ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পৃথিবীর ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় সনাতনি শাস্তি হল শারীরিকভাবে কষ্ট দেয়া। আদিতে এ কষ্ট দেয়ার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। মিশেল ফুকোর ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’ গ্রন্থের শুরুর দিকেই এমন একটি শারীরিক শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একজন অপরধীকে ১৮ দিন ধরে শারীরিক শাস্তি দিযে শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়। শাস্তির শুরু হয় প্রথম দিন অপরাধীর একটি হাত  ফুটন্ত পানিতে ঝলসে দেয়ার মাধ্যম। ক্রমান্বয়ে দিনের পর দিন তার এক একটি অঙ্গের উপর চলে নির্যাতন। ফুটন্ত পানি থেকে ক্রমান্বয়ে যাওয়া হয় উত্তপ্ত শিশায়। অপরাধীর বুকেপিঠে ও অন্যান্য স্থানে গতিল শিশা ঢেলে দেয়া হয়। অতঃপর তার অঙ্গগুলো এক এক করে কেটে ফেলা হয়।

 

বিচার ব্যবস্থা ও শাস্তিদানের প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে মানবিক হতে শুরু করে। শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে প্রচলন হয় জেলখানায় বন্দী করে রাখা। অতি আধুনিককালে জেলখানায় বন্দী না রেখে অপরাধীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে ভূক্তভোগীকে দেয়া কিংবা ভূক্তভোগী কিংবা কমিউনিটির জন্য শারীরিক পরিশ্রম করার রীতিও চালু হয়েছে যার নাম দেয়া হয়ে পুনর্ভরণমূলক বিচার ব্যবস্থা বা রেস্টোরেটিভ জাস্টিস সিস্টেম।

 

শারীরিক শাস্তির প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে  রয়েছে বেত্রাঘাত, প্রস্তর নিক্ষেপ্, চাবুক মারা, অঙ্গহানি করা এবং চরমতম হল শাস্তি হিসেবে  অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড দেয়া। জাতিসংঘের পরিকল্পনা অনুসারে ক্রমান্বয়ে পৃথিবী থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান উঠে যাবে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই বললেই চলে। তবে এখনও অনেক দেশে এটা বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং থাকবে।

 

বর্তমান সময়ের অন্যান্য আলোচিত শারীরিক শাস্তিগুলোর মধ্যে বেত্রাঘাত কিংবা চাবুক মারা অন্যতম। পৃথিবীর অনেক দেশেই বেত্রাঘাতের দণ্ড  রয়েছে। মূলত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, এশিয়ার পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ক্ষেগুলো, আফ্রিকার কিছু দেশ ও দক্ষিণ আমেরিকার দু একটি দেশে বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে কমপক্ষে বিশ্বের তেত্রিশটি দেশের বিচার ব্যবস্থায় বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রচলিত আছে । এর বাইরেও অনেক দেশে আছে যেগুলোর দণ্ডবিধিতে বেত্রাঘাতের দণ্ড রয়েছে। কিন্তু নির্বাহী আদেশে হয় তা স্থগিত রয়েছে কিংবা দণ্ড প্রদানকরলেও তা কার্যকর করা হয় না। বলাবাহুল্য, এ ধরনের দেশের মধ্যে বাংলাদেশেও রয়েছে।

 

বেত্রাঘাতের দণ্ড সত্যিকারভাবে প্রচলিত রয়েছে  এমন দেশগুলোর মধ্যে সিংগাপুর অন্যতম। এদেশের বিচার ব্যবস্থায় প্রায় ৩৫টি অপরাধের জন্য বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রচলিত রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য শাস্তির সাথে বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রদান বাধ্যতামূলক। যেমন, ধর্ষণ, মাদক দ্রব্যের চোরাচালান, ভাঙ্গচুর করা, অবৈধ লোনের ব্যবসা করা , ভিসার মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও বিদেশিদের ৯০ দিনের বেশি সিংগাপুরে অবস্থান করার অপরাধে বাধ্যতামূলকভাবে বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হয়।

 

ফৌজদারি অপরাধের বাইরেও সিংগাপুরে জেলখানায় বন্দীদের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, স্কুল-কলেজে ছাত্রদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর অধঃস্তন কর্মচারীদের নিয়ম ভঙ্গের জন্যও বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রদান করা হয়।

 

সিংগাপুরের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বেত্রাঘাতের দণ্ড সাধারণভাবে ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যকার সুস্থ দেহের অধিকারী পুরুষ অপরাধীদের দেয়া যাবে। কোন মহিলাকে এ দণ্ড দেয়া যাবে না। একটি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২৪টি বেত্রাঘাতের আদেশ দেয়া যাবে। বেত্রাঘাত দেয়ার জন্য বিশেষ ধরনের বেত ব্যবহার করতে হবে। এ বেতের ব্যাস ১.২৭ সেন্টিমিটারের বেশি হতে পারবে না। ১৮ বছরের কম বয়সী বালকদের সর্বোচ্চ ১০টি বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া যাবে। তবে তাদের দণ্ড কার্যকর করার সময় অপেক্ষাকৃত হালকা বেত ব্যবহার করতে হবে।

 

বেত্রাঘাতের দণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়াটাও মজার। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সময় যেমন সতর্কতা ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সিংগাপুরে বেত্রাঘাতের দণ্ড কার্যকর করার জন্যও তেমনি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অপরাধীকে দণ্ড কার্যকর করার দিনই এ সম্পর্কে জানান হবে। এরপর ডাক্তার কর্তৃক তার শারীরিক পরীক্ষা করান হয়। ডাক্তার তার রক্তচাপসহ অন্যান্য শারীরিক প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে যদি তাকে বেত্রাঘাতের দণ্ড গ্রহণ করার মতো সুস্থ বলে সনদ দেয় তাহলেই কেবল এ দণ্ড কার্যকর করা হয়।

 

বেত্রাঘাত করার নির্বাচিত দণ্ডটিকে পূর্বের রাতে পানিতে কিংবা জীবনুনাশক তরলে ডুবিয়ে রাখতে হয়। বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদরে একজন সবলদেহী সুঠাম গঠনের লোককে বেছে নেয়া হয়। দণ্ড গ্রহীতাকে রীতিমত উলঙ্গ করে একটি কাঠের ফ্রেমে ইংরেজি এ-অক্ষরের স্টাইলে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। এরপর তার হাত-পা শক্ত করে চামড়ার বেল্ট দিয়ে বেঁধে দিয়ে শরীরটি নব্বই ডিগ্রি কোনে বাঁকানো হয় যাতে অপরাধীর পাছাটা বেত্রাঘাতের জন্য উপযুক্ত স্থানে থাকে।এরপর বেত্রাঘাতের জল্লাদ তার শরীরের যাবতীয় শক্তি দিয়ে  নির্দিষ্ট সংখ্যকবার বেত্রাঘাত করে।

 

সিংগাপুরে সাম্প্রতিককালে সর্বোচ্চ ৬,৪০৬ টি মামলায় বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হয় ২০০৭ সালে এর পর এর হার ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। ২০১২ সালে ২,৫০০টি মামলায় বেত্রাঘাতের দণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। উল্লেখ্য আদালত কর্তৃক প্রদত্ত বেত্রাঘাতের দণ্ডগুলোর প্রায় শতকরা ৯৫-৯৯ ভাগ পর্যন্ত কার্যকর করা হয়

 

বেত্রাঘাতের  দণ্ড অমানবিক বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সর্বদাই সোচ্চার। জাতিসংঘ কর্তৃক গ্রহণকৃত নির্যাতনের বিরুদ্ধে কনভেনশ অনুসারে বেত্রাঘাত একটি অমানবিক নির্যাতন। তাই সিংগাপুরের বিচার ব্যবস্থার এই বহুল অনুশীলনকৃত বেত্রাঘাতের দণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বত্রই কথা উঠছে। এ দেশের বেত্রাঘাতের দণ্ড নিয়ে পাশ্চাত্য মহলে ব্যাপক হৈচৈ পড়ে ১৯৯৪ সালে যখন সিংগাপুরে বসবাসকারী  মাইকেল পিটার ফে নামের ১৮ বছরের এক তরুণকে চুরি ও ভাঙ্গচুর(ভ্যান্ডালিজম) করার অপরাধে চার মাসের কারাদণ্ড, ৩,৫০০ সিং ডলার জরিমানা ও ছয়টি বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারমাধ্যমগুলো সিংগাপুরের বিচার ব্যবস্থাকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে বর্ণনা করে বলার চেষ্টা করে যে,  ফে  এর জন্য এ শাস্তি প্রাপ্য নয় সিংগাপুরে আমেরিকান দূতাবাস থেকেও এর সাথে দ্বি¦মত পোষণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট  বিল ক্লিন্টনও শাস্তি মওকুফের আবেদন জানান। সমালোচনায় যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের দুই ডজন সিনেটরও। কিন্তু সিংগাপুর সরকার পাশ্চাত্যের কোন সেমালোচনায় কর্ণপাত করেননি। তবে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির সম্মানে মাইকেল ফে এর বেত্রাঘাতের দণ্ড ছয়টি থেকে কমিয়ে চারটিতে করা হয়। কিন্তু মাফ করা হয়নি।

 

মাইকেল ফে এর বেত্রাঘাতের দণ্ডের ঘাত-প্রতিঘাতে একটি মজার বিষয় বেরিয়ে  আসে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অফিস থেকে বেত্রাঘাতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা হয়, তবুও দেখা যায় এ শাস্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ দুভাগে বিভক্ত  হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিংগাপুর দূতাবাসে প্রচুর সংখ্যক আমেরিকান মাইকেল ফে এর বেত্রাঘাতের দণ্ড সঠিক আছে মর্মে পত্র লেখেন। আলোচনায় বেরিয়ে আসে যে সিংগাপুরের বেত্রাঘাতের দণ্ডকে অমানবিক বলে সে দেশের রাষ্ট্রপতি তা বন্ধ করার জন্য সিংগাপুরের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ করলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী সমাজে বেত্রাঘাতের দণ্ডের চেয়েও অনেক  জঘন্যতম দণ্ডের বিধান আছে যা তিনি বন্ধ করতে অনাগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোকে আদিবাসীদের নিজস্ব বিধানের অজুহাতে চালু রাখতে দিয়ে সিংগাপুরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছে। বিষয়টি যেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বকীয়তা আর সিংগাপুরের জন্য আদিমতা। বলা বাহুল্য বেত্রাঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মেকিকান্নার প্রেক্ষিতে সিংগাপুরে বেত্রাঘাতের দণ্ডের সংখ্যা দিগুণ হয়ে যায়।

 

প্রত্যেক সমাজেই বিচার ও শাস্তির প্রক্রিয়া স্বকীয় ও ভিন্নতর। এক সমাজের জন্য যা অপরিহার্য অন্য সমাজের জন্য তা অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু তাই বলে এক সমাজের সব কিছুই জঘন্য, অন্য সমাজের সব কিছ্ইু মানবিক বা  আধুনিক, এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। বেত্রাঘাতের দণ্ড সিংগাপুরসহ কতিপয় দেশের বিচার ব্যবস্থার অপরিহার্য অনুসঙ্গ। সিংগাপুরে কম সংখ্যক আইন  আছে যেখানে বেত্রাঘাতের দণ্ড ন্ইে। সেদেশের সকল সেক্টরেই শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বেত্রাঘাতের দণ্ড অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি সেদেশেক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছাত্রদের শৃঙ্খলায় রাখার জন্য বেত্রাঘাতের দণ্ড শুধু প্রচলিতই নেই, তা নিয়মিত চর্চা করা হয় এবং সিংগাপুরের শিক্ষা বিভাগ সরকারি সার্কুলারের মাধ্যমে তা কঠোরভাবে চর্চা করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে।

 

সিংগাপুরবাসীর কাছে তথাকথিত মানবাধিকারের চেয়ে সিংগাপুরের সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সিংগাপুরি নামে কোন কজ জাতীয়তার অস্তিত্ব ছিল না। বিভিন্ন ভাষা, নৃতাত্ত্বিক গঠন, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিচারে সিংগাপুরবাসীগণ এখনও  একটি একক জাতি নয়। তাদের জাতীয়তাবাদ অনেকটাই কৃত্রিম। তাই এ তৈরিকৃত জাতিকে একত্রে রাখতে হলে কঠোর শৃঙ্খলার প্রয়োজন। তাই আইন প্রয়োগ ও শাস্তির কঠোর। তা থেকে সিংগাপুর কোনক্রমেই দূরে সরে আসবে না।

নিরাপত্তার দিক দিয়ে সিংগাপুর পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিরাপদ শহর। কিন্তু সেদেশের পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তি বলেন, Low crime is no crime. অর্থাৎ অপরাধের নিম্নহার অপরাধহীনতার নামান্তর নয়। তাই তারা অপরাধকে সর্বনিম্নস্তরে এনেই তৃপ্ত নন, তারা সিংগাপুরকে কার্যত একটি অপরাধহীন সমাজে পরিণত করতে চান। এর জন্য দরকার আইনের শাসন। দ্রুততম সময়ে কঠোর শাস্তি জমাজকে শৃঙ্খলে রাখতে সহায়তা করে যা সিংগাপুর বারংবার প্রমাণিত করেছে। বেত্রাঘাতের দণ্ড এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়তা করেছে।(১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)