ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ধর্ষণ অপরাধটি নিয়ে সাম্প্রতিক কালে প্রচার মাধ্যমের সোরগোল পড়ে গেছে। গত একমাস ধরে প্রচার মাধ্যমে যেভাবে প্রচার মাধ্যমে ধর্ষণের খবরগুলো প্রচারিত হচ্ছে তাতে যে কেউ ভাববেন যে সারা দেশ এখান ধর্ষণের অপরাধে ডুবছে। তবে গত কয়েক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যানে অপরাধ যে ঊর্ধ্বমুখি হবে সেটা বাংলাদেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও তদন্ত করার কাজে যারা নিয়োজিত তারা কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন। তবে অনেক সময় ঝানু পুলিশ অফিসারগণও  মাঝে মাঝে ভুল করে বসেন। একজন সিনিয়র পুরিশ অফিসারও মন্তব্য করে বসলেন, ইদানীং ধর্ষণের ঘটনা এত বেশি বেড়ে গেছে, যে পুলিশ ধর্ষণ ঠেকাতে হিমসিম খাচ্ছে?

 

হ্যাঁ, শুধু ধর্ষণ নয়,  গত দুমাসে অন্য প্রকার অপরাধও বেড়ে গেছে। কিন্তু এ বেড়ে যাওয়াটাও  তো অস্বাভাবিক নয়। কারণ গরমকালে বাংলাদেশে অপরাধ বাড়ে। এ বিষয়ে আমার এ ব্লগেই একটি বিশ্লেষণী পোস্ট রয়েছে। তবে এ নিবন্ধে আমরা অন্য প্রকার অপরাধ বিশ্লেষণে যাবনা। এখানে বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যাগত বিশ্লেষণে আমারদের আলোচনা সীমিত রাখব।

 

বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলাগুলোর মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এখানে শীতকালে ধর্ষণের ঘটনা কম ঘটে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি এ দেশে ভরা শীত। তাই এ দুই মাস অন্যান্য শ্রেণির  অপরাধগুলোর মতো ধর্ষণের অপরাধও কমে আসে। আমি ২০০৯-২০১৪ এবং ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত ধর্ষণের মামলাগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখেছি, জানুয়ারিতে ধর্ষণের মামলা থাকে সর্বনিম্ন। এর পর তা ক্রমান্বয়ে তা বাড়তে থাকে। এটা সবচেয়ে বেশি হয় মে মাসে। তবে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এটা খুবই কাছাকাছি থাকে। এর পর নভেম্বরে কমতে থাকে এবং ডিসেম্বরে গিয়ে এটা প্রায় জানুয়ারি মাসের ধর্ষণ মামলার সংখ্যার খুবই কাছাকাছি চলে আসে।

২০০৯-২০১৪ সময়ের গড় বিশ্লেষণ: আমরা ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের মালাগুলোর গড় পর্যালোচনা করলে দেখব ২০০৯ সালের পর ধর্ষণের মামলা বাড়তে শুরু করেছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে এ গড় সংখ্যা তিন শত এর নিচে ছিল। কিন্তু তার পরবর্তী বছরগুলোতে এ সংখ্যা  তিনশত এর উপরে চলে গেছে। তবে এ সময়ের মধ্যে গড়ে সবচেয়ে বেশি ৩১২টি মামলা রুজু হয়েছিল ২০১১ সালে।

                                            ধর্ষণ মামলার বাৎসরিক গড়

    বছর-            ২০০৯     ২০১০    ২০১১     ২০১২     ২০১৩      ২০১৪

.গড়               ২৪৮       ২৭৯      ৩১২       ৩০২       ৩০৪        ৩০৮

 

মাসিক গড় পর্যালোচনা:২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মাসভিত্তিক ধর্ষণের মামলাগুলোর মাসিক গড় নিয়ে দেখা যাবে এ ছয়/ সাত বছরের ( জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সাত বছর। জুন-ডিসেম্বর পয়ন্ত ছয় বছর) গড় হিসেবে  করলে দেখব জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এ গড় সংখ্যা ২০৯ থেকে ২৯৫ পর্যন্ত অর্থাৎ তিনশত এর নিচে। কিন্তু  এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩১০ থেকে ৩৩১ এর মধ্যে রয়েছে। এসময় সবচেয়ে বেশি ৩৩১টি মামলা রুজু হয়ছিল মে মাসে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ধর্ষণ মামলার গড় সংখ্যা আবার তিনশয়ের নিচে নেমে আসে এবং ডিসেম্বরের গড় মামলা ২২১ যা একই বছরের প্রথম মাস বা জানুয়ারির খুবই খাছাকাছি(জানুয়ারি ২০৯টি)

                                                         ধর্ষণ মামলার মাসিক গড়

  মাস         জানু:    ফেব্রু:    মার্চ     এপ্রিল     মে      জুন     জুলাই     আগস্ট    সেপ্ট:    অক্টো:   নভে:  ডিসে:

মামলা       ২০৯      ২৪৪      ২৯৫     ৩২২     ৩৩১    ৩২৪    ৩২৫      ৩১০      ৩২৪       ৩২৯   ২৮৬    ২২১

 

 ২০১৫ সালের মে মাসের ধর্ষণ পর্যালোচনা: পূর্বেই বলেছি যে মে মাসে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হত। ২০১৫ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত সাত বছরের গড়ে দেখা গেছে সর্বোচ্চ  মামলা হয় মে মাসে।  চলতি বছরেও তাই ঘটেছে। গত মে মাসে দেশে ধর্ষণের মামলা হয়েছিল ৩৭৮টি। যদি এপ্রিলের তুলনায় সংখ্যা ৬২টি বেশি।  কিন্তু গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে মাত্র  ৬টি মামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। যে দেশে প্রতি বছর ১৯ লাখ লোক বৃদ্ধি পায়, সেখানে এক বছরে ৬টি মামলা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

পরিসংখ্যান পুরো সত্য প্রকাশ করেনা:সমাজে যত অপরাধ সংঘটিত হয়, পুলিশের খাতায় তার সবগুলো নিবন্ধিত হয়না। অপরাধ পরিসংখ্যানের এ অন্ধকার দিকটি পৃথিবীর সব দেশেই অপরিহার্য বাস্তবতা। নানা প্রকার বাস্তব, অবাস্তব, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় কারণে মানুষ যেমন সব অপরাধ পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে আসেনা, তেমনি পুলিশ তাদের গোচরে আসা সব অপরাধই আমলে নিয়ে থানায় মামলাও রুজু করেনা। সাধারণত কোন সমাজে সংঘটিত অপরাধের এক তৃতীয়ংশ থানায় এসে মামলায় রূপ নেয়। উন্নত দেশগুলোতেও এ গড়পড়তা সংখ্যাটি সত্য। তবে আমাদের মতো দেশে এটা আরো বেশি সত্য। আমার মতে, বাংলাদেশে এক তৃতীয়াংশ নয়, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ অপরাধ থানায় নিবন্ধিত হয়।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধ গোপনের বিষয়টি আরো বেশি ভয়াবহ। কেবল অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নয়, উন্নত দেশ ও অগ্রসর সমাজেও ধর্ষণের অপরাধ সহজে পুলিশের কাছে আসেনা। এর কারণ বহুবিধ। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হল, এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর লাভের চেয়ে লোকশানের হারই বেশি। চোর-ডাকাত তো অর্থলুট করে, কিন্তু ধর্ষকগণ ইজ্জত লুট করে। অর্থ সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু ইজ্জত ফিরে পাওয়া যায়না। অর্থ সম্পদের পুনর্বিক্রয় বা রিসেল ভ্যালু আছে, কিন্তু ইজ্জতের রিসেল ভ্যালু নেই। ধর্ষিতা নারী সমাজে অপূর্ণাঙ্গ নারী হিসেবেই বিবেচিত হয়। এটা সৌদি আরবের মতো গোড়া মুসলিম দেশে যেমন সত্য, তেমনি যুক্ত রাষ্ট্রের মতো মুক্ত বিশ্বেও সত্য।

আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে থানা-পুলিশের কাছে ধর্ষণ ঘটনার নিবন্ধনের হার  সারা বিশ্বে সর্বাধিক। কিন্তু তারপরও প্রতি দশটি ধর্ষণ ঘটনার মধ্যে মাত্র একটি ঘটনা পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ হয় বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সেদেশের নিবিড়ভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকৃত শতকরা ৪০ জন নারী একটি নির্দিষ্ট সময়ে অন্তত একবার হয় বলপূর্বক ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এ থেকে গবেষকগণ ধারণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে সংঘটিত ধর্ষণ ঘটনাগুলোর খুব সম্ভবত শতকরা এক ভাগ পুলিশের খাতায় রেজিস্ট্রি হয়।

 

ভবিষ্যতে ধর্ষণ কমলেও মামলা বাড়বে:আমার এ ভবিষ্যদ্বাণী অনেকের কাছেই বেখাপ্পা ঠেকবে। কেউ কেউ ভাববেন, পুলিশ ধর্ষণের অপরাধ কমানোর পরিবর্তে বাড়ানোর ভবিষ্যদ্বাণী করে কিভাবে? কিন্তু এটাই সত্য। কোন সমাজে সংঘটিত অপরাধগুলো পুলিশের গোচরে না আসার প্রধানতম কারণ হল, পুলিশের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস ও অসহযোগিতা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে আরো একটি শক্তিশালী অনুসঙ্গ হল, একটি মুসলিম সমাজে নারীদের অধঃস্তন অবস্থান।  পুলিশকে হাতের কাছে না পাওয়ার বিষয়টিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু বাংলাদেশে উপর্যুক্ত তিনটি কারণই দ্রুত বিদূরিত হচ্ছে। জনগণ ক্রমান্বয়ে পুলিশমুখি হচ্ছে। সমাজে নারীর অবস্থান দ্রুত উন্নত হচ্ছে। তাছাড়া পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পুলিশ স্থাপনাগুলো ক্রমান্বয়ে মানুষের দোরগোড়ায় চলে যাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ সাংগঠনিকভাবে নিজেরাও জনগণের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা অব্যহত রেখেছে। এমতাবস্থায়, পূর্বে যে বিষয়গুলো পুলিশের নজরে আসতনা কিংবা জনগণ থানায় মামলা করতে যেতনা সেগুলো এখন দ্রুত পুলিশের খাতায় চলে আসবে। তাই পুলিশের খাতায় নিবন্ধিত অপরাধের সংখ্যা অবশ্যই বেড়ে যাবে যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাগুলোও থাকবে। তবে এ থেকে এটা প্রমাণিত হবেনা যে সমাজে ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাবে। বরং পূর্বের চেয়ে প্রকৃত অপরাধ কমে গেলেও পুলিশের খাতায় অপরারধ নিবন্ধন বাড়বে। পুলিশের খাতায় অপরাধ নিবন্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি কোন সমাজের মানুষের ন্যায় বিচারে প্রবেশগম্যতার একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবেই পরিগণিত হয় যা  বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সূত্রাবলীঃ

১. http://www.police.gov.bd/Crime-Statistics-comparative.php?id=208

২. The Psychology of Crime: A Social Science Textbook By Philip Feldman, Maurice Philip Feldman

৩. পরিসংখ্যান সেল, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

৪.Changing Policing Theories for 21st Century Societies(2005), Second Edition, by Charles Edwards ; The Federation Press