ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

ভিক্ষাবৃত্তি নিঃসন্দেহে একটি প্রাচীন পেশা। তবে এর ধরন ও বিস্তৃতি কালে কালে পরিবর্তিত হয়। দেশ-কাল-পাত্র ভেদেও ভিক্ষাবৃত্তির ভিন্নতা রয়েছে। তবে ভিক্ষাবৃত্তির সাধারণ ধরন হল, উচ্ছ্বিষ্টগোভীতা। ভিক্ষুকরা অন্যের রোজগারে বেঁচে থাকে। উন্নত-অনুন্নত, অগ্রসর-অনগ্রসর, পূঁজিবাদী-সাম্যবাদী সকল শ্রেণির রাষ্ট্র ও সমাজে কোন না কোনভাবে ভিক্ষাবৃত্তি রয়েছে। সিংগাপুরের মতো কল্যাণ-রাষ্ট্রেও আমি মানুষকে ভিক্ষা করতে দেখেছি। তবে তা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে। আধুনিক যন্ত্র বাজিয়ে জনাকীর্ণ রাস্তায় কয়েক জনকে  গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছি। তবে তারা সব সময় পুলিশের ভয়ে ভীতু থাকত। আমাদের ফুট পাতের কাপড়ের দোকানদারদের মতো পুলিশ আসলেই পাততাড়ি গুটিয়ে দিত দৌড়।

কিন্তু  বাংলাদেশে ভিক্ষাবৃত্তি একটি নির্ভরযোগ্য পেশায় পরিণত হয়েছে। আমার গ্রাম এলাকার এক কুঁজো লোক ঢাকায় থেকে ভিক্ষা করেন। তবে তিনি যখন বাড়িতে যান তখন বেশ পরিপাটি থাকেন। গ্রামে সে এখন সুদের ব্যবসা করে। ভিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সে গ্রামে লগ্নি করে। বর্তমানে গ্রামের মানদে- সে ভিক্ষুক মোটামুটি বড় লোক। ঢাকায় যে ভিক্ষা করে,এমন কথা সে আর বলে না। সে বলে বেড়ায়, ঢাকায় সে ছোটখাট ব্যবসা করে। ফুটপাতে হকারগিরি করে।

আমাদের সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ভিক্ষাবৃত্তি ভাল নিরাপত্তা ও উৎসাহ পায়। যদিও ভিক্ষুকের পেশাকে মহানবী (স) সবচেয়ে নিকৃষ্ট পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবুও বিভিন্নভাবে ধনীদের সম্পদে দরিদ্র বা ফকির-মিসকিনদের হককে তিনি দান খয়রাতের মাধ্যমে প্রকারান্তরে উৎসাহিতই করেছেন। রমজান মাসে কিংবা বিশেষ বিশেষ দিবসে এক  টাকার দানে বহু টাকার ফায়দা কিংবা ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দিলে প্রভূত ছওয়াব বা নেকি হাসিল হয়- ইত্যাকার বচনগুচ্ছ আমাদের এক শ্রেণির মানুষকে বেশি বেশি করে ভিক্ষাদানে উদ্বুদ্ধ করে। আর যে সমাজে হাত পাতলেই দান পাওয়া যায়, সে সমাজে কি দানগ্রহীতার অভাব হয়?

ভিক্ষুক ও ভবঘুরেদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন মূলত শহর এলাকায় ক্রিয়াশীল। কিন্তু  গ্রাম এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তির অবাধ প্রচলন রোধের কোন আইন নেই। আবার রাজধানী থেকে ভিক্ষুক তাড়ানোর প্রচেষ্টা গ্রহণের খবর শোনা গেলেও অন্যান্য শহর বা মফসাল এলাকায় ভিক্ষুকদের রাজধানী থেকে শুধু চালান দেয়া হয়। শ্রেণি বিভাগ অনুসারে কিছু ব্যক্তি বেঁচে থাকার তাগিদেই ভিক্ষাবৃত্তি করে। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে এক শ্রেণির টাউট-বাটপাড় ভিক্ষাবৃত্তিকে লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। অসহায় মানুষকে নিয়ে তারা রীতিমত আর্থিক খেলা খেলছে।

শুধু ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করার জন্য সনত্মান চুরি থেকে শুরু করে সুস্থ্য শিশুদের পরিকল্পিতভাবে বিকলাঙ্গ পর্যন্ত করা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চল থেকে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের এক প্রকারের ক্রয় করে বা ভাড়া নিয়ে এসে এক শ্রেণির দালাল ভিক্ষাবৃত্তির মহাজনে পরিণত হয়েছে। এরা মানুষকে হাল আমলের খণ্ডকালীন দাসে পরিণত করেছে।

সমাজের অসহায় শ্রেণিগুলোর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এক শ্রেণির দালাল মোটা অংকের অর্থ রোজগার করছে। পত্রিকার খবর ও টিভি রিপোর্টিং এ প্রকাশ হিঁজড়া না হয়েও অনেক লোক হিঁজড়াদের নেতা বনে গেছে। তারা ঢাকাসহ বড় বড় শহরে গিয়ে হিঁজড়াদের নিয়ে রীতিমত ব্যবসা করছে। যে হিঁজড়াগণ কেবল পেটের দায়ে নাচ-গান বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত, এ সব নকল হিঁজড়াদের প্ররোচনায় তারা এখন রীতিমত চাঁদাবাজি বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এভাবে ভিক্ষাবৃত্তি ক্রমান্বয়ে সহিংস অপরাধে রূপ নিচ্ছে।

আমার মতে ভিক্ষাবৃত্তি রোধকল্পে আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। দান-খয়রাত, যাকাত-ফিতরার ধরনে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। সামান্য দানে হাজার হাজার মানুষকে বিদুরের খুদ বিতরণ না করে নির্বাচিত দানের মাধ্যমে আমরা সমাজের অসহায় বা দরিদ্র কিংবা দান গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্রমান্বয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি।  অধিকন্তু, পেশাদার, সৌখিন ও মহাজনি ভিক্ষাবৃত্তি রোধকল্পে কিছু নতুন ও ব্যতীক্রমী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যেমন-

১. প্রতি বছর ঈদের আগে এক শ্রেণির মানুষ ঘটা করে যাকাতের কাপড় বিতরণ করেন। নিম্নমানের কাপড় কিনে তারা রীতিমতো প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ জড়ো করে তাদের মাঝে কাপড়াচোপড় বিতরণ করেন। এ কাপড় বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রতিবছরই বেশ কিছু লোক পাদপিষ্ট হয়ে নিহত হয়। এ নিহত হওয়াটা তাদের জন্য আরো বেশি প্রচার নিয়ে আসে।

আমার প্রস্তাব হল, যদি এ ভাবে যাকাদের অর্থ দিয়ে হাজার মানুষকে একখণ্ড কাপড় না দিয়ে এই অর্থে নির্বাচিত কিছু ব্যক্তিকে আয়ের একটি পথ করে দেয়া যেত কিংবা কোন কারখানা স্থাপন করা যেত কিংবা এদের মধ্যে সক্ষম মানুষগুলোকে বিদেশে চাকর-ঝি এর কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা যেত তাহলে যাকাতের অর্থের পূর্ণ সদ্ব্যবহার হতো।

২. যাকাত বা দানের টাকায় বয়স্ক বা অক্ষমদের জন্য আশ্রয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। এটা হতে পারে সরকারি উদ্যোগে কিন্তু বেসরকারি অনুদানে। সরকার সমাজ সেবা অধিদফতরের মাধ্যমে এটা পরিচালনা করবে কিন্তু এর ব্যয় নির্বাহ করা হবে বেসরকারি অনুদানের টাকায়।

৩. অক্ষম ও জন্মগত বিকলাঙ্গ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণতহবিলের মতো  দেশে ‘দুঃস্থ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। যারা দান-খয়রাত করে বেশি বেশি পূণ্যার্জন করতে চান তারা দুঃস্থ তহবিলে দান করতে পারেন। সাত জন মিলে একটি গরু কোরবানি দেয়া ওয়াজিব জেনেও যারা দশ/পনেরেটি গরু কোরবানি দেন, একবার মাত্র হজ্জ করা ফরজ জেনেও যারা দশ/পনেরবার হজ্জ করতে যান —  এ ধরনের দানবীর ব্যক্তিগণ  দুঃস্থ তহবিলে দান করে কামেলিয়াত হাসিল করতে পারেন।

৪. পেশাদার ভিক্ষুক ও মহাজন ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম একটি জরিপকার্য পরিচালনা করতে হবে। আদমশুমারির মতো দেশে ভিক্ষুক শুমারির আয়োজন করা যেতে পারে। জরিপের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বুরো অব স্টাটিস্টিকস বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে।

৫. পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় পেশাদার ভিক্ষুক ও মহাজন ভিক্ষুকদের তালিকা তৈরি করে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। ক্রমান্বয়ে এসব ব্যক্তিদের মুখোস জনসম্মুখে উন্মোচন করতে হবে। অতঃপর এদের বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সামাজিকভাবে তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা যেতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালনানো যেতে পারে এবং প্রচলিত আইনগত ব্যবস্থা কিংবা প্রচলিত আইন পর্যাপ্ত না হলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য নতুন আইন তৈরি করা যেতে পারে।

৬. ভিক্ষুক সমস্যা সমাধানের জন্য সমাজসেবা অধিদফতরকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে হবে। সমাজ সেবা অধিদফতরকে শুধু খয়রাত বিতরণকারী সংস্থা নয়, প্রতিরোধকারী সংস্থার মতো কাজ করতে হবে। পেশাদর ও মহাজন ভিক্ষুক কিংবা সৌখিন ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্পণ করা যেতে পারে। বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদফতর ইত্যাদির মতো তাদের প্রসিকিউশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পণ করা যেতে পারে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে এক শ্রেণির মানুষ স্বাভাবিক কর্মধারার বাইরে কিছু কিছু অস্বাভাবিক কর্কাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরের ধনে পোদ্দারী কিংবা অন্যের উচ্ছ্বিষ্টভোগী কিছু লোক থাকবেই। এসব লোক হতে পারে পেশাদার অপরাধী কিংবা পেশাদার ভিক্ষুক। ভিক্ষাবৃত্তিকে আমাদের সমাজে অপরাধ মনে করা না হলেও ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে নানা প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি অনেকটাই শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই একটি সভ্য দেশের পক্ষে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশায় পরিণত হতে দেয়া উচিৎ নয়। ( রংপুর, ১ আগস্ট, ২০১৪)