ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশে প্রথম কারাগার স্থাপিত হয়েছিল ১৭৮৮ সালে ঢাকায়। প্রথম দিকে এটাকে বলা হত ক্রিমিনাল ওয়ার্ড। কিন্তু কারাগারের ব্যবস্থাপনার বিধান সম্বলিত একটি কোড তৈরি করা হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। এর পর কোডে সাতবার সংশোধনী এসেছে। সর্বশেষ সংশোধনী এসেছিল ১৯৩৭ সালে। এর পর ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারও হতে চলল প্রায় অর্ধশত বছর। কিন্তু নির্বাহী আদেশে কতিপয় পরিবর্তন ও সংশোধনী এলেও, জেল কোডে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়নি।

 

এটা অবশ্য আমাদের বিচার ব্যবস্থারই সার্বিক চিত্র। এক্ষেত্রে কিছু নতুন আইন ও বিধি তৈরি হলেও আমাদের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থায় মৌলিক কোন পরিবর্তন আসেনি। এ অপরিবর্তনীয়তার পিছনে দুইটি বিবেচনা কাজ করতে পারে। প্রথমত, ব্রিটিশগণ আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে এতটাই ‘আমাদের উপযোগী’ করে তৈরি করেছিল যে ব্রিটিশগণ চলে যাবার প্রায় আশি বছর পরও এগুলোর উপযোগিতা আগের মতোই রয়েছে। তাই পরিবর্তন প্রয়োজনীয়। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশহীন বঙদেশের বিচার ব্যবস্থার ধারকবাহকগণ এতটাই মেধাশূন্য যে, প্রয়োজন থাকলেও এতে কেউ পরিবর্তন আনার মতো দুঃসাহস দেখাতে পারছে না। অর্থাৎ ব্রিটিশরা যা তৈরি করে আমাদের উপর প্রয়োগ করেছেন, তা সংশোধনের মুরোদ আমাদের নেই। ১৮৬৪ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ৭৩ বছরে ব্রিটিশ সরকার জেল কোডে সাতবার পরিবর্তন ও সংশোধনী নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এর পর দীর্ঘ ৭৮ বছরেও প্রভূত প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও আমরা  এর একটি সংশোধনীও নিয়ে আসতে পারিনি।

 

তবে বাংলাদেশে এটা সংশোধনীর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয় ২০০৩ সালে। এ সময় একটি উচ্চ পর্যয়ের কমিটি ৬০ টি বৈঠকের মাধ্যমে জেল কোডে কিছু পরিবর্তনের সুপারিসসহ একটি খসড়া প্রস্তুত করে। খসড়াটি যথারীতি কেবিনেট বৈঠকে অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং এ পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছরেও এটা চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা যায়নি।

 

গত ৭ জুলাই, ২০১৫ তারিখ বাংলাদেশ সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে এই ভেটিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আইন, সচিব। আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। মিটিং এ উপস্থিত সদস্যদের অধিকাংশই ছিল কারাগাার ও কারা প্রশাসনের সাথে জড়িত। সমাজ সেবা মন্ত্রণালয়ের একজন ডেপুটি সেক্রেটারি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে আমিই সম্ভবত একটু বেশি বাইরের। উপস্থিত ছিলেন কারা প্রশাসনের আইজি (প্রিজন)।

 

বলতে কি আমি ইতোপূর্বে জেল কোড পড়ে দেখিনি। পুলিশের মৌলিক প্রশিক্ষণে জেল কোডের কোন অংশই পড়ানো হয়না।কারণ এটা পুলিশের দায়িত্ব পালনে তেমন কোন কাজে আসে না। কিন্তু আজ যখন এটা সংশোধনীর জন্য গঠিত কমিটিতে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, তখন পড়াশোনা না করে মিটিং এ উপস্থিত হওয়াটা বোকামীর পরিচয় হবে বলেই মনে হল। তাই পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স লাইব্রেরি থেকে একটি বই নিয়ে (জেল কোড সংকলন মোঃ আবু বকর সিদ্দীক, কামরুল বুক হাউক ২০০৬) পড়া শুরু করলাম। এটাই  আমার জেল কোডের প্রথম পাঠ।  জেল কোড মূলত ৬টি বিশেষ আইন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধিসহ আরো কয়েকটি বিশেষ আইনের কিছু ধারা বলে রচিত একটি সংহিতা।  ১৯৩৭ সালের সপ্তম সংশোধনীতে আরো প্রায় পাঁচটি আইনের বিধি বিধান এতে সন্নিবেশিত হয়েছিল। কিন্তু সেই সব আইন বাংলাদেশে পরে রহিত  করা হয়েছে।

 

এমতাবস্থায়, পুরো জেল কোর্ড না পড়লেও কোডের মূল আইন গুলোর মধ্যে উম্মাদ আইন-১৯১২, শিশু আইন-১৯৭৪, বন্দী আইন- ১৯০০ ও বন্দী শনাক্তকরণ আইন-১৯২০ আমি ইতোপূর্বে পড়েছিলাম। জেল কোডে কি আছে, না আছে তা একদম অজানা ছিল না।

 

যাহোক, অবশেষে ৭৮ বছর পরে হলেও জেল কোডের একটা সংশোধনী হয়তো চলতি বছরই গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। আর এ ব্যাপক কর্মকাণ্ডের সামান্য অংশ হতে পেরে আমার ভালই লাগছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এ সুযোগে কারা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারছি যেটা আমার অপরাধ বিজ্ঞানের চর্চা ও অপরাধ বিষয়ক লেখনিতে ইতিবাচক সংযোজনী বলে বিবেচিত হবে। (০৭/০৭/২০১৫ ইং)