ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমার এক জ্ঞাতী ভাই গ্রাম্য চিকিৎসক হলেও এলাকায় একজন ভাল ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এক সময় তার প্রাকটিসের এতটাই পশার ও প্রসার জমেছিল যে পাশ করা ডাক্তাররাও তার চেয়ে কম সংখ্যক রোগী পেতেন, কম  কামাতেন।  প্রতি বছরই ভাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হালখাতা করতেন। তার হালখাতায় কয়েক লাখ টাকার মতো আয়রোজগার হত। আমাদের মিষ্টিমণ্ডা খাবারটাও ভাল হত।

 

কিন্তু  আমার ভাই যে আসলে বড় কোন ডাক্তার ছিলেন না, তা বোঝা গেল অনেক পরে এবং সে বোঝাটা তার জীবনের বিনিময়েই বুঝতে হয়েছিল। ভাইয়ের পেটে-বুকে ব্যথা হলে তিনি পেইন কিলার খেয়ে নিতেন। এভাবে ভালই ছিলেন তিনি। কিন্তু একবার তার পেটের ব্যথা এতটাই বেড়ে গেল যে প্যারাসিটামল বা তার চেয়ে উচ্চ মাত্রার পেইন কিলারও কাজ দিচ্ছিল না। তিনি মনে করেছিলেন, এত বছর ডাক্তারি চালাচ্ছেন, আর এ সামান্য পেটের ব্যথা দূর করতে পারবেন না! তা কি করে হয়! তিনি আরো বেশি মাত্রার পেইন কিলার খেয়ে সুস্থ্য থাকার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শরীর কি সেটা মানে? ভাই বড় বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা তাকে শেষ পর্যন্ত বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম।

 

পরীক্ষার পর বড় ডাক্তার বললেন, তার বাঁচার মেয়াদ বড় জোর দু মাস। কারণ, তিনি ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। তার লিভারের ক্যান্সার এখন আরোগ্যের অতীত।  তিনি চল্লিশ দিনের মাথায় মারা গিয়েছিলেন। তবে রোগটা যাই হোক, ভাই  কিন্তু নিজ চিকিৎসায় তার  ব্যথা কমিয়ে এটাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন। অবশেষে যখন জানা গেল তিনি প্যারাসিটাম দিয়ে চিকিৎসার মতো নয়, এর চেয়েও বড় রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তখন আর করার কিছু ছিল না। তিনি মরে গেলেন। পৃথিবীর কোন কিচিৎসাই তাকে বাঁচাতে পারল না।

 

কিন্তু ক্যান্সার আক্রান্ত সবার ক্ষেত্রেই একই অবস্থা হয় না। শুরুতেই ক্যান্সারের চিকিস্যায় আরোগ্য লাভ হয়। আমার পরিচিত এক ভাই তার লিভারের একটি অংশ পাল্টিয়ে এখন বেশ সুস্থ আছেন। আমাদের এক সহকর্মী নাড়ি-ভুঁড়ির ক্যান্সার ভাল করে এখন দিব্বি চাকরি করছেন। এরা ভাল হয়েছেন। কেননা এরা শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের রোগটি ছোট নয়, বড়। তারা রোগ নিরাময়ের জন্য শুরু থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। তারা হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসা নয়, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন।

 

আমার এ নিবন্ধ আসলে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত নয়। আমি একজন অপরাধ বিশ্লেষক, অপরাধ প্রতিরোধে দুচার কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য। কিন্তু ডাক্তারি পেশার সাথে পুলিশিং পেশার সার্ভিস ডেলিভারি পর্যায়ে অনেক মিল আছে বলেই উপরিউক্ত গল্পের অবতারণা। এবার আমরা মূল বিষয়ে আসব।

 

প্রথমেই ধ্রুব সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয়, অপরাধবিহীন কোন সমাজ কল্পনা করা যায় না। পানি থাকলে যেমন মাছ বা জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদের জন্ম অবশ্যম্ভাবী; জমি বা মাটি থাকলে যেমন সেখানে উদ্ভিদ জন্মে; আকাশ থাকলে যেমন  মেঘ জন্মে, তেমনি মনুষ্য সমাজের অস্তিত্ব থাকলে সেখানে অপরাধ থাকবেই। মুসলিম বিশ্বাস মতে, এ পৃথিবীতে যখন আদম ও তার সন্তানগণ ভিন্ন অন্য কোন মানুষ ছিল না, তখনও সেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। আদমের এক সন্তান তার অন্য সন্তানকে হত্যা করেছিল। তাই পৃথিবীতে প্রথম ফৌজদারি অপরাধের সূচনা হয়েছিল হত্যা দিয়েই। পৃথিবীর প্রথম ফৌজদারি অপরাধ বলেই হোক, কিংবা আমাদের বর্তমান সমাজের বিশ্বাস মতেই হোক, হত্যা এখনও পৃথিবীতে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ বলে সবাই স্বীকার করে।

 

কিন্তু সমাজে অপরাধ থাকলেই তা সব সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে না। কারণ অপরাধ মানেই সমাজের জন্য সর্বাংশেই ক্ষতিকর কিছু নয়। বরং অনেক সময় অপরাধ সমাজের জন্য কাঙ্খিত পরিবর্তন নিয়ে আসে। কেননা, অপরাধ সব সময় সমাজের সবার জন্য একই রকমভাবে সংজ্ঞায়িত হয় না। সক্রেটিস তৎকালীন গ্রিক সমাজের তথা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী ছিলেন। কিন্তু সক্রেটিসের অপরাধই গ্রিস সভ্যতাকেই শুধু নয়, গোটা বিশ্বসভ্যতাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আজ সক্রেটিস বিশ্বপূজ্য ব্যক্তিত্ব।

 

কোন কোন মনুষ্য আচরণ সম্পর্কে প্রত্যেক সমাজেই বিশেষ কিছু ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু অনেক মনুষ্য ক্রিয়া সম্পর্কে সমাজে থাকে ভিন্ন মত। প্রত্যেক মানব সমাজেই হত্যাকে জঘন্য অপরাধ বলে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু একই সাথে হত্যা বা খুনকে আবার কাঙ্খিত ও সহনীয় আচরণ বলেও মনে করা হয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যে সুলতানগণ দৈনিক তাদের সালতানতের  সহস্র ব্যক্তিকে হত্যা করার ক্ষমতা ভোগ করতেন। ১৯৭১ সালে আমাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় জড়িত একজন পাকিস্তানী সৈনিকের হত্যা আমাদের নিত্য দিনের কামনা ছিল।

 

এখনও আমরা জঘন্য অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কামনা করি। যদিও মৃত্যুদণ্ড আইনি প্রক্রিয়ার একটি ফল, তবুও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বলে হত্যা আর এক মানুষ কর্তৃক অন্য মানুষকে হত্যার বিষয়টি তো একই। উভয় ক্ষেত্রেই একজন মানুষকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হয়। তাকে হারাতে হয় বেঁচে থাকার অধিকারটুকু। যেহেতু বেঁচে থাকার অধিকার মানুষের মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার ফলে স্বাভাবিকভাবে জাত একটি অধিকার, তাই এটি হল একটি মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার। এমতাবস্থায়, মানবাধিকারের অতিমাত্রায় পরেপকারী নীতিতে বিশ্বাসীরা আজকাল মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তাদের মতে মানুষ অপরাধ করলে তার শাস্তি অবশ্যই পেতে হবে। তবে তাকে জীবন দিয়ে সেই শাস্তি ভোগ করতে হবে, এমনটি হতে পারে না। তাই তারা জঘন্যতম অপরাধের জন্যও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিপক্ষে। বলা বাহুল্য, বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘও মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর বিচার ব্যবস্থা থেকে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করার নীতি গ্রহণ করেছে।

 

যা হোক, যখন কোন সমাজে অপরাধ-প্রবণতা সহনীয় মাত্রা ছেড়ে যায়, তখন সেই সমাজের মানুষ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, শুভ-অশুভ ইত্যাকার তাত্ত্বিক বিতর্কে কান দিতে রাজি হয় না। তারা এর থেকে উত্তরণের পথ খোঁজে। কিন্তু কি সেই পথ, কিভাবে অর্জিত হবে সেই পথের দিশা — তা আম জনতার বোধেরও অগম্য। তবে তারা একটি পথ চায়। তখন তারা হিংসা দিয়ে হিংসা, হত্যা দিয়ে হত্যাকে মেকাবেলা করার মতো সর্বজনিন ধিকৃত নীতিকেও অকাতরে সমর্থন দিয়ে যায়। অপরাধ নিয়ন্ত্র, প্রতিরোধ কিংবা সমাজকে শৃঙ্খলে রাখা যাদের দায়িত্ব, সেই সব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠী তখন মানুষের এ আপতত মধুর কিন্তু চূড়ান্তভাবে গরল সমাধানকে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়। আর আপামর আমজনতা তাদের সেই আত্মঘাতি সমাধানকে গরল জেনেও হজম করতে উদ্যত হয়। কিন্তু গরল হল আপাত মধুর। বিষ খেতে ভালই  লাগে। অনেক বিষ আপাতত মানুষের স্বাস্থকে ফুলিফে-ফাঁপিয়েও তোলে। কিন্তু এর বিষক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন মৃত্যু ভিন্ন উপায় থাকে না।

 

অপরধাধ মানুষের একটি স্বাভাবিক আচরণ হলেও নানা দিক দিয়ে তা অস্বাভাবিক। অপরাধের কারণগগুলো যেমন নানামাত্রিক ও জটিল, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ ও জটিলতর পদ্ধতির অধীন। এক বাক্যে যেমন অপরাধের কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না, তেমনি এক বাক্যে অপরাধ সমস্যার সমাধানও কেউ দিতে পারে না। এর চেয়েও বড় কথা হল, অপরাধ প্রতরোধ বা অপরাধ সমস্যার সমাধান সমাজের কোন একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্বের মধ্যেও যেমন পড়ে না, তেমনি এককভাবে কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারও  বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় অপরাধ সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

 

তবে সমাজের কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের সততা, সক্ষমতা ও সদিচ্ছার উপর অপরাধ প্রতিরোধ অনেকাংশে নির্ভর করে। বলাবহুল্য, সভ্য সমাজে পুলিশই হল সেই প্রতিষ্ঠান যাকে রাষ্ট্র বা সমাজ অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষভাবেব দায়িত্ব দিয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিই অপরাধ সমস্যা সমাধানের এখন পর্যন্ত উত্তম কৌশল বলে বিবেচিত হয়।

 

পূর্বেই বলেছি, অনেক সময় অপরাধ প্রবণতা মানুষের কাছে অসহনীয় হয় পড়ে। মানুষ অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি চায়। প্রবল খরায় যেমন ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি, আইলা , সিডর সব কিছুর মধ্য দিয়ে হলেও খরাপীড়িত মানুষ বৃষ্টির পানি কামনা করে, তেমনি অপরাধ-কবলিত মানুষও যে কোন উপায়ে অপরাধীদের বহিষ্কার, উচ্ছেদ এমনকি মৃত্যুও কামনা করে। কিন্তু তাই বলে আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য আপাত মধুর কোন অনৈতিক, বেআইনি, মানবতা বিরোধী এবং চূড়ান্ত বিচারে কোন আত্মঘাতি পদক্ষেপ গ্রহণ করা কিংবা সেই পদক্ষেপকে অনুমোদন দেয়ার সুযোগ নেই।

 

আমাদের দেশের অপরাধ প্রতিরোধের মূল সমস্যা হল, আমাদের নীতিনির্ধারণ, পরিচালনা, কৌশল প্রণয়ন ও আভিযানিক কোন পর্যায়েই অপরাধের কারণগুলো খুঁজে বের করার কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু রোগের কারণ না জেনে চিকিৎসা প্রদান যেমন চূড়ান্ত পর্যায়ে কোন কাজে আসে না, তেমনি আমাদের অপরাধ প্রতিরোধে হাতি ঘোড়া মারার মতো বড় বড় প্রকল্প বা থোক বরাদ্দগুলোও কোন কাজে আসে না।  অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ, তদন্ত ও ব্যবস্থাপনার  প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমাদের হাতুড়ি ডাক্তারদের ছড়াছড়ি। এরা প্রেসক্রিপশন হিসেবে প্যারাসিটামল কিংবা কিছু কিছু এন্টিবায়টিক দিতে পারে। কিন্তু ক্যান্সারের চিকিৎসা কিংবা অপারেশন করার মতো কোন চিকিৎসকের দেখা আমরা পাই না। তাই হাতুড়ে ও ভাড়াটে আইডিয়ার পুলিশিং দিয়ে যা হয়, সেটাও মন্দ কী! (২১ আগস্ট, ২০১৫)