ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২১শে  ফেব্রুয়ারি,৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম শুরু হয় ঢাকায়। তার পরদিন অর্থাৎ, ২২ শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র, জনতা, মেহনতী মানুষ হলো ক্ষিপ্ত। মর্মাহত। শোকে শোকাছন্ন। প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল, সরকার বিরোধী শ্লোগান শুরু হলো সর্বত্র। এ কার্যক্রম থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরও বাদ পড়ল না। সেখানেও শুরু হলো প্রতিবাদ সভা, মিছিল। ছাত্র-জনতার ঢল নামে রাস্তায়। নারায়ণগঞ্জ শহর জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে।

 

এমতাবস্থায়, সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। বিরোধী কার্যকলাপ দমনের লক্ষে আইন-শৃঙ্খলা জোরদার করা হলো। বন্দুকধারী পুলিশ মোতায়েন করা হলো রাস্তায় রাস্তায়। অধিকতর ব্যস্ত রাস্তা এবং মোড়ে মোড়ে স্থির পাহারা বসান হলো। টহল পুলিশ রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে চলল। পুলিশের তৎপরতা বেড়ে গেল। কিন্তু তাতেও কি জনতার মুখ বন্ধ হয়। প্রতিবাদ তার সামনে করেই চলল। বেলা বারটা নাগাদ একটা স্থির পাহারা পোষ্টের উপর হঠাৎ একটা গুলি হলো। তাতে একজন রাইফেলধারী কনস্টেবল মারা যান। সামনে ছিল একটা টিনের ঝাঁপওয়ালা চায়ের দোকান। ঐ ঝাঁপের উপরও তিন চারটা ছিদ্র হয়।

 

এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। শহরে দারুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সে আমলে একজন কনস্টেবল প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্য করা একটা অভাবনীয় ব্যাপার বলে মনে করা হত। চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। সমস্ত প্রশাসন নড়ে উঠলো। কর্তৃপক্ষ মনে করলেন, এটা একটা মারাত্মক অন্তর্ঘাতী কাজ। বিরোধী রাজনৈতিক পার্টিকে দায়ী করা হলো। মনে করা হলো, তারা সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারের পুলিশকে আক্রমণ করেছে। এদেরকে দমন করতেই হবে।

 

আইজি পুলিশ থেকে আরম্ভ করে গভর্নর পর্যন্ত কান খাড়া করলেন। পুলিশের একার উপর আর নির্ভর করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে সামরিক বাহিনীর তলব পড়লো। জারি করা হলো কারফিউ। বন্ধ হলো রাস্তায় ঘুরাফেরা। আটকা পড়ে গেল যে যার ঘরে। শুরু হলো ব্যাপক ধরপাকড়। বিরোধী পার্টির ছোটবড় নেতাদের আটক করা হলো। নারায়ণগঞ্জ জেলখানায় আর ঠাঁই নাই। সামরিক বাহিনীর টহল চলতে থাকে কয়েক দিন ধরে। কারফিউ মাঝে মাঝে থেমে থেমে চলল।

 

এদিকে যে কনস্টেবলটি প্রাণ দিল তার লাশ দেশের বাড়িতে পাঠানো হলো।  নিহতের অভিভাবকদের দশ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হল।  হত্যা ও বিষ্ফোরক দ্রব্যের মামলা রুজু হল নারায়ণগঞ্জ থানায়। তদন্তের ভার পড়লো ঐ থানার একজন অফিসারের উপর-অবশ্য একজন উপরওয়ালা সুপারভিশনে থাকলেন।

 

কিছুদিন ধরে ঘোর তদন্ত চলল। কত কাঠখড়ি যে পুড়লো, কত টানাহেঁচড়া হলো, তার ইয়ত্তা নেই। তদন্তে দেখা গেল, মৃতের দেহে দুইটি জখম, একটি হাতে; অপরটি বুকে। তাছাড়া চায়ের দোকনের টিনের ঝাঁপের উপর আরো তিন-চারটি ছিদ্র। সাক্ষীরা বলল, তারা একটি মাত্র গুলির আওয়াজ শুনেছে। সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণ হলো যে একবার মাত্র গুলি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি মাত্র গুলিতে এতগুলি ছিদ্র হয় কি করে? তবে নিশ্চয় টোটার বন্দুক ব্যবহার করা হয়েছে। একটি টোটার মধ্যে অনেকগুলি ছররা থাকে, সেগুলি বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করেছে যে কারণে এতগুলি ছিদ্র হয়েছে। এই ছিল নারায়ণগঞ্জের থানার তদন্তকারী অফিসারের অভিমত।

 

পশাসনের উৎসুক দৃষ্টি ছিল তদন্তের ফলাফলের দিকে। নারায়ণগঞ্জ থানা পুলিশের উক্ত মতামতের উপর প্রশাসন একরকম নিশ্চিত হলো যে বিরুদ্ধে রজানৈতিক পার্টি সরকারকে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ এই হত্যাক- ঘটিয়েছে। এই হত্যাকা-ে ব্যবহৃত বন্দুক খুঁজে বের করার জন্য বহু জায়গায় পুলিশ হানা দিল। যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মার্ডার কেসের চার্জ ফ্রেম করা হবে স্থির হলো। মামলার তদন্ত একরকম শেষ পর্যায়ে। তদানন্তীন আইজি, পুলিশ ব্যক্তিগত ভাবে এ ব্যাপারে তাদরক করছিলেন। তবু তিনি ১০০% নিশ্চিত হবার জন্য ডিআইজি সিআইডি-কে নির্দেশ দিলেন।  যদিও ঘটনা ঘটেছিল বেশ কিছু দিন আগে তবুও সিআইডি-র ব্যালেষ্টিকস এক্সপার্টকে দিয়ে ঘটনাস্থলটা সরেজমিনে পরিদর্শন করে তার একটা মতামত  গ্রহণের জন্য আইজিপি নির্দেশ দিলেন।

 

নির্দেশ মোতাবেক ব্যালেস্টিকস এক্সপার্ট জনাব সাকেদ আলী নারায়ণগঞ্জ থানায় গেলেন। কেসের ইতিহাস ভালভাবে শুনলেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন। সঙ্গে ছিল নারায়ণগঞ্জ থানার তদন্তকারী অফিসার। যে টিনের ঝাঁপের উপর গুলির ছিদ্র হয়েছে সেগুলো ভাল করে পরিদর্শন করলেন ব্যালেস্টিকস এক্সপার্ট।

 

মৃতদেহের ক্ষতস্থান দেখার প্রশ্নই উঠে না, কারণ তার সৎকার অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে। কাজেই তার মেডক্যাল রিপোর্টটা দেখলেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ডিউটিকালে কোথায়, কোন্ কনস্টেবল কি অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল এবং যিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনি কি অবস্থায় ছিলেন —  এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলের সিআইডি এক্সপার্ট জনাব সাকেদ আলী। তিনি শুধু বর্ণনা শুনেই সন্তুষ্ট হলেন না। পুলিশ নিয়ে রীতি মতো ডেমনেস্টেশন করে দেখলেন। এর পর তিনি যে অভিমত দিলেন তা তদন্তকারী অফিসার এবং প্রশাসনের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি নিশ্চিতভাবে বললেন, এখানে টোটার বন্দুক ব্যবহার করা হয়নি এবং মৃতের দেহের ক্ষত ও টিনের চালার ছিদ্রসমূহ টোটার গুলি থেকেও হয়নি। এখানে রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। এটা রাইফেলের গুলি এবং একটা মাত্র বুলেট দ্বারা এতগুলি ক্ষত ও আঘাত হয়েছে।

 

তিনি ব্যাখ্যা করলেন, মৃতের দেহে যে দুটি ক্ষত মেডিকেল রিপোর্টে দেখা যায়, তার একটি হাতে; অন্যটি বুকে। এর দ্বারা তদন্তকারী অফিসার বলতে চাচ্ছেন, ছররার আঘাত কোনটা হাতে কোনটা বুকে এবং কোনটা টিনের ঝাঁপে লেগেছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেই সেরূপ নয়। রাইফেল থেকে একটিই গুলি ছোড়া হয়েছে। একটা বুলেটই প্রথম আঘাত করেছে হাতে। হাতের যে স্থান দিয়ে বুলেটটি ঢুকছে সে স্থানের ছিদ্রটা আকারে ছোট। ঠিক বুলেটের মাপ সমান। হাতের উপর দিকে সে স্থান দিয়ে বুলেটি বেরিয়ে গেছে সে স্থানের ছিদ্রটি অপেক্ষাকৃত বড়। এটাই রাইফেলের ধর্ম।

 

রাইফেলের গুলির বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পাকিয়ে পাকিয়ে চলে। হাতে আঘাত করে বুলেটি বের হয়ে দ্বিতীয়বার আঘাত করেছে বুকে। দ্বিতীয় বারের ছিদ্রটা হয়েছে আকারে আরো বড়। আবার বুক চিরে পিঠের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। বেরিয়ে যাওয়ার ছিদ্রটা আকারে পূর্বাপেক্ষা ছোট এবং পিঠ থেকে বেরিয়ে ঝাপের টিনের উপর দিয়ে স্লিপ খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত চায়ের দোকানের চৌকাঠে ঠেকেছে। লক্ষ করে দেখা গেল, চৌকাঠে বুলেটের দাগ তখনও পড়ে আছে। এটা তদন্তকারী অফিসারের নজরেই পড়েনি।

 

রাইফেলের ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রথম যেখানে বুলেটের আঘাত লাগবে সে ছিদ্রটা হবে ছোট, ঠিক বুলেটের মাপ মতো। সেটা যেখান দিয়ে বের হয়ে যাবে সেটা হবে আকারে বড়। সেই বুলেটটি দ্বিতীয়বার যেখানে আঘাত করবে, সে ছিদ্রটা হবে আকারে আরো বড়। সেই বুলেটটি দ্বিতীয়বার যেখানে আঘাত করবে সে ছিদ্রটা হবে আকারে আরো বড়। কিন্তু যেখান থেকে আবার এটা বের হবে সে ছিদ্রটা হবে পূর্বাপেক্ষা আকারে ছোট। ব্যালেসটিকস এক্সপার্ট বই-কেতাব খুলে রাইফেলের এ ধর্ম দেখিয়ে দিলেন। মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী মৃতের দেহে ক্ষতও এ রকমই ছিল।

 

তদন্তকারী অফিসারের টনক নড়লো। তবে কি এতদিন যে জল্পনা-কল্পনা চলছে সবই ভুল? এক্সপার্টের মতামত আইজি পুলিশকে জানান হলো। তিনি জানালেন সরকারকে। এতদিন তদন্ত যে লাইনে চলে আসছিল এবং যে ধারণার উপর ভিত্তি করে এতসব রাজনৈতিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে জেলখানায় ঢোকানো হয়েছে, আজ  নতুন কথা শুনে সরকার সহজে তা মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু এক্সপার্টের অভিমতকে নাকচ করাও যাচ্ছে না। প্রথম থেকে যে ভুল করে আসছে তা তারা এখন শোধরাবে কি করে? ব্যাপারটা আরো একটু ভাল করে তাদারক কারার জন্য ডিআইজি অব সিআইডি-কে নির্দেশ দিলেন ব্যাক্তিগতভাবে সরেজমিনে ডেমনেষ্টেশন করে দেখার জন্য। ডিআইজি, সিআইডি এক্সপার্টকে সঙ্গে নিয়ে নারয়ণগঞ্জে এলেন। তাকে সরেজমিনে ডেমনেসট্রেসন করে বুঝানো হলো। ডিআইজির কাছে ব্যাপারটা পানির মতো পরিষ্কার হলো। সেখানে অনুসন্ধান করে তখনই পাশের ড্রেনের মধ্যে বুলেটটি পাওয়া গেল। কাজেই এর চেয়ে সঠিক প্রমাণ আর কি হতে পারে?

 

এবার তদন্তের মোড় ঘুরে গেল। পরবর্তী তদন্তে জানা গেল, স্থির পাহারা পোষ্টের কনস্টেবলদের দু’ঘন্টা পর পর বদলী করতে হয়। তখন আপন আপন রাইফেল লোডিং-আনলোডিং করতে হয়। লোডিং করার সময় আলোচিত কনস্টেবলটির রাইফেল থেকে একটি বুলেট বেরিয় যায়। তদন্তে আরো দেখা গেল, যে কনস্টবলটি মারা গেছে সে তখন শ্লোপ-আর্ম পজিশনে মানে বগলের নিচে অস্ত্র নিয়েছিল। কাজেই প্রথম হাতে গুলি লেগে ভেদ হয়ে বুকে গুলি লাগা খুবই স্বাভাবিক। যে কনস্টেলের রাইফেল থেকে ফায়ার হয়েছে তার একটি বুলেটের হিসাব পাওয়া যায়নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হলো যে এটা একট দুর্ঘটনামূলক ফায়ারিং । গুলিটি পুলিশের রাইফেল থেকেই হয়েছে। এর জন্য বাইরের লোক দায়ি নয়।

 

এই কেসে যেসব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের ধরা হয়েছিল তাদের অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া হলো। তবে তদন্তে এত কিছু যে হল, এ ভিতরের রহস্যটুকু বাইরের কেউ টের পেল না। দেশবাসী জানলো সরকার সদয় হয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মুক্তি দিয়েছেন। পুলিশ হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হল। ( মরহুম সিকান্দার আলী পিপিএম এর আত্মজীবনী আমার পুলিশ-জীবন অবলম্বনে রচিত, ২২ জুন, ২০১৫)