ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অসততা, অক্ষমতা, কর্তৃত্বের অপব্যবহার, দুর্নীতি ইত্যাকার হাজারও বদগুণে পুলিশকে চিত্রায়িত করার একটি বিশ্বব্যাপী সার্বজনিন প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মনে করা হয়, পুলিশ মাত্রই অসৎ। বঙ্গ-ভারতে তো বটেই, এমনকি পৃথিবীর অধিকাংশ সমাজেই পুলিশকে বিনা বাক্যে ঘুষখোর, বদমেজাজী, কর্তৃপরায়ণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়। পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক সমাজ আছে যেখানে পুলিশে অততার তকমা পরতে হয় না।

 

কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের অসততার কতটুকু পার্থক্য রয়েছে? একজন পুলিশ সদস্যের বিপরীতে সমাজের উচ্চ থেকে নিম্ন মার্গের নৈতিকতার ধ্বজাধারী নাগরিকগণ, যারা প্রতিনিয়তই উঠতে-বসতে পুলিশের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করেন, তারা কতটুকু সৎ?  পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সততার পরীক্ষা নিতে একটি নাটক মঞ্চায়িত হলে দুইয়ের মধ্যে কে দ্রুত সকল বিদ্যা-বুদ্ধি ও মূল্যবোধ কিংবা ধর্মীয় অনুসাশন ভুলে গিয়ে অসততার পথ ধরবেন? হ্যাঁ, বিষয়টি খুবই কৌতুহলোদ্দীপক। নির্মোহ অপরাধ বিজ্ঞানীরা এ বিষয়টি নিয়ে খুঁটিনাটি ভেবেছেন অনেকবার। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হয়েছে আজ থেকে বহু বছর আগে। সেই  ১৯৭৪ সালে।

 

Patrolman’s Benevolent Association নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে একটি গবেষণার ধরন ছিল এরূপ-

গোপনে স্থাপন করা ক্যামেরার নিচে একজন ব্যক্তি একটি টাকা ভর্তি মানিব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একজন ছদ্মবেশী গবেষক। তিনি মানিব্যাগটি কুড়ে পাবার অভিনয় করছেন। পথ দিয়ে যাচ্ছেন পথচারীগণ। পথচারীদের মধ্যে যেমন রয়েছেন সাধারণ মানুষ, জ্ঞানী-গুণী মুটে-মজুর, তেমনি রয়েছে পুলিশ সদস্যগণও। তবে তারা কেউই জানেন না যে তাদের উপর গবেষণা চালান হচ্ছে। আসলে মানিব্যাগটি কুড়িয়ে পাবার অভিনয় করা হচেছ।

 

ছদ্মবেশী গবেষকদলের সদস্য পথচারীদের এভাবে বলছেন, ‌‌’জনাব এ টাকা ভর্তি মানিব্যাগটি আমি এখানে কুড়িয়ে পেয়েছি। এটা, সম্ভবত আপনার। দয়া করে এটি গ্রহণ করুন।’ পথচারীগণ জানেন যে এ মানিব্যাগটি তাদের নয়। তবে নগদ কিছু টাকার লোভ সামলাবে কে? তাই নিজেদের না হওয়া সত্ত্বেও তাদের অনেকেই মানিব্যাগটি নিজের দাবি করে গ্রহণ করে। কিন্তু এটাই ছিল গবেষণার মূল প্রকল্প। অনুমানটি ছিল যে পথচারীদের মধ্যে অনেকেই মানিব্যাগটি গ্রহণ করবেন এবং উচ্চতর নৈতিকতার অধিকারী অনেকেই সেটা নিজের বলে গ্রহণ করবেন না।

 

গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ৩০% সদস্য নিজেদের নয় জেনেও টাকা ভর্তি মানিব্যাগটি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষদের মধ্যে ৮৪% এই টাকা গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছে।

 

গবেষণার সিদ্ধান্ত হল, পুলিশ সদস্যরাও মানুষ। তাদের মধ্যে সাধারণ মানুষের মতোই লোভ-লালসা ও নৈতিকতার ঘাটতি রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের চেয়ে গড়পড়তা পুলিশ সদস্যদের অন্তর্নিহিত সততার মাত্রা বেশি। সুযোগ পেলে যেখানে মুহূর্তের মধ্যে একশ জনের মধ্যে ৮৪ জন  সাধারণ মানুষ অসৎ হয়ে পড়েন, সেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ পুলিশ সদস্য অসৎ হওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

 

আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে নিরপেক্ষতাকে মূল্যায়ন করা হয়। সরকারি-বেসরকারি সকল সংগঠনই সততার সাথে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। পেশাজীবীদের মধ্যে পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে। সাধারণভাবে মানুষ বিশ্বাস করে যে পুলিশ সৎ, নিরপেক্ষ ও কাঙ্খিতমাত্রায় দক্ষ। কিন্তু তারপরও সে দেশে পুলিশের অসততার ঘটনা অবিদিত নয়। গ্যালাপস পোলে সততা ও নিষ্ঠার স্কেলে পুলিশ প্রায়ই উপরের দিকে থাকে। যদিও চলতি বছরে(২০১৫) তে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থার মাত্রা গত ২২ বছরের চেয়ে সবচেয়ে নিম্ন(৫২%),তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পুলিশ মানুষের আস্থার স্কেলে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। (মিলিটারি ৭২% এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ৬৭%)। তবে একই সাথে একথাও ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিপুর সংখ্যক মানুষ (৪৮%) পুলিশের সততা নিয়ে কম বেশি সন্দেহ প্রকাশ করে।

 

পুলিশ ও অপুলিশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সততার পরীক্ষার গবেষণাটি একটি ছোট উদারহণ যেখানে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সততার মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে। এ মাত্রায় পুলিশ এগিয়ে; সাধারণ জনগণ পিছিয়ে। অর্থাৎ অনুকূল পরিবেশে পুলিশ তার অবৈধ লাভের সুযোগের যতটুকু সদ্ব্যবহার করে, সাধারণ জনগণ তারচেয়ে অনেক বেশি  করে।

 

বাংলাদেশের সমাজ সম্পর্কে আমাদের কতটা উচ্চ ধারণা রয়েছে তা পাঠক মাত্রই জানেন। সততার পরীক্ষা নিয়ে পুলিশ ও সাধারণ মানুষের তুলনা করার মতো কোন গবেষণা এদেশে কোন দিন  হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবেও বলে মনে হয় না।  তাই বাংলাদেশ পুলিশ আর বাংলাদেশি জনগণের মধ্যে সততার মাত্রা পরিমাপ করার কোন উপায়ই নেই। তারপরও যে আমরা মনে মনে অনুমান করি না, তা কিন্তু নয়। প্রত্যেকেরই একটা অনুমান আছে। আমি একই সাথে একজন পুলিশ সদস্য এবং একজন সাধারণ মানুষও বটে। এ সমাজকে আমি যেমন হাড়ে হাড়ে চিনি, তেমনি চিনি পুলিশকেও। তাই একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে এ ব্যাপারে আমার অনুমান সত্যের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু আমি কোন অনুমান করব না। এটা পাঠকগণই করে নিন। (২৩ জুন, ২০১৫)

রচনা সূত্র:

১. The Psychology of Crime: A Social Science Textbook By Philip Feldman, Maurice Philip Feldman(পৃষ্ঠা-১০০)

২. গ্যালাপ চলতি জুন/১৫ মাসের ২-৭ তারিখে এ জরিপটি চালিয়েছে। দেখুন http://www.gallup.com/poll/183593/confidence-institutions-below-historical-norms.aspx