ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

হিরজিদের পরিচয়

১৯৫০ সালের ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত-পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন দেশ হয়েছে মাত্র তিন বছর আগে। ঢাকা তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী। তাই এর উন্নয় হচ্ছে দ্রুততর। উন্নয়নকে ঘিরে ঢাকায় শিল্পপতিদের আনা গোনা বেড়েছে। এ সময় রওশন আলী হিরজি নামে একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি ব্যবসার উদ্দেশ্যে কোলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন।  জনাব হিরজির পৈত্রিক বাড়ি গুজারাটে, কিন্তু নিজের জন্মস্থান জাপান। তিনি একজন প্রতিপত্তিসম্পন্ন প্রভাবশালী ধনী ব্যবসায়ী। আগাখানী সম্পদায়ের মধ্যে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব। এখানে এসে ব্যবসার নানান ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেন। ঢাকা নতুন প্রাদেশিক রাজধানী হয়েছে। ডেভেলাপমেন্ট তো হবেই। নতুন নতুন কনস্ট্রকসন হবে।  দরকার হবে ইঁটের। তাই তিনি বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সিরামিক ব্রিক্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার মনস্থ করলেন।

হিরজির ব্যবসা পরিকল্পনা

পূর্ব পাকিস্তানে ইঁটের ব্যবসা তখন একেবারেই নতুন। মাকের্ট ভাল। লাভও যথেষ্ঠ। তবে ইঁটের কারখানা করতে হলে শহর থেকে তা একটু দূরে হওয়া উচিত। তাই জনাব হিরজি জায়গা বেছে নিলেন মিরপুর।  এখানকার মাটি ভাল। জায়গার কোন দুর্ভিক্ষ নাই। সেদিনে প্রচুর জায়গা পড়ে ছিল। একেবারে পানির দামে কিনলেন ৩০০ বিঘা। মিরপুর তখন জনমানবিহীন বললেই চলে। মাজারের ওখানে দু’চারজন লোক দেখা যেত। রাস্তার আশেপাশে কিছু কিছু বিহারী রিফিউজি কয়েকটি ছাপড়া ঘর তুলেছিল মাত্র। একটি মাত্র রাস্তা ছিল তাও কাঁচা। টিলায় টিলায় শুধু কাঁঠাল গাছ আর ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ।

মিরপর রোডের জন্ম

তখন ঢাকা থেকে মিরপুর অনেক দূরপাল্লার রাস্তা। রোজ রোজ সেখান থেকে এসে ফ্যাক্টরি দেখশুনা অসুবিধা। ফ্যাক্টরিতে আসার অন্য কোন রাস্তা ছিল না। তাই হিরজি সাহেব নিজ খরচে রাস্তা করে নিলেন।বছর খানেকের মধ্যে হিরজি সাহেব ফ্যাকটিরর পাশেই বসবাসের জন্য সুদৃশ্য বাংলোও তৈরি করলেন। শ্রমিক, কর্মচারী, দারোয়ান নিয়োগ হলো। তাদের থাকার জায়গা ফ্যাক্টরির কাছে কাছেই হলো। তবে একই সাথে ফ্যাক্টরি ও বাংলো পাহারা দেওয়ার জন্য বাদশা খান নামে একজন পশ্চিমাকে দারোয়ান নিয়োগ করা হল।

জমে উঠল ইঁটের ব্যবসা

কিছুদিনের মধ্যে প্রোডাকশন শুরু হলো। আস্তে আস্তে চাহিদা বাড়লো। ব্যবসা জমে উঠলো। কোলকাতা থেকে হিরজি সাহেবের ফ্যামিলি ঢাকায় বসবাসের জন্য এলেন। ফ্যামিলি বলতে হিরজি সাহেবের স্ত্রী মিসেস গুলশান হিরজি, শ্যালক আমান ভেলাইন, নাবালক একটি ছেলে ও দু’টি মেয়ে, আর ছিলেন হিরজি সাহেবের এক বয়স্ক ভগ্নী। মিসেস হিরজি ছিলেন একজন গুণান্বীত সুশিক্ষিতা এবং রুচিসম্পন্না মহিলা। সুটিং- এ তা হাত পাকা ছিল। তার ভাই মিঃ আমান ছিলেন একজন কার্যনির্বাহক। ফ্যাক্টরি দেখাশুনার কাজ তিনিই বেশি করতেন। কারণ হিরজি সাহেব তো কোলকাতা-ঢাকা-করাচী কার্যোপলক্ষে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতেন।

বেয়াড়া দারোয়ান বাদশা খান

ব্যবসায় প্রসার জমে উঠলো। শ্রমিকরা প্রায় সবাই অনুগত ছিল। কেবল দারোয়ানটা ছিল বেয়াড়া। তার কার্যকলাপ সন্তোষজনক ছিল না। কয়েকবার হুঁশিয়ার করা সত্ত্বেও  সে সোধরালো না। শেষ পর্যন্ত মিঃ আমান তাকে ডিসমিস করলেন। মিঃ হিরজি তখন কোলকাতায়। দারোয়ান ওখান থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় এসে কি একটা কাজে গেলে গেল। আপাততঃ ফ্যাক্টরি এবং বাংলোতে কোন দায়োরান থাকলো না। রাত্রিতে বাড়ি অরক্ষিত অবস্থায় থাকে।

হিরজি পরিবারের অমানিশা

১৯৫৭ সাল। ১৭ই জানুয়ারী রাত ৯টা। হিরজি পরিবারের জীবনে নেমে এলো এক কালো রাত্রি। নৈশভোজের জন্য হল রুমে টেবিলে খেতে বসেছেন মাত্র, এমন সময় দুই তিনজন দুর্বৃত্ত সন্তর্পণে ঘরে ঢুকেই বন্দুকের গুলীতে প্রথমে ভূপাতিত করলো মিসেস গুলশানকে। কারণ তিনি ছিলেন একজন ভাল শিকারী। একবার যদি তার রাইফেলটি হাতে নেবার সুযোগ পেতেন তবে কারো রক্ষা ছিল না। এই হেতু প্রথম টার্গেট হলো মিসেস গুলশান হিরজি। তারপর তার ভ্রাতা মিঃ আমানকে লক্ষ করে গুলি ছোড়া হলে তিনি দৌড়ে শয়ন কক্ষে ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারলেন না। ঘাতকের গুলিতে দরজার মুখেই পড়ে গেলেন। বাইরে বোধ করি আরো লোক ছিল। ঘরের মধ্যে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। তারপর শয়ন কক্ষের মধ্যে ঢুকে আলমারীর ড্রয়ার ভেঙে মূল্যবান অলষ্কারাদি এবং টাকাপয়সা লুট করে চম্পট দিল ডাকাতদল। ডাকাতদের চেনার বা বাধা দেবার মতো কেউ ঘরে ছিল না। শুধুমাত্র হিরজি সাহেবের দুইটি শিশু। মিঃ হিরজি তখন কোলকাতায়।

সিআইডির মুভ এট ওয়ান্স

পরদিন খবরের কাগজে বড় বড় হরফে ছাপা হলো, “শহরের উপকন্ঠে সশস্ত্র ডাকাতি। দুইজন খুন।” সংশ্লিষ্ট মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। আগাখানী সম্প্রদায়ের লোকেরা উপর মহলে ঘন ঘন টেলিফোন করতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের টনক নড়লো। তেজগাঁ থানার পুলিশ দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। মিরপুর থানা তখনও যাত্রা শুরু করেনি। এই এলাকা ছিল তেজগাঁ থানার অধীন। উপরের মহল থেকে সি. আই. ডি. এক্সপার্টদের উপর নির্দেশ এলো ‘মুভ এ্যাট ওয়ান্স’। সঙ্গে সঙ্গে সিআইডির সকল সেকশনের এক্সপার্টগণ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মালমশলা নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে রওয়ানা হলেন।

খুনসহ ডাকাতির পর হিরজির কারখানা ও বাংলো একেবারে নির্জন হয়ে পড়েছে। আশেপাশে কোথাও মানুষের গন্ধ নাই। মিরপুরে তখনও বসতি হয়নি। জঙ্গলে ভর্তি। রাতে কেন, দিনের বেলায়  ডাকাতি করলেই বা কে ঠেকায়?  কী চমৎকার বাংলো! মাঝখানে বড় হলরুম। তিন পাশে সংলগ্ন বেডরুম। সামনের দিক দিয়ে ঢোকা এবং বাইরে যাবার পথ। ঐ পথ ছাড়া আর কোন দিক দিয়েই বের হবার পথ নাই। হলরুমের মধ্য দিয়ে বেডরুম যেতে হবে অনেকটা স্টিমারের প্রথম শ্রেণির সেলুনের মতো।

করুণ হত্যার ঘটনাস্থল

সিআইডির এক্সপার্টগণ ঘরের মধ্যে ঢুকে রাতের খাবার টেবিলের উপর বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে থাকতে দেখলেন। পোলাও-এর সঙ্গে মটরশুটি। প্লেট, চামুচ, গ্লাস ওলট-পালট হয়ে আছে। ঘরের মেঝের উপর জমাট বাঁধা রক্ত। দেওয়ালে ছররার দাগ। এখানে সেখানে রক্তের ছিটেফোঁটা। চেয়ার টেবিল এদিক ওদিক চিৎ-কাত হয়ে আছে। ঘরের ভিতর আলমারী খোলা। ড্রয়ার বের করা।কাপড় চোপড় বিক্ষিপ্ত ছড়ানো। কী ভয়াবহ সে দৃশ্য! নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড সিআইডর গোয়েন্দারও যেন বিষন্ন হয়ে পড়লেন।  সিআইডি গোয়েন্দাদের পৌছবার পূর্বেই তেজগাঁ থানার পুলিশ মৃতদেহ সাক্ষাৎকারের জন্য সরিয়ে নিয়েছিল। ঘটনাস্থলের ফটো যে অবস্থায় ছিল ঐ অবস্থায়ই নেওয়া হল। পায়ের রক্তাক্ত ছাপ কাঁচের উপর আঁকা হল। আঙ্গুলের ছাপ যা পাওয়া গেলা তুলে নেওয়া হলো। একে একে সমস্ত দৃশ্যের ফটো নেওয়া হলো।

সিআইডিতে মামলা এল

এই কেসটি রেকর্ড হলো তেজগাঁ থানায় পাকিস্তান দন্ডবিধি ৩৯৬ ধারা মতে। থানার দারোগা হিমসিম খেয়ে গেল। বিলম্ব না করে সিআইডি তদন্তভার গ্রহণ করলো এবং ইন্সপেক্টর জনাব মকবুল হোসেনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো। দুই একদিন পর ব্যালেসইটকস এক্সপার্ট, জনাব সাদেক আলীকে সঙ্গে নিয়ে একজন উর্ধ্বতন অফিসার ঘটনাস্থল দেখতে এবং প্রাথমিক তদন্ত পরিদর্শনে গেলেন। দেওয়ালে গুলীর চিহ্ন দেখে শর্ট গানের গুলি বলে এক্সপার্ট মন্ত্রব্য করলেন।

প্রথম দুই সন্দিগ্ধ

এখানে বলা প্রয়োজন এই ঘটনার তিন চারদিন আগে ফ্যাক্টরির একটা বন্দুক চুরি হয়েছিল। তদন্তের শুরুতে ফ্যাক্টরির দুজন লেবারকে এ খুনসহ ডাকাতি মামলায় সন্দেহ করে ধরা হয়। কারণ ছিল ওদের হাতে বন্দুকের ছররার ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্তকারী অফিসার তাদের হাতে এই ক্ষত দেখে মনে করলেন এরা অপরাধী। ফায়ার করার সময় দেওয়ালে গুলি লেগে প্রতিক্ষেপ করেছে ওদের হাতে। কিন্তু এক্সপার্টের মতে তা নয়। ক্ষতের অবস্থা পরীক্ষা করে ব্যালেস্টিক এক্সপার্ট মন্তব্য করলেন, অন্য কেউ গুলি করেছে, সেই গুলি এদের হাতে লেগেছে। ওরা জবানবন্দিতে বলল, গুলির শব্দ শুনে যখন তারা লেবার সেড থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের হাতে এই গুলি লাগে। এজন্য তারা ভয়ে ডাকাতদের পিছু ধাওয়া করতে পারেনি। এক্সপার্টদের মতামতের সাথে অনেকটা মিল হলো। যা হোক, ঐ মূহূর্তে তারা ছাড়া পেল না। এটা আরো তদন্ত করে দেখার বিষয়। ঘটনাস্থলে কোন ফায়ার্ড কার্টিজ পাওয়া যায় কিনা খোঁজাখুজি করে পাওয়া গেল না, তবে জানা গেল তেজগাঁ থানার দারোগা প্রথম দিন একটা তাজা কার্টিজ পেয়ে ওটাকে সিজ করেছে।

গ্রেফতা ও জবানবন্দী রেকর্ড

তদন্ত খুব জোরেসোরে শুরু হলো। এক এক করে লেবারদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হলো। আরো দুই একজনকে ধরাপাকড়া করা হলো। কিন্তু কোন যোসূত্র পাওয়া গেল না। তদন্তকারী ইন্সপেক্টর চারদিকে গুপ্ত সন্ধানী লাগিয়ে দিলেন। ছদ্মবেশে তারা ফ্যাক্টরির আশেপাশে ঘুরাঘুরি করতে থাক। কেউ লেবার বেশে। কেউ পান বিড়িওয়ালার বেশে। কিন্তু তেমন একটা সুবিধা হলো না। ছদ্মবেশি কোন সিআইডি সদস্যই ঘটনার সাথে জড়িতদের সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য খবর সংগ্রহ করতে পারলেন না।

গেইম কিং অভিযান

এদিকে তেজগাঁ থানার পুলিশ কর্তৃক ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা জীবন্ত কার্টিজটি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যালেসটিকস এক্সপার্ট চেয়ে পাঠালেন। ওটাকে দেখে মনে হলো একেবারে সদ্য আমদানি করা। চক্চক্ করছে এর রং। মনে হচ্ছে এমাত্র প্যাকেট থেকে বের করা হয়েছে। গায়ে লেখা আছে “এধসব শরহম.’ অর্থাৎ এটা কোম্পানির মার্কা। তদন্তকারী অফিসার মকবুল সাহেবকে ব্যালেস্টিক এক্সপার্ট পরামর্শ দিলেন, বন্দুকের দোকানে খোঁজ করে বের করতে হবে কারা এ কার্টিজ আমদানি করেছে, কতদিন আগে এবং কবে কার কাছে তা বিক্রি করেছে।

আজকের দিনে কাজটা কঠিন মনে হলেও সেই সময় এটা মোটেই কঠিন ছিল না। কারণ তখন ঢাকা মাত্র কয়েকটি বন্দুকের দোকান ছিল। খুঁজতে খুঁজতে জনৈত এলাহি বক্সের দোকানে গিয়ে সন্ধান পাওয়া গেল যে এই ব্রান্ডের কার্টিজ তারা সদ্য আমদানি করেছে। সেল রেজিস্ট্রি দেখে বের করা হলো ই,পি আর এর এক সিপাই এর বৈধ লাইসেন্সের বরাবর আটটি কার্টিজ  তারা বিক্রয় করেছিল।

দুই পাঠানের বন্ধুত্ব

হিসাব করে দেখা গেল কর্টিজগুলো কেনা হয়েছিল ঘটনার দুই তিনদিন আগে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মকবুল সাহেব ছুটে গেলেন ই.পি.আর অফিসে। সেখানে এক অফিসারের মারফত কার্টিজ কেনা সিপাইকে ডাকা হলো। জানা গেল সে একজন পাঠান। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করলো তার এক বন্ধু কয়েকদিন আগে লাইসেন্সটি নিয়ে কয়েকটি কার্টিজ কিনেছে শিকারে যাবে বলে।

ইপিআর সিপাইয়ের বন্ধুর নাম শুনে এক দিকে আঁৎকে উঠলেন সিআইডি অফিসার, অন্য দিকে সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়ার আনন্দেও উৎফুল্ল হলেন। ইপিআর সিপাইর বন্ধুর নাম বাদশা খান । হ্যাঁ, এই সেই বাদশা খান যাকে জনাব হিরজির শ্যালক ফ্যাকটরির ম্যানেজার ঘটনার কয়েকদিন আগে চাকরি থেকে ডিসমিসড করেছিল। সিআইডি মকবুল হোসেন এক প্রকার নিশ্চিত হলেন, বাদশা খান কোন না কোন ভাবে এ কাজে জড়িত। তাকে ডিসমিস করা হয়েছিল বলে হয়তো প্রতিশোধ নিয়েছে। পাঠান জাত দারুন প্রতিশোধ পরায়ন । সিআইডি অফিসারের ধারণা হল, ফ্যাক্টরির হারান বন্দুকটাও  হয়তো বাদশা খানই চুরি করেছিল।

বাদশা খানের খোঁজে

এখন বাদশা খানের খোঁজে চারদিকে ছুটাছুটি শুরু হলো। মকবুল সাহেবের গোপন সন্ধানী পার্টি লেগে গেল আদাজল খেয়ে। ফ্যাক্টরির লোক যারা বাদশা খানকে চেনে, তাদের কয়েকজনকে সাথে নেওয়া হলো। সমস্ত ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করা হলো, কিন্তু কোন খোঁজ না পেয়ে পুলিশ হতাশ হয়ে পড়ল।

হঠাৎ খবর পাওয়া গেলা বাদশা খান আজই চিটাগাং থেকে জাহাজ যোগে করাচী পালিয়ে যাচ্ছে। খবরটা এমন সময় পাওয়া গেল যখন চিটাগাং যাবার পরিবহন রুটের কোন গাড়ি নেই। তখন ঢাকা চিটাগাং রুটের রাস্তাটি আজকের অবস্থায় ছিল না। নির্দিষ্ট সময়ের পরে ঐ রুটে কোন বাস চলত না। তাই সড়ক পথে চট্টগ্রাম পৌঁছিতে হলে পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করলে বাদশা খানের টিকিটিও পাওয়া যাবে না। যদি জাহাজ সময় মতো করাচির উদ্দেশ্যে চিটাগাং রওয়ানা দেয় তাহলে সড়ক পথে গিয়ে কোন লাভই হবে না। সুতরাং চিটাগাং-এর ডি.আই.জি, এসপি ও ডিসি কে টেলিফোনে জানানো হল, করাচীগামী জাহাজকে কয়েক ঘন্টার জন্য আটকে রাখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সিআইডি দল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে পৌঁছেন ততোক্ষণে যে কোন কৌশলেই হোক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে রাখতে হবে। তবে তদন্তের গোপনীয়তার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে এর বেশি কিছু বলা হলো না। এদিকে জাহাজ ছাড়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শুধু মাত্র শেষ হুইসিলটি বাজাতে বাকি। এমন সময় ক্যাপটেনের উপর ফরমান জারি হলো। পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ ছাড়বে না। স্থানীয় পুলিশ জাহাজে মোতায়েন করা হলো।

অপারেশন চিটাগাং

অতি কষ্টে প্লেনে সিটের ব্যবস্থা করা হলো। হিরজি সাহেব একজন লোক দিলেন মকবুল সাহেবের সঙ্গে যে কিনা বাদশা খানকে সনাক্ত করতে পারবে। এসব যেন মুহুর্তের মধ্যে ইলেকট্র্রোনিকস উপায়ে যোগাড় হয়ে গেল। ইন্সপেক্টর মকবুল সাহেব সনাক্তকারীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে চিটাগাং এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলেন। পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী সেখানে গাড়ি প্রস্তুত ছিল। প্লেন থেকে নেমেই সোজা পোর্টে হাজির হলেন সিআইডির তদন্তকারী দল। গোপনীয়তা এতটাই ছিল যে চিটাগাং-এর এসপি এবং ডিসিও জানেন না কেন এই ব্যবস্থা।

ইন্সপেক্টর মকবুল সাহেব জাহাজের কাছে এসে ক্যাপটেনকে তার আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে সনাক্তকারী এবং পোশাকধারী পুলিশ সঙ্গে নিয়ে জাহাজের ভিতর ঢুকে পড়েন। এবার শুরু হলো তল্লাসি। প্রায় ঘন্টাখানেক তল্লাসি চলল। বাদশা খানের কোন সন্ধান পাওয়া গেলা না। খবরটা কি তাহলে ভূয়া, মনে মনে ভাবলেন ইন্সপেক্টর মকবুল। কিন্তু খবর যত ভূয়াই হোক সিআইডি গোয়েন্দা মকবুল সাহেব ছাড়ার পাত্র নান। নিরলসভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকলেন তিনি। তার সঙ্গীয় সিআইডি টিকটিকিরা বিরক্ত হলেও তিনি থেকে গেলেন নির্বিকার। তাকে অনুসন্ধান চালাতেই হবে। কারণ বাদশা খানই এখন পর্যন্ত এ খুনসহ ডাকাতি মামলার একমাত্র সন্দেহভাজন। এ খুনের সাথে তার জড়িত থাকার সপক্ষে অকাট্য যুক্তি রয়েছে। কিন্তু সে যদি পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তবে এ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন যার পর নেই কঠিন হয়ে পড়বে। তাই বাদশা খানতে তার চাই।

বাদশা খান গ্রেফতার হল

কয়েক ঘন্টা ধরে চলল তল্লাসি। সিআইডি পুলিশের এ কাজে শুধু জাহাজের যাত্রীগণই বিরক্ত হলেন না, বিরক্ত হলেন, খোদ ইন্সপেক্টর মকবুলের সহকর্মীগণও। এ বিশাল জাহাজে কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে কোথায় পাব বাদশা খানকে? সকলের ধৈর্য্যচ্যূতির ঠিক শেষ পর্যায়ে দেখা গেল বাদশা খান ডেকের এক কোণে চুপটি করে মাথা গুজে বসে আছে। সনাক্তকারী আড়াল থেকে মকবুল সাহেবকে দেখিয়ে দিল। তিনি কাছে গিয়েই বাদশা খানকে ধরে ফেললেন। যেমন ছিল ইন্সপেক্টর সাহেবের চেহারা, তেমন ছিল তার সাহস।

বাদশা খান মুষিকের মতো মুষড়ে পড়ল। প্রতিবাদ করার সাহস হলো না তার। তার মনোবল একেবারে ভেঙে গেছে। তল্লাসি কর তার কাছে একটা সুটকেস পাওয়া গেল। তল্লাসি করা হল তার সুটকেস। সুটকেস থেকে উদ্ধার হল চুরি হয়ে যাওয়া মূল্যবান অলঙ্গারাদি । সবচেয়ে বড় আলামত হল, বাদশা খানের দেহ তল্লাসি করে তার পকেট থেকে পাওয়া একটি ডাইরি। যথানিয়মে সেগুলি জব্দ করা হলো।

বাদশা খানের ডায়েরি

ডাইরির মধ্যে বাদশা খানের জীবনের ঘটনাবলী, মিলিটারী চাকরি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় সকল ঘটনাই ধারাবাহিকভাবে লেখা ছিল। বাদশা খান এক সময় মিলিটারিতে চাকরি করতো। ওর মধ্যে এক জায়গায় লিখে রেখেছে ”১৭ই জানুয়ারী রাত ৯ টায় হিরজি সাহেবের স্ত্রী এবং তার ভাইকে হত্যা করে বদলা নিয়েছি। সঙ্গে ছিল নারায়নগঞ্জের হাতেম আলী ডাকাত এবং তার সঙ্গীরা।” আহ! কী চমৎকার স্বেচ্ছা স্বীকারোক্তি! বাদশা খানকে গ্রেফতার করে, তার কাছ থেকে আলামতগুলো উদ্ধার করে ইন্সপেক্টর মকবুল হিরজি পরিবারের খুনের সাথে জড়িত প্রায় গোটা ডাকাতদলকেই শনাক্ত করলেন। চিটাগাং-এ অপেক্ষা না করে বাদশা খানকে নিয়ে ইন্সপেক্টর সাহেব চলে আসেন ঢাকায়।

বাদশা খানের স্বীকারোক্তি

কালবিলম্ব না করে বাদশা খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হলো। তাকে নিয়ে বেশি বেগ পেতে হলো না। হড়হড় করে সব স্বীকার করলো। ডাইরিতে যা লিখে রেখেছে তা অস্বীকার করার যো নাই। তাছাড়া সুটকেসের মধ্যে যে অলঙ্কারাদি পাওয়া গেল তাতে এক রকম হাতেনাতে ধরা। তবে বাদশা খানের গ্রেফতার কাহিনী আপাতত গাপন রাখা হলো। কারণ জানাজানি হলে তার সঙ্গীরা অবশ্যই গা ঢাকা দেবে। বাদশা খান জবানবন্দিতে স্বীকার করলো ১৭ই জানুয়ারী ১৯৫৭ সাল রাত ৯টায় মিসেস হিরজি ও তার ভাই মিঃ আমানকে সে নিজে গুলি করে হত্যা করেছে। বন্দুকটিও হিরজি সাহেবের। ঘটনার পাঁচ ছ’দিন আগে সে ওটাকে চুরি করে।  তবে বন্দুর চুরির জন্য অন্য লোকেকে সন্দেহ করা হলে বাদশা খানের সাহস আরো বেড়ে যায়। বন্দুকের সঙ্গে টোটা ছিল না বলে তাকে টোটা যোগাড় করতে হয় ইপিআর এ কর্মরত তার বন্ধুর মাধ্যমে।

হিরজি সাহেবের শ্যালক ম্যানেজার আমান বাদশা খানকে শুধু ডিস্মিস্ করেনি, গালিও দিয়েছিল বলে বাদশা এর বদলা নেবার কসম করে। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সে নারায়নগঞ্জ হাতেম আলী নামের এক ডাকাতের সঙ্গে হাত মিলায়। তাকে লোভ দেখিয়েছিল, এখানে ডাকাতি করতে পারলে বহু অলঙ্কারাদি ও টাকাপয়সা পাওয়া যাবে। বন্দুক এবং টোটা সে নিজেই যোগাড় করেছে। কাজেই হাতেম আলী এ সুযোগ ছাড়লো না। মিঃ হিরজি ঐ সময় কোলকাতায় ছিলেন। বাদশা খান চেয়েছিল হিরজির অনুপস্থিতিতে একাজ শেষ করতে। সে আরো স্বীকার করলো মিসেস হিরজিকে সে প্রথম গুলি করে, তার কারণ তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সুটার। যদি কোন কারণে তার রাইফেলটি হাতে নিতে পারতেন, তবে মুশকিল ছিল। তারপর মিঃ আমানকে গুলি করে সে। ডাকাতি ও খুন শেষ করে ঐ রাতেই তারা পায়ে হেঁটে ঢাকায় চলে আসে। চুরি করা বন্দুকটি আর বাদশা খানের দরকার ছিল না। সে তার উদ্দেশ্য সফল করেছে। তাই বন্দুকটি হাতেম আলীকে দিয়ে দেয় সে।

হাতেম আলী ডাকাতের খোঁজে

হাতেম এবং তার সঙ্গীদের এখনই না ধরলে পালিয়ে যাবে। ইন্সপেক্টর মকবুল সাহেব তার দলবল নিয়ে এবং নারায়নগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ নিয়ে ঐ রাতেই রেইড করলেন। বাদশা খানের সনাক্ত মতে হাতেম আলী এবং তার সঙ্গীদের গ্রেপতার করা হল। তল্লাশী করে আরো কিছু মালামাল উদ্ধার করলেন সিআইডি গোয়েন্দারা। কিন্তু বন্দুকটি পাওয়া গেল না। হাতেম আলী ঘটনার আদ্মপান্ত স্বীকার করলো। তবে বন্দুকটি হাতেম তার শ্বশুরের কাছে পাচার করেছে। তার শ্বশুর বাড়ি ফরিদপুরে।

ঘটনার আগাগোড়াই উদ্ঘাটিত হল। এখন শুধু ঘটনায় ব্যবহৃত বন্দুকটি উদ্ধার করলেই নাটকের যবনিকা টানা যাবে। তাই সিআইডি মকবুল ছুটলেন ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। তাকে এখনই যেতে হবে। কারণ এদের গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বন্দুকটি উদ্ধার করা কঠিন হবে। কিন্তু ঐ মূহূর্তে ফরিদপুরে যাবার কোন উপায় নাই। না আছে ষ্টীমার, না আছে লঞ্চ। আবার সমস্যা এসে বাধা দিল।

সেই বন্দুকটি

কিন্তু ইন্সপেক্টর মকবুল থেমে থাকার লোক নন। তার কর্তব্যজ্ঞান ছিল অসাধারণ, জেদ ছিল অদম্য। যত বাধাই আসুক না কেন সিআইডি পুলিশ তা উত্তরণ করে চলবেই। একটি স্পেশাল লঞ্চ ভাড়া করে হাতেম আলী ও বাদশা খানকে সঙ্গে নিয়ে ঐ মূহূর্তে ছুটে চললেন পানির উপর দিয়ে। অনেক বাধাবিপত্তি ঠেলে এবং বহু কষ্টে তিনি পৌছলেন ফরিদপুরে হাতেম আলীর শ্বশুর বাড়িতে। অতর্কিতে হানা দেয়ায় হাতেম আলীর শশুরকেও বাড়িতে পাওয়া গেল। পালাবার বা অস্বীকার করার কোন উপায় নাই, কারণ সদলবলে হাজির সবাই। ডাকাত-শ্বশুর একেবারে ঘাবড়িয়ে গেল। অধিক বাক্যে ব্যয় না করে লক্ষ্মী ছেলেটির মতো হাতেমের শ্বশুর বন্দুকটি একটি গাছের নিচ থেকে মাটি খুঁড়ে বের করে ইন্সপেক্টরের হাতে দিল। সমাপ্ত হল একটানা এক সফল তদন্তের কাজ। ঐ রাতেই ইন্সপেক্টর মকবুলঢাকায় ফিরে এলেন। সাথে নিয়ে ফিরলেন প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য ও আলামতসহ হিরজি পরিবারের ঘাতকদের।

গুলির খোসা চাই

তবে মামলার তদন্ত কিন্তু এখানেই শেষ হল না। বাকী রইল ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার করা গুলির খোসাগুলি উদ্ধার করা। মজার ব্যাপর হল, ফায়ার করার পর ঘটনাস্থল থেকে গুলির খালি খোসাগুলি অপরাধীরা নিজেরাই কুড়িয়ে নিয়েছিল। কারণ, তারা জানতো এগুলি পুলিশ পেলে এক্সপার্ট দ্বারা পরীক্ষা করাবে। তবে ঢাকা ফেরার পথে সেগুলি একটি জঙ্গলের মধ্যে ফেলে তারা যাতে পুলিশ খোসাগুলির খোঁজ না পায়। মকবুল সাহেব তাদের সেই জঙ্গলের কাছে নিয়ে আসেন। অনেক খোঁজাখুজির পর গুলির খোসাগুলোর সন্ধান গেল।  অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার পক্ষে আরো কিছু অকাট্য প্রমাণ সংগৃহীত হল।

সিআইডির পরীক্ষাগারে

তদন্ত এবার শেষ পর্যায়ে। আসামীদের হাতের ছাপ ও পায়ের ছাপ নেওয়া হলো।সিআইডির পরীক্ষাগারে চলল আলামতসমূহের পরীক্ষা। পরীক্ষায় ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত হস্ত রেখা, পায়ের ছাপ ইত্যাদি অপরাধীদের পায়ের ছাপের সাথে হুবুহু মিলে গেল। মিলে গলে বাদশা খানের কাছ থেকে পাওয়া ডাইরির লেখার  সাথে তার হাতের লেখার নমুনাও। ব্যালেস্টিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হল ফায়ার্ড কার্টিজগুলি ঐ বন্দুক দিয়েই ফায়ার করা হয়েছে।  সর্বোপরি বাদশা খান ও হাতে আলী আদালতে দোষ স্বীকারমূলক জবানবন্দী দিল যা বিচারকালে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যাবে।

বাদশা- হাতেমের ফাঁসি

ঢাকা সেসনস কোর্টে এ মামলার বিচার চলল। মামলাটি নিঃসন্দেহে সেই সময় অত্যন্ত চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছিল। বিচারের রায় ঘোষণার দিন কোর্টে লোকে লোকারণ্য। বিচারে বাদশা খান ও হাতেম আলীর ফাঁসি হয়। সিআইডি এর সুনাম শুধু অক্ষন্ন থাকলো না, সিআইডির গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর মকবুল হোসেন সবাইকে অবাক করে দিলো। তার কৃতিত্বের জন্য তদানীন্তন সরকার তাকে পাকিস্তান পুলিশ মেডেল ভূষিত করেন। তিনি হলেন মোঃ মকবুল হোসেন, পিপিএম।( ২১ জুন, ২০১৫: মরহুম সিকান্দার আলী, পিপিএম এর আমার পুলিশ জীবন আত্মজীবনী অবলম্বনে রচিত)