ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশের থানা-পুলিশের কাছে যে সব ধর্তব্য অপরাধের জন্য ফৌজদারি মামলা রুজু হয় তাদের মধ্যে ১০-১২% থাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা। কত বিচিত্র কারণে মানুষ এ আইনের আওতায় যে মামলা করে তা বিচার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত পুলিশ, আইনজীবী বা বিচারক না হলে পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করা দুরুহ।

 

৭০ বছরের বৃদ্ধের শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক দাবি করা থেকে শুরু করে ৭/৮ বছরের নাবালিকা অপহরণের অভিযোগেও এই আইনের অধীন মামলা রুজু হয়। এ আইনের মামলা সমূহের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে যে কেউ নিজেকে ঘৃণা করবেন এ ভেবে যে আমরা কোন সমাজে বসবাস করছি, আমাদের সম্পর্কে অন্য সমাজের লোকদের মূল্যায়ন বা কি!

 

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করতে গিয়ে নাইজেরিয়ান এক মহিলা পুলিশ অফিসারের সাথে তর্ক বাঁধিয়ে শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিয়েছিলাম। তর্কের বিষয় ছিল ‌‘আমরা বাংলাদেশে মেয়েদের পাইকারী হারে নির্যাতন করি’। এটা আমাদের সমাজে মহামারী রূপে বিরাজ করছে। এখানে নাবালিকা মেয়েরা অহরহ অপহরণের শিকার হয়, ধর্ষণ ও ধর্ষণ প্রচেষ্টা এদেশে একটি অতি সাধারণ সামাজিক ব্যধি। আর যৌতুকের জন্য মারপিটের কোন লেখা জোখা নেই। আমরা পিতা-পুত্র, মামা-ভাগ্নে, ছোটভাই-বড়ভাই, চাচা-ভাতিজা, শিক্ষক-ছাত্র এক সাথে নারী ধর্ষণে মত্ত থাকি।

 

আমার ডিফেন্স ছিল আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা আর এই আইনের পরিকল্পিত অপপ্রয়োগ। আর আমার নাইজেরিয় শান্তিরক্ষী সহকর্মীর অস্ত্র ছিল আমাদের পুলিশ ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন গবেষণায় প্রদত্ত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাসমূহের পরিসংখ্যান। সেদিন অপরাধ পরিসংখানের কাছে আমাকে পরাচিত হতে হয়েছিল। কারণ, অপরাধ পরিসংখ্যান সম্পূর্ণরূপে সরকারি দলিল। অন্যদিকে, আমার সামাজিক বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব উপলব্ধি। তাই সরকারি দলিলের কাছে ব্যক্তিগত যুক্তি পরাজিত হবারই কথা।

 

আমার এলাকার বেশ কিছু বিষয়ে আমার কাছে মানুষ জন আসে, ফোন করে, আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে তদবির করে। তাদের তদবিরের একটি বড় অংশ হল নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা। কেউ কেউ ফোন করের মামলায় পড়ার পর, কেউ বা ফোন করের মামলা রুজ করার জন্য। উভয়ের স্বার্থই আমি রক্ষা করার চেষ্টা করি। কারণ বাদি-বিবাদী আর আসামী-ফরিয়াদি উভয়েরই আইনি সুরক্ষার অধিকার রয়েছে।

 

পুলিশে যোগদান করার পর দ্বিতীয় যে মামলার আসামীদের জন্য তদবির করেছিলাম তা ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন যৌতুকের জন্য মারপিটের মামলা। ঘটনাটি ছিল আমার গ্রামের অন্য পাড়ার। মামলার বাদি ও আসামী উভয়ই আমার গ্রামের মানুষ। তাই ঘটনাটি জানার পর সংগত কারণেই আমি একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম। মামলার আসামীদের চেয়ে বাদির সাথেই আমার ওঠা-বসা বেশি ছিল। কিন্তু ঘটনাটি যেরূপ তাতে বাদির চেয়ে আসামীরাই আমার সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য ছিল।

 

ঘটনাটি ছিল এইরূপ। ভিকটিমকে আসামী পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল প্রায় অসম্ভব। কারণ ভিকটিমের বয়স ছিল ৪০ এর উপর। সে স্বামী পরিত্যাক্তা। তার ঘরে শুধু ছেলে মেয়েই ছিল না, ছিল মেয়ের জামাইও। বস্তুত ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক ওল্টো। অবিবাহিত ২০/২২ বছরের প্রধান আসামীকে বরং ভিকটিমই ভুলিয়ে ভালিয়ে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিল। বিয়ের কাবিনের অন্যতম সাক্ষী ছিল ভিকটিমের মেয়ের জামাই। ছেলের বাবা-মায়ের আর্থিক সংগতি ভাল। অন্য দিকে মেয়ের পরিবার গ্রামের অন্যতম দরিদ্র পরিবার।

 

আসামী পক্ষ বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত ছিল। তারা তার ছেলেকে বউ নিয়ে বাড়িতে উঠতে দিতে নারাজ ছিল। কিন্তু এক দিন এই যুবক ছেলের মধ্য বয়সী বউ ঢাকা থেকে গিয়ে জোরপূর্বক শ্বশুর বাড়িতে ওঠে। শ্বশুর বাড়ির সবাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এতে নিঃসন্দেহে চুলাচুলি হয়।

 

ভিকটিমের বড় ভাই থানায় গিয়ে মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তার বোনকে তার শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই মিলে যৌতুকের জন্য মারপিট করেছে। বটি দিয়ে আঘাত করার ফলে তার এক হাতে ক্ষত হয়েছে। কিন্তু ভিকটিমের হাতের ক্ষতটির কথা সঠিক হলেও তা হয়েছিল ঘটনার বহু আগে তরকারী কাটার বটি দিয়ে। ৫/৭ বছরের একটি শুকানো ক্ষতকেও তারা নতুন ক্ষত বলে চালিয়ে দিয়ে মামলা করেছিল।

 

মামলার আসামী গড়পড়তা বাড়ির সবাই। সে সময় আমি দিনাজপুর জেলায় প্রবেশনার ছিলাম। ঝড়বাদলের দিনে অন্যতম আসামী ছেলের বাবা আমার ডাকবাংলোতে গিয়ে হাজির। সাথে আমার বড় ভাই। কাঁদতে কাঁদতে  ছেলের বাবা  তার দুঃখের বর্ণনা দিলেন। তার কথা হচ্ছে, আমি আমার ছেলেকেও বাড়িতে স্থান দেই নি। তাই মধ্য বয়সী ছেলের বউকে বাড়িতে থাকতে দিতে পারি না। আমার ছেলে নয়, বরং সে আমার ছেলেকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছে। আমি কোন অপরাধ করিনি। আমার ছেলে তাকে নিয়ে সংসার করুক। আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমার বাড়িতে নয়। আমি হাজি মানুষ। এখন রমজান মাস। পুলিশের ভয়ে বাড়ি থাকতে পারি না। ঠিক মতো ইফতারিতে বসতে পারি না। নামাজে দাঁড়াতে পারি না। তারাবির নামাজে দাঁড়ালে গাড়ির শব্দ শুনলে মনে হয়, ঐ বুঝি পুলিশ এলো। নামাজ ছেড়ে পালিয়ে যাই। বড়ই করুণ অবস্থা আসামী হাজি সাহেব।

 

আমি তখনও একজন শিক্ষাণবিশ অফিসার মাত্র। কোন মামলার তদবির করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধ করতে বড়ই ভয় হত। তবে সার্কেল এএসপি সাহেবের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল। তাই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি রংপুর বি-সার্লের এএসপি জনাব রফিকুল ইসলামকে ফোন করি।  সার্কেল এএসপি  হাজি সাহেবকে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেন। আসামী হয়েও তিনি সার্কেল এএসপির কাছে পরদিন গেলেন। সার্কেল এএসপি বড় ভাল মানুষ, সৎ, নিষ্ঠাবান ও ন্যায় পরায়ন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি বাড়ি গিয়ে রোজা রাখুন, নামাজ পড়ুন। আপনাকে কেউ আর ধরতে যাবে না। আর পারলে আমাদের জন্য দোয়া করুন।’ হাজি  সাহেবের মন থেকে ভয় কাটল। তিনি বাড়ি গিয়ে ইবাদত বন্দেগি শুরু করলেন। এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। কোন না রাজি টেকে নাই।

 

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলোর সাজার হার নিম্ন হওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে প্রচুর সমালোচনা হয়। এ সমালোচনায় সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে মুটে মজুর শ্রেণির মানুষ পর্যন্ত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এসব মামলা মিথ্যা। কেউ কেউ বলেন, পুলিশের তদন্তের দুর্বলতার জন্যই অপরাধীদের সাজা হয় না। কেউ কেউ আবার এমনও দাবি করেন যে, এ আইনটি বর্তমানে পুরুষ নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাই পুরুষ নির্যাতন নিবারণের জন্য পৃথক আইন দরকার।

 

মিথ্যা মামলা বলার সারিতে পুলিশ অফিসারগণও রয়েছে। কিন্তু পুলিশ অফিসারগণ এ ক্ষেত্রে তীব্র স্ববিরোধিতায় ভোগেন। থানার অফিসারগণ বলেন, এ আইনের অধিকাংশ মামলা মিথ্যা। কিন্তু তারা তদন্ত শেষ করে আবার অধিকাংশ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, ঘটনার সত্য-মিথ্যা কোন প্রসঙ্গই নয়, প্রাসঙ্গিক হল পুরুষদের, বিশেষ করে স্বামী বা স্বামী পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগপত্র। আমার আলোচিত ঘটনায়, অন্তত এ বিষয়টি হয়নি। সার্কেল এএসপির মহানুভবতায় সত্যই বিজয়ী হয়েছিল। (২২/৭/২০১৩)