ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশ জঙ্গি দমনে শতকরা আশি ভাগ সফল হয়েছে বলে ১০ আগস্ট, ২০১৫  মাননীয় আইজিপি সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন। এ নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ পুলিশের দাবিকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু আইজিপির দাবিতে যে প্রকৃতপক্ষেই সারবস্তু আছে, সেটা অনেকই তলিয়ে দেখছেন না।

 

পুলিশ প্রধানের জঙ্গি দমনের সাফল্য দাবির সপক্ষে-বিপক্ষে জরিপ চালিয়েছিল দেশের সবচেয়ে বেশি সার্কুলেশনের বাংলা দৈনিক পত্রিকার প্রথম আলো। প্রশ্নটি ছিল এরূপঃ  জঙ্গি দমনে পুলিশ ৮০ ভাগ সফল—আইজিপির এই দাবি সমর্থন করেন কি?

 

নানা বিষয়ে প্রথম আলো অনলাইন জরিপ চালিয়ে থাকে। আমি লক্ষ করেছি অনলাইনে এ সব জরিপ প্রায় ক্ষেত্রেই মানুষের প্রত্যাশার অনুরূপ হয়ে থাকে। আমি মাঝে মাঝেই জরিপের ফলাফলগুলো দেখে থাকি। আমি লক্ষ করেছি যে বিষয়গুলো জরিপে জয়লাভ করে সেগুলোর প্রতি আমার সমর্থন থাকে।

 

অনলাইনের জরিপগুলোকে প্রায় ক্ষেত্রে মোচড়ান সম্ভব হয়। কোন গোষ্ঠী যদি মনে করে এ জরিপটিকে তারা তাদের মতো করে জেতাবেন, তবে বারংবার ভোট দিয়ে সেটা করতে পারে। আবার এ জরিপ শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির  পাঠকদের মধ্যেই হয়ে থাকে। যেমন দৈনিক ইনকিলাবের পাঠকগোষ্ঠী ও দৈনিক ইত্তেফাকের পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

 

অন্যদিকে পত্রিকার পাঠকগণ শিক্ষিত হলেও বিশেষজ্ঞ নয়। তারা সাদামাটা ধরনের মত পোষণ করে থাকেন। তাই দেখা যায়, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোও অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠকের সমর্থন পেয়েছে।  অন্য দিকে মানুষের পূর্বসংস্কাজনিত বিশ্বাসগুলোও এতে বেশ এগিয়ে থাকে । প্রকৃত সত্য যা, অনলাইন পাঠকদের সমর্থন তার বিপরীতও হতে পারে।

 

অনেক অনলাইন জরিপে পাঠক ইচ্ছেমত ভোট দিতে পারেন। কেউ ইচ্ছে করলে একাধীকই শুধু নয় কয়েক হাজার ভোটও দিতে পারেন। বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক সপ্তম আশ্চর্য নির্বাচনে যেখানে আমাদের সুন্দরবনকে জেতানোর দারুণ চেষ্টা আমরা করেছিলাম সেখােও অনলাইনে একাধীক ভোটের বিধান ছিল।

 

তবে প্রথম আলোর জরিপে একটি মাত্র সিস্টেম(কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন) থেকে কেবল একটি মাত্র ভোট দান সম্ভব। যদি কেউ একাধিক ভোট দিতে চান, তবে তাকে একাধিক কম্পিউটার ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ কেউ একশ ভোট দিতে চাইলে তাকে একশতটি ডিভাইস(কম্পিউটির বা মোবাইল ফোন) ব্যবহার করতে হবে। তাই অন্যান্য দৈনিক পিত্রকা থেকে  প্রথম আলোর জরিপটি একটু বেশি মূল্যবান।

 

জঙ্গি দমনে পুলিশ  প্রধানের সাফল্য দাবি সম্পর্কে পরিচালিত  প্রথম আলোর অনলাইন জরিপটিতে ১০ আগস্ট, ২০১৫ তারিখের রাত নয়টা থেকে পরদিন ১১ আগস্ট ২০১৫ তারিখের  রাত ৮:৫৯ মিনিট পর্যন্ত এ জরিপে মোট ভোট পড়েছে ৭,১১৭টি। এর মধ্যে হ্যাঁ ভোট পড়েছে ৩,৭৭২টি ও না ভোট পড়েছে ৩,২২২টি। শতকরা হিসেবে হ্যাঁ হল ৫৩% ও না ৪৫.২৭%। অর্থাৎ সামান্য ব্যবধানে এখানে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। (প্রথম আলো অনলাইন জরিপ)

 

পুলিশের সাফল্যকে সাধারণ মানুষ  সহজে অনুমোদ দেয় না। হাজারো ব্যর্থতার মাঝে পুলিশের সাফল্যগুলো সহজেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ পুলিশের উপর যে গভীর আস্থা ও প্রত্যাশা আরোপ করে, পুলিশের নানা সীমাবদ্ধতার জন্য সেগুলোর খুব কমই পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে পুলিশ সম্পর্কে এদেশের মানুষের মনে যে কয়েকশ বছরের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তা সহজে মুছে ফেলা সম্ভব হয়না। পুলিশের সাথে এখানে সাধারণ মানুষের একটা বড় ধরনের কমিউনিকেশন গ্যাপ রয়েছে। পুলিশের কাজে জনগণের সম্পৃক্ততা এখানে এখনও জায়মান পর্যায়ে রয়েছে। তাই কোন আইনগত কাজ আইনগতভাবে সম্পন্ন করলেও পুলিশ সমালোচিত হয়। এমতাবস্থায়, পুলিশ প্রধানের জঙ্গি দমনে সাফল্য দাবিকে প্রথম আলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক সঠিক বলে মনে করাটা অনেকটাই ব্যতীক্রমী ঘটনাই বলা চলে।

 

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, জঙ্গি দমনের ব্যাপারে আমাদের জাতীয় অর্জন আসলেই প্রশংসনীয়। আর এ জাতীয় অর্জনে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী তাদের সকল ইউনিটকে নিয়ে যে তৎপরতা চালিয়েছে তাকে কোনভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশব্যাপী বোমা ফোটানোর মাধ্যমে দেশে জঙ্গিদের যে উত্থান ঘোষিত হয়েছিল তা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই প্রশমিত হয়েছে। জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে। হরকাতুল জেহাদের নেতারা জেল খানায়। অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর নাকানি চুবানি খাওয়ার অবস্থা।

 

তবে এর অর্থ এ নয় যে জঙ্গিরা নির্মূল হয়েছে। এখনও তারা তৎপর রয়েছে। তারা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।  ব্লগারসহ বেছে বেছে অনেককেই হত্যা করছে। জেলখানায় বসে পরিকল্পনা করে আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় বাইরে থাকা জঙ্গিরা আসামী জঙ্গিদের ছিনিয়ে নিয়েছে। এতে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারগণ নিহতও হচ্ছেন। নির্বাচিত ব্যক্তিদের  হত্যা করতে গিয়ে অনেক জঙ্গি হাতে নাতে জনতা ও পুলিশের কাছে ধরাও পড়ছে। কিন্তু তারপরও জঙ্গিরা এখন আমাদের সমাজের জন্য ঘুম কেড়ে নেয়া আতঙ্ক তৈরি করতে পারেনি।
প্রতিনিয়তই জঙ্গিদের কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। চূড়ান্তভাবে সংগঠিত হওয়ার পূর্বেই তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।  নানা ভাবে তারা খোলস পাল্টালেও পুলিশ তাদের নেটওয়ার্ক দ্রুত উদ্ঘাটন করছে। তাই মাননীয় আইজিপির দাবি নেহায়তই উড়ে দেয়ার মতো নয়।

 

তবে জঙ্গি দমনের সাফল্যের পরিমাপ যাই হোক না কেন, জঙ্গি সমস্যার  স্থায়ী সমাধান এখন পর্যন্ত হয়নি। এ সমস্যা যেমন একদিনে কিংবা এক বছরে তৈরি হয়নি, তেমনি তা এক দিনে বা এক বছরে সমাধান করাও সম্ভব নয়। জঙ্গি সমস্যার মূল শুধু যে দেশে তা নয়। এটা এখন আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর সাথে যেমন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি জড়িত রয়েছে, তেমনি জড়িত রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি। তাই আন্তর্জাতিক সমর্থন, সহায়তা ও সহযোগিতা ভিন্ন বাংলাদেশ এককভাবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমর্থ হবে না।

 

সুখের বিষয় আমাদের সরকার এ বিষয়ে সচেতন। অন্য দিকে পুলিশ বাহিনীও তাদের আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থাগুলোর সাথে ইতোমধ্যেই এ সম্পর্কে কার্যকারী যোগাযোগ শুরু করেছে। জঙ্গি সক্রান্ত ঘটনাগুলোর অনুসন্ধানে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা যেমন নেয়া হচ্ছে তেমনি দেশের তদন্তকারী অফিসারদের বিদেশেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুলিশের দক্ষতা এখন পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আশা করা যায়, জঙ্গি সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান  আজ হোক আর কাল হোক হবেই। (১১ আগস্ট, ২০১৫)