমৎকার ঐতিহ্যের অধিকারী তিনি। পরিবারের সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সরকারি চাকরিতে সুপ্রতিষ্ঠিত।

 

সিএমপি থেকে বরগুনায় পোস্টিং হলে জনাব সাইফুল বেশ মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন। তার মা বেশ অসুস্থ ছিলেন। তাই তার ঢাকায় থাকলে ভাল হয়। কিন্তু সেই পাবনার ছেলেটিকে পাঠান হল সাগর পারের বরগুনা জেলায়।

 

কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই সাইফুল বরগুনার মানুষের মন জয় করে ফেললেন। মাত্র সাত মাসেই তিনি এমন কিছু করে বসলেন যে তার বদলির খবরে বরগুনার মানুষ তার জন্য হা-পিত্তেস করছেন। তার বদলির আদেশ বাতিলের জন্য মানব বন্ধন ও সমাবেশ করছেন।

 

খবরটি প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। খবরটি পড়ে দেখলাম, বরগুনার সিভিল সোসাইটি তাকে বরগুনায় রেখে দেয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করেছেন। তারা সাইফুলকে একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও জনবান্ধব পুলিশ অফিসার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের ভাষায়, আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের মনোভাব খুবই নেতিবাচক। কিন্তু এসপি সাইফুল ইসলাম তাদের ধারণাকে বদলে দিয়েছেন।

 

বরগুনার প্রায় ৫০টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতির সংগঠনের নেতাকর্মীগণ একত্র হয়ে গত ০৬ জুন, ২০১৫ বরগুনা শহরে এসপির বদলির আদেশ বাতিলের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির কাছে স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন।

 

আমি জানি, এ বদলিতে সাইফুল অখুশি নয়। কারণ তিনি ঢাকায় বদলি হওয়ার জন্য হয়তো চেষ্টাও করে থাকতে পারেন। কিন্তু  মাত্র সাত মাসে তিনি যে রাজধানী থেকে দূরবর্তী একটি জেলার সকল স্তরের মানুষের মনে স্থান করে নিতে পেরেছেন সেটা এ সমাবেশ থেকেই বোঝা যায়। ইতোপূর্বেও এ জেলায় অনেক পুলিশ অফিসার কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকই আমার কোর্সমেটেও ছিলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী সবার চেয়ে সাইফুলের চরিত্রে এমন কিছু আলাদা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাকে বরগুনার মানুষের কাঝে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

 

মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের চেষ্টার পাশাপাশি যদি সততা ও নিষ্ঠার গুণটি ধরে রাখা যায়, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সরকারি কর্মচারিদের দ্রুত আপন করে নেয়। পুলিশ জনগণের জন্য জরুরি সেবা দিয়ে থাকে। এ সেবা অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্পহীন। সরকারি ব্যবস্থার বাইরে অধিকাংশ পুলিশি সেবা আদায় করার কোন উপায় নেই। তাই সেব প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশের কৃপণতা জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে। অপরপক্ষে পুলিশ সদস্যদের সামান্য উদারতাই মানুষকে অতিমাত্রায় সন্তুষ্ট করে তোলে।

 

সাধারণ মানুষের ভিতরে গিয়ে অতি মামুলি বিষয় থেকে শুরু করে মানুষের জীবন-মরণের ফায়সালা করার মতো দায়িত্ব পালন করে পুলিশ। তাই একজন পুলিশ অফিসার সমভাবে মানুষের কাছে ভাল ও মন্দ উভয়ই হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষের ভাল করার চেয়ে মন্দ করার প্রবণতাই বেশি লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে ভাল করার প্রবণতা যে সহজেই মানুষের অনুমোদন লাভ করে তা আমার সহকর্মী এসপি বরগুনা, সাইফুলের পক্ষে জনসমাবেশ থেকেই বোঝা যায়।

 

একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার করে বলা ভাল। অনেক স্থানে কিছু কিছু পুলিশ অফিসারের পক্ষে জনসমাবেশের খবর পত্রিকায় আসার ইতিহাস রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষের মেকি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। আবার সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারগণ নিজেদের জনপ্রিয় প্রমাণ করতে ও নিজেদের বদলি ঠেকাতে কতিপয় সুবিধাভোগী দিয়ে তার পক্ষে সমাবেশের আয়োজনও করান। কিন্তু এসপি বরগুনা জনাব সাইফুল ইসলামের পক্ষে এ জনসমাবেশ, আমার জানা ও বিশ্বাস মতে, নির্ভেজাল।

 

আমি একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরকে অত্যন্ত জনসম্পৃক্ত বলে জানি। তিনি যে থানাতেই যান সেখানেই ্এমন কিছু কাজ করেন যা তাকে খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের মনে স্থান করে দেয়। তিনি মানুষের সমস্যার সমাধানের জন্য চেষ্টা করেন।অনেকে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, এমনও ঘটনা ঘটেছে যে কোন এক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সমস্যা সমাধান করে দেয়ার জন্য সেই ওসির পায়ে ছুঁয়ে সালাম পর্যন্ত করেছিলেন।

 

সেই ওসির ভাষ্য হল, তিনি যে পুলিশ স্টেশনে চাকরি করে বদলি হন, তার বদলির পর যে পুলিশ অফিসার ওসির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি সাধারণত ছয় মাসের বেশি সেই থানায় ওসি হিসেবে থাকতে পারেননা। এর কারণ হল, পূর্ববর্তী ওসি মানুষকে যেভাবে নিঃস্বার্থ সেবা প্রদান করতেন, পরবর্তী ওসি তা দিতেও পারতেন না; নিঃস্বার্থও হতেননা। তাই মানুষ অসন্তুষ্ট হয়ে পরবর্তী ওসির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করত যার পরিণতি হত ওসির দ্রুত বদলি।

 

আমার কোর্স মেইট বদলির আদেশ প্রাপ্ত জনাব সাইফুল ইসলামের পর রবগুনায় যে নতুন এসপি যাবেন, তার জন্য বরগুনায় কাজ করা প্রাথমিক পর্যায়ে কঠিনই হবে। কারণ বরগুনার মানুষ পূর্বের এসপিকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করবেন। তবে পরবর্তী এসপি পূর্ববর্তী এসপির অনুরূপ জনবান্ধব হলে ও সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিলে, তিনিও বরগুনার মানুষের মনে দ্রুতই স্থান করে নিতে পারবেন। একজন পেশাদার পুলিশ অফিসারের পক্ষে এধরনের পাবলিক সমাবেশ খুব বেশি স্বস্তিদায়ক না হলেও, পুলিশকে নিয়ে হাজারও বিরূপ খবরের মধ্যে এ ধরনের একটি খবর পুলিশ বাহিনীর সকল সদস্যকে নিঃসন্দেহে উদ্দীপ্ত করবে। জয়তু, এসপি সাইফুল, জয়তু আমার কোর্সমেইট-রুমমেইট। ( ০৭ জুন, ২০১৫)