ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশের চাকরির ঊর্ধ্বপদে চাকরির একটি মহাযন্ত্রণা হল, প্রতিনিয়তই নিম্নপদের সহকর্মীদের কাছে তদবির করতে হয়। রাস্তায় মোটর সাইকেল আটক থেকে শুরু করে হত্যা মামলার পক্ষে-বিপক্ষেও তদবির চলে। যারা আসামী তারাও এসে ধরে, যারা বাদী তারাও ফরিয়াদ করে। কিন্তু তদরিবর নিয়ে যারা আসেন, তাদের বাছবিচার না থাকলেও সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমার নিজের একটা বাছবিচার আছে। কেউ আসলেই আমি তদবিরটা মেরে দেই না। একটু তলিয়ে দেখি। তদন্তে হস্তক্ষেপ করার মতো কোন পরিস্থিতি যাতে মাঠ পর্যায়ে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও পূর্ণ সচেতন থাকতে হয়।

 

পুলিশের চাকরির শুরুতেই তদবির করেছিলাম একটি  এসিড অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলার আসামীর পক্ষে। বাদীর এজাহার, আলামত, ডাক্তারি প্রতিবেদন ও স্থানীয় বিষয়াদি বিশ্লেষণ করে আমার মনে হয়েছিল, আসামীদের নিতান্তই হয়রানির জন্য এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমি থানার অফিসার-ইন-চার্জকে বিষয়টি সততা ও ন্যায় বিচারের মনোভাব নিয়ে দেখার অনুরোধ করেছিলাম। অফিসার-ইন-চার্জ নিজেই এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিলেন।

 

আমি সেই অফিসারের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছিলাম। অত্যন্ত ছোট ছোট অক্ষর অথচ এত স্পষ্ট ছিল যে, যে কোন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ তা গড় গড় করে পড়ে ফেলতে পারবেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি অতি সংক্ষেপে পুরো ঘটনাকে বর্ণনা করে, তার তদন্তের খুঁটিনাটি পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে। তার সাথে তুলে ধরা হয়েছে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার যুক্তিসমূহ। পরবর্তী জীবনে কয়েক হাজার মামলার তদন্ত তদারক করেছি। অনেক চূড়ান্ত প্রতিবেদন পড়ে দেখেছি। কিন্তু এ ধরনের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চূড়ান্ত প্রতিবেদন আমি আর পাইনি। আমার জানা মতে এ চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি একজন অভিজ্ঞ পুলিশ তদন্তকারী কর্মকর্তার শ্রেষ্ঠ লেখনি। রংপুরের মিঠাপুকুর থানার সেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম আর মনে নেই। তবে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের লেখা, ভাষা ও তার নিরপেক্ষতা আমার সারা জীবনই মনে থাকবে।

 

কিন্তু থানা থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলে কি হবে, সেই মামলার আসামীরা শেষ পর্যন্ত অভিযোগপত্র থেকে বাঁচতে পারেনি। বাদী এ চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেয়। মামলাটির অধিকতর তদন্তভার পড়ে সার্কেল এএসপি’র উপরে। সার্কেল এএসপি অবধারিতভাবে এ মামলার সুপারভাইজিং অফিসার ছিলেন।  সার্কেল এএসপি একটি মামলা রুজু থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত শুধু তদারকই নয়, নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তার কাছে প্রতিনিয়তই তদন্তকারী কর্মকর্তার সিডি যায়, সাক্ষীদের জবানবন্দী যায়। তিনি তদন্ত কোন পথে যাচ্ছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা কোন অসদুপায় অবলম্বন করছেন কিনা  তাও কাগজ কলমেই বুঝতে পারেন।

 

অন্যদিকে, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এ সার্কেল এএসপি’র মাধ্যমেই আদালতে গিয়েছিল। মামলা নিষ্পত্তির পূর্বে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার রুজু থেকে শুরু করে তদন্ত ও তার তদারক — সব কিছুর বিবরণ দিয়ে মামলার প্রতিবেদন তৈরির পূর্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠান। এতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্র প্রদানের ব্যাপারে প্রস্তাবনা করা হয়।  মামলার তদন্ত সঠিক না হলে ঊর্ধ্বতনরা সেই প্রস্তাবনায় সই করেন না।

 

এ এসিড নিক্ষেপ মামলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এ ডিপার্টমেন্টাল পদোন্নতি প্রাপ্ত সার্কেল এএসপি ইতোপূর্বে একই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের ব্যপারে শুধু একমতই হননি, তার সপক্ষে তিনি মন্তব্যও লিখেছিলেন। অথচ একই মামলার অধিকতর তদন্তভার তার উপর অর্পিত হলে তিনি আর ফাইনাল রিপোর্ট প্রদানে সম্মত হননি। তিনি কোন রকমে একটি অভিযোগপত্র দিয়ে বসেন। যাহোক, পরবর্তীতে সে মামলায় আসামীগণ সবাই বেকসুর খালাস পায়।

 

এক শ্রেণির পুলিশ অফিসার শুধু তদন্ত নয়, যে কোন কাজেই সামান্যতম ঝুঁকি নিতে চান না। আদালতে কেউ নারাজি দিলেই অধিকতর তদন্তে একটি মিথ্যা ঘটনাকে সত্য বানিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পরিবর্তে একটি অভিযোগপত্র দিয়ে বসেন তারা। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেন না, পেশাগত জীবনে তাদের নিরাপদ প্রান্তে (Safe Side) থাকার এ কৌশল ভূক্তভোগীদের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে! মামলা রুজু, তদন্ত, গ্রেফতার ও বল প্রয়োগের মতো একচেটিয়া বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী কোন সরকারি সংগঠনের সদস্যদের কুয়োর ব্যাঙকে পাথর মেরে মজা পাবার মতো বালকসুলভ মানসিকতা থাকা উচিৎ নয়।

 

বাদী নারাজি দিবেন বলেই আমি নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে অপরাধী বানিয়ে মামলার অভিযোগপত্র দিয়ে বসব—এটা কি মানবিক আচরণের মধ্যে পড়ে? প্রত্যেক পেশার সাথে কিছু কিছু ঝামেলা-ঝক্কি ওতপ্রোতভাবে জাড়িত থাকে। ইংরেজিতে এটাকে অনেকে পেশাগত বিপত্তি বা Professional Hazard  বলেন। একজন পেশাদার পুলিশ অফিসার তার পেশাগত বিপত্তিকে মেনে নিয়েই তার দায়িত্ব পালন করেন। শুধু নিজের ঝামেলা এড়ানোর জন্য একজন নিরীহ নাগরিককে আইনী ধাঁধাঁর মধ্যে ফেলে দেয়া পেশাগত দুরাচারই বটে। আমাদের পুলিশ অফিসারদের এ দুরাচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে।(মূল- ২২ জুলাই, ২০১৩; পরিমার্জন ২৫ জুন, ২০১৫)