ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

প্রতি ঈদের ছুটিতে অন্তত একটি নতুন বই পড়ে শেষ করা আমার অনেকটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে গাড়ি ধরতে যাবার প্রাক্কালে দেখলাম হাতের কাছে কোন নতুন বই নেই। যেগুলো আছে সেগুলো অনেকবার চর্বন করা হয়েছে। তাই ছুটলাম আজিজ সুপার মার্কেটে। প্রথমেই খুঁজলাম মুক্তিযুদ্ধের উপর নতুন বই। কিন্তু সারা মার্কেট ঘুরেও নতুন কোন বই পেলাম না। যেগুলো আছে সেগুলোও কোন না কোনভাবে আমার পড়া কিংবা অমৌলিক। অর্থাৎ অন্যান্য বই থেকে ধার করে লেখা। এমতাবস্থায়, ঝুঁকলাম ইতিহাসের দিকে।

 

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলামানদের শাসনকালের ইতিহাস সর্ম্পকে আমার তীব্র আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও বাজারে নতুন বই বিরল। দোকানদার একটি বই হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এটা চেষ্টা করতে পারেন। এটা ইতিহাস নয়। তবে ইতিহাস আশ্রিত গল্প। ঐতিহ্য প্রকাশনের এ গল্পের বইটির নাম ‘মোঘলশাহি’। লেখক এ.এন.এম. নূরুল হক। লেখক আমার পূর্ব পরিচিত নয়। তার সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানিনা। তবে ঐতিহ্য প্রকাশনের বইগুলো সাধারণত মানসম্মত হয়। তাই এ বইটি নিতান্তই খারাপ হবে না।

 

বইটির ভূমিকাটুকু পড়ে নিলাম। যে কোন বইয়ের ভূমিকা পড়া আমার অন্য একটি অভ্যাস। অনেকে ভূমিকা না পড়েই সরাসরি বইয়ের মূল অংশে চলে যান। কিন্তু আমি মনে করি ভূমিকা হল একটি বইয়ের পূর্ণ নির্যাস না হলেও নির্যাসের নির্যাস। একটি বই কেন পড়ব, ভূমিকা পড়ে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে বইয়ে ‘ভূমিকা’ নামেও কোন অনুচ্ছেদ নেই। লেখা আছে ‘আভাস’। হ্যাঁ, আমি আসলে আভাসই চাচ্ছিলাম। ২৪০ পৃষ্ঠার একটি বই পড়তে একাগ্রচিত্তে সব মিলে আমাকে অন্তত চারটি ঘন্টা ব্যয় করতে হবে। চারঘন্টা ব্যয় করে আখেরে আমার কি প্রাপ্তি ঘটবে তার আভাসতো বইটি পড়া শুরু করার পূর্বেই আমাকে জানতে হবে। আভাসের শেষাংশে লেখকের বক্তব্য এভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

এই বইটি লিখতে গিয়ে আমি সর্বান্তকরণে চেষ্টা করেছি আমার লেখায় ঐতিহাসিক সত্যের যেন কোন ব্যত্যয় না ঘটে। বইটিতে গল্পের আদলে ইতিহাস উঠে এলেও ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে গল্প সরে আসেনি এক বিন্দুও। সাহিত্যের শিল্পিত দিকটি বজায় রাখতে গিয়ে সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে কিছুটা কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।

মোঘলশাহি বইটির প্রকাশকাল ২০১৫ সালের মে মাস। তার মানে বইটি একেবারেই নতুন। প্রকাশের মাত্র দুমাসের মাথায় একটি বই একদম আনকোরাই বটে।

 

ভারতের মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস সম্রাট বাবরকে দিয়ে শুরু। তবে লেখক তার বইতে মোঘলদের পূর্বপুরুষ তৈমুর লং পর্যন্ত গিয়েছেন। মোঘলরা পিতার দিক থেকে তুর্কি এবং মাতার দিক থেকে মোঙ্গল। ইতিহাসে তুর্কি ও মোঙ্গল উভয়েই প্রসিদ্ধ। এক সময় ভূখণ্ডগত এশিয়ার প্রায় পুরোটাই মোঙ্গলরা শাসন করত। তুর্কিরা এশিয়া ছাড়াও ইউরোপের বড় অংশ শাসন করেছিল। তাই মধ্য এশিয়ার ফারঘানার (বর্তমানে তুর্কমেনিস্তানে) শাসনকর্তা বাবরের প্রতিষ্ঠিত মোঘল রাজবংশ যে পিতৃ-মাতৃ উভয় কূল বিবেচনায় জাত বনেদি তা বলাই বাহুল্য। তবে পৃথিবীতে তো বটেই, এমনকি মোঘলদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পিতৃকুল বিবেচনায় তুর্কি রাজবংশ না হয়ে  মাতৃকুলের ধারা নিয়ে তারা কেন যে মোঘল নামে অভিহিত হল, সেটাই এখন গবেষণার বিষয়।

 

মোঘলশাহির জনক বাবর নাকি মোঙ্গল বিজেতা তৈমুরলং এর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষ ছিলেন। তবে এ পুরুষ-লতিকা মায়ের দিক থেকে। ১৪০৫ সালে তৈমুরের মৃত্যু হয়। আর বাবরের জন্ম ১৪৮৩ সালে। অন্যদিকে বাবর ফারঘানার সুলতান হন ১১ বছর বয়সে। এরপর ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে রাজ্যহারা হয়ে ঘুরতে থাকেন দিগবিদিক। অবশেষে কাবুলের শাসক হয়ে নিজের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। চেষ্টা করতে থাকেন ভারত জয়ের। ১৫৫৬ সালে পনিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন বাবর। প্রতিষ্ঠা করেন মোঘল রাজ বংশের যার পতন ঘটে ইংরেজদের হাতে। এ পতনের অসুভ সূচনা হয়েছিল ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীন সুলতান নবাব সিরাজউদৌলাকে পরাজিত করা মাধমে এবং চূড়ান্ত হয়েছিল ১৮৫৮ সালে মোঘলদের সর্বশেষ শাসক (তখন নামে মাত্র) বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানোর মধ্য দিয়ে। এ দীর্ঘ তিনশ বছরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি বছর শেরশাহের কাছে দিল্লির সিংহাসন খোয়ান ছাড়া  কাবুল-কান্দাহার থেকে শুরু করে সমগ্র ভারতবর্ষের একচ্ছ্ত্র অধিপতি ছিলেন বাবরের প্রতিষ্ঠিত মোঘলশাহিরাই।

 

মোঘলশাহি বইটিতে মোঘলদের মাতৃপুরুষ তৈমুরলং এর সামান্য কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। এ কাহিনীতে তৈমুরের ভারত বিজয়ের কাহিনী বিধৃত রয়েছে। কাহিনীর সূত্রও তৈমুরের নিজের নির্দেশনায় লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘তুজুক-ই-তৈমুরির’ মধ্যে নিহিত। ইতিহাসে তৈমুর পৃথিবীর সভ্যতা ধ্বংশকারী যোদ্ধাদের অন্যতম। তার স্বজাতি পুরুষ হালাগু খান বাগদাদসহ মুসলিম সভ্যতা পুড়ে ছারখার করে দিয়েছিলেন। তৈমুরও দিল্লিকে মোটামুটি প্রেতের নগরিতে পরিণত করেছিলেন। তার বর্ণনা মতেই তিনি দিল্লিতে প্রায় এক লাখ ‘কাফের’ হত্যা করেছিলেন।  তৈমুরের জীবনী মতে:

কেউ কেউ বলে পঞ্চাশ হাজার, কেউ বলে এক লাখ লোক হত্যা করেছে আমার সৈন্যরা। তবে আমর সৈন্যরা যে কী পরিমাণ দীপ্তিময় মণি-মুক্তা সবুজাভ-নীল পান্না, ঝকঝকে হীরা আর সোনা-রুপার মোহর হাতিয়ে নিতে পেরেছিল, তা পরিমাপ করা যায়নি। অসংখ্য হাতি ও উটের পিঠে লুন্ঠিত রত্নরাজি বোঝাই করে আমি সমরখন্দে ফিরে আসি। দিল্লি ছেড়ে আসার পর শুনতে পাই যে মৃতদের কবর দেয়ার মতো কোন লোকও ছিল না। পরবর্তী কয়েক মাস দিল্লি ছিল মানুষের মৃতদেহ ভক্ষণকারী শিয়াল-কুকুর ও কাক শকুনের শহর।

 

 

মোঙ্গলদের রাজনৈতিক ইতিহসা ধ্বংশলীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের প্রতিষ্ঠাতাপুরুষ চেঙ্গিস খান কাউকে কুর্ণিশ করেনি বটে। কিন্তু তিনি ও তার অধঃস্তন পুরুষদের অনেকেই পৃথিবীতে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছেন বারংবার। ১২৫৬ সালে চেঙ্গিসের অধঃস্তন পুরুষ হালাগু খান বাগদাদ নগরীর অবকাঠামোই শুধু ধ্বংস  করেননি, এ নগরির ২০ লাখ লোকের মধ্যে ১৬ লাখই হত্যা করেছিলেন। টাইগ্রিস নদীর কয়েক মাইল পানি বাগদাদবাসীর রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম শিল্পকলার যাবতীয় নিদর্শন এমনকি হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা গ্রন্থাগারগুলোও তারা ধ্বংস করে দিয়েছিল।

তবে এ হালাকু খানের সাথে মোগলশাহিদের সরাসরি রক্তের সম্পর্ক ছিল না। সরাসরি রক্ত সম্পর্ক ছিল তৈমুরলং এর সাথে। এ তৈমুর লংই দিল্লি লুন্ঠন ও ধ্বংশ করেছিলেন ১৩৯৮ সালে। এর প্রায় দেড়শত বছর পরে তারই দৌহিত্রপুরুষ বাবার দিল্লি দখল করেন; ধ্বংশের জন্য নয়, গড়নের জন্য। তৈমুর ভারতে যে ধ্বংস চালিয়েছিলেন, তারই বংশের সম্রাটগণ পরবর্তী তিনশ বছর তা শুধু গঠনই করেননি, পৃথিবীর শিল্প ও নির্মাণকলার কারিগর হিসেবে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। তৈমুরের উত্তরপুরুষ সাহাজাহানের তৈরি করা তাজমহল এখনও সারা বিশ্বের কাছে একটি জ্বলন্ত বিস্ময়। মোঘলদের এক সম্রাট যা তৈরি করেছেন, আধুনিক বিশ্বের হাজারও ধনকুবের মিলে তা শত চেষ্টাতেও তৈরি করতে পারেননি।

 

তৈমুর ছাড়াও মোঘলশাহি বইতে বাবর থেকে শুরু করে বাহাদুর শাহ পর্যন্ত ছয়জন মোঘল সম্রাটের গল্প বর্ণিত হয়েছে । তবে এগল্প যুদ্ধ বিজয়ের গল্প নয়, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা আর ঘৃণা-বিদ্বেষের গল্প। লেখকের মতে:

জয়পরাজয়ের বিস্তীর্ণ রণাঙ্গনের বাইরে মোঘলশাহির ইতিহাসের অন্য একটা সুখোঞ্চ অঙ্গনও রয়েছে। এই অঙ্গনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের আলোছায়ায় ছাওয়া টুকরো টুকরো নানা ঘটনা, রাজন্যবর্গের প্রেম-প্রীতির নানান উপাখ্যান। রয়েছে ঐতিহাসিকদের অগোচরে রয়ে যাওয়া অনেক অজানা ঘটনা আর সরস রাহিনী। রাজসিক সুধাসিক্ত এসব কাহিনীর সন্ধানে ইতিহাসের রাজপথ ছেড়ে অলিগলি পথে আমি হেঁটেছি বহুদূর। মোঘলশাহির ইতিবৃত্ত ছেঁকে তুলে আনা অনেক চমক জাগান ঘটনা আর বিচিত্র কাহিনীর সন্নিবেশে সাজান হয়েছে এই বইটি।

এবারের ঈদের ছুটিতে একটি সুন্দর বই পড়ে ছুটির সদ্ব্যবহার হল। যারা মোঘলদের সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখেন, তাদের জন্য তো বটেই, এমনকি যারা ইতিহাসের পথে তেমন হাঁটেন না, তাদের জন্যও ‘মোঘলশাহি’ সত্যিই একটি উপভোগ্য বই।