ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

জনাব সিকান্দার আলি পুলিশের এসআই পদে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৪৪ সালে। সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিক। এরপর ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তিনি স্থানান্তরিত হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ বিাহিনীতে। এরপর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে হল বাংলাদেশ। জনাব সিকান্দার আলী বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন ১৯৭৮সালে। তখন তিনি পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন পুলিশ সুপার। পুলিশে চাকরি করেছিলেন দীর্ঘ ৩৩ বছর। তিনি তিনটি পতাকার তলে চাকরি করেছিলেন তিনি। তিনি ব্রিটিশ দেখেছেন, পাকিস্তান দেখেছেন এবং বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার অধীন চাকরি কেরেছেন।

অবসর জীবনে সিকান্দার আলী ‘‌আমার পুলিশ-জীবন’ নামে একিট বই লিখেছিলন। গ্লোব লাইব্রেরি (প্রা)  লিমিটেড থেকে প্রকাশিত বইটিতে প্রকাশনার তারিখ লেখা নেই। তবে এটা যে ১৯৭৮ সালের পরে সম্ভবত আশির দশকের প্রথম দিকেই বের হযেছিল সেটা অনুমান করা যায়।

পুলিশ অফিসারদের লেখা বস্তুনিষ্ঠ বইয়ের সংখ্যা অতিন গণ্য। গোটা চাকরি জীবনে যারা লক্ষ লক্ষ পাতার প্রতেবেদন তৈরি করেন, যাদের প্রতিবেদনে অরপরাধীরা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলে কিংবা নিপরপরাধ প্রমাণিত হয়, তারা একটি শত পৃষ্ঠার বইও লিখতে পারেননা। সেদিক দিয়ে জনাব সিকান্দার আলী পিপিএম একজন ব্যতিক্রমী পুলিশ অফিসারই বটে।

 

ব্রিটিশ আমলে চাকরিতে প্রবেশ করে বাংলাদেশ দেখে মৃত্যুবরণ করেছেন এমন মাত্র তিনজন পুলিশ অফিসারের বই আমি পেয়েছি। এদের একজন অতি পরিচিত কাজী আনোয়ারুল হক। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কাজী ইমদাদুল হকের ছেলে। ১৯৩৩ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করে তিনি ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল নিযুক্ত হয়েছিলেন। তারপর হয়েছিলেন সচিব। তিনি আইয়ুব খানের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি বাংলাদেশ আমলে তিনি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। তাই পুলিশ অফিসা হিসেবে অবসর নিলেও টেকনোক্র্যাট হিসেবে রাজনীতিতেও তার পদচারণা ছিল।  আনোয়ারুল হকের  লেখা আন্ডার থ্রি ফ্ল্যাগ বইটি আমাদের ইতিহাসেরও মূল্যবান সম্পদ।

 

এর পরে আছেন জনাব সাদত আলি আখন্দ। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্বের একজন উল্লেখযোগ্য লেখক। যখন ‘দারোগা ছিলাম’, ‘তের নম্বরে পাঁচ বছর’সহ তার বেশ কিছু লিখা ব্রিটিশ বঙ্গ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্বের ইতিহাস সম্মৃদ্ধ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্র খ্যাত এম আখতার মুকুলের বাবা।

তবে এতিন জন লেখকের মধ্যে সিকান্দার আলীই স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের চাকরি করেছিলেন। অন্যরা পুলিশ জীবন শেষ করেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বেই। এমতাবস্থায় সিকান্দার আলীর ‘আমার পুলিশ-জীবন’ বইটিতে  তিনটি পৃথক আমলেরই চিত্র পাওয়া যাবে।

 

আমার পুলিশ-জীবন বইটির সূচনা হল ১৯৪৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর লেখকের খুলনা থেকে পুলিশ একাডেমি সারদা যাওয়ার ঘটনা দিয়ে। বইটি শেষ হয়েছে ১৯৭৮ সালের ৩০ অক্টোবর লেখকের অবসরে যাওয়ার দিনটির ঘটনা দিয়ে। দীর্ঘ তেত্রিশ বছরের বহু ঘটনা ও সেগুলোর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে এ বইটিতে। তবে আমরা সবগুলো বিষয় নিয়ে নয়; মাত্র একটি বিষয় নিয়ে এখানে আলোকপাত করব। এটা হল সেই সময়ের পুলিশের দুর্নীতি।

বইটির গোড়ার দিকেই লেখকের প্রথম পুলিশি কাজের অভিজ্ঞতায় কিভাবে ঘুষ সংগ্রহ করা হয় তার বর্ণনা রয়েছে। শিক্ষানবিশ এসআই থাকা অবস্থায় লেখকের উপর দায়িত্ব পড়ল একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের। বর্ধমানের মহারাজার কাছারি বাড়ির ম্যানেজারের পুত্র কোলকাতায় অপরাধ করে বর্ধমানে পালিয়ে এলে তাকে গ্রেফতারের জন্য কলকাতা পুলিশ থেকে ওয়ারেন্ট আসে। লেখক সেই পরোয়ানা তামিল করতে যান। কাছারি বাড়িতে গেলে অভিযুক্তের পিতা তার সাথে কিরূপ আচরণ করেন ও কিভাবে তার ছেলেকে গ্রেফতার না করতে ৫০ টাকা ঘুষ দেন তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে-

ভদ্রলোকের (অভিযুক্তের পিতার) বয়স ষাটের কোঠায়। মুখের স্বাভাবিক ভাবটা বদলে গিয়ে একটু বিচলিত হলেন। সযত্নে বসিয়ে দুচারটা কথা বলে আপ্যায়ন করার পর কাছে এসে আস্তে আস্তে বল্লেন, ‘ও বাড়ি নাই। আপনার কষ্ট করে আসার দরকার হবে না। কোর্টে হাজির হয়ে যাবে।’ এই বলে আমার হাতে ৫০টি টাকা দিয়ে আবারও অনুনয় করে বল্লেন, ‘এই দয়াটুকু করুন’।

এ হল লেখকের নেয়া প্রথম ঘুষ। এ ঘুষগ্রহণের ঘটনাকেও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন:

 

‘কোন কেসের কোন কাগজের কতখানি ওজন তাও বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এটা আমার জানা হয়েছে থানার বাবুরা কিছু কিছু উপরি পান। এতে কতটা দোষ আছে, না কৃতিত্ব আছে তা না বুঝেই টাকাটা পকেটে নিলাম। মাসিক বেতনের টাকা ছাড়াও বাড়িত টাকা পেয়ে আমার বেশ ভালই লাগল। এ বিদ্যায় এই প্রথম।

এছাড়াও বিভিন্ন কাজের তদরারক কতে গিয়ে তিনি শিক্ষানিবশ অবস্থাতেও কিছু কিছু বাড়তি রোজগার করতেন। আর এ কাজে কোথায় কিভাবে ঘুষ নিতে হবে বা পাওয়া যাবে, তা ঝানু পূর্বসূরীগণ শিখে দিত। তারপর তিনি একাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তা চাকরি জীবনের প্রায় প্রথম সাড়ে তিন বছর চালু রাখেন। তবে একজন ঘুষখোর পুলিশ অফিসার কি কারণে ঘুষ গ্রহণ বাদ দিয়ে সৎ জীবনে ফিরে এলেন এ সম্পর্কেও কৌতুহলোদ্দীপক কাহিনী রয়েছে যা আমরা পরে জানব। এবার ঘুষ সম্পর্কে লেখকের বিশ্লেষণগুলো জেনে নেই:

আমার বয়স তখন ২৬ বছর। সংসারে আমি আর আমার স্ত্রী। বেতন পেতাম ৮০ টাকা। বাড়ি ভাড়া ২০ টাকা, সাইকেল এলাউন্স ৫ টাকা। রেশনে পেতাম ৭ সের তেল বা ঘি বা অলসন্স বাটার, চাল, ডাল, চিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে। দুধের বিল বাবদ মাসে পেতাম ৪/৫ টাকা। সর্বমোট যে টাকা এবং সুযোগ-সুবিধা পেতাম তাতে বালভাবেই চলতো। মাসে ৪০/৫০ টাকা পোস্ট অফিসে জমা রাখতাম। তখন ব্যাংক ছিল না। পৃষ্ঠা-৪৭

 

লেখকের বর্ণনা থেকে বোঝা যাবে সেই সময় পুলিশের দারোগাগণ যা বেতন পেতেন তা নিতান্তই কম ছিলনা। মাসিক বেতন আশি টাকা হলেও বাড়িভাড়া ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম ছিলনা। তাই স্বামী-স্ত্রী মিলে দুসদস্যের সংসার চালিয়ে তিনি ৪০/৫০ টাকা জমা করতে পারতেন যা তার মাসিক মূল বেতনের অর্ধেকের বেশি ছিল। যদি বর্তমান আমলের কথা ধরি, তাহলে বোঝা যাবে সেই সময় পুলিশের বেতন নগণ্য হলেও জীবন যাত্রায় ব্যয় ছিল অল্প। তাই পুলিশ ঘুষ না খেয়েও দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল। লেখকের ভাষায়:

তবুও কেন এই অদৃশ্য আয়ের প্রবণতা? কেন এই লোভ? এটা কি অভাব? না স্বভাব? নাকি পারিপার্শ্বিকতা? নাকি অধিক বিলাসিতার প্রবণতা? আর যাই হোক না কেন ‘অভাব’ আমি স্বীকার করতে রাজি না। অভাবের কোন পূরণ নাই। চাহিদার কোন শেষ নাই। হতে পারে পারিপার্শ্বিকতা। তার থেকে অভ্যাস। অভ্যাস থেকে স্বভাব।( পৃষ্ঠা-৪৭)

 

অর্থাৎ আর্থিক সংকটের কারণে সরকারি কর্মচারীগণ ঘুষ গ্রহণে বাধ্য হওয়ার যে প্রচলিত বিশ্বাস লেখক তা স্বীকার করেননা  তার মতে সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ গ্রহণের সাধারণ সূত্রও নয়। তিনি এটাকে পারিপার্শ্বিকতা ও অভ্যাসের বিষয় বলে মনে করেন। তবে কি কি কারণে পুলিশ কর্মচারীগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন তার একটা ব্যাখ্যা বইটিতে পাওয়া যাবে-

প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। কাজের ধরন ভিন্ন। সুযোগ-সুবিধা ভিন্ন। যে ধরনের কাজ করা হয় এবং যে ধরনের লোকের সাথে মেলামেশা হয় বা যা দেখা যায় বা শোনা যায়, অনুভব করা যায়, চরিত্রও অনেকাংশে সেইভাবে গড়ে ওঠে। পুলিশের কাজ-কর্ম ভিন্ন, চালচলন ভিন্ন, সুযোগ-সুবিধা অনেক। এখানে উপরি আয়ের প্রচলন প্রথা ও সুযোগ বহু পূর্ব থেকে ক্রমাগত চলে আসছেন। কাজেই যারা পুরাতন তারা আগে থেকেই অভ্যস্ত হয়ে আসছেন। যারা নবাগত তারা পরিষ্কার মন নিয়ে ডিপার্টমেন্টে ঢুকেই পুরাতনদের সংশ্রবে আসেন। নানান রকম গল্প শোনেন, বহু ঘটনা চোখে দেখেন, অনেক কিছু অনুভব করেন, তাই তাদের চরিত্রও বহুলাংশে ঐভাবে গড়ে ওঠা স্বাভাবিক। ডিপার্টমেন্টাল ট্রেনিং এর সাথে ঐসব ট্রেনিংও এস যায়। তাদের অজান্তে, অজ্ঞাতে, পরোক্ষভাবে। এ কথা অনস্বীকার্য। ক্রমান্বয়ে তাদের ঐ পথ ধরাই স্বাভাবিক। যদি নবাগতরা ডিপার্টমেন্টে পা দিযে দেখতে পেতেন সবা্‌ই পাকসাফ, উপরি আয়ের কোন প্রচলন নাই, তবে নিশ্চয় দুর্নীতি তাদের মনে স্থান পেতো না; মন প্রলুব্ধ হতো না। এই সর্বনাশা ব্যাধি তাদের কচি মনকে আক্রমণ করতে পারত না। পৃষ্ঠা-৪৭/৪৮

এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে লেখক পুলিশ বিভাগের উপ-সংস্কৃতিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। একজন পুলিশ অফিসারের উপর বাইরে যে প্রভাব তার চেয়েও বেশি প্রভাব পড়ে তার ভিতরের সংস্কৃতির। ব্রিটিশ ভারতের পুলিশই শুধু নয়, প্রত্যেক সেক্টরেই ক্রমান্বয়ে একটি ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিসের কর্মকতারা একজন পুলিশ কনস্টেবলের চেয়ে প্রায় ৬শত গুণ বেশি বেতন পেতেন। তারপরও ছিল তাদের নানা প্রকার সুযোগ সুবিধা। কিন্তু নিম্ন পদস্থদের বেতন ছিল নেহায়তই সামান্য। যদিও ভারতীয় মানদণ্ডে এটা খুব নগণ্য ছিলনা, তবুও এই সিনিয়র জুনিয়র বা বিলেতি-ভারতী বিভেদ তা অনেক দেশি কর্মচারিকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে মানসিক যুক্তি যোগাত।

 

সেই সময় পুলিশের সিনিয়র অফিসারগণ ঘুষ গ্রহণ করতেন না। কেবল পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে দারোগা বা এসআই পর্যন্ত পদের কর্মকর্তাগণই ঘুষ গ্রহণে অভ্যস্ত ছিলেন। সেই সময় থানার অফিসার-ইন-চার্জ ছিলেন একজন সিনিয়র এসআই। ইন্সপেক্টরগণ সাধারণভাবে হয় সার্কেলে নয়তো কোর্ট পুলিশ বা অন্যান্য শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। ইন্সপেক্টর হলে তারা নিজেদের সিনিয়র অফিসারের সমমর্যাদায় ভাবতেন। আর এজন্য ইতোপূর্বে যাই করে থাকুন না কেন পদের মর্যাদা রক্ষার জন্য ঘুষ গ্রহণ করতেন না। বিষয়টি লেখক এভাবে বর্ণনা করেছেন:

সেদিনে পুলিশকে উপরি পয়সা দেওয়া-নেওয়া দারোগা পর্যন্ত সীমাব্ধ ছিল। তার উপরে বড় একটা শোনা যায়নি। যারা অর্থলোভী বা যারা মনে করতেন বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চলবে না বা ভোগ-বিলাসের ব্যাঘাত হবে তারা ইন্সপেক্টর হতে চাইতেন না বলে পরীক্ষাও দিতেন না। দারোগায় ভর্তি হয়ে দারোগায়ই অবসর নিতেন।  কিন্তু একবার ইন্সপেক্টর হলে আর ওপথে পা বড়াবার রেওয়াজ ছিল না। ঐ পদে  অধিষ্ঠ থেকে উপরি আয় গ্রহণ করা লজ্জাকর। বৃটিশ আমলে এটা প্রচলন ছিল। এমন কি পাকিস্তান হবার পরও এই হাওয়া চলছিল। পৃষ্ঠা-৫১

 

এ প্রসঙ্গে লেখক একটি বাস্তক গল্পের অবতারণা করেছেন:

একটি কেসের বাদীর সঙ্গে খুলনা জেলায় কোন এক থানার ওসির সঙ্গে লেনদেনের কথাবার্তা ঠিক হয়। ৫০% টাকা আগেই দিয়ে দেয়। বাকি টাকা কার্য শেষে দিবে। ইত্যবছরে ওসি প্রমোশন পে ইনে্সপেক্টর হলেন। বাদী পড়্গ এ খরবর জানতেন না। পূর্বের কথামত একদিন তার বাসায় কাকি টাকাটা দিতে গেলে তিনি লজ্জিত হয়ে বল্লেন, ছি! আপনি জানে না আমি ইন্সপেক্টর হয়েছি? ও টাকা আমি আর স্পর্শ করতে পারিনা। (পৃষ্ঠা-৫১)

পুলিশ বিভাগের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে নিজে এ ব্যধি থেকে কিভাবে মুক্ত হলেন তার একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। তার বর্ণনায় জানা যায় তিনি দুর্নীতিমুক্ত হয়েছেন তার স্ত্রীর চাপে পড়ে। তার স্ত্রী লেখকের সকল খবর রাখতেন। মাসিক বেতনের টাকা তিনি তার স্ত্রীর হাতেই দিতেন। স্ত্রী তা মিতব্যায়ীতার নীতিতে খরচ করতেন। কিন্তু যখন তার হাতে ঘুষের টাকা আসত তিনি সেটা আর লুকাতে পারতেননা। তাই স্ত্রীর কাছে ধরা পড়তেন। তার স্ত্রী তাকে ঘুষ গ্রহণে শুধু নিরুৎসাহিতই করতেন না, রীতিমত তিনি এটা প্রতিহত করতেন। তিনি পুনর্বার ঘুষ গ্রহণ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞাও করাতেন। কিন্তু ঘুষ একটি নেশার মতো। তিনি এ থেকে মুক্ত হতে পারতেননা। তাই সংসারে চলত অশান্তি। লেখক একাধিক বার ঘুষ গ্রহণ করবেন না বলে প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন। কিন্তু সে প্রতীজ্ঞা রাখতে পারেননি। তার ভাষায়, ‘এ বড় কঠিন ব্যাধি। চিকিৎসা করা বড়ই কঠিন’। তবে সংসারে শান্তি বজায় রাখার জন্য তাকে শেষ পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ চিরতরে বন্ধ করতে হয়েছে।  এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন:

 

চাকরিতে কনফার্মড হওয়ার পর অর্থাৎ দফতর পাওয়ার পর এ কাজে হাত পাকা হতে থাকে। এ সময় আমার স্ত্রীর চোখে ধরা পড়লাম। তিনি ভীষণভাবে আপত্তি তুললেন। ও পথে যেতে পারবে না বলে আমাকে প্রতীজ্ঞা করালেন এবং সোজা ভাষায় বলে দিলেন, আমাকে যদি তোমার কাছে রাখতে চাও তবে দুর্নীতি বন্ধ করবে এবং হালাল রুজি খাবে। যেমন করে সিগারেট খাওয়া বন্ধ কারা হয়েছে অমনি করে এটাও বন্ধ করা হবে। (পৃষ্ঠা-১০৭)

জনাব সিকান্দার আলী এর পরও প্রায় ত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছিলেন। কিন্তু ঘুষ খাননি বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েননি। কিন্তু দুর্নীতি করেননি বলে তিনি ও তার স্ত্রী জীবনে যেমন অসুখী ছিলেননা তেমনি বস্থগত বিষয়ে অতৃপ্তও ছিলেননা। তার ভাষায়, ‘আমার যতটুকু সামর্থ্য তার মধ্যেই তার(স্ত্রী) চাহিদা সীমাবদ্ধ রেখেছেন। জীবন সায়াহ্নে হিসাব করলে দেখা যায় আলস্নাহর ইচ্ছায় আমাদের সব ইচ্ছা পূরণ হয়েছে’।

জনাব সিকান্দার আলী পুলিশ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। তার বইয়ের ভাষায় পুলিশের ঘুষ দুর্নীতি ক্রমশঃ নিম্ন পর্যায় থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু আর্থিক সংকট বা নিম্ন বেতনের জন্যই যে সরকারি কর্মচারীগণ ঘুষ গ্রহণ করেন সেটা লেখক যেমন বিশ্বাস করতেন না, তেমনি  অপরধা বিজ্ঞানী, জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিজ্ঞানীরাও মনে করেননা। তার মতে  ঘুষ গ্রহণএকটি ‘পারিপার্শ্বিকতা’।  এ পারিপার্শ্বিকতা  থেকে আসে  অভ্যাস।  আর এ ঘুষ গ্রহণের অভ্যাসটি শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়। আমার মনে হয়, ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে জনাব সিকান্দার আলীর এ মূল্যায়ন একজন প্রতিষ্ঠিত সমাজ বিজ্ঞানীর মূল্যায়নের চেয়েও গভীর ও সত্য।