ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানীগুনীদের মধ্যে একটি বিষয়ে দারুণ মিল রয়েছে। মিলটি হল, পুলিশিং বিষয়ে এরা সবাই  বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞ। রাস্তার রিকসা চালক, ক্ষেতের মজুর, কারখানার শ্রমিক, স্কুলের মাস্টার, কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বৈজ্ঞানিক ইন্সটিটিউটের গবেষক পর্যন্ত সবাই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসফল হলেও পুলিশের ব্যর্থতা নিয়ে তাদের উপদেশ খয়রাত কোন দিনই শেষ হয় না।  মহাবিজ্ঞের মতো সবাই পুলিশিং নিয়ে সরকার ও পুলিশ প্রধানকে উঠতে-বসতে, সময়ে-অসময়ে সবক দিতেই থাকেন। এরা সবাই হয় অপরাধ বিজ্ঞানী, নয়তো অপরাধ বিশ্লেষক অথবা সমাজ সংস্কারক রামমোহন।

 

সম্প্রতি এমনি একজন অপরাধ বিজ্ঞানী ও পুলিশিং বিশেষজ্ঞদের আবির্ভাব ঘটেছে বাংলাদেশের আকাশে। তিনি ঠিক ধূমকেতুর মতো উদিত হননি। কারণ বহু আগ থেকেই তিনি টিভির টকশোতে একাই একশ। এ ভদ্রলোক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, সাবেক সংসদ সদস্য এবং একজন সফল ব্যাবসায়ীও বটে। তার দলটি বর্তমানে ক্ষমতার বাইরে। অবশ্য আইন ও বিধিগতভাবে বলতে গেলে বর্তমানে তার কোন দলই নেই। কারণ অতি বেশি বুদ্ধিদীপ্ত হওয়ায় তিনি তার দলের সদস্য পদও হারিয়েছেন। কিন্তু তার পরও তিনি নিজেকে সেই দলের লোক বলেই মনে করেন; আকারে ইঙ্গিতে বোঝান।

 

যাহোক, সে বুদ্ধিদীপ্ত প্রাক্তন সেনানীর দলীয় পরিচয়টি এ নিবন্ধে তেনম প্রাসঙ্গিক নয়। তার সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, তিনি একজন স্বঘোষিত অপরাধ বিজ্ঞানী, একজন পুলিশিং বিশেষজ্ঞ। তিনি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একজন নতুন তত্ত্বদাতাও বটে। একদা টিভির এক টকশোতে বাংলাদেশের সকল অপরাধের মূলে তিনি পুলিশ বাহিনীর অস্তিত্বকে দায়ি করেছিলেন। তার মতে, বাংলাদেশে যত অপরাধ সংঘটিত হয় সেগুলোর সবই হয় পুলিশ করে কিংবা পুলিশ অন্যদের দিয়ে করায়। তাই পুলিশ হল বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি বড় সড় দানব বা মনোস্টার। তাই পুলিশ বাহিনীকে বিলুপ্ত করাই হবে অপরাধ নির্মূলের একমাত্র উপায়; সহজতম সলিউশন। তার ভাষায়, ‘আজকেই বাংলাদেশের সব পুলিশকে কাজ করা থেকে বিরত রাখুন, আগামী কালই বাংলাদেশে অপরাধ শূন্যের কোটায় নেমে আসবে’। তার টকশোটি একটি জনপ্রিয় কেবল টিভিতে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশেয় সচেতন নাগরিকদের অনেকেই  তা দর্শন, শ্রবণ ও উপভোগ করেছেন।

 

পুলিশকে অনেক সাহিত্যেই প্রয়োজনীয় বালাই বা Necessary Evil বলে উল্লেখ করা হয়। কারণ পুলিশ না হলে যেমন চলে না, তেমনি পুলিশ নিয়ে ঝামেলাও কম হয় না। পুলিশ যেমন নিরাপত্তা বিধান ও শান্তিরক্ষা করে, তেমনি পুলিশের দ্বারা অনিরাপত্তা ও অশান্তিরও সূচনা হতে পারে। পুলিশ কার্যক্ষেত্রে দেশের রাষ্ট্র প্রধানের চেয়েও ক্ষমতাধর হতে পারে, সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতে পারে। আর সময়ে-অসময়ে শ্রেণি-বর্ণ-ব্যক্তি নির্বিশেষে তা রাস্তা ঘাটে প্রয়োগও করতে পারে। রাষ্ট্রের আইন-কানুন-বিধি-বিধান ও জনগণের অনুমোদন পুলিশকে যে সামান্য ক্ষমতা দিয়েছে তা বাস্তব ক্ষেত্রে অসামান্য।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তা শাসন করে সে দেশের সামান্য একজন ট্রাফিক পুলিশ। সে তাৎক্ষণিকভাবে যে নির্দেশ দেয়, আমেরিকার রাস্তার সবাই তা মেনে চলতে বাধ্য থাকে। অবাধ্যজনকে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠাতে পারে। মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ, সন্দেহপূর্ণ আচরণে, তর্কে-বিতর্কে সন্তুষ্ট কিংবা অসন্তুষ্ট হয়ে পুলিশ যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু আমেরিকার এক জন বিচারক তা কি পারেন ? কোর্ট-কাচারি আদালতের বিচারক কাউকে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলানোর রায় দিতে পারেন। কিন্তু বিনা পরোয়ানা সন্দেহবসত কোন নাগরিককে গ্রেফতারের ক্ষমতা তাদের নেই। অথচ পুলিশের একজন কনস্টেবলও বিনা পরোয়ানায় যে কোন নাগরিককে গ্রেফতার করতে পারে।

 

যে সাধারণ পুলিশের অসাধারণ ক্ষমতা সেটার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ উভয় কারণেই সমাজের মানুষ পুলিশকে ভয়, ঘৃণা, সম্মান, সমীহ ও বিস্ময়ের চোখে দেখে। মানুষের চিরায়ত প্রবণতাই হল আইন ভঙ্গ করা। শৃঙ্খলা নষ্ট করে আপনার মতো করে চলা। কিন্তু পুলিশ তাদের সেই ‘যেমন খুশি, তেমন চলায় বাধ সাধে; আকস্মাৎ বাগড়া দেয়। এর বাইরে আছে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ইত্যাদি হাজারও প্রকার অভিযোগ। তাই পুলিশকে অপছন্দ করা , অচ্ছুৎ ভাবা, এডিয়ে চলা এবং সময়ে অসময়ে সুযোগ পেলে দুই ঘা বসিয়ে দেয়ার মানুষের অভাব নেই। কিন্তু শ্রম বিভাজনের চরমতম উৎকর্ষের এ আধুনিক সমাজে পুলিশবিহীন দিন-ক্ষণ, স্থান-পাত্র কেউ ভাবতে পারেন না। ‌’ডাকুন বা নাই ডাকুন; রক্ষক হোক আর ভক্ষক হোক; গালি দেন বা অচ্ছুৎ বলেন, পুলিশ আধুনিক জীবনের অপরিহার্য বাস্তবতা[১]

 

তাই পুলিশকে বিলুপ্ত করার কোন তাগিদ কেউ এখন পর্যন্ত কেউ অনুভব করেননি। কোন সমাজ বা রাষ্ট্র নিজেদের পুলিশ বিহীন কল্পনাও করতে পারে না। ঢাকার রাস্তায় একটি দুপুর ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে কি হবে সেটা যানবাহন ব্যবহারকারীগণ সহজেই অনুমান করতে পারেন। কিন্তু অনুমান করতে পারেন না শুধু নিবন্ধে আলোচিত অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মহোদয়।

 

গত কয়েকদিন আগে এ উদ্ভট কল্পনার স্বঘোষিত ফৌজদারি-বিশেষজ্ঞ সাহেব একটি দৈনিক পত্রিকায় বড় সড় একটি কলাম লিখেছেন। কলামে তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে নির্বাহী আদেশ বলে বৈধ করার এক বাল্যখিল্যপূর্ণ মডেল তুলে ধরেছেন। তিনি সরকারকে পুলিশ বাহিনীর অপরাধ গোয়েন্দা বিভাগ, র‌্যাব কিংবা অন্য কোন ইউনিটে ক্রসফায়ারের জন্য আলাদা সেল খোলার পরমর্শ দিয়েছেন। এসব সেল থেকে কথিত অপরাধীদের বিনা বিচারে দুনিয়া থেকে বিদায় করা সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। আবার ক্রসফায়ারে যাতে কোন পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত শত্রুকে বা ভুল ব্যক্তিতে হত্যা না করে বসেন, সে জন্য তাদের ক্রসফায়ারকে জাস্টিফাইড করার জন্য উচ্চতর রিভিউ সেলের মডেল তুলে ধরেছেন। কেউ সঠিক ব্যক্তিটিকে ক্রসফায়ার না করে ভুল ব্যক্তিকে ক্রসফায়ার করলে সেই পুলিশ কর্মকর্তাকেও ক্রসফায়ার করার বিধান দিয়েছেন।

 

দেশে বিচারবর্হিভূত কোন হত্যাকাণ্ড হয় কিনা সেটা অনেক তর্কের বিষয়।  পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে কেউ নিহত হলেই তাকে বাছবিছার ছাড়া হত্যাকাণ্ডই বলা যাবে না। পুলিশিং সব সময়ই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি নিযুক্তি। পুলিশিং কোন যুদ্ধ নয়। কিন্তু একটি যুদ্ধের দ্বারা সংঘটিত অনিরাপত্তার চেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিপরীতে পুলিশের ঝুঁকি কোন অংশেই কম নয়।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর গড়ে শতাধিক পুলিশ অফিসার সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়। আবার এর বিপরীতে পুলিশের হাতেও প্রতি বছর প্রায় চারশয়েরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এসবই ঘটে গুলি-পাল্টাগুলি  ও আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার আড়ালেই। একই ভাবে বাংলাদেশের সমাজও ক্রমান্বয়ে সহিংস হয়ে উঠছে। এমতাবস্থায়, পুলিশের আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার সুযোগটুকুকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে, বিচার বহির্ভূত কোন হত্যা কাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কোন প্রস্তাব কোন সুস্থ মস্তিস্কের মানুষের পক্ষে করা অনেকটাই অস্বাভাবিক; এটা ভাবাই মুসকিল।

 

আমাদের আলোচিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ অপরাধ নির্মূল নয়, অপরাধী নির্মূলের যে মডেল দাঁড় করিয়েছেন তার সাথে প্রাচীন কালের বেবিলনীয় সম্রাট হাম্মুরাবির  আইনের যেমন মিল রয়েছে, তেমনি মিল রয়েছে প্রাচীনকালের গ্রিক সম্রাট ড্রাকোর আইনেরও । হাম্মুরারি আইনে চোখের বদলে চোখ; দাঁতের বদলে দাঁত নেয়ার বিধান ছিল। বিধান ছিল কোন বিচারক ভুল করলে কিংবা কোন লোক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে তাকে মূল অভিযোগের অনুরূপ বা সমপরিমাণ শাস্তি দেয়া। অর্থাৎ কেউ কারো বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ এনে তা প্রমাণে ব্যর্থ হলে অভিযোগকারীকেই হত্যার আদেশ দেয়া হত।

 

অন্যদিকে সম্রাট ড্রাকোর রাজ্যে একটি এক পয়সার রুমাল চুরি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রদ্রোহ পর্যন্ত সকল অপরাধের একমাত্র শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। একবার ড্রাকোকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তার রাজ্যের আইনে অপরাধের শাস্তি এত কঠিন কেন? আর কেনই বা সকল অপরাধের জন্য একই শাস্তি-মৃত্যুদণ্ড ? ড্রাকো নাকি বলেছিল, মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে কঠিন কোন শাস্তির কথা তার জানা নেই। থাকলে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে  তিনি সেই শাস্তিই দিতেন।

 

যা হোক, আমরা বেবিলন আর ড্রাকোর যুগ থেকে কয়েক হাজার বছর এগিয়ে এসেছি। এখানে মানবিকতার যেমন বিবর্তন ঘটেছে, তেমনি অপরাধ সমস্যা সমাধানের জন্য যুগোপযোগী পন্থাও বের হয়েছে। আমাদের দেশে রয়েছে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থা। আমাদের বিচার ব্যবস্থার  হাজারও ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু তাই বলে এটা একদম পচে গিয়ে পুরোপুর অকেজো হয়ে যায়নি। বিচার ব্যবস্থার উপাদানগুলো নানা কারণে কাঙ্খিত মাত্রায় ক্রিয়াশীল নয়। কিন্তু তাই বলে এগুলোকে অকার্যকরও বলতে পারি না। পুলিশ থেকে শুরু করে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিচার প্রাপ্তির সকল পর্যায়েই ত্রুটি থাকার পরও বলতে হবে ন্যায় বিচারের ব্যবস্থা এ দেশে আছে।আমাদের উচিত হবে এই ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করা। এ ব্যবস্থায় সংযোজন, বিয়োজন,উন্নয়ন ও  সংস্কার চলতে পারে।

 

কেউ যদি প্রচলিত বা বৈধ বিচার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বিনা বিচারে কথিত অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালুর পরামর্শ দেন; এর জন্য আবার বুদ্ধিদীপ্ত মডেলও দাঁড় করান, তবে তিনি সন্দেহাতীতভাবে একজন উদ্বায়ুগ্রস্ত আদম। আইনের বাইরে গিয়ে আইন প্রয়োগ করার জন্য পুলিশ বা সরকারকে ওসিয়তকারী এসব স্বঘোষিত অপরাধ বিজ্ঞানী ও পুলিশিং বিশেষজ্ঞের জন্য মানসিক হাসপাতালে সুচিকিৎসার প্রয়োজন। (২৬ আগস্ট,২০১৫)

সূত্রবাবলী:

[১].

Welcome or unwelcome, protectors, pigs or pariahs, the police are an inevitable fact of modern life.  (The Politics of the Police by Robert Reiner, second edition. page-11)