ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের পাঠানোর খবরে অনেকেই আতঙ্কিত হয়েছেন। গৃহকর্মীদের উপর নিয়োগকারীদের নির্মম আচরণের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি দেশ গৃহকর্মী প্রেরণ বন্ধ রেখেছে – এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।  কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ নারীদের জন্য সরকার বিদেশে কর্মসংস্থান খুঁজবে না – এটা তো হতে পারে না।

বাংলাদেশে নারীদের তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করার প্রাথমিক পর্বে অনেক কথাই শোনা যেত। মালিকপক্ষ, বিশেষ করে তাদের নিয়োগকৃত অফিসার ও নিয়ন্ত্রকগণ, নারী গার্মেন্টসকর্মীদের নির্মম নির্যাতন করত বলে অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছিল; এখনও হয়। এ নির্যাতন শুধু আর্থিক বা শারীরিকই নয়, এগুলোর মধ্যে যৌন নির্যাতনের খবরও থাকে। কিন্তু তাই বলে আমরা গার্মেন্টস সেক্টরে মহিলাদের নিয়োগ বন্ধ রাখিনি। বস্তুত প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্পসংখ্যক নারী থাকায় শোষকগণ যে সুবিধা পেত, বর্তমানে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী গার্মেন্টস সেকটরে কাজ করার ফলে তাদের বারগেইনিং ক্ষমতা বেড়েছে। সরকারও সেটা আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু তারপরও গার্মেন্‌টস কর্মী নারীরা যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না, তা কিন্তু নয়। এরপর তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের নারীদের যে আর্থিক সক্ষমতা দিয়েছে এবং যার ফলে তাদের যে  সামাজিক অবস্থানে অগ্রগতি হয়েছে, সেটা তো আমাদের গোটা নারী সমাজকেই প্রভাবিত করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক নারীর গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হলে সেটা গার্মেন্টস সেক্টরের মতো আরও একটি সক্ষমতার খাত তৈরি করবে। যে সকল গৃহকর্মী আমাদের দেশের বাসাবাড়িতে কাজ করছেন, তাদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক অবস্থান যা, তাতে তারা যে দেশে খুব বেশি ভাল অবস্থায় আছেন — এমনটি মনে করা অজ্ঞতা বৈকি! বরং সত্য হল, এরা দেশেও নানাভাবে নির্যাতিতা হচ্ছেন। নাবালিকা গৃহকর্মী তো বটেই, এমনকি প্রাপ্ত বয়স্কা নারী গৃহকর্মীদের উপর এ দেশের কিছু মানুষ যে নির্যাতন চালান, তার ছিঁটেফোটা তো পত্রিকায় প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছে।

 

তাই এ মহিলাগুলো যখন বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হবেন, সেটা তাদের কাছে নতুন কিছু মনে হবে না। বরং সমজাতীয় নির্যাতনের অতিরিক্ত তারা বেশি বেশি বেতন পাবেন, সুবিধা পাবেন। এটা দেশের গৃহকর্তাদের নির্যাতনের সাথে তুলনা করলে মন্দের মধ্যে অনেক বেশি ভাল বলেই তো মনে করি। আমার এ মতকে নারীদের প্রতি  বিদেশি গৃহকর্তাদের নির্যাতনকে বৈধ বলে ছাড়পত্র দেয়ার নামান্তর বলে ভুল বুঝবেন না। এটা আমাদের দেশে অনেকটাই বাস্তবতা। তাই এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে যাওয়া মানে হাজার হাজার গৃহকর্মী যারা মধ্যপ্র্রাচ্যে গিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার বৈদেশিক মূদ্রা করত এবং এর ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন, জাতীয় পর্যায়েও তেমনি আমাদের উন্নয়ন হত।

 

আমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করা নয়, বরং আমাদের উচিৎ হবে সরকারকে এমন পরামর্শ দেয়া যাতে এসব গৃহকর্মীদের বিদেশে পাঠিয়ে তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের শত শত গৃহকর্মী কাজ করছেন। এদের একটি বড় অংশ আবার অবৈধ। অবৈধ হবার ফলে তারা যেমন সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার থেকে কোন আইনি বা প্রশাসনিক সুবিধা পান না, তেমনি বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দুতাবাস/হাই কমিশন থেকেও সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না। এ অবৈধ গৃহকর্মীদের অবস্থা এতটাই করুণ যে তারা মধ্যযুগের আরব দেশের ক্রয়কৃত দাসীদের চেয়েও অধমে পরিণত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হল, এত কিছুর পরেও মাত্র কয়েকটি ডলারের জন্য তারা বিদেশে পড়ে থাকেন।

 

এখন যদি বৈধভাবে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক গৃহকর্মী পাঠাতে পারে তাহলে সেসকল গৃহকর্মী দুই দেশের সরকার কর্তৃক আইনি ও প্রশাসনিক সুবিধা পাবেন। তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আওতায় থাকবেন, তাই তাদের প্রতি অবিচার করা হলে তা সাথে সাথেই সরকারি মহলে জানাজানি হবে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসবে। অবৈধ হবার ফলে যে প্রতিবাদ শক্তি তাদের ছিল না, বৈধ হওয়ার ফলে সেটা তারা পেয়ে যাবেন। তাই নিয়োগকারীগণ তাদের উপর যেনতেন ব্যবহার করতে পারবেন না।

তারপরও যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীদের নির্যাতনের একটা ইতিহাস বা ধারণা প্রচলিত আছে, সেহেতু সরকারকে প্রেরিতব্য গৃহকর্মীদের সহায়তা দেয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন বোধে এজন্য নতুন নতুন কনসুলার অফিস খুলতে হবে। শ্রম বিষয়ক সুবিধাদি দেখভালের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও আইনি তথা ফৌজদারি বিষয়গুলো দেখা শোনার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের এসব দূতাবাস/কনসুলারে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

 

এজন্য বাংলাদেশ সরকারের কোষাগার থেকে অবশ্যই একটু বেশি খরচ করতে হবে। কিন্তু এ সব গৃহকর্মী যে বৈদেশিক মূদ্রা রোজগার করে দেশে পাঠাবেন, তার তুলনায় এ বাড়তি খরচ তেমন বেশি কিছু নয়। নারী গৃহকর্মী ছাড়াও সাধারণ প্রবাসীগণও বিদেশে গিয়ে প্রতারণা, চাঁদাবাজি, অপহরণ এমন কি মানব পাচারের  শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সীমারেখায় বিস্তৃত এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেফতার তথা দেশে ফেরত নিয়ে এসে বিচারের সম্মুখীন করার লক্ষে বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ অনেকবার বিদেশে যাতায়াত করছেন। একজন করে পুলিশ কর্মকর্তা দূতাবাস/হাইকমিশনগুলোতে নিয়োগ করা হলে এ ধরনের অপরাধ গোড়াতেই নিবারণ করা যাবে। একই সাথে দূতাবাস/হাইকমিশনের মাধ্যমে প্রবাসীদের আইনগত সহায়তা দেয়ার কাজটিও নিশ্চিত হবে।

(৩ জুলাই, ২০১৫)